Thursday, 12 June 2025

শহীদ নলিনী বাগচি

 "Don't disturb me-Let me die in peace."

"আমাকে বিরক্ত করবেন না, শান্তিতে মরতে দিন।"

  --- শহীদ_নলিনী বাগচি  


--- মুর্শিদাবাদ বাসীর গর্ব দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের বীর বিপ্লবী যোদ্ধা নিলীন বাগচি যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন জীবনের শেষ কথাটি বলছেন।  

       বিপ্লবী লড়াইরত যুবকদের মুখে মুখে ঘুরতো " Don't distrub me, Let me die in peace". নলিনী বাগচী বাংলা তথা ভারতের অগ্নিযুগের একটি কালজয়ী নাম, যে নাম একসময়ে বিপ্লবী যুবকদের প্রাণে শুধু প্রেরণার সঞ্চার করতো তাই নয়, দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য আত্মবলিদানের প্রেরণাও মজ্জায় মজ্জায় জাগিয়ে তুলেছিল। অগ্নি যুগাকাশে তিনি ছিলেন মধ্যাহ্ন গগনে প্রদীপ্ত সূর্যের মতো তেজস্বী। সেই যুগের বীর বিপ্লবীরা যাকে 'স্কলার 'ওরফে 'পাবলিশার' বলে জানতেন। অনুশীলন গোষ্ঠীর অন্যতম বিপ্লবী নায়ক ছিলেন তিনি।                     

       ১৮৯৬ সালে  মহান বীর বিপ্লবী শহীদ নলিনী বাগচী মুর্শিদাবাদ জেলার সামসেরগঞ্জ ব্লকের ধুলিয়ানে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ভূবন মোহন বাগচী ধুলিয়ান কাঞ্চনতলা এস্টেটে সেরেস্তার কাজ করতেন । তাঁর আদি নিবাস ছিল নদীয়ার শিকারপুরে। নলিনীর শিক্ষা জীবন শুরু হয় কাঞ্চনতলা উচ্চবিদ্যালয়ে । ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী। সেই ছোটবেলা থেকেই সততা, তেজস্বিতা, নির্ভীকতা ছিল তাঁর মধ্যে বিদ্যমান । হঠাৎ করেই পিতার অকাল মৃত্যু হয়। ফলে পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক দুর্দশা । নলিনী মায়ের উপর অভিমান করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে চলে যায় পাকুড়ে। সেখানে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাকুড় স্কুলে ভর্তি হয় ও ফ্রি-তে পড়াশোনা, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। ঐ স্কুল থেকেই নলিনী ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরে কিছু শুভানুধ্যায়ীর প্রচেষ্টায় তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে আই এ ভর্তি হন। কুমার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা চলতে থাকে। এই কুমার হস্টেলেই বীর বিপ্লবী নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন থেকেছেন।

            বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ তৎকালীন বিপ্লবীদের একটা প্রধান প্রাণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।এইসময় কয়েকজন বিপ্লবীর সংস্পর্শে এলেন নলিনী বাগচী। এখানেই তিনি উপলব্ধি করলেন--- দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লড়াই, স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইয়ে নিজেকে যুক্ত না করলে ছাত্র জীবনের পরিপূর্ণতা এবং মনুষ্যত্ব লাভ করা যায় না। যোগদান করলেন অনুশীলন সমিতিতে। দীক্ষিত হলেন বিপ্লবী মন্ত্রে। প্রতিজ্ঞা করলেন সংগ্রামময় জীবনের। বাংলার সংগ্রামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র সংগ্রাম দ্বারা ইংরেজ শাসনকে উচ্ছেদ করার দৃঢ় সংকল্পে নলিনী ও তাঁর সতীর্থরা এখন বদ্ধপরিকর । মুলত তাঁরই উদ্যোগে ছাত্রাবাস ও শহরের নানা স্থানে গুপ্ত সমিতি তৈরি গড়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নলিনী দলের নেতৃত্ব দিতে থাকলেন বিপ্লবীদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠলেন। পুলিশের সন্দেহের তালিকায় পড়লেন তিনি। অনুশীলন সমিতিতে তার কর্মকাণ্ড চরম পর্যায়ে পৌঁছালে পুলিশের নিকট তিনি একজন 'ভয়ঙ্কর ব্যক্তি' রূপে ওয়ান্টেড তালিকায় চিহ্নিত হয়ে গেলেন । ফলে পুলিশের গ্রেফতারি এড়াতে হবে।  এজন্য বাংলা ও বাংলার বাইরে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন। ফলস্বরূপ বিভিন্ন জায়গায় তিনি বিপ্লবী ক্রিয়া কর্ম ছড়াতে থাকলেন। বাংলার বাইরে বিপ্লবী লড়াইয়ের শক্তি বৃদ্ধি করতে ভর্তি হলেন বিহারের মুজঃফরপুর কলেজে। সেখানেও পুলিশের কুনজরে পড়লেন।  ফলে এই কলেজ ছেড়ে চললেন  বাঁকিপুর কলেজে। এখানেও তাঁর লক্ষ্য লড়াইয়ের মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া। এবং তিনি করতে থাকলেন। তিনি গোপনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিহারের বিপ্লবী দলের সঙ্গে বাংলার অনুশীলন সমিতির সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস চালিয়ে যেতে থাকেন। এরই মাঝে একসময় নলিনী তাঁর সতীর্থ সুধীর কুমার সিংহ এবং বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে দানাপুর কেল্লাস্থ ভারতীয় সৈনিকদের বিদ্রোহ ঘটানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কোনও রকমে কলকাতায় পালিয়ে আসেন ।                             

       এদিকে কলকাতার কুখ্যাত Deputy super in tendent - বসন্ত চ্যাটার্জিকে হত্যা করেন বিপ্লবী প্রবোধ বিশ্বাস। ফলে কলকাতায় শুরু হয় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতিতে ব্যাপক ধরপাকড় এবং বেপরোয়া অত্যাচার। অবস্থা বেগতিক দেখে সমিতির নেতৃস্থানীয় কর্মীদের নির্দেশে নলিনী বাগচি সহ বেশ কয়েকজন বিপ্লবী পাড়ি দিলেন গৌহাটির নিরাপদ আস্তানায় এবং সেখান থেকেই তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন । ১৯১৮ সালের ৯ জানুয়ারি গৌহাটির গোপন ডেরা বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলে। শুরু হয় এক অসম খণ্ডযুদ্ধ হয়। তারা সেখান থেকে অনেকেই পালিয়ে যান। যদিও বিপ্লবী প্রভাস লাহিড়ি ও মণীন্দ্রনাথ রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

           পুলিশের তাড়া খেয়ে ক্ষুধার্ত  তৃষ্ণার্ত বিপ্লবীরা আশ্রয় নিলেন নবগ্রহ পাহাড়ে, কিন্তু সেখানেও পৌঁছে গেল ইংরেজের বিশাল পুলিশ বাহিনী। ফলে আবারও শুরু হলো  এক প্রবল সম্মুখসমর। দলনেতার নির্দেশে নলিনী বাগচী ও প্রবোধ দাশগুপ্ত  কোনোক্রমে সেখান থেকে পালিয়ে যান। ক্লান্ত অবসন্ন ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত ভারত মাতার দুই বীর সন্তান পায়ে হেঁটে জঙ্গল পাহাড় পাঁচ দিন চার রাত্রি চলার পর ছদ্মবেশে পুনরায় ফিরে এলেন মুজঃফরপুরে।যোগাযোগ করতে থাকেন বিপ্লবীদের সাথে। পরে ফিরে আসেন কলকাতার গোপন ডেরায়। এবার ঢাকা অনুশীলন সমিতির নেতৃত্বের ভার পড়লো নলিনী বাগচির উপর । দলের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছদ্মবেশে তিনি ও বিপ্লবী তারিনী মজুমদার পৌঁছলেন ঢাকার এক গোপন আস্তানায় । অতি সাবধানে গোপনে তাঁরা তাঁদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন।             অবশেষে এল সেই চরমতম মুহূর্ত রাত্রি ১৫ জুন, ১৯১৮ সাল।

         কলতাবাজারের গোপন আস্তানায় মাত্র তিন জন বিপ্লবী।নলিনী বাগচি, তারিনী মজুমদার এবং হরিচৈতন্য দে। সঙ্গে মাত্র তিনটি দেশীয় পিস্তল ও কিছু কার্তুজ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এক বিশাল সশস্ত্র ইংরেজ পুলিশ বাহিনী চারদিক থেকে বাড়িটিকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে এক অসম যুদ্ধ, অখণ্ড লড়াই। এ এক মরণপণ লড়াই। মাত্র তিনটি দেশীয় পিস্তলের গুলি, যা শৃঙ্খলিত দেশ মাতৃকার এক একটা পাঁজরের হাড়, আর অপরদিক থেকে অসংখ্য রাইফেলের ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ধেয়ে আসছে। যেন ধেয়ে আসছে মৃত্যু শেল। বীরবিক্রমে লড়াই করতে করতে একসময় বিপ্লবী তারিনী মজুমদার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। বিপ্লবী হরিচৈতন্য দে পুলিশের গুলির আঘাতে সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বৃটিশ শাসকের রক্ষাকারী বাহিনীর তিন পুলিশকর্মী নিহত ও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হল। তবুও চলছে লড়াই। এ যেন সেই যুদ্ধ যা বলছে " জীবনের শেষ রক্তবিন্দুটাও দিয়ে যাবো দেশের শৃঙ্খল ছিন্ন করতে, এ মোর অহংকার।" এই অসম যুদ্ধক্ষেত্রে একদিকে নলিনী একাকী নিঃসঙ্গ, চোখের সামনে পরে আছে দুই বিপ্লবী সাথীর নিথর দেহ অন্যদিকে বিশাল রণসাজে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী। তাঁর সারা শরীর গুলিবিদ্ধ, তাজা গরম রক্তে ভেসে যাচ্ছে পরিধেয় বস্ত্র। রক্তে তখন গোটা চত্বর লালে লাল। তবুও তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্নিবৃষ্টি করে চলেছেন। শত্রু পক্ষের করা অবিরাম গোলাবর্ষণ গুরুতর আহত অবস্থায় একসময় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘরের ভেতর থেকে পিস্তল চালানো থেমে গেলে পুলিশ বাহিনী ঘরে ঢুকে দেখল--- গুলিবিদ্ধ তিন যুবক ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে, লাল রক্তে রক্তা ভেসে যাচ্ছে ঘরময়, একজন নিহত, দুইজন গুরুতর আহত-সংজ্ঞাহীন। সেই অবস্থায় পুলিশ তাদেরকে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে   নিয়ে যায় তাঁদের বাঁচিয়ে তুলে বিপ্লবী দলের গোপন খবর আদায় করতে। জ্ঞান ফিরলে পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জানতে চায় - পরিচয়, গোপন পরিকল্পনার কথা, অন্যান্য সাথীদের কথা, গোপন ডেরার খবর। তাদের প্রশ্নের সদুত্তর না পেয়ে তারা নলিনী বাগচীর উপর অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে। নলিনী বাগচী শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলেন "Don't disturb me. Let me die in peace" ১৬ জুন ১৯১৮ এক রণক্লান্ত যোদ্ধার জীবনের শেষ দিন। সাথে সাথে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো হাজার হাজার যুবক প্রাণের মনিকোঠায় দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের আলোক শিখা। হাসপাতালের একটি নিভৃত কক্ষে ভারত মাতার বীর সন্তান নলিনীর দেহটা যেন একটি বারের জন্যে কেঁপে উঠল-শেষ! সব শেষ! অপলক হয়ে গেল তাঁর দৃষ্টি -সব স্থির শান্ত। এক তরতাজা দেশপ্রেমিক তরুণ যুবক নলিনী বাগচীর নিভে গেল জীবন প্রদীপ। তাঁর ঐ মৃত লাশটা যেন আমাদের বলে গেলো "রক্তের দাম দিতে শিখ বন্ধু।" অপর সঙ্গী হরিচৈতন্য দে'কে দশ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ড দেয় বৃটিশ শাসক। বৃটিশদের হাত থেকে আজ আমরা মুক্ত একথা ঠিক। দেশ মাতার শৃঙ্খল মোচন করে তাঁরা রক্তের বিনিময়ে চেয়েছিলেন শোষণহীন, নিপীড়নহীন, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা। এই বীর বিপ্লবী যোদ্ধাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা কি আজ আমরা সত্যিই পেয়েছি? তা আজ ভাবার সময় এসেছে। ভারতমাতার এই বীর সন্তান আমাদের জেলার উজ্জ্বল নক্ষত্র শহীদ অনালোচিত নলিনী বাগচির জীবনকে জানা এবং জানানোর একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস।

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...