গরিবের পার্টির সাতকাহন - ৩৪ বছরের কালরাত্রি :
এখনো কিছু এমন মানুষ আছেন , যারা শ্বেতশুভ্র পোশাক পরিহিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের , ক্যামেরার সামনে গুছিয়ে কথা বলার ভিডিও পোস্ট করে বলেন - উই মিস ইউ অথবা বুদ্ধবাবু নাকি শিক্ষিত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন I কেউ আবার বলেন , বুদ্ধবাবুর মুখ চেয়েই নাকি বিদেশ থেকে স্বদেশে ফিরেছিলেন I
সিপিএমের সব থেকে বড় সাফল্য বোধহয় , বিপুল সংখ্যক বাঙালির মস্তিষ্ক প্রক্ষালন করে , মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া -
#ক ) রাজনৈতিক বিরোধী মানেই শ্রেণী শত্রু , যাদের খুন করলে দল পাশে থাকবে , এবং শ্রেণীশত্রু নিকেশ করা দলের প্রতি আনুগত্যের মাপকাঠি I
#খ) পার্টি যাই করুক , সেটাই ঠিক - ইংরাজি তুলে দিলে ও ঠিক , কম্পিউটারের বিরোধিতা করলেও ঠিক , মানুষ খুন করলেও ঠিক I
#গ) পার্টির স্বার্থ বিঘ্নিত হয় অথবা যে সব ব্যক্তি মাথা নুইয়ে দলের দাসানুদাস হয়না , তাদের চরম অপমান করা দলের পবিত্র কর্তব্য I
#ঘ) এই একটি দল , যারা বাঙালিকে শিখিয়েছে , সরকারে থেকে কি করে বন্ধ ডেকে রাজ্য অচল করে দিতে হয় , বিদ্যালয় প্রাঙ্গন থেকে সরকারি অফিস - যে কাজের জন্য প্রতি মাসে মাইনে নেবে , সেই কাজ না করে দিনের পর দিন পার্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার নামই বিপ্লব I
বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের অমাবস্যায় দুজন মুখ্যমন্ত্রীকে বাংলার মানুষ দেখেছে - জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য I
এবারে সেই গরিবের পার্টির মহান একমেবাদ্বিতীয়ম অবিসংবাদিত নেতা - শ্রীল শ্রীযুক্ত পূজ্যপাদ বঙ্গেশ্বর শ্রী শ্রী জ্যোতি বাবুর কথায় আসা যাক :
১৯৭২ সালে সল্টলেকে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় অধিবেশনের প্রাক্কালে এ বাড়িটি গড়া হয়েছিল। যার নাম ছিল ‘পর্ণকুটির’। পরে ওই বাড়িতে ইন্দিরা গান্ধীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সল্ট লেকের এই বাড়িটিই " ইন্দিরা ভবন " নামে পরিচিত এবং জ্যোতি বসু ১৯৮৯ সাল থেকে ওই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। জীবনের শেষ ২০ বছর ইন্দিরা ভবনেই কাটিয়েছিলেন I
নরেন্দ্র মোদির বিদেশভ্রমন নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন , এতো ঘুরে কি লাভ হলো , তাদের জ্যোতি বসুর ভ্রমণ বৃত্তান্ত আগে থেকে জানা থাকলে হয়তো খাতা কলম নিয়ে হিসেব করতে বসতেন , কে বেশি ঘুরেছে , দেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী I
জ্যোতি বসুর ভ্রমণ বৃত্তান্ত :-
১৯৭৭: যুগোস্লাভিয়া ও ব্রিটেন ভ্রমণ।
১৯৭৯:রোম, বেলগ্রেড, ওয়ারশ ও জেনিভা ভ্রমণ।
১৯৮০:লন্ডন, মস্কো ও হাঙ্গেরি সফর।
১৯৮১:লন্ডন, জেনিভা, প্যারিস ভ্রমণ।
১৯৮৩:সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর। বুদাপেস্ট, প্যারিস, আমস্টারডাম ও লন্ডন যাত্রা।
১৯৮৪:চীন ও হংকং যাত্রা করেন মে মাসে। ইংল্যান্ড এবং পরে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর।
১৯৮৫: ইংল্যান্ড ও জার্মান ভ্রমণও সোবিয়েত ইউনিয়ন সফর।
১৯৮৭: ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর। বিনিয়োগ অানার জন্য ইউরোপ, অামেরিকা যান।
১৯৮৮:জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ভ্রমণ।
১৯৮৯:ইংল্যান্ড , অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানি সফর।
১৯৯১: ইংল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানি সফর।
১৯৯২:ইংল্যান্ড, হামবুর্গ, রোম ও ফ্লোরেন্স ভ্রমণ।
১৯৯৩:ইংল্যান্ড ও কিউবা ভ্রমণ।
১৯৯৪:ইংল্যান্ড ও সুইৎজারল্যান্ড ভ্রমণ।
১৯৯৫: ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা।
১৯৯৭ : ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ।
Source :
http://spordha.com/এক-নজরে-কমরেড-জ্যোতি-বসু/
ভোজন রসিক জনদরদী গরিবের দুঃখে কাতর মহান নেতার রসনাতৃপ্তির একটি অকিঞ্চিতকর নমুনা :-
উত্তরবঙ্গের একটি বিখ্যাত মাছের নাম - বোরোলি I
কোচবিহারের মহারানি ইন্দিরা দেবী যখন কলকাতা বা মুম্বইয়ে থাকতেন, তখন তাঁর জন্য বিমানে বোরোলি মাছ পাঠানো হত রাজ পরিবারের তরফে। রাজ-আমল পেরিয়ে বাম আমলেও প্রশাসকের পছন্দের মেনুতে পাকাপাকি ঠাঁই মিলেছিল বোরোলির। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু তাঁর আপ্ত সহায়ক জয়কৃষ্ণ ঘোষকে বোরোলির স্বাদ চেখে দেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
রাজ্যের প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু উত্তরবঙ্গে এলেই বোরোলি মাছের রকমারি পদ থাকত তাঁর জন্যে সাজানো ডাইনিং টেবিলে। মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে জ্যোতি বসু একটা সময়ে ফি বছর পুজোর ছুটি কাটাতেন হলংয়ে। সেখানে প্রায় রোজকার মেনুর অপরিকার্য আইটেম ছিল বোরোলি।
জ্যোতি বাবুর রোজনামচার পাশাপাশি , গরিবের পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন , বঙ্গের গরীবগুর্বো মানুষদের অবস্থা :
২০০৪ সালে পশ্চিম মেদিনীপুর (এখন ঝাড়গ্রাম) জেলার ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন, শবর-মুন্ডা (মুড়া) অধ্যুষিত অখ্যাত গ্রাম আমলাশোলে পাঁচ জন মানুষের অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল I
রাজনীতিতে অসৌজন্যের অনুপ্রবেশ এ রাজ্যে নতুন কিছু নয়৷ নেতাজিকে ‘তোজোর কুকুর’ কিংবা রবীন্দ্রনাথকে ‘বুর্জোয়া কবি’-বলার মধ্যে দিয়ে সূচনা হয়েছিল এই প্রবণতার৷ এরপর বারবার দলমত নির্বিশেষে সৌজন্যর গণ্ডী টপকেছেন একাধিক নেতা-নেত্রী৷ চোখে দেখতে না পাওয়ায় ছয়ের- দশকে কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষকে ‘কানা অতুল্য’ বলে কটাক্ষ করত সিপিএম৷ আপাদমস্তক সাধারণ জীবনযাপন করা প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধে স্টিফেন হাউস কেনার অভিযোগ তুলতেও পিছপা হয়নি তারা৷ পরবর্তীকালে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম মুখে আনতেও দ্বিধাবোধ করতেন তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু৷ ‘উনি’ বা ‘ও’-ছাড়া কখনওই মমতাকে নাম ধরে সম্বোধন করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি জ্যোতি বাবু৷ সিপিএমের প্রয়াত রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস মমতাকে বলেছিলেন, ‘যমের অরুচি’ I
যদিও, পরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন অনিল বিশ্বাস৷ জ্যোতি বাবুর পর মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন চরম অসৌজন্যের প্রদর্শন করেছিলেন, যখন ক্ষমতার দম্ভে তিনি বলেছিলেন,‘আমরা ২৩৫, ওরা ৩০’
যদিও, যাবতীয় সৌজন্যের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের যে লজ্জাজনক নজির প্রাক্তন সিপিএম নেতা অনিল বসু স্থাপন করেছিলেন, তাঁর জুড়ি মেলা ভার৷ মমতাকে আক্রমণে অনিল বসুকে কড়া টক্কর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর সতীর্থ সুশান্ত ঘোষ৷
নন্দীগ্রাম পর্বে মেধা পাটকরদের হুমকি দিয়ে প্রয়াত বিনয় কোঙার বলেছিলেন, ‘চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে লাইফ হেল করে দেব৷’ এবং, ‘ওরা নন্দীগ্রামে গেলে মানুষ পাছা দেখাবে৷’ কম যান না সিপিএমের অনিল বসু এবং আনিসুর রহমান-ও৷ তাঁরা দু’জনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্কে সাধারণত ছাপার অযোগ্য মন্তব্য করেছিলেন৷
বেশ কয়েক বছর আগে আশুতোষ কলেজের অধ্যক্ষ শুভঙ্কর চক্রবর্তী মেয়েদের সালোয়ার কামিজ পরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন৷ পরে অবশ্য তাঁকে ঢোক গিলতে হয়৷
সাংবাদিক বৈঠকে মেজাজ হারিয়ে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল-কংগ্রেস সর্ম্পক নিয়ে অশালীন মন্ত্যব করে বির্তকে জড়িয়েছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ও বামফ্রন্ট সভাপতি বিমান বসু।
সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে একটা পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করা হয় তৃণমূল ও কংগ্রেসের সর্ম্পক নিয়ে। এই সময় তিনি মেজাজ হারিয়ে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করেন।
তিনি বলেন, কংগ্রেস-তৃণমূল সর্ম্পক শাড়ির ওপরে, নাকি শাড়ির তলায় থাকবে তা আমি জানব কী করে?
জ্যোতি বসুর পরে , মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য , দশ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকালীন চারটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা :
১) দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের লোকজনদের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু I
২) নন্দীগ্রামে ১৪ জন মানুষের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু I
৩) সিঙ্গুরে চাষিদের জমি কেড়ে নিতে পুলিশ পাঠানো এবং অকথ্য অত্যাচার I
৪) নেতাইগ্রামে সিপিএম ক্যাডারদের গুলিতে ৯ জন নিরীহ গ্রামবাসীর মৃত্যু I
'দে হ্যাভ পেইড বাই দেয়ার ওন কয়েন্স’ (ওরা নিজেদের জালেই ফেঁসেছে)। স্মরনীয় এই উক্তিটি করেছিলেন তৎকালিন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
জ্যোতি বাবু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ১৯৭৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত , এই ২৫ বছর সময়ে কেমন ছিল বাংলার অবস্থা ?
১৯৯৫ সালের ইন্ডিয়া টুডে ( #India #Today ) পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কিয়দংশ এখানে দিলাম :
" Last year, against a backlog of 52 lakh applicants, over 12,000 got jobs through the employment exchange. Moreover, an estimated 55,000 industrial units are closed across the state, a few for the past 15 years. "
আপনারা ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৭৭ সালে , এবং ১৯৯৫ সালে , ৫৫,০০০ কলকারখানা বন্ধ , শুধু তাই নয় , ১৯৯৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী , ৫২ লক্ষ্য নথিভুক্ত বেকারদের মধ্যে চাকরি পেয়েছিলো মাত্র ১২০০০ I
Source :
https://www.indiatoday.in/magazine/living/story/19950331-despite-govts-promises-of-a-better-future-west-bengal-records-highest-suicides-cases-807068-1995-03-31
বামপন্থীদের অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায় , ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
বুদ্ধবাবু নিজেই বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন , ৭৭ থেকে ৯৭ পর্যন্ত তাদের জামানায় ২৮, ০০০ মানুষ খুন হয়েছিলেন I
" In 1997, Buddhadeb Bhattacharjee, in a reply to an Assembly question, stated that between 1977 (when they came to power) and 1996, 28,000 political murders were committed. "
https://www.mainstreamweekly.net/article2234.html
১৯৮৪–র লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় জীবনে প্রথম ও শেষবার হারেন। মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার চেয়েও সঞ্জীব ও তীর্থঙ্কর নামে দুটি ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুর আদালতে সিবিআই তদন্তের দাবির বিরোধিতা করেই ডেকে আনেন তাঁর পরাজয়।
Source :
https://aajkaal.in/news/editorial/post-edit-tii0
বাম জামানার রক্তাক্ত নৃশংস ইতিহাস , সেই সাক্ষী বহন করে :
সাইবাড়ি ( ১৯৭০ )
কাশিপুর - বরানগর ( ১৯৭১)
মরিচঝাঁপি ( ১৯৭৯ )
বিজন সেতু ( ১৯৮২ )
বানতলা ( ১৯৯০ )
ধর্মতলা ( ১৯৯৩ )
সুচপুর ( ২০০০ )
ছোট আঙ্গারিয়া ( ২০০১)
সিঙ্গুর ( ২০০৬ )
নন্দীগ্রাম ( ২০০৭ )
বাসন্তী ( ২০০৮ )
নেতাইগ্রাম ( ২০১১)
জ্যোতি বাবুর সময় ৫৫,০০০ কলকারখানা বন্ধ , এবং ৯৬' সাল পর্যন্ত ২৮,০০০ মানুষ খুন , বুদ্ধবাবুর জামানায় , দশ বছরে চারটি নৃশংস অত্যাচারের ঘটনা I
যদি সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে ক্যামেরার সামনে গুছিয়ে কথা বলতে পারলেই শিক্ষিত হওয়া যেত , তাহলে বিজয় মাল্য , নীরব মোদী , ললিত মোদী - এরা সবাই শিক্ষিত , কারণ এদের ভালো পোশাকের অভাব নেই আর এরা গুছিয়ে কথা বলতেও পটু I
#সংগৃহীত
Video link :
https://youtu.be/JLzonzmnAVQ
https://youtu.be/osmXfpdqhXU
https://youtu.be/t190BVQJkCo
https://youtu.be/-CdVUGf5gsw
https://youtu.be/Ek549Hab5aE
.........................xxxxx............
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে......
সঞ্জীব ও তীর্থঙ্কর হত্যাকাণ্ড
১৯৮৪ সালে লোকসভা ভোটে জাঁদরেল নেতা ও দুঁদে আইনজীবী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এক অজানা অচেনা প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে হেরে গেলেন। শুধুই কী ইন্দিরা গান্ধী হত্যার সহানুভূতি ভোটে?
এই মানেটা খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে আরও কয়েকটা মাস।
সম্ভবত তিরাশি সালের ঘটনা, মাসটা মনে নেই। ব্যান্ডেল-বর্ধমান সেকশনে রেল লাইনের ওপর পাওয়া গেল রহড়া মিশন স্কুলের দুই মেধাবী ছাত্রের মৃতদেহ। সঞ্জীব ও তীর্থঙ্কর, দুজনেই ব্যারাকপুর চন্দনপুকুর এলাকার বাসিন্দা। সঞ্জীবের পরিবার ব্যাবসায়ী, শহরে দুটো চালু চশমার দোকান আর তীর্থঙ্করের বাবা ছিলেন বেসরকারি কোম্পানীর পদস্থ আমলা। দুই বন্ধু বিকেলের দিকে চিড়িয়া মোড়ে এসেছিল, আর বাড়ি ফেরেনি। রাতেই থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। পরদিন সকালে রেললাইনে পুলিশ দুই অজ্ঞাত পরিচয় কিশোরের দেহ দেখতে পেয়ে খবর দেয় তাদের বাড়িতে। দেখতে এসে আকাশ ভেঙে পড়ে দুই পিতার, দেহ দুটো তাদের আদরের সন্তানদের!
প্রশাসন প্রথম থেকেই বলে আসছিল এটা নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা, কিন্তু সেই তত্ত্ব বাড়িতো বটেই পাড়ার লোকজনদেরও হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল। কেন দুই স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে আত্মহত্যা করবে, তাও বাড়ির থেকে অতো দূরে?আর তারা যে সেদিন চিড়িয়া মোড়ে এসেছিল সেটাও দেখেছেন অনেকে, তাহলে? মৃতদেহ দেখে অনেকেরই মনে হয়েছিল ট্রেনে ধাক্কা লাগার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশ রিপোর্টে সন্তুষ্ট না হয়ে তদন্তের জন্য দুই কিশোরের পরিবার নিযুক্ত করে সেই আমলের এক বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ সংস্থা কে। অন্তর্তদন্তে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর কাহিনী।
আদালতে রাজ্য সরকারের হয়ে মামলাটি লড়ছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি সাক্ষ্য প্রমাণ সহকারে এটাই প্রমাণ করতে চাইলেন, ছেলে দুটি আদৌ খুন হয়নি। এর মাঝে তৎকালীন পার্টি সম্পাদক সরোজ মুখার্জি এমন এক মন্তব্য করে বসলেন যা রাজ্যের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এমনকি সেই মন্তব্য খোদ বিমান বাবুর মা অব্দি ভালোভাবে নেননি, আঘাত করেছিল তাঁর অন্তরে।আর তাই ঘরের ছেলেকে ভোট না দিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম বার ভোটে দাঁড়ানো কংগ্রেসের এক অচেনা প্রার্থীকে!
কি হয়েছিলো মেধাবী ছেলে দুটোর সাথে? পটভূমিকা হার মানাবে যে কোন টলিবলি চিত্রনাট্য কে। সুযোগ পেলেই এরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। নেশা ছিল ছবি তোলার আর তাই সাথে থাকতো ক্যামেরা। এমনই ঘুরতে ঘুরতে একদিন তাদের চোখে পড়েছিল নীলগঞ্জ রোডের ওপর এক পরিত্যক্ত বাড়ি। আডভেঞ্চার প্রিয় ছেলে দুটি জঙ্গল ঠেলে ঢুকেছিল সেই হানাবাড়িতে আর তারপর...... ?
বিস্মিত হয়ে দেখে সেখানে রয়েছে লেদ মেশিন আর সারি সারি অর্ধ সমাপ্ত বন্দুক! ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত গ্রেনেডের খোল। বিস্ময় কাটিয়ে ছবি তুলে নেয় তারা। খবর কিন্তু চাপা থাকেনি। লেখা হয়ে যায় তাদের মৃত্যু পরোয়ানা, শীলমোহর দিলেন এলাকার দাপুটে শিক্ষক-নেতা ( শু.বা এখনো বেঁচে আছে, পচেগলে মৃত্যু ওর কপালে লেখা যে)। অনেকদিন ধরেই ফলো করা হতে থাকে তাদের, সুযোগ আসে ঐদিন। সেদিন বালক ব্রহ্মচারীর অনুগামীদের এক শোভাযাত্রা বেরিয়েছিল সন্ধ্যার দিকে। প্রায় শ'খানেক লোক ঢাক ঢোল করতাল নিয়ে তারস্বরে রামনাম করতে করতে হাঁটছিলো বড়রাস্তা দিয়ে। চিড়িয়ামোড় থেকে ঐ মিছিলের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে সঞ্জীব তীর্থঙ্কর। এরপর সবটাই অনুমান। মিছিল থেকেই তাদের নাকমুখ চেপে ধরে তুলে নেয়া হয় সঙ্গের গাড়িতে। আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় ঢাকঢোল করতালের আওয়াজে !
আনন্দবাজারের সৌজন্যে সে সময় এই ঘটনায় জনমত প্রবলভাবে ছিল রাজ্য সরকারের বিপক্ষে ৷ যাদবপুর কেন্দ্রে অনামী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সোমনাথ বাবুর অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের সেটাও ছিল একটা বড় কারণ, শুধুই ইন্দিরা হত্যার সহানুভূতির হাওয়া নয়। দুটি নিষ্পাপ কিশোরের হত্যার ঘটনাকে সোমনাথবাবু অস্বীকার করতে চাইছেন, অনেকেই সে সময় তা মেনে নিতে চায়নি৷ যাদবপুরে হারের ব্যথা দুঁদে মানুষটিও ভুলতে পারেননি অনেক অনেক দিন৷
সরকারি কৌঁসুলি হয়ে অবশ্য মামলায় জিতিয়েছিলেন সরকার কে, কিন্তু চরম রাজনৈতিক মাশুল গুনতে হয়েছিল বাঘা আইনজীবী সোমনাথ চাটুজ্জেকে। বলতে দ্বিধা নেই, ব্যারাকপুরে রহস্যময় দুই তরুনের হত্যাকান্ডের ঘটনা পরোক্ষ ভাবে তৈরি করে দিয়েছিলো রাজ্য রাজনীতির এক ভবিষ্যৎ জায়ান্ট কিলারের রাজনৈতিক ভিত!
(চলবে)।
৭১’র রক্তক্ষয়ী বাংলায় তখন বিধানসভা নির্বাচনের দামামা। কমিউনিস্ট নেতা চারু মজুমদারের ঘাতক বাহিনীর হাতে রক্তাক্ত বারাসাত দমদম বরানগর সহ মহানগরেরও বিস্তীর্ণ অংশ। কলেজ স্ট্রিটে কমিউনিস্ট ভ্যাণ্ডালদের হাতে ভুলুণ্ঠিত বাংলার নবজাগরণের নাস্তিক নায়ক বিদ্যাসাগর। রাজ্যের দিকে দিকে চলছে স্কুল-লাইব্রেরি পোড়ানোর বহ্ন্যুৎসব। কমিউনিস্ট নেতা অসীম চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবরেটরি। ২০’ই ফেব্রুয়ারি উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরের প্রকাশ্য রাস্তায়, দিনের আলোতে খুন হলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয়তাবাদী ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা হেমন্ত বসু, যিনি, তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী অজয় মুখোপাধ্যায়ের পক্ষে ছিলেন। যুক্তফ্রন্টে তখন চলছে সরকারের ভিতরেই জ্যোতি বসুর মার্ক্সবাদী সাবোতাজের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী অজয় মুখার্জিদের সত্যাগ্রহ। বাংলার ইতিহাসে প্রথম ও শেষবার কোনো মুখ্যমন্ত্রী নিজের সরকারের বিরুদ্ধে অনশনে বসেছিলেন যুক্তফ্রন্ট আমলেই; সিপিয়েমের বিষাক্ত এনক্রোচমেন্ট থেকে বাংলাকে বাঁচাতে বিপ্লবী অজয় মুখোপাধ্যায়ের ছিল সেটা শেষ চেষ্টা। পরিচিত বামপন্থী ঘাতকরাই প্রকাশ্য রাস্তায় খুন করেছিল হেমন্ত বসুকে, মৃত্যুর আগে হেমন্তবাবুর শেষ কথা 'তোমরা আমাকে মারছ কেন, আমি তোমাদের কী ক্ষতি করেছি!' বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা হয়েছিল।
হেমন্ত বসুর ঘটনার পরে বাংলার মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কমিউনিস্টদের হত্যার রাজনীতি থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে দিল্লি থেকে ছুটে আসেন আমৃত্যু মার্ক্সবাদবিরোধী যোদ্ধা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, যাঁর একার প্রচেষ্টায় বাংলায় কমিউনিস্ট অ্যাপোক্যালিপ্স পিছিয়ে গিয়েছিল দশ বছর, ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭। খুনের দু-ঘণ্টার মধ্যে, বিমানবন্দরে নেমেই, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘হেমন্ত বসুকে হত্যা করেছে সিপিএম’। অবিশ্বাস্য তৎপরতায়, দায়িত্ব সহকারে জ্যোতি-প্রমোদের ঘাতক বাহিনীর বিরুদ্ধে সত্যিটা তুলে ধরেন মানুবাবু। বাংলার মানুষ শুধু জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়ানোর মত একজন নায়কের অপেক্ষা করছিল। ক্রোধোন্মত্ত মহানগরের গনগনে হাওয়ায় সিপিএমের খুনিদের প্রতি ঘৃণার বারুদ মিশিয়ে গর্জে উঠে বাংলার জনতা। জ্যোতি বসুর স্বরাষ্ট্রদপ্তরের পরোয়া না করে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালো প্রথম সারির প্রতিটা খবরের কাগজ। ক্ষুব্ধ জনতার ক্রোধের দমদমে অগ্নিদগ্ধ হল সন্ত্রাসের কেন্দ্র সিপিএম’র পার্টি অফিস। নোয়াপাড়ায় জনতার হাতে আক্রান্ত সিপিআই(এম)’র হার্মাদ, আলিপুরে হেমন্ত বসু বিরোধী সিপিএম প্রার্থী। শহীদ হেমন্ত বসুর শোক মিছিলেও ধিক্কৃত হল ঘাতক সিপিএম। জ্যোতি বসুর পুলিশ আর গলায় লাল রুমাল বাঁধা প্রমোদ ব্রিগেডের গুণ্ডাদের সাহায্যে ব্যাপক বুথ দখল ও বোমাবাজি করেও সেবারের ৩৫টি আসনে দু-হাজারেরও কম ব্যবধানে পরাজিত হয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে বঞ্চিত হল সিপিআই(এম)। মানুষ বুঝিয়ে দিল তারা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে।
পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল হেমন্ত বসুর খুন মার্ক্সবাদী দলেরই উচ্চপর্যায়ের চক্রান্ত। জ্যোতিবাবুদের উদ্দেশ্যও সফল হয়েছিল, মার্ক্সবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার হেমন্ত বসুকে প্রকাশ্য দিবালোকে খতম করে দেওয়ার পরে আতঙ্কিত ফরওয়ার্ড ব্লকও গণতান্ত্রিক ‘আট পার্টির জোট’ ছেড়ে সিপিআই(এম)’র নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রুখে দাঁড়াতে না পারার মূল্য পরে বার বার দিতে হয়েছে ফরোয়ার্ড ব্লক বা আরএসপির মত ছোট দলগুলোকে। এদের জনভিত্তি ভাঙিয়ে চৌত্রিশ বছরে রাজনৈতিক দানব হয়ে উঠেছে সিপিয়েম৷ আর কখনও বাসন্তীতে জ্বালিয়ে দিয়েছে বাম শরিক আরএসপির সমর্থকদের বাড়ি, কখনো দিনহাটায় খুন করেছে ফরোয়ার্ড ব্লক সমর্থকদের। কুখ্যাত মরিচঝাঁপি গণহত্যার কথা তো সকলেই জানে, যখন উদ্বাস্তুদের মধ্যে আরএসপির সাপোর্ট বেস তৈরি হওয়া ঠেকাতে পুলিশ ক্যাডার লেলিয়ে কুমিরমারি-মরিচঝাঁপির শত শত বাঙালী হিন্দু উদ্বাস্তুকে খতম করে দেয় জ্যোতি বসুর সরকার।
নেহরুভিয়ান সোশ্যালিজমের রেশনের দোকানের দীর্ঘ লাইন আর সমাজতান্ত্রিক কাঁকর মেশানো চালের ভাত খেয়ে 'আমার নাম তোমার নাম ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম' করার দিন আজ অতীত। বাঁকুড়ার মত পিছিয়ে পড়া জেলায় দুর্নীতি করে তিনতলা প্রাসাদের মত বাড়ি, ব্যক্তিগত এসি জিম, চারচাকা গাড়ির মালিক, ছেলের বিয়েতে কোটি টাকা ওড়ানো সর্বহারা কমিউনিস্ট নেতার কর্পোরেটে চাকরি করা ছেলেরা যাই বলুক, মনমোহন-নরসিংহের মুক্তবাজার অর্থনীতির এই নতুন ভারত আজ আপনাদের দুপুরের খাবার পাতেও এনে দেয় সর্ষে ইলিশ আর কচু শাকের স্বর্গীয় মধ্যাহ্ন ভোজনের স্বাদ, যা আগে করতলগত ছিল শুধু পার্টিনেতার পরিবারের সদস্যদের। আজ আধুনিক প্রযুক্তির টেলিভিশনে চোখ রাখলেই এমনকি একতলা বাড়ির বাসিন্দারও চোখে ভেসে উঠবে "মহাকাশ থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটদান করলেন মহাকাশচারী।" আর মনে পড়ে যাবে সিপিয়েম আমলের কথা, যখন মহাকাশ দূরে থাক, বাড়ি থেকে দশ পা দূরের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবার অনুমতি ছিল না বিরোধী পার্টির ভোটারদের। পার্টির হার্মাদদের হাতে মার ছাড়া যাদের আর কিছু জুটত না তাদের জন্যও নতুন ভারতে এক পলকে এ.বি.পি আনন্দ এঁকে দেবে চিজ বার্গার আর লা ভিদা লোকার সুস্বাদু আশ্বাস। বামপন্থী মিডিয়াও কী নেই? আছে। গাঁড়শক্তি আপনাকে শোনাবে আট বছর ধরে ঘরছাড়া 'অসহায় কমিউনিস্ট' সমর্থকদের গল্প, কিন্তু এই গাঁড়শক্তিই আপনাকে জানাবে না যে, গত ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার সময় সিপিয়েমের অকথ্য অত্যাচারে খুন হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। তাই, কোনো 'অসহায় সিপিয়েম ক্যাডার' না, পাড়ায় ফিরতে পারে না শুধু তারাই যাদের অত্যাচারে খুন হয়েছে বাম বিরোধী নাগরিকেরা, যাদের হুকুমে ভোটের আগে বিরোধীর ভেড়িতে ঢেলে দেওয়া হয়েছে বিষ, ক্যাডার লেলিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে ক্ষুধার ফসল। কোনো সশস্ত্র গুন্ডা নয়, বঁটি হাতে বাংলার নিপীড়িতা মা বোনেদের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে গ্রাম থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতে হয় সিপিয়েমের ঘাতক মাস্টারদের। পশ্চিমাঞ্চলের রুখা জেলার ক্ষুধার্ত জনতার রোষ আছড়ে পড়ে কেন্দ্রীয় কমিটির কমিউনিস্ট চোরের প্রাসাদে। এই গাঁড়শক্তি আপনাকে বলবে না যে সর্বহারার পার্টি সিপিয়েমের সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি, বলবে না চৌত্রিশ বছর বাম শাসনের পরেও যখন বাংলার বহু মানুষের মাথায় একটা ছাদ জোটেনি, তখন কমি নেতা রিগিং দেব থাকেন কোটি টাকার বাড়িতে। গাঁড়শক্তি বলবে না কলকাতার প্রগতিশীল ক্যাম্পাসে নারীমুক্তির বাণী দেওয়া বাম ছাত্রযুব নেতাদের শ্লীলতাহানি উৎসবের কথা। বলবে না, ক্ষমতা হারানোর দশ বছর পরে আজও দক্ষিণ কলকাতার রেলস্টেশনে বিক্ষোভ কর্মসূচীই হোক বা দিল্লিতে সংসদ অভিযান, অন্য কেউ দূরে থাক, ধর্ষকের পার্টি সিপিয়েমের লালসা থেকে তাদের নিজেদের মহিলা কর্মী সমর্থকদেরই নিস্তার নেই। বলবে না, ইসলামি মৌলবাদের সক্রিয় সহযোগী বামপন্থীরা কিভাবে জঙ্গি হামলার পক্ষে একের পর এক যুক্তি সাজিয়েছে, কিভাবে দিল্লির বিখ্যাত বাম ছাত্র নেতা জিহাদী কনফারেন্সে বক্তব্য রেখেছেন, বাম ছাত্র নেত্রী উল্লাস প্রকাশ করেছেন ধর্মান্তরের ঘটনায়।
প্রয়োজন কমিউনিস্ট-ইসলামিস্ট-পেট্রোলিয়াম লবির এই আঁতাতের বিরুদ্ধে নিবিড় পাল্টা প্রচারের। প্রয়োজন বিকল্প মিডিয়া'তে সংঘবদ্ধ প্রচারের। ২০০৯’এ ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন ১.২৮ কোটি মানুষ। তাতেই বাংলা থেকে উপড়ে দেওয়া গিয়েছিল সিপিয়েমের বিষাক্ত শিকড়। ২০১৩'তে সেটা ১৮.৯ কোটি। সাতবছর আগে ফেসবুক ব্যবহার করতেন যে দেশের ৮০ লক্ষ মানুষ, এখন ১৪.২ কোটি। পাঁচ বছর আগেও যে টুইটারের নামও শোনেনি যে দেশের মানুষ, এখন সেই টুইটার ব্যবহারকারী ৩.৩ কোটি। গত তিন বছরে ভারতবর্ষে হোয়াটস-অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৬ কোটি। বামপন্থীদের পার্টিভিত্তিক রেজিমেন্টেড মগজধোলাইয়ের রাজনীতিকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ভারত -গোটা বিশ্ব জুড়েই গত কয়েকবছরে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। যোগ্য অনুঘটক হিসেবে সেই সামাজিক আন্দোলন কে রূপান্তরিত করেছে রাজনৈতিক সংগ্রামে। দেশে দেশে আইটির প্রচার বদলে দিয়েছে অকর্মণ্য সরকার কে। কর্মী সমর্থক'দের কান্না, রক্ত, ঘামে’র অক্লান্ত লড়াই, সংগ্রামে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক বামবিরোধী দলের নীতি যেমন শুধু সোশ্যাল মিডিয়া তে নির্ধারিত হবে না, তেমনই নিবিড় প্রচারের মাধ্যমে বামপন্থীদের মুখোশ খুলে দিতে না পারলে, সেই নীতি, সেই কর্মসূচি ব্যাপক আকারে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলেও কিন্তু অভীষ্ট লক্ষ পূরণ হবে না; সমাজের যে অংশ আজ পেট্রোডলার মিডিয়ার প্রচারণায় বামপন্থীদের সম্পর্কে আশাবাদী তাঁদেরও বাম মগজধোলাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। বাস্তবে তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সঙ্ঘবদ্ধ প্রচার আর বাম ফ্যাসিবাদ ও আরব সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তচিন্তার দলগুলির সংগঠনের শ্রী-বৃদ্ধি কোন পরস্পর বিরোধী প্রক্রিয়া নয় বরং সমান্তরাল অনুশীলনী।
তাই সময় এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে নির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ করবার। সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত ‘বিক্ষিপ্ত’ জাতীয়তাবাদী-গণতান্ত্রিক বিন্দু গুলোকে একত্রিত করে সিন্ধু বানাবার; সমর্থক-দরদী'দের স্বীকৃতি দিয়ে গণ্ডীর মধ্যে টেনে আনবার। সময় এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া কে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলবার; সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করে রণকৌশল সাজাবার। সময় এসেছে পেট্রোডলারের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া লিবারাল মিডিয়ার চোখে চোখ রেখে তাকাবার। সোশ্যাল মিডিয়াতেও বুক চিতিয়ে লড়াই করবার। সময় এসেছে বিক্রি হয়ে যাওয়া ইনকিলাব জিন্দাবাদের মুখে থুতু দিয়ে, প্রগতিশীলদের লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, লাইক, শেয়ার.. অ্যাকশন বলবার!
* চলবে