বেদে নাকি এক ঈশ্বরের কথা বলা আছে
তাহলে বিষ্ণু ,শিব, ব্রহ্মা , সরস্বতী ,ইন্দ্র, অগ্নি, লক্ষি আদি এত দেব -দেবী কেন?
➢ হ্যা, সনাতন ধর্ম মতে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।
♦ পবিত্র বেদে বলা আছে,
★সমেত বিশ্বে বাচসা পতিং দিব একো বিভুরতিথির্জননাম্। স পুর্ব্যো নুতনমাবিবাসত্তং বতেনিরনূ বাবৃত একমিত্পূরু।।
-[অথর্ববেদ ৭/২১/১]
পদার্থ - হে মানব! (বিশ্বে) তোমরা সবাই (দিবঃ) সেই প্রকাশের (পতিং) স্বামী পরামাত্মার কাছে (বচসা) [স্তব] বাণী সহিত (সম-এত) একত্রিত হয়ে আস। তিনি (একঃ) এক ও অদ্বিতীয়, (বিভু) সর্বব্যাপী এবং(জননাম্) সমগ্র জীবের (অতিথিঃ) অতিথি। (সঃ) তিনি (পূর্ব্যো) [জগতের] পূর্ব হতেই বিদ্যমান।তিনিই (নুতনম্) নব জগতকে ( আবিবাসত্) প্রকট ও ব্যাপ্ত করেন এবং (তম্) সেই (একম্) এক পরমাত্মার কাছেই (পূরু) নানান প্রকারের (বর্ত্তনিঃ) মার্গ বা লোক (অনুবাবৃতে) পৌঁছায় ।
★যঃ প্রাণতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব।যঈশেঅস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায হবিষা বিধেম।।
-[যজুর্বেদ ২৩/৩]
পদার্থ- (মহিত্বা) নীজ মহিমাই (যঃ) যিনি (নিমিষতঃ) এই নেত্র দ্বারা দর্শনকারী (প্রাণতঃ) প্রাণ ধারণকারী (জগতঃ) জগতের (এক ইত্) এক ও অদ্বিতীয় (রাজা বভূব) অধীশ্বর। (অস্য) এই (দ্বিপদঃ চতুষ্পদ) দ্বিপদী চতুষ্পদী সমস্ত প্রাণীসমূহের (যঃ) যিনি (ঈশে) প্রভু (কস্মৈ) সেই আনন্দস্বরূপ (দেবায) প্রকাশস্বরূপ পরমেশ্বরকে (হবিষা) প্রেম,ভক্তি ও নানা সামগ্রী দ্বারা (বিধেম) পূজা করি।
★য এক ইৎ তমু ষ্টুহি কৃষ্টীনাং বিচর্যণিঃ
পতির্জজ্ঞে বৃষক্রতুঃ।।
-[ঋগ্বেদ. ৬/৪৫/১৬]
পদার্থ - হে মানব! (যঃ) যিনি (এক ইত্) এক ও অদ্বিতীয় (কৃষ্টিনাম) মনুষ্যদের (পতি) পালক (বিচর্ষণিঃ) সর্বদ্রষ্টা (বৃষক্রতু জজ্ঞে) ও সর্বশক্তিমান (তম্ উ) কেবল সেই পরমেশ্বরেরই (স্তুহি) উপাসনা কর।
★এভাবে বেদের অসংখ্য মন্ত্রে কেবল এক ঈশ্বরের কথা পাওয়া যায়। উপরন্তু আমাদের উপনিষদ - দর্শনেও একইভাবে একেশ্বরের কথাই বলা আছে। এবং সনাতনধর্ম হল পৃথিবীর সর্বপ্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম।
♦এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঈশ্বর যদি একজনই হবেন
তাহলে এত দেব-দেবী কেন?
উত্তর- পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে
বিষ্ণু, শিব , ব্রহ্মা, ইন্দ্র ,অগ্নি, সরস্বতী, লক্ষি ইত্যাদি
- এগুলো মোটেও কোন মানুষের মত দেখতে আলাদা আলাদা দেব- দেবী বা দেবতা না। এগুলো হচ্ছে সেই এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই বিভিন্ন গুনবাচক নাম।
পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র এই সম্পর্কে বলছে,
★ এক পরমসত্য ঈশ্বরকেই জ্ঞানিগণ ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, দিব্য, সুপর্ণা, বরুণ, গরুৎমান, মাতারিশ্ব, যমসহ প্রভৃতি নামে অভিহিত করে থাকেন।
- (ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬)
★সেই পরমাত্মাই অগ্নি, আদিত্য, প্রজাপতি, ব্রহ্মা , আপ, বায়ু, শুক্র ও চন্দ্রমা।
- (যজুর্বেদ ৩২/১)
★ হে সর্বজ্ঞ পরমাত্মা (অগ্নি) আপনি ইন্দ্র, আপনিই বিষ্ণু এবং আপনিই ব্রহ্মা।
- (ঋগ্বেদ ২/১/৩)
★তিনি আর্যমা, তিনি বরুণ,তিনিই রুদ্র, তিনি মহাদেব।
- (অথর্ববেদ ১৩/৪/৪)
★আপনি ব্রহ্মা, রুদ্র, বরুণ, অগ্নি, মনু, শিব, ধাতা, বিধাতা, ও হষ্টা এবং আপনি সর্ব্বদর্শী প্রভু। স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত প্রাণী আপনা হইতে জন্মিয়াছে, এবং আপনিই এই সমগ্র সচরাচর ত্রিভুবন সৃষ্টি করিয়াছেন।
-(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ১৩/৪০৫-৪০৬)
★তুমি বায়ু, যম, অগ্নি, চন্দ্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা, অতএব তোমাকে আমি সহস্রবার প্রণাম করি এবং পুনরায় নমস্কার করি।
- (ভগবদগীতা ১১/৩৯)
★এছাড়াও পবিত্র গীতায় বলা আছে,
"আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য "
- (ভগবদ গীতা ১৫/১৫)
জ্ঞাতব্য শব্দের অর্থ হচ্ছে আলোচ্য বিষয়
অর্থ্যাৎ, সমস্ত বেদে ইন্দ্র,অগ্নি, বিষ্ণু, শিব সহ প্রভৃতি নামে সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মা সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।
♦ এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মার নানা গুণকে তুলে ধরতেই তাকে এইরূপ অসংখ্য নামে পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রে সম্মোধন করা হয়েছে। যেমন,
বিষ্ণু - পরমাত্মা সর্বব্যাপী বলে তার নাম "বিষ্ণু"।
ব্রহ্মা - পরামাত্মা সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা বলে তার নাম "ব্রহ্মা "।
শিব - পরমাত্মা কল্যাণস্বরূপ বলে তার নাম "শিব "।
সরস্বতী- পরমাত্মা জ্ঞানস্বরূপ বলে তার নাম"সরস্বতী"।
লক্ষি - পরামাত্মা সমগ্র জগতকে দর্শন ও তিনি এই জগতকে দর্শনীয় করেই নির্মাণ করেছেন বলে তার নাম "লক্ষি"।
ইন্দ্র - পরামাত্মা নিখিল ঐশ্বর্যশালী বলে তার নাম "ইন্দ্র"।
অগ্নি - পরামাত্মা সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ, প্রকাশস্বরূপ বলে তার নাম অগ্নি।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তার অমর গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশের প্রথম সমুল্লাশে এক ও নিরাকার পরমাত্মার এরকম ১০০ টি নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পরমাত্মার এই অসংখ্য নামের মধ্যে "ওম্ " হল সর্বশ্রেষ্ঠ।
পবিত্র বেদে পরমাত্মা বলছেন,
★ অহম্ ওম্ খং ব্রহ্ম (যজুর্বেদ ৪০/১৭)
আমি আকাশের ন্যায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ব্রহ্ম " ওম্ "।
উপনিষদে বলা আছে,
★ সমস্ত বেদ যার স্বরূপকে বর্ণনা করে, যার উদ্দেশ্যে সমস্ত তপস্যা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে লাভের জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করে, সেই ব্রহ্মের স্বরূপ হল "ওম্"।
-(কঠোপনিষদ ১/২/১৫)
★ ব্রহ্মকে লাভ করার যত উপায় রয়েছে তার মধ্যে ওম্ -কারই সর্বশ্রেষ্ঠ। এটিই ব্রহ্মের প্রকৃষ্ট জ্ঞাপক। এটিই ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়।
-(কঠোপনিষদ ১/২/১৭)
অতএব, পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, রুদ্র,মহাদেব, সরস্বতী, লক্ষি, ইন্দ্র,অগ্নি ইত্যাদি এগুলো মোটেও আলাদা আলাদা মানুষের মত দেখতে কোন দেব - দেবী না। এগুলো এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই বিভিন্ন গুণবাচক নাম।
মূলত পরবর্তী সময়ে রচিত বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোতেই এক ঈশ্বরের এই বিভিন্ন নামগুলোকে বিভিন্ন মানুষের মত দেখতে পৃথক দেব-দেবী হিসেবে দেখিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ও কল্পকাহিনীর অবতারণা করে হিন্দু সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু, সনাতনধর্মে যেকোন বেদবিরুদ্ধ গ্রন্থই সরাসরি নিষিদ্ধ(মনু ১২/৯৫,৯৬)। তাই আমাদের সকল হিন্দুদের এই বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোকে ত্যাগ করে পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রের মান্যতাই ফিরে যাওয়া উচিত।
(এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার যে, প্রয়োগভেদে এই শব্দগুলোর অন্যান্য অর্থও রয়েছে। যেমন, পরমাত্মা পক্ষে "ইন্দ্র " অর্থ সর্ব ঐশ্বর্যের অধিকারী। উপরন্তু প্রয়োগভেদে বিদ্যুৎ, শাসক ও বিভিন্ন অর্থেও ইন্দ্র শব্দটি ব্যবহৃত হয়। পরামাত্মা পক্ষে "অগ্নি" অর্থ সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ। প্রয়োগভেদে অগ্নি শব্দটি আগুন,তাপ, অগ্রণী নেতা ইত্যাদি অর্থ বোঝাতেও প্রযুক্ত হয়।)
♦পবিত্র বেদে দেবতা সম্পর্কে ও বলা হয়েছে যে
★ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভূতান্য শাম্যন্ প্রজাপতিঃ ।
পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসীৎ।।
(যজুর্বেদ ১৪।৩১)
অর্থ- জগতের প্রভু,সৃষ্টির পালক,সর্ব্বব্যাপী,পরমাত্মার তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীলন কর।
(শতপথ ব্রাহ্মন ১৪/৫ ) এ বলা আছে দেবতা ৩৩ টি যারা ঈশ্বরের মহিমাকে প্রকাশ করে। এগুলো হল,
★আটটি বসু
[তাপ( Heat), গ্রহসমূহ(Planets), সুর্য(Sun) ও অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ(Stars), উপগ্রহসমূহ(Satellites), অন্তরিক্ষ (Space), রশ্নি (Rays of etherial space), বায়ু (Atmospheres)]
★এগারটি রুদ্র
[ দেহের দশ জীবনিশক্তি ও একটি হল জীবাত্মা ]
★বারটি আদিত্য
[ বছরের বার মাস ]
★একটি ইন্দ্র [ বিদ্যুৎ (Electricity) ] ও
★একটি প্রজাপতি [ যজ্ঞ(Yajna) ]
অতএব, দেবতা মানেই কোন মানুষের মত দেখতে কাল্পনিক সত্ত্বা না। ৩৩ প্রকার দেবতার মধ্যে জীবাত্মা ব্যতিত বাকি সবই এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন সৃষ্টিমাত্র।
♦এবার আসি দ্বিতীয় আলোচনায়।
বেদাদি বৈদিক শাস্ত্রে বলা হচ্ছে,
★ পরমাত্মা "অকায়েম" বা শরীররহিত।
( যজুর্বেদ ৪০/৮, ঈশোপনিষদ ৮)
★তার কোন রুপ নেই।
(কথোপনিষদ ১/৩/১৫)
★সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক তথাপি তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত।
(ভগবদগীতা ১৩/১৫)
★পরমেশ্বর শরীররহিত, ইন্দ্রিয়রহিত। তার সমান বা তার থেকে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই, তার নানা প্রকার শ্রেষ্ঠ শক্তি, স্বরূপভূত জ্ঞানরূপ শক্তি এবং ক্রিয়াশক্তির বিষয় শ্রুতিতেও কীর্তিত হয়েছে।
-(শেতাশ্বতর উপনিষদ - ৬/৮)
★যিনি অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, অগোত্র, অবর্ণ এবং অচক্ষু , অশ্রোত্র, হস্তপাদশূন্য, নিত্য, বিভু, সর্বব্যাপী এবং অতিসূক্ষ্ম, সেই অব্যয় এবং সর্বভূতের কারনকে ধীরগণ সর্বত্র দেখতে পান।
(মুন্ডকোপনিষদ ১/১/৬)
★পরমেশ্বরের হাত নেই পরন্তু নিজ শক্তিরূপ হাত দ্বারা সবকিছু রচনা ও ধারণ করেন। পা নেই তবুও সর্বব্যাপী হওয়াই সবার চেয়ে অধিক বেগবান, গতিশীল। কোন চক্ষু গোলক নাই পরন্তু সবাইকে যথাযথ দেখেন, কান নেই কিন্তু শুনতে পারেন। তিনি সমস্ত জগৎ কে যথাযথভাবে জানেন কিন্তু তাকে কেউ জানে না। তাহাকে সবথেকে শ্রেষ্ঠ, সব থেকে মহান বলা হয়।
(শেতাশ্বতরপনিষদ ৩/১৯)
♦উক্ত Reference গুলো প্রমাণ করে যে সনাতনধর্মমতে ঈশ্বর নিরাকার।
তবে ঈশ্বরকে সাকারভাবে উপাসনা করা কি সঠিক ?
উঃ-এক, নিরাকার এবং অসীম ঈশ্বর এই জগতের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তিনি যদি সাকার হয়েও থাকেন সেই সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ঈশ্বরের অসীম আকৃতিকে একটি ছোট্ট মূর্তিতে রূপ দেওয়া কোন মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব না।
তবে কোন ব্যাক্তি যদি হৃদয়ে নিহিত ভক্তি থেকে নিরাকার ঈশ্বরকে কোন সাকার রূপে কল্পনা করে উপাসনা করে থাকে। তাতে কোন সমস্যা দেখি না। কেননা, পরমাত্মা জানেন যে এই সমস্তকিছুর উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই।
ও৩ম্
ব্রহ্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম স্মরণ করে নিরাকারবাদ সিরিজ আরম্ভ করলাম।
নিরাকারের স্বরূপ কী? নিরাকার বলতে আপনি কী বোঝেন? বায়ু আদিকে আমরা দেখতে পাই না, এরা কি নিরাকার?
নিরাকার = নিঃ + আকার, অর্থাৎ আকারের অভাব। যাঁর কোনো আকার থাকা সম্ভব নয়, তিনিই নিরাকার। আকার কোথা থেকে আসে? আমাদের চারপাশে যত বস্তু আছে, যাদের আমরা দেখতে পাই বা পাই না, সবই আকারযুক্ত। যেমন: গোরু, ছাগল, আম, জাম কিংবা চেয়ার টেবিল সবারই আকার আছে, সবাই অণু, পরমাণু, কণিকা দ্বারাই নির্মিত। আমাদের চোখের স্থূলতার বা দূরত্বের দরুণ আমরা দেখতে পাই না, অথচ তারাও অণু পরমাণু আদি দ্বারা নির্মিত। যেমন: আমরা কোলকাতা থেকে শিলিগুড়ি থাকা কোন ব্যক্তিকে দেখতে পারব না। আবার মহাবিশ্বের দূরবর্তী নীহারিকা, নক্ষত্রপুঞ্জ আদিও আমরা দেখতে পাই না। আবার নানা অণুজীব বা বায়ুকণা আছে, আমরা সেগুলোকে দেখতে পাই না। তবে এইসব বস্তুই পদার্থ, এদের আকার রয়েছে। এদের মূল তত্ত্ব বা উপাদান হলো পরমাণু বা নানা কণিকা। বৈশেষিক দর্শনে এই জগতের সব বস্তুর মূল উপাদানের নাম 'পরমাণু' [ বৈশেষিক মতে পরমাণু অবিভাজ্য। এখন আমরা পরিভাষাগতভাবে পরমাণু বলতে atom বুঝিয়ে থাকলেও বৈশেষিক অনুযায়ী সর্বোচ্চ অবিভাজ্য কণিকাই পরমাণু]।
এই পরমাণু বা কোনো পারমাণবিক কণিকাও অনাদি উপাদান নয়, কারণ পরমাণুর সৃষ্টি, ধ্বংস আছে; বিকার আছে, পরিবর্তন আছে। পরমাণুর মূল অর্থাৎ ভরযুক্ত সকল কণিকার মূলভূত উপাদান হলো শক্তি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, শক্তি থেকেই ভরের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ এই সমগ্র জগৎ মূলত অচেতন শক্তির বিকার। সাংখ্য দর্শনে এই শক্তিকেই অভিহিত করা হয়েছে "কারণ প্রকৃতি" নামে। এই জগতের সব উপাদান ও আমাদের আত্মা (চেতনা) ব্যতীত শরীর জড় প্রকৃতির বিকার নানা তত্ত্বের দ্বারা নির্মিত, যাদের আকার আকৃতি রয়েছে।
সত্ত্বরজস্তমসাংসাম্যাবস্থা প্রকৃতিঃ ।প্রকৃতের্মহানমহতোহহঙ্কারঃ ।অহঙ্কারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণ্যুভয়মিন্দ্রিয়ং-তন্মাত্রেভ্যঃস্হূলভূতানিপুরুষঃ ইতি পঞ্চবিংশতির্গণঃ।। সাংখ্য ১।৬১
যেহেতু সব আকার আকৃতির উৎস প্রকৃতি, এসব বস্তু দ্বারা নির্মিত না, অর্থাৎ জড় প্রকৃতির বিকার নয়, বরং প্রকৃতির মতোই অনাদি বাকি দুই তত্ত্ব ঈশ্বর ও জীবাত্মা নিরাকার।
ঈশ্বরের নিরাকারত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণ কোথায়?
বেদ, বৈদিক ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদ্ এবং ষড়দর্শন মতে ঈশ্বর নিরাকার।
প্রত্যক্ষ নিরাকারবোধক কিছু শ্রুতিবাক্যসমূহ-
যজুর্বেদ ৪০।৮ (ঈশ উপনিষদ্, ৮ম শ্রুতি) (অকায়ম্ বা শরীর রহিত)
কেন উপনিষদ ১।৩ (ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না)
কেন উপনিষদ ১।৭ (লোকে যেসব দৃশ্যমান বস্তুর উপাসনা করে, তারা ব্রহ্ম বা ঈশ্বর নয়)
কঠ উপনিষদ ১।২।২২(অশরীরী বা শরীরবিহীন)
কঠ উপনিষদ ১।৩।১৫(অরূপ বা রূপহীন)
কঠ উপনিষদ ২।৩।৮(অলিঙ্গ বা লিঙ্গ বা চিহ্নবিহীন)
কঠ উপনিষদ ২।৩।৯(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না)
কঠ উপনিষদ ২।৩।১২(ব্রহ্ম-বাক্য, মন, চক্ষুর অগোচর)
প্রশ্ন উপনিষদ ৪।১০(অশরীরী)
মুণ্ডক উপনিষদ ১।১।৬(অপাণিপাদম্ অচক্ষুশোত্রম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ নেই।)
মুণ্ডক উপনিষদ ২।১।২(অমূর্ত)
মুণ্ডক উপনিষদ ৩।১।৭(অচিন্ত্যরূপ বা ব্রহ্মের রূপ চিন্তা করা সম্ভব নয়)
মুণ্ডক উপনিষদ ৩।১।৮(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না।)
তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২।৭।২(ব্রহ্ম দর্শনাতীত এবং অশরীরী)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ২।১৫ (জন্মরহিত)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩।১০ (অরূপ বা রূপহীন)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩।১৯ (অপাণিপাদম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত পা নেই)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪।১ (বর্ণ রহিত)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪।১৯ (মূর্তি বা প্রতিমা নেই)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪।২০ (চক্ষু আদি দ্বারা দেখা যায় না এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪।২১ (জন্মরহিত)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৫।১৪ (অশরীরী)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬।৮ (ব্রহ্মের শরীর এবং ইন্দ্রিয় নেই)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬।৯ (লিঙ্গ বা চিহ্ন নেই এবং তাঁর কোন জনক বা পিতা নেই)
ব্রহ্মের নিরাকারত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকা অসম্ভব। এর আরেকটি কারণ ব্রহ্ম তিন কালে একরস বা অপরিবর্তিত। আমরা জানি, প্রকৃতির নির্মিত সকল পদার্থেরই বিকার বা পরিবর্তন রয়েছে। বিকার মোট ছয় প্রকার, উৎপত্তি, স্থিতি, বৃদ্ধি, রুগ্নতা, ক্ষয় এবং বিনাশ। ব্রহ্মের শরীর থাকলে ব্রহ্মের পক্ষে তিনকালে একরস হওয়া সম্ভব নয়।
সারসংক্ষেপ- নিরাকার হল আকারের অভাব। সব আকারের উৎস প্রকৃতি থেকেই নির্মিত এই জগতের নানা পদার্থ। আমাদের দেহস্থিত ইন্দ্রিয়, মন আদিও প্রকৃতির বিকার। দেহস্থিত ইন্দ্রিয় আর পদার্থের কারণভূত মূল তত্ত্ব এক থাকায়, আমরা পদার্থের নানা ধর্মকে আমরা দেখতে পাই, স্বাদ গ্রহণ করি, শুনতে পাই, স্পর্শ করে অনুধাবন করতে পারি, আঘ্রাণ নিতে পারি। প্রকৃতি ব্যতীত অন্য দুই সৎ ও অনাদি তত্ত্ব ব্রহ্ম ও জীবাত্মার কোনো আকার বা শরীর নেই।
No comments:
Post a Comment