Sunday, 25 September 2022

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র

 আজ মহালয়া।এই মহালয়াকে শুভ না অশুভ কি বলা যাবে?সেটা সনাতন ধর্ম যারা একটু আধটু ঘাঁটাঘাঁটি করেন তারা নিশ্চয় জানেন এটা কে শুভ মহালয়া বলা যায় কি না?যাই হোক এটা নিয়ে সোশাল মিডিয়া তে লেখা লিখি তো চলতেই থাকে।তাই এই বিষয়টা নিয়ে আর বেশী কিছু বলে লেখা টিকে দীর্ঘায়িত করছি না।আজ যে বিষয়টা নিয়ে লিখছি সেটা এই মহালয়ার সাথে অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত।বিশেষ করে বাঙালী হিন্দুদের তো বটেই।কারণ বছরের এই একটি মাত্র দিন,যেই দিনের ভোর চারটে থেকে বাঙালীর আবাল বৃদ্ধ বনিতা মহিষাসুর মর্দিনী অনুষ্ঠান টি শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে সারা বছর ধরে।আর শ্রী ৺বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠের মহিষাসুর মর্দিনী না শোনা গেলে কেমন যেন একটা ফাঁকা ফাঁকা মনে হয় এই মহালয়াটা।আসলে রেডিও তে মহালয়া আর তা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠ ছাড়া?একদম ই অসম্ভব।বাঙালীর নষ্টালজিকতা জড়িয়ে রয়েছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠের সাথেই।চারিদিকে কাশবনের হিন্দোল,সাথে শিউলি ঝরা সকাল,আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ,নীলাকাশ সব মিলিয়ে শারদীয়ার আগমনীতে বাঙালীর মন প্রাণ ভরে ওঠে।আগমনীর সূর মায়ের আগমনীর বার্তা বয়ে আনে পরিবেশের বিভিন্ন আভাস দিয়ে।তবে যে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বর ছাড়া এই পুরো শারদীয়ার শুরুটাই অকল্পনীয় মনে হয় সেই বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সম্বন্ধে এবং তার কন্ঠের এই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের শুরুর ইতিহাস আজ বাঙালী ভূলেই গেছে হয়ত।1905 সালের 4ঠা আগষ্ট উত্তর কলকাতার মামাবড়ীতে জন্ম হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। পিতা ছিলেন রায়বাহাদুর কালী কৃষ্ণ ভদ্র ও মা ছিলেন সরলাবালা দেবী।কলকাতার আহারীটোলার বাসিন্দা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন একাধারে একজন নাট্যকার,

বেতার সম্প্রচারক,ও নাট্য পরিচালক ও ছিলেন।জন্মের পরেই পিতা কালীকৃষ্ণ ভদ্র বাসস্থান বদল করে উঠে আসেন,7নং রামধন মিত্র লেনে।বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর কেনা জমিতে।পিতা কালীকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম বহু ভাষাবিদ।14টি ভাষাতে তাঁর দক্ষতা যথেষ্ট ই ছিল।তৎকালীন সরকার বাহাদূরের থেকে তিনি 1927 সালে লাভ করেছিলেন রায়বাহাদূর খেতাব।তৎকালীন সময়ে কলকাতার নিম্ন আদালতে দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন। পরে অবশ্য তিনি তাঁর যোগ্যতা দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের জগতে এক পরিচিত ব্যাক্তিত্ব।কাজের সুবাদে তিনি আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা পড়েন তৎকালীন কলকাতা পুলিশের অন্যতম আইনজীবি কালীচরণ ঘোষের পরিবারের সাথে।কালীচরণ ঘোষ মহাশয়ের দ্বিতীয় কন্যা সন্তান সরলাবালা দেবীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কালীকৃষ্ণ ভদ্র।তাঁদের দুই পুত্র সন্তান  ভূপেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ও বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র।যদিও ভূপেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সম্বন্ধে বেশী কিছু জানা যায় নি।প্রচারের আড়ালেই থেকে গেছেন,বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের বড় ভাই ভূপেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র।

যাই হোক জন্মের পরে প্রাথমিক শিক্ষার পরেই বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র 1926 সালে ইন্টারমিডিয়েট ও 1928 সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন।

এদিকে 1927 সালের 26 শে  আগষ্ট কলকাতার ওয়ান গ্যারিসন প্লেসে প্রতিষ্ঠিত হল ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং রেডিও ক্যালকাটা সেন্টার।

এখানের ভারতীয় অনুষ্ঠানগুলির দ্বায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন  অন্যতম বাঙালী নৃপেন্দ্র নাথ মজুমদার।

তারপর রেডিওতে যোগ দিলেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য যাকে আমরা বাণীকুমার নামে চিনি।তারপর এখানে চাকরি করতে এলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এদের সাথেই যোগ দিলেন প্রেমাঙ্কুর রাতুর্থী।বেতার জগৎ নামে একটি মুখপত্রের সম্পাদক হলেন প্রেমাঙ্কুর আতর্থী।আর তখনের বাঙালী তো মানেই কৃষ্টি আর সংস্কৃতি মনস্কতার পরিচায়ক ছিলেন।তাই যেখানে এমন বাঙালীদের চাঁদের হাট বসবে আর নতুন কিছু উদ্ভব হবে না সেটা কি হয়? তাই এক্ষেত্রেও সেটার ব্যাতিক্রম হলো না।

আইডিয়া তে এসেছিল প্রেমাঙ্কু আতর্থীর মাথা থেকে। তিনি বলেন যে সমস্ত সংস্কৃত শ্লোক গুলি লিখে ফেলবে বাণীকুমার। রায়চাঁদ গড়াল গানগুলি সিলেক্ট করবেন আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সেই সংস্কৃত শ্লোক গুলো কে সুন্দর করে পরিবেশন করবেন। এই চিন্তা ভাবনা টা নিয়ে তারা সকলে গেলেন নৃপেন বাবুর কাছে এবং নৃপেন বাবু এতে রাজি হলেন।

কিন্তু বাঙালীর দীর্ঘদিন ধরে জাত পাত আর উঁচনীচতার গন্ডিতে যেখানে আবদ্ধ,সেখানে কোন নতুন কিছু শুরুই যে সহজ হবে না এটা বলাই বাহুল্য।যাই হোক বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সংস্কৃত পাঠ নিয়ে সে সময় যথারীতি একটা চাপা অসম্মতি উঠলো।কারণ বীরেন্দ্র,কৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন কায়স্থ।আর জাতপাতের ভেদাভেদের মানসিকতাতে বাঙালী মেনে নিতে পারে নি যে একজন কায়েতের ছেলে সংস্কৃত পড়বে?যাই হোক কড়া ধাতের মানুষ নৃপেন বাবুর প্রচেষ্টায় সেই দ্বন্ধ শেষ হলো।যাই হোক এর পর  

1932 খ্রিস্টাব্দে প্রত্যুষ প্রোগ্রাম নামে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। পরের বছর নাম পরিবর্তিত করে নাম রাখা হল প্রভাতী অনুষ্ঠান। 1936 সালে আবার নাম বদল এবার নাম রাখা হল মহিষাসুর বধ।তারপর পরের বছর শেষবারের জন্য এই অনুষ্ঠানের নাম বদল করে রাখা হল মহিষাসুরমর্দিনি। সেই থেকে  নামটি এখনো চলে আসছে।

মহালয়া অনুষ্ঠানটির মধ্যে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পাঠের মাঝখানে গান গেয়েছেন অনেক বিশিষ্ট শিল্পীরা। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। প্রথম প্রথম অনুষ্ঠানটি প্রতি বছরের নতুন করে করতে হতো। কারণ তখন রেকর্ডিং ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। তবে শেষ রেকর্ড করা হয়েছিল 1966 সালে, সেই রেকর্ডিংয়ে আমরা এখনও শুনতে পাই। তবে মাঝখানে মহানায়ক উত্তম কুমার একবার এই মহালয়া অনুষ্ঠান  করেছিলেন। কিন্তু তা একেবারেই সাধারণ মানুষ গ্রহণ করতে পারেননি।এর মাঝে আরো একটা বিষয় রয়ে গেছে।যেটা নিয়ে আজো এ বঙ্গের স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ দাবীদার রা দাবী করেন,যে একজন মুসলিম

( নাজির আহমেদ) একবার মহালয়া পাঠ করেছিলেন।সম্প্রতি একটি লেখার কথা উল্লেখ করে একাধিক সংবাদমাধ্যম দাবি করে, একদিন ভোরবেলা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের আসতে দেরি হওয়ায় সেদিন তাঁর স্থানে স্তোত্রপাঠ করেছিলেন নাজির আহমেদ নামে আকাশবানীর আরও এক স্বনামধন্য মানুষ। কিন্তু এই খবরটি একেবারেই ভুল বলে দাবি করেছে আকাশবানী কর্তৃপক্ষ। কোনওদিনই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে নাজির আহমেদ স্তোত্রপাঠ করেননি। বাংলাদেশের একাধিক লেখক, তার মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক শামসুর রহমান, তিনি তাঁর লেখাতে এই তথ্য দিলেও তথ্যটি ভুল বলে দাবি করা হয়েছে। ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া রেডিওর কর্মরত তুহিনশুভ্র ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‌গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জঘন্য খবর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত শ্রদ্ধেয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় জনৈক 'নাজির আহমেদ' স্তোত্রপাঠ করেছিলেন। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং আপনাদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ যে, এই খবরে আপনারা কোনও ভাবেই বিভ্রান্ত হবেন না, বা বিশ্বাস করবেন না। শ্রদ্ধেয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ছাড়া আর কেউই কোনদিনই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে স্তোত্রপাঠ করেননি।’‌

যারা এই খবরের বিষয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবেন, তাদের জন্য লিংক দিলাম,লিংকে গিয়ে নাজির আহমেদের মহিষাসুর মর্দ্দিনী পাঠের খবরের সত্যতা দেখে নিতে পারেন

(https://bengali.news18.com/news/entertainment/nazir-ahmed-never-recited-mahalayas-hymns-ub-508253.html)

যাই হোক একটা শতাব্দী প্রাচীন জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক থাকবে না সেটা কি হয়? তাই বির্তক থাকবেই।এবং তার থেকে সত্য ও উদ্ভাসিত হবে।এটাই নিয়ম।যাই হোক চলুন এবার তাহলে মাতৃপক্ষের শুরুর সাথে সাথে বাঙালীর চির অপেক্ষার অবসান শারদীয়ার শুভ যাত্রা শুরু হোক। শুভ শারদীয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা রইলো সকলের জন্য।


✍কলমে P.rasenjit bose.

Sunday, 4 September 2022

ভারতের অজানা ইতিহাস।

 বিষয়: তৈমুর লঙের ভারত আক্রমণ ও ভারতের বীর যোদ্ধাদের হাতে তৈমুরের পরাজয় - হিন্দু সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ

(যুগ: মধ্যযুগ, সময়কাল: ১৩৯৮ - ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দ)


ইতিহাসে আমাদের পড়ানো হয় তৈমুরের ভারত আক্রমণ ও এদেশের মাটিতে তার হত্যালীলার কাহিনি। কিন্তু তৈমুরের শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হয়েছিল সেটা আমাদের পড়ানো হয় না। আমরা কি কোনোদিনও জানতে পেরেছি যে এই ভারতবর্ষের বীর সন্তানদের হাতেই তৈমুরের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল ?


মধ্য এশিয়ার সমরখন্ডের তুর্কি নেতা আমির তার্ঘির পুত্র তৈমুর লঙের জন্ম হয় ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে। তৈমুর লঙ ছিল মুঘল আক্রমণকারী বাবরের পিতামহের পিতামহ (great great grandfather) - তাকে মুঘলদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়; তার বংশ ‘তিমুরিদ’ বংশ নামে পরিচিত।


তৈমুর ভারত আক্রমণের পূর্বে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশ আক্রমণ করে ও ধ্বংস করে এবং তৎকালীন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ বা প্রায় এক কোটি সত্তর লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। সবশেষে তার নজর এসে পড়ে সভ্য ও সমৃদ্ধ ভারতবর্ষের উপর।


দিল্লীতে তখন তুঘলক বংশের সুলতানদের শাসনকাল, তুঘলকবংশীয় শেষ সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনকালে ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর দিল্লী আক্রমণ করে ও তুঘলক বংশের পতন হয়। এখানে সে ব্যাপক হত্যালীলা চালায় - তখনকার কোনো কোনো নথি অনুযায়ী পুরুষ, মহিলা, শিশুসহ প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষের অধিক মানুষকে তৈমুর নির্বিচারে হত্যা করে! নানা স্থানে মৃতদের খুলির স্তূপ বানানো হয়।


এই ব্যাপক ও নৃশংস গণহত্যা প্রতিরোধ করতে মিরাটের গুর্জর রাজার তত্ত্বাবধানে একটা পঞ্চায়েত গঠিত হয় (যা ‘সর্বখাপ পঞ্চায়েত’ নামেও পরিচিত, এটা ছিল একটা প্রজাতান্ত্রিক সংগঠন ও এর রাজধানী বর্তমানের উত্তরপ্রদেশের মুজাফ্ফর নগরের শোরামে অবস্থিত। এই খাপ পঞ্চায়েত তার ইতিহাস বিভন্ন সময় নানা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, এর মধ্যে তৈমুর, খলজি, বাবর, নাদির শাহ, আবদালি, মারাঠা এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও আছে।) ও অধুনা উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এক বিশাল অরাজকীয় বাহিনী গড়ে ওঠে।


যোগরাজ সিং পওয়ার এই বাহিনীর সর্বোচ্চ অধিনায়ক নির্বাচিত হন। যোগরাজ ছিলেন সে যুগের এক অতি পরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা। বিভিন্ন উপকথা থেকে জানা যায় যে তাঁর উচ্চতা ছিল প্রায় সাত ফুট নয় ইঞ্চি! তাঁর বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র এত ভারী ছিল যে আজকের দিনের কেউ তা তুলতেও পারবে না! তিনি তাঁর ভারী তলোয়ারের এক কোপে তৈমুরের সেনাবাহিনীর বহু সৈন্যের ধর থেকে মাথা নামিয়ে দেন।


ঐ বাহিনীর অপর দুই সেনাপ্রধান ছিলেন ধুলা ভাঙ্গী (বাল্মীকি) ও হরবীর সিং গুলিয়া (জাঠ)।


অন্যান্য সেনানায়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - গজে সিং জাঠ গাটওয়ালা, তুহিরাম রাজপুত, নেধা রাওয়া, সরযূ ব্রাহ্মণ, উমরা তাগা (ত্যাগী), দুর্জনপাল আহীর।


উপসেনাপ্রধানদের মধ্যে ছিলেন - কুন্দন জাঠ, ধারী গাদারিয়া, ভন্ধু সইনি, হুল্লা নাই, ভানা জুলাহা (হরিজন), আমান সিং পান্ডির (রাজপুত), নাথু পরদার (রাজপুত), ধুল্লা (ধান্ধী) জাঠ, যিনি হিসার থেকে দাদরি ও মুলতান পর্যন্ত আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন, মামচাঁদ গুর্জর, ফালওয়া কাহার। এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন বর্ণ থেকে আরও কুড়ি জন সহকারী সেনানায়ক নিয়োগ করা হয়েছিল।


এছাড়াও এই বাহিনীতে ছিল রামপেয়ারী চৌহানের (গুর্জর) নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার নারীর এক বিশাল প্রমীলা বাহিনী।


দুটি বিশেষ কারণে এই ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ -

এক, এইসময় ভারতীয় সমাজের সর্বস্তরের তথা সব বর্ণের মানুষ স্বেচ্ছায় একত্রিত হয়ে ও বাহিনী গঠন করে বহিরাগত বর্বরদের প্রতিরোধ করে।

দুই, সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথম শুধুমাত্র নারীদের দ্বারা গঠিত রামপেয়ারীর নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার সদস্যার বাহিনী কোনো লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে ও বিজয়ও লাভ করে।


কৃতি কবি চন্দ্রভট্ট এই সংগ্রামের কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন।


● দিল্লীর সংঘর্ষ: একবার তৈমুরের বাহিনী দিল্লীতে লুটপাট চালাচ্ছিল এবং পুরুষ, মহিলা, শিশুসহ সবাইকে তলোয়ারের কোপে হত্যা করছিল।

এইসময় মধ্যরাতে যোগরাজের নেতৃত্বাধীন কুড়ি হাজার সেনার বাহিনী তৈমুরের বাহান্ন হাজার সেনার উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে ও তাদের নয় হাজার সেনাকে হত্যা করে। যমুনা নদীতে তাদের মৃতদেহ ভেসে যায়। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে এই বীর বাহিনী শহরের বাইরে চলে যায়। এইভাবে তিনদিন ধরে লড়াই চলে।

তৈমুর এতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়, সে কখনও এমন প্রতি-আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি; তাই সে এই গেরিলা বাহিনীকে ধ্বংস করতে দিল্লী ছেড়ে মিরাটের দিকে ধেয়ে যায় ।


● মিরাটের সংঘর্ষ: এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী ও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র সমেত তৈমুর মিরাটে উপস্থিত হয়। কিন্তু এখানেও সে প্রচন্ড প্রতি-আক্রমণের মুখে পড়ে। সারাদিন প্রবল যুদ্ধ করার পর রাতে যখনই তৈমুরের বাহিনী বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামত তখনই যোগরাজের সেনা তাদের আক্রমণ করে উৎখাত করত।

রামপেয়ারীর নেতৃত্বাধীন বীরাঙ্গনারা স্বদেশী যোদ্ধাদের খাদ্য ও অস্ত্রের যোগান দিতেন। তাঁরা শত্রুপক্ষের যোগানও লুঠ করতেন।

পাঁচশো অশ্বারোহী সংবাদবাহক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই বিশাল বাহিনীর মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের কাজ করত। তৈমুরের সেনাবাহিনীর কাছে যাতে কোনো খাদ্য পৌঁছাতে না পারে গুর্জর মহিলারা সেটা সুনিশ্চিত করেন।

অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তৈমুর শেষ পর্যন্ত যোগরাজের জন্মভূমি হরিদ্বারের দিকে গমন করে, উদ্দেশ্য ভারতীয় প্রতিরোধ বাহিনীর শীর্ষনেতাকে হত্যা করা।


● হরিদ্বারের সংঘর্ষ: এবার তৈমুর হরিদ্বারে পৌঁছালে সেখানেও সে গুর্জরদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। যাইহোক সে হরিদ্বারের পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে জ্বালাপুরে এসে পৌঁছায়। সেখানে হরিদ্বারের পুণ্যভূমিতে তৈমুর নরাধমের পদার্পণ আটকাতে তিনটে বড় লড়াই হয়।


প্রথমে হরবীর সিং গুলিয়া পঁচিশ হাজার সেনা নিয়ে তৈমুরের সুবিশাল বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তৈমুর তার বেশ কয়েকজন সেরা সৈন্য ও অশ্বারোহীদের দ্বারা পরিবৃত ছিল, হরবীর এই বেষ্টনী ভেদ করে তৈমুরের একদম কাছে পৌঁছে যান ও তার বক্ষদেশে বল্লম দ্বারা আঘাত করেন।

তৈমুর তার ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়ে যাচ্ছিল, সেসময় তার সেনাপতি খিজরা তাকে রক্ষা করে।

হরবীর তৈমুরের বাহিনীর আক্রমণে প্রভূত পরিমাণে আহত হন ও যুদ্ধক্ষেত্রে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে যান। যোগরাজ পরে তাঁকে উদ্ধার করলেও কিছু সময় পর হরবীর দেহত্যাগ করেন।


এরপর দ্বিতীয়বার তৈমুরের বাহিনীর উপর আক্রমণ নেমে আসে হরিদ্বারের জঙ্গলে। ধুলা ধারধী তাঁর নেতৃত্বাধীন মাত্র একশো নব্বইজন সৈন্যের একটা ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে তৈমুরের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেন ও তাদের এক বিশাল অংশকে হত্যা করেন। অতি বীরের মত লড়াই করে একশো নব্বইজনই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন।


এরপর তৈমুর শেষবারের মত হরিদ্বার ধ্বংস করার জন্য আক্রমণে উদ্যত হলে সর্বশেষ লড়াইয়ে যোগরাজ, রামপেয়ারী এবং তাঁদের সহযোদ্ধারা বীরদর্পে সেই আক্রমণ প্রতিহত করেন। তৈমুরের সেনাবাহিনীকে তারা প্রচন্ড শক্তিতে আক্রমণ করেন। তাদের শক্তি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত নরাধমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়।

কথিত আছে, এই সর্বশেষ লড়াইয়ে যোগরাজ দেহে পঁয়তাল্লিশটি আঘাত পান কিন্তু তবুও তিনি মনের জোরে তাঁর সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। এর ফলেই তাঁরা গঙ্গার পবিত্র তীর তৈমুরের স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। 

পরাজিত তৈমুর পাহাড়ের পথ দিয়ে পালিয়ে যায়, তার ভারত আক্রমণ ও লুঠের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।। এই দেশের মাটি থেকে তার নির্গমন নিশ্চিত করতে তার সেনাবাহিনীকে হরিদ্বার থেকে অম্বালা পর্যন্ত ধাওয়া করা হয়। তৈমুর ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি এবং পরবর্তী দেড়শো বছর আর কেউ ভারতে আক্রমণের উদ্দেশ্যে আসেনি।


ভারতীয় সেনারা এই যুদ্ধে প্রায় সত্তর হাজার বর্বরকে হত্যা করে।


যে পাঁচ জন সেনানায়ক তৈমুরের যুদ্ধবাজ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ শেষে জীবিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে যোগরাজ ছিলেন একজন, পরবর্তীকালে তিনি জাবেরা রাজ্যের পত্তন করেন।


তথ্যসূত্র:

১. The Royal Gurjars: Their contribution to India - Naunihal Singh, Anmol Publications

২. History of Origin of Some Clans in India - Mangal Sen Jindal (1992)

৩. Conquest of Tamerlane - Cothburn O'Neal (Avon,1952. ASIN: B000PM1IG8)

৪. Uttarakhand ka Itihaas bhag 4 - Dr. Shiv Prasad Dabral, Veer Gatha Press, Dogadda, Pauri Garhwal

৫. Garwal ka Itihaas - HariKrishna Ratauri

৬. Garwal Ancient and Modern - Dr Pritam

৭. Himalayan Folklore - Oakley & Gairola

৮. Gazetteer of British Garwal - H.G. Walton

৯. Prachin Bharat ka Itihaas - Vimal Chandra

১০. Early Chauhan dynasties - Dhasrath Sharma

১১. Ancient History and Civilization - Shailendra Nath Sen


ছবি পরিচিতি:

১. তৈমুর লঙ

২. যোগরাজ সিং পওয়ার


✍️ অজানা

( অজানা ভারতবর্ষ Discover India 🇮🇳)

ভূলে যাওয়া এক বাঙালী

 •স্মরণ করি•

-^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^-

জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ (৪ঠা সেপ্টেম্বর,১৮৯৪ – ২১শে জানুয়ারী,১৯৫৯) একজন বাঙালী রসায়নবিদ, শিক্ষক ও উদ্ভাবক। তিনি ভারতবর্ষে জ্ঞান ঘোষ আর ইউরোপে স্যার জি সি ঘোষ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর অমূল্য গবেষণা কর্ম, শিল্প ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভারতে প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।


জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায়। পিতার নাম রামচন্দ্র ঘোষ। ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে গিরিডি থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১১ খ্রীস্টাব্দে চতুর্থ স্থান অধিকার করে আই.এসসি ও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দে রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি.এসসি এবং ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এসসি.পাশ করেন। তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহার সতীর্থ ছিলেন। তিনি গাঢ় দ্রবণের মধ্যে লবণের অণুগুলি কীভাবে আয়নিত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহন করে - এই বিষয়ে মৌলিক গবেষণা করে ১৯১৮ খ্রীস্টাব্দে ডি.এসসি উপাধি লাভ করেন ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি ও স্যার তারকনাথ পালিত স্কলারশিপ পান। তাঁর এই গবেষণালব্ধ তত্ত্ব "ঘোষের আয়নবাদ" নামে বিখ্যাত। বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে যান এবং সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণা স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংক, উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ, ভালগার নের্নষ্ট প্রমুখ দ্বারা উচ্চ প্রসংশিত হয়।


এম. জবাব ফল প্রকাশের বিরুদ্ধে রাজনীতি তৎকালীন উপাচার্য আশু মুখোপাধ্যায় শিক্ষকের পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানান। ফল পর নবনির্মিত রাজাবাজার বিজ্ঞান গােয় রসায়ন প্রকাশের গবেষণা নিযুক্ত হন। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং দীর্ঘ কুড়ি বৎসর্যাপনার সাথে গবেষণা ধরনের ব্যাপৃত ছিলেন। তার মধ্যে আলোক রসায়ন বা ফোটো কেমিস্ট্রি ব্যাপক। সাধারণ থেকে ফিসার-ট্র্যাপস পদ্ধতিতে অনুঘটকের উপস্থিতিতে তরল বিদ্যুৎ শক্তি-বিষয়ক তার গবেষণা দেশ সমমৃত্যু হয়েছে। এই গবেষণার বিষয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থ হল - 'সাম ক্যাটালাইটিক রিয়্যাকশন অফ ইন্ডাস্ট্রিয়ার ইমপারট্যান্স' ১৯৩৯ খ্রীষ্টব্দে নোবেলজয়ী প্রদান চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামনের বাঙ্গালোরস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সর আরও বেশি সহিত সহ বিজ্ঞানের বিজ্ঞানের সদস্য হন। ইণ্ডিয়ান কেম নেটওয়ার্ক সোসাইটির দেশতা ছিলেন তিনি। ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৫০ খ্রীস্টব্দে প্রথম আই.আই.টি. খড়্গপুরের (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি) প্রথম ডিরেক্টর হন। ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতা খুলি উপাচার্য হন। বিশেষজ্ঞ প্রশাসনের সদস্য হিসাবে শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দেন তিনি।

ডঃ চন্দ্র ঘোষ দেশর অনেক সম্মান লাভ করেন। ১৯৪৩ খ্রীষ্টব্দে তিনি "নাইট" উপাধিতে ভূষিত হন। ভারত সরকার তাঁকে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে 'পদ্মভূষণ' সম্মানে সম্মানিত করেন।

(সৌজন্যে : উইকিপিডিয়া)

Unknown History of India


 আমরা সবাই মুহাম্মদ ঘোরি এবং পৃথ্বীরাজ চৌহানের বিরুদ্ধে তার বিজয় সম্পর্কে জানি যা দিল্লি সালতানাতের সূচনা করেছিল।
ঘোরি মিসাইল থেকে ঘুরিদ বিজয় পর্যন্ত, ঘোরি তথাকথিত "শান্তিপূর্ণ ধর্ম" থেকে লক্ষ লক্ষ লোককে ভারতের বিরুদ্ধে একটি পবিত্র যুদ্ধ শুরু করতে অনুপ্রাণিত করেছে।


কিন্তু অনেকেই জানেন না যে একজন নম্র সনাতানি হিন্দু, রামলাল খোখর শুধু মুহম্মদ ঘোরির শিরচ্ছেদ করেননি, লাহোরের সিংহাসনও পুনরুদ্ধার করেছিলেন।


রামলাল খোখর ঘোরির বিরুদ্ধে 25,000 শক্তিশালী হিন্দু সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। পরবর্তী যুদ্ধে ঘোরি কেবল তার মাথাই হারায়নি বরং ঘুরিদ সাম্রাজ্যের চিহ্নও চিরতরে মুছে যায়। দুঃখজনকভাবে, ভারতীয় শিক্ষাবিদরা (বর্তমান সরকারের সহ, ভারতীয় ইতিহাসের পাঠ্যসূচিতে বীর রামলাল খোখরকে উল্লেখ করতে অস্বীকার করেন।) 

সূত্র:- FB.

 #সঠিক ইতিহাস #মুঘল সাম্রাজ্য #দিল্লীসুলতানাত #ভারতীয় ইতিহাস

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...