Wednesday, 30 April 2025

অজানা বাংলার বীর ।

 আপনারা তো সবাই ডায়মন্ড হারবার বেড়াতে যান, সপ্তাহান্তে ফুর্তি করতে। কখনো ট্রেনে গেলে চোখে পড়েছে ন্যাতড়া (Netra) নামের স্টেশনটা? জায়গাটার নাম শুনেছেন হয়ত, বা শোনেন নি। বাংলার আঞ্চলিক আর গর্বের ইতিহাসকে ভুলে যাওয়াই মনে হয় আত্মঘাতী লিবারেলদের কাজ। বাবার হইল আবার জ্বর সারিল ঔষধে পড়া, ইতিহাসকে ইসলামিস্ট লেখকদের চোখ দিয়ে পড়া, বাঙালি হিন্দু তাই ভুলে গেছে ন্যাতড়ার মিত্রদের মন্দিরের কথা। কাদের চক্রান্তে চাপা পড়ে রইল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজা নেত্রমিত্রর লড়ায়ের কাহিনী? প্রবল পরাক্রান্ত সাহসী হিন্দু রাজা নেত্র মিত্রের কথা কোনো ইতিহাস বইতে লেখা হয়েছে? আমাদের তো চোখে পড়েনি।  

নেত্র মিত্রের নামেই আজকের ন্যাতড়া। কে ছিলেন এই নেত্র মিত্র? 

একটু পিছিয়ে যেতে হবে এবার। বাংলায় পর্তুগীজ জলদস্যুদের আগমনের কাহিনী থেকেই শুরু করা যাক। 

১৫১৭ সাল থেকে গোয়া থেকে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথে বাংলায় যাত্রা শুরু করে। জোয়াও ডি সিলভারিয়া পরিচালিত চারটি জাহাজের একটি বহর ৯ মে ১৫১৮ সালে চট্টগ্রামে নোঙর করে। ১৫৩৭ সালে তাদের চট্টগ্রামে (তদানীন্তন নাম xetigam) বাণিজ্য করার অনুমতি দেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। কর্ণফুলীর তীরে বন্দর করে পর্তুগিজরা বাংলায় বাণিজ্য শুরু করে। চট্টগ্রাম আর সপ্তগ্রাম হয়ে উঠলো বাংলায় পর্তুগিজদের প্রধান বাণিজ্য স্থল। এই বনিকদের সাথে আরেকটি মার্সেনারী গোষ্ঠীও বাংলায় ঢুকে পড়ে, তারা জলদস্যু। জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস, তাঁর বিখ্যাত বই History of the Portuguese in Bengal -এ লিখেছেন, এরা ছিল মূলত গোয়া এবং অন্যান্য স্থান থেকে আগত এবং পলাতক অপরাধপ্রবণ লোকজন।

১৫৩৩ সালে মার্টিম এফোনসো দে মেলো (Martim Affonso de Mello) চট্টগ্রাম যান। প্রথানুযায়ী তিনি এক দূতের মাধ্যমে নানাবিধ বহুমূল্য উপহার ভেটস্বরূপ গৌড়ের নবাবের কাছে পাঠান। বলা হয় যে এই ভেটের মধ্যে এমন কিছু উপহার ছিল যা পূর্বে পর্তুগিজরা নবাবেরই এক জাহাজ থেকে লুঠ করেছিল। নবাব তা চিনতে পেরে সেই দূতকে বন্দী করেন এবং সৈন্য পাঠিয়ে চট্টগ্রামে মার্টিম এফোনসোর দলের অর্ধেককে হত্যা করেন এবং মার্টিম এফোনসো সহ বাকি অর্ধেককে বন্দী করেন। মার্টিমের প্রধান সেনাপতি কলাপী পেড্রো ছিল দক্ষ নাবিক ও নৌযোদ্ধা। সে কোনোক্রমে পালায় এবং নিজের জলদস্যু দল গড়ে তোলে। তার প্রধান ঘাঁটি হয় অধুনা দক্ষিণ ২৪ পরগণার কুলপী বন্দর। শুনেই বুঝতে পারছেন কুলপী নামটি জলদস্যু কলাপীর সাথে সংযুক্ত।

এর কিছুদিন পরই বাঙলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল শুরু হল। ১৫৩৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীন বিহারের শাসনকর্তা শের শাহ সুরি বঙ্গ আক্রমণ করেন। সুলতান মাহমুদ শাহ গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নরের কাছে দূত পাঠিয়ে সাহায্য প্রার্থণা করলেন। এর ফলেই পর্তুগিজদের অবাধ চলাচল শুরু হল বাংলায় আর কলাপী পেড্রোর মত জলদস্যুদের লুঠের রাস্তা খুলে গেল বাংলার বুকে। 

এই কলাপী পেড্রো ছিল অসম্ভব অত্যাচারী ও ধূর্ত। নারীলোলুপতা, লুঠতরাজ এসব বদগুণ তো ছিলই। গঙ্গার  উপকূলবর্তী গ্রামগুলিতে হানা দিয়ে একের পর এক জনপদ জ্বালিয়ে দিত, শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা কেউ তার নিষ্ঠুরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে দাস হিসাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাচার করত দস্যুরা। এই ভয়ংকর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্থানীয় রাজা নেত্র মিত্র। 

The Unsung Warriors of Medieval Bengal গ্রন্থে বিশিষ্ট গবেষক দেবোত্তম চক্রবর্তী লিখেছেন নেত্র মিত্র ছিলেন প্রজাপালক ও সুশাসক। সবচেয়ে বড় কথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। ১৫৩৯ সন নাগাদ, উত্তরে বিবিরহাট ফলতা থেকে দক্ষিণে কাকদ্বীপ অব্দি বিস্তীর্ণ ছিল তাঁর হিন্দু সাম্রাজ্য। তাদের কূলদেব বিষ্ণুমন্দিরে বৃহৎ স্বর্ণ মূর্তি পূজিত হতো। স্থানীয় জেলে, সদগোপ, কৈবর্ত ও আদিবাসী যুবকদের নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন নেত্র মিত্র। সেই আমলে আক্রমণের আগাম সতর্কতা হিসাবে মশাল সংকেত প্রচলন করেন গ্রামের মানুষদের নিয়ে।

স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার The Early History of Bengal  (১৯২৪) বইতে জানিয়েছেন কলাপী পেড্রোর সেনাবাহিনীর প্রধান ছিল রোজারিও, নুনিশ, গোমেজ, পেড্রা প্রমুখ কুখ্যাত জলদস্যুরা। 

ত্রৈমাসিক আঞ্চলিক জ্ঞানচর্চ্চা পত্রিকার শ্রাবণ-ভাদ্র, ১৪১৩ সংখ্যায় ‘সুন্দরবনের অকথিত ইতিহাস’ প্রবন্ধে শ্রী রক্তানুপম চক্রবর্তী লিখেছেন কলাপী পেড্রো সাধারণত গভীর রাতে হানা দিতো অসুরক্ষিত জনপদে। এরকমই এক রাত্রে জলদস্যুদের দল যখন নূরপুরের কাছে শ্রীফলবেড়িয়া গ্রামে নোঙ্গর করে তখন অতর্কিতে তাদের ওপরেই হামলা চালায় নেত্রমিত্রের বাহিনী। সেদিন প্রায় কেউই প্রান নিয়ে ফিরতে পারেনি। জল জঙ্গলে বেড়ে ওঠা বাদাবনের বাঘ আর বিষধর সাপের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা বাঙালী অকুতোভয় যোদ্ধারা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিল নৌযুদ্ধ কাকে বলে। ভাগীরথী রাঙা হয়ে ওঠে জলদস্যুদের রক্তে। মশাল হাতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন নেত্র মিত্র স্বয়ং। এই ঘটনার কয়েক মাস পরে আবারো হামলা চালায় কলাপী পেড্রোর সেনারা। সেবারও তাদের প্রতিরোধ করেন নেত্র মিত্র। তাঁর কূলদেবতা বিষ্ণুর আশীর্বাদে তিনি জয়ী হন। তবে বুঝতে পারেন জলদস্যুদের মূল আস্তানা কুলপীতে। তাই শিকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেললে আর তারা মাথাচাড়া দিতে পারবেনা। নেত্র মিত্রের প্রধান সেনাপতি সাহেবুল্লা খানকে সেই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। এতদিনের বিশ্বস্ত সহেবুল্লা সামান্য উপঢৌকনের লোভে নিজেকে বিকিয়ে দেবে সরলপ্রান বীর নেত্র মিত্র ভাবতেও পারেননি। সময়টা ১৫৪০ সাল। তিনি যখন ধারণা করছেন যে জলদস্যুদের উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে তখনই তারা পূনরায় আক্রমণ করে। প্রতিরোধের কোনো সুযোগ না দিয়ে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় নেত্র মিত্রের রাজবাড়ি দখল করে তারা। তারপর শুরু হয় গণহত্যা। ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয় মিত্র রাজবাড়ি, নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয় তাঁর সাম্রাজ্য। অগনিত নারী শিশুকে বন্দী করে এবং নির্বিচারে হত্যা করে রাজপরিবারের মানুষদের। নেত্র মিত্র বংশের কূলপুরোহিত মন্দির রক্ষার্থে শহীদ হন। রাজার অবর্তমানে, পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে কয়েক মাসের মধ্যেই এলাকার অনেক সমৃদ্ধশালী জনপদ জনশূন্য হয়ে যায়।

Portuguese in Bengal: A History Beyond Slave Trade বই থেকে জানা যাচ্ছে যে সেসময় সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গে মিত্রদের মন্দির ছিল সবচেয়ে সম্পদশালী, ধনরত্নে পরিপূর্ণ। সমস্ত সম্পদ লুঠ করে মন্দিরটি একেবারে ধ্বংস করে চলে যায় পর্তুগীজ দস্যুরা। কলাপী পেড্রোর কি হল তা সঠিকভাবে আর জানা যায়নি, ইতিহাসবিদেরা এ বিষয়ে নীরব। অসমর্থিত সূত্রে শোনা গেছিল সে বজ্রাঘাতে মারা যায়। পরবর্তীকালে এর প্রায় অর্ধ শতক পরে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য এই পর্তুগীজ দস্যুদের ব্যবহার করেই অপ্রতিরোধ্য ও সুবৃহৎ নৌবহর গড়ে তুলবেন, সে কথা ইতিহাস লিখে গেছে। কেবল হারিয়ে গেছেন নেত্র মিত্র। হারিয়ে গেছে মিত্রদের প্রাচীন গৌরবময় মন্দির। 

এই ন্যাতড়ার গৌরবময় মিত্র বংশের বংশধররা কিন্তু আজও আছেন। সূদূর মহারাষ্ট্রে বসে নিরলসভাবে বাংলার গৌরবজ্জ্বল হিন্দু বীরদের কথা লিখে যাচ্ছেন দেবশ্রী মিত্র, যিনি সেই নেত্র মিত্রের বংশধর। নিজস্ব এনজিও চালান, পথশিশুদের জন্য ক্রাউড ফান্ডিং, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য রক্তদান শিবির আয়োজন, কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ী ফেরার ব্যবস্থা এমন অনেক কিছু করেও তিনি থাকেন অন্তরালে। তাঁর একাধিক বই হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, মারাঠা বীরদের কথা, দক্ষিনী রাজাদের প্রতিরোধের কাহিনী, জওহরব্রতের ইতিহাস। তাঁর লেখা  আমাদের শোনিত উত্তপ্ত করে। বাংলার এমনই দুর্ভাগ্য, সাংস্কৃতির পীঠস্থান বইপ্রেমী বাঙালীরা শ্রীমতি মিত্রের বই অনুবাদের সাহস অব্দি করেনি। জানিনা কার অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে তাঁর লেখাপত্র বাংলায় প্রকাশিত হয়না।  

ডায়মন্ড হারবারের পরিত্যক্ত জলদস্যু ফোর্ট তো অনেকেই দেখতে যান, কেউ কি কখনো ন্যাতড়ার মিত্র রাজ বংশের মন্দিরের কথা বলেন? বলেন না। কেউ কি শুনেছেন জনদরদী রাজা নেত্র মিত্রের কথা? না না এবং না।

( কঠোরভাবে সংগ্রহীত)

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...