Thursday, 27 July 2023

ত্রিপাক্ষিক দ্বন্ধ।

সম্রাট হর্ষবর্ধনের সময় থেকেই কনৌজ ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। তখন মালবরাজ দেবগুপ্ত, এবং বাংলার শাসক শশাঙ্ক কনৌজ অধিকার করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সমৃদ্ধ গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থানের জন্য কনৌজ ভারতীয় রাজাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পরে প্রায় একশো বছর ধরে উত্তর ভারতে কোন সাম্রাজ্যিক ঐক্য ছিল না। সেই সময় কাশ্মীর ও কামরূপের রাজারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জয় করে শক্তিশালী রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মালবের রাজা যশোবর্মন অল্প কিছুকাল কনৌজে রাজত্ব করেছিলেন, তবে কনৌজ ততদিনে নিজের পূর্ব গৌরব হারিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খৃষ্টীয় অষ্টম শতকের ভারতীয় রাজাদের মধ্যে এই ধারণা গড়ে উঠেছিল যে, কনৌজ-ই সার্বভৌম সাম্রাজ্যের প্রতীক। তাঁদের ধারণা ছিল যে, যিনি কনৌজ অধিকার করতে পারবেন, তিনিই সার্বভৌম সম্রাটের স্বীকৃতি পাবেন। ইতিহাস বলে যে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে ভারতের তিনদিকে তিনটি রাজশক্তির উদ্ভব হয়েছিল। অষ্টম শতকের মধ্যে রাষ্ট্রকূট রাজা দন্তিদুর্গ চালুক্য সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিয়ে সমগ্র দাক্ষিণাত্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রকূটরা অত্যন্ত পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন। দন্তিদুর্গের বংশধরদের মধ্যে ধ্রুব, তৃতীয় গোবিন্দ ও তৃতীয় ইন্দ্ৰ কনৌজ জয় করে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, ভারতের মধ্যবর্তীস্থলে অবস্থানের জন্যই রাষ্ট্রকূটরা দুই অঞ্চলের ওপরে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সময়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছিল।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত দ্বিতীয় পক্ষটি ছিলেন বাংলার পালরাজারা। অষ্টম শতকে বাংলা ও বিহার অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে তখন বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র ধর্মপাল বাংলাকে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনিই কনৌজকে কেন্দ্র করে পাল সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেখতে দেখতে পূর্বভারতে পালরাজারা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিব্বতের সঙ্গে পালরাজাদের সুসম্পর্ক ছিল, সেজন্য নিজেদের রাজ্যের উত্তর সীমান্ত নিয়ে তাঁদের কোনো চিন্তা ছিল না। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। ধর্মপাল ও তাঁর পুত্র দেবপাল বাংলার নেতৃত্বে এক বিশাল সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের তৃতীয় পক্ষটি ছিলেন রাজপুতনার প্রতিহাররা। ঐতিহাসিকদের মতে তাঁরা সম্ভবতঃ গুর্জর জাতির লোক ছিলেন, সেজন্য অতীতে তাঁদের গুর্জর-প্রতিহার বলা হত। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকূট রাজারা তাঁদের ‘দ্বাররক্ষক’ গোত্রীয় নিম্নবর্গের মানুষ বলে গণ্য করতেন। হতে পারে যে, প্রতিহাররা প্রথমে হয়ত রাজপ্রাসাদের কর্মচারী ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁরা রাজা হয়ে বসেছিলেন। পশ্চিমে আরবদের প্রতিহত করে প্রতিহাররা পূর্বদিকে নিজেদের রাজ্য সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। অষ্টম শতকের শেষদিকে রাজস্থান, কনৌজ, মালব ও গুজরাট জুড়ে তাঁদের একটা বিস্তৃত রাজ্য ছিল।

ভারতের তিনদিকের এই তিনশক্তি কনৌজ দখল করে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রায় দু’শো বছর ধরে সেই তিন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলেছিল (৭৫০-৯৫০ খৃষ্টাব্দ)। ওই ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয়লাভ করতে পারেনি। প্রথমদিকে প্রতিহাররা জয়ী হলেও আরব, পাল ও রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তাঁদের শক্তিক্ষয় হয়েছিল। তাঁরা কখনো দাক্ষিণাত্য জয়ের চেষ্টা করেন নি। একটা সময়ে তাঁদের অধীনস্থ সামন্ত রাজারা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে তাঁদের জয়ও শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অবশেষে খৃষ্টীয় একাদশ শতকের গোড়ার দিকে তুর্কিদের আক্রমণে কনৌজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে উক্ত ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কতগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেই দ্বন্দ্বে জড়িত তিনপক্ষই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি থেকে এসেছিলেন, তাঁদের কেউই ভারতের মধ্যদেশের রাজশক্তি ছিলেন না। উত্তর, পূর্ব ও দাক্ষিণাত্যের সমকালীন তিনশক্তিই গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত কনৌজ (মহোদয়) অধিকার করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একটা সময়ে পশ্চিম এশিয়ার জাতিগুলি ব্যাবিলনকে তাঁদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বলে গণ্য করত। জার্মানির জাতিগুলি রোম দখল করাকে সাম্রাজ্য দখল করবার সমান বলে ধরে নিয়েছিল। ঠিক তেমনি অষ্টম শতকের ভারতের তিন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিই কনৌজকে সাম্রাজ্যের ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে গণ্য করেছিল। তাঁরা কনৌজ অধিকার করবার জন্য যথেচ্ছ শক্তিক্ষয় করেছিল। শেষপর্যন্ত প্রতিহাররা সেই সংগ্রামে জয়ী হলেও কোনো শক্তিই নিরবচ্ছিন্নভাবে জয়লাভ করতে পারে নি; পাল ও রাষ্ট্রকূটরা কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। মোট কথা হল যে, ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের ইতিহাসে উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যায়।

বাংলার পালরাজাদের তাম্র অনুশাসনগুলিতে (খালিমপুর, মুঙ্গের) এবং বাদল স্তম্ভ লেখতে সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রতিহার রাজাদের দৌলতপুর ও বরা লেখ; এবং রাষ্ট্রকূটদের সনজান ও সিরপুর লেখগুলিতে সেই সংঘর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। সমকালীন গুজরাটি কবি সোদধালা, এবং বাঙালি কবি সন্ধ্যাকর নন্দীও তাঁদের লেখায় সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের দুই প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন - বাংলার পালরাজা ধর্মপাল ও দেবপাল এবং প্রতিহাররাজ বৎসরাজ, দ্বিতীয় নাগভট্ট ও ভোজ। বাংলার রাজা ধর্মপাল কনৌজ দখলের অভিপ্রায় নিয়ে পশ্চিমদিকে এগিয়ে গেলে প্রতিহাররাজ বৎসরাজ তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দোয়াবের কাছে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে ধর্মপাল পরাজিত হয়েছিলেন। এরপরে বৎসরাজ কনৌজে তাঁর প্রতিনিধি ইন্দ্ৰায়ুধকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজা ধ্রুব শক্তিসাম্য বজায় রাখবার জন্য হস্তক্ষেপ করেছিলেন, প্রতিহারদের সঙ্গে মালব ও গুজরাট নিয়ে তাঁদের বিরোধ ছিল। তিনি বৎসরাজকে পরাজিত করে বিতাড়িত করেছিলেন, এবং তারপরে ধর্মপালকে প্রতিহত করে পুনরায় দাক্ষিণাত্যে ফিরে গিয়েছিলেন। উত্তর ভারতে তাঁর সাময়িক জয় স্থায়ী হয়নি। এরপরে ধর্মপাল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ভাগলপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, ধর্মপাল বৎসরাজের প্রতিনিধি ইন্দ্রায়ুধকে বিতাড়িত করে তাঁর প্রতিনিধি চক্রায়ুধকে কনৌজে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। মুঙ্গের লেখতে বলা হয়েছে যে, ধর্মপাল সেই সময়ে উত্তর ভারতের অনেক জায়গা অধিকার করে নিয়েছিলেন, তিনি হিমালয়ের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। খালিমপুর লেখের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি কনৌজে এক বিরাট সভার আয়োজন করেছিলেন। তাতে ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, গান্ধার ও কীরের শাসকেরা উপস্থিত হয়েছিলেন। পাঞ্জাব, পূর্ব রাজপুতনা, মালব ও বেরারে ধর্মপালের আধিপত্য সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু ধর্মপালের সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। কারণ, এরপরেই প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্ট কনৌজ আক্রমণ করে অধিকার করে নিয়েছিলেন। যোধপুর লেখতে বলা হয়েছে যে, তখন দ্বিতীয় নাগভট্টের সঙ্গে তাঁর সামন্তরাজারা যোগ দিয়েছিলেন। তিনি চক্রায়ুধকে পরাজিত করে কনৌজ অধিকার করেছিলেন, এবং তারপরে সম্ভবতঃ তিনি পাল রাজ্যের মধ্যেও প্রবেশ করেছিলেন। পাল- প্রতিহার দ্বন্দ্ব চলাকালীনই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দ উত্তর ভারতে চলে এসেছিলেন। পাল-প্রতিহার দ্বন্দ্বের মাঝে হঠাৎ করে তৃতীয় গোবিন্দর হস্তক্ষেপের দুটি সম্ভাব্য কারণ ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন। সেগুলোর মধ্যে একটি হল যে, ধর্মপালের রানী রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা ছিলেন; এবং দ্বিতীয়টি হল যে, প্রতিহারদের জয়ের ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তৃতীয় গোবিন্দ বুন্দেলখণ্ডের যুদ্ধে প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্টকে পরাজিত করেছিলেন। তবে তৃতীয় গোবিন্দ শুধু প্রতিহার রাজাকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হননি, এরপরে তিনি ধর্মপাল ও তাঁর কনৌজের প্রতিনিধি চক্রায়ুধকেও পরাজিত করেছিলেন। সেই যুদ্ধের পরে তিনি দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে, ধর্মপাল পুনরায় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ধর্মপালের পরে তাঁর পুত্র দেবপাল সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন, এবং নাগভট্টের উত্তরাধিকারী রামভদ্র তাঁর হাতে পরাজিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটরাজ অমোঘবর্ষের একটি লেখতে বলা হয়েছে যে, তিনি নাকি বঙ্গ জয় করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, দেবপাল কখনোই কোনো রাষ্ট্রকূট রাজার কাছে পরাজিত হননি, উল্টে তিনি প্রতিহাররাজ ভোজকে পরাজিত করেছিলেন। ভোজ রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সংঘাতেও নিজের পরাজয় বরণ করে নিয়েছিলেন। দেবপালের পরে পালশক্তির অবনতি ঘটলে, সেটার সুযোগ নিয়ে প্রতিহাররাজ ভোজ কনৌজ অধিকার করেছিলেন। আর কনৌজ অধিকার করেই তিনি সোজা মগধে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অতিহাসিকদের মতে সম্ভবতঃ তিনি বঙ্গ জয় করেছিলেন, এছাড়া তিনি রাষ্ট্রকূটদের পরাজিত করে মালব ও গুজরাট অধিকার করেছিলেন। রাজা ভোজই প্রকৃতপক্ষে ‘উত্তরাপথস্বামী’ হতে পেরেছিলেন। ভোজের পুত্র মহীপাল বাংলা জয় করেছিলেন, তবে তিনি রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে সেই ঘটনা ঘটে, সেই পরাজয়ের ফলে প্রতিহার শক্তি হীনবল হয়ে পড়েছিল।

দু’শো বছর ধরে স্থায়ী হওয়া ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল, এবং সেটার রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর ছিল। তৎকালীন ভারতের তিনটি আঞ্চলিক শক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্রমাগতঃ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকবার ফলে একটা সময়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। প্রায় ঠিক একই সময়ে উক্ত তিনশক্তির পতন ঘটেছিল। ওই তিনশক্তিই প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। তিন বংশের রাজাদের কাছেই বিশাল সৈন্যবাহিনী ছিল, সেই বাহিনীর পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হত। সেই সামরিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁদের রাজস্ব বাড়াতে হয়েছিল, ফলে সাধারণ মানুষের ওপরে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, সেজন্যই তখন কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল। তাঁদের মতে পালরাজাদের আমলের কৈবর্ত বিদ্রোহ আসলে কৃষক বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে প্রাদেশিক শাসক ও সামন্তরাজারা বিদ্রোহ করে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। উক্ত তিনশক্তির সীমান্তে নেপাল, কামরূপ, কাশ্মীর, উৎকল প্রভৃতি স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ব উপকুলে চালুক্য ও গঙ্গাবংশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, এবং গুজরাটে সোলাঙ্কিরা তাঁদের নিজস্ব রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে তিনশক্তি এতটাই শক্তিক্ষয় করে ফেলেছিল যে, শেষপর্যন্ত তাঁদের কেউই আর সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। ভারতের সেই তিন উদীয়মান শক্তি আরব অনুপ্রবেশের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেনি। খৃষ্টীয় দশম শতকে ভারতে তুর্কি আক্রমণ শুরু হলে তাঁদের প্রতিহত করবার ক্ষমতাও তাঁদের উত্তরাধিকারী রাজ্যগুলির ছিল না। রাষ্ট্রকূটরা যদি নিজেদের উচ্চাশাকে সংযত রাখতেন, তাহলে দাক্ষিণাত্যে তাঁরা আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারতেন। প্রতিহাররা পশ্চিমে আরব, এবং পূর্বে পালদের প্রতিহত করতে গিয়ে নিজেদের দুর্বল করে ফেলেছিলেন। তাঁরা দাক্ষিণাত্য জয় করে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। আর বাংলার পালেরা পূর্বভারত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে হয়ত তাঁদের রাজ্যে কৈবর্ত বিদ্রোহ হত না, আর সেই ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে পাল রাজ্যও ভেঙে পড়ত না।

ঐতিহাসিকদের মতে ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ছিল অনাবশ্যক শক্তিক্ষয়। আরবীয় পরিব্রাজক মাসুদি খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে কনৌজে এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, কনৌজের প্রতিহার রাজা তখন রাষ্ট্রকূটদের শত্রু ছিলেন। দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নরপতিরা দুইপক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতেন, সেই সময়ে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে বিদেশী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১০১৮ খৃষ্টাব্দে তুর্কিরা কনৌজ অধিকার করে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তখন সারাদেশে অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, তারা আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিলেও, কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারে নি। তিনি শক্তির মধ্যেকার লড়াইয়ের ফলে শুধু ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থানীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণ গড়ে উঠেছিল। ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সামরিক শক্তিক্ষয় এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রের বিকাশ।

                           

(তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century, Upinder Singh.

২- Lords of the Deccan: Southern India from the Chalukyas to the Cholas, Anirudh Kanisetti.

৩- History of the Pala Dynasty Kings of Bengal (An Archival Study), Prashant Kashyap and Umesh Kumar Singh.)

Tuesday, 25 July 2023

রত্ন পাথর ও বিঞ্জান

 পাথর আসলে কী?

 *১.নীলা:-* 

নীলা কী? নীলা হল কপার সালফেটের কেলাস। CuSO4, 5H 2O হল এটার রাসায়নিক নাম। তামা আর সালফার ছাড়া এর মধ্যে অন্য কোনো ধাতু বা মেটাল নেই। বাকি যা আছে তা হল পাঁচ অণু জল।এবারে এটা কীভাবে গ্রহের গতিপথ বদলে দেবে সেটা নাসার গবেষকেরা কেউ-ই বলতে পারবেন না।

 *২।প্রবাল কী?* 

প্রবাল হল অ্যান্থজোয়া শ্রেনীভূক্ত সামুদ্রিক প্রাণী। এদের নিকটাত্মীয় হল সাগর কুসুম। এরা সাগর কুসুমের মতই পলিপ তৈরি করে, তবে সাধারণত এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। এরা প্রাণী হলেও, জীবনের পূর্ণবয়ষ্ক অবস্থায় সাগরতলে কোন দৃঢ় তলের উপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে গেড়ে বসে সেখানে নিজের দেহের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ( Ca CO3) নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে খোলস বা বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে। একটা প্রবাল পলিপের মৃত্যুর পরেও খোলসটি রয়ে যায় এবং তা অস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। এরকম অস্মীভূত প্রবালের দেহাবশেষের উপর নতুন করে আবার প্রবাল বসতে পারে। এভাবে একটা কলোনি বহু প্রজন্ম ধরে চলার ফলে বড়সড় পাথুরে আকৃতি ধারণ করে। এভাবেই তৈরি হয় বড় প্রবাল দ্বীপ এবং প্রবাল প্রাচীর। অস্ট্রেলিয়ার সন্নিকটে গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর। রাসায়নিক ভাবে ক্যালসিয়াম কার্বনেটই হল প্রবাল।এবারে এই প্রবালের প্রস্তরীভূত দেহাবশেষ কীভাবে গ্রহের গতিপথ বদলে দিতে পারে সেটা নাসার গবেষকেরা কেউ-ই বলতে পারবেন না।

 *৩.মুক্ত কী?* 

ঝিনুকের মধ্যে তৈরি  মুক্ত আসলে 86 % calcium carbonate (CaCO3) 2 - 4 % জল. ~ 10 % conchiolin (an organic binding agent)। তাহলে দেখা যাচ্ছে মুক্তও প্রবালের মতোই রাসায়নিক ভাবে ক্যালসিয়াম কার্বনেটই। শামুক,ঝিনুকের খোলের প্রধান উপাদান এই ক্যালসিয়াম কার্বনেট।ক্যালসিয়াম কার্বনেট কীভাবে আকাশের গ্রহের গতিপথ বদলাবে? সবচেয়ে বড় কথা প্রবাল বা মুক্ত যে আসলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট এতটা জানেই না জ্যোতিষীরা।

 *৪.চুনি (Ruby) কি?* 

খনিজ বা বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম। Al2O3. লাল বা নীল রঙের। কীভাবে ভাগ্য পাল্টাবে এই এলুমিনিয়ামের যৌগ? আর যদি পারেই বদলাতে তাহলে আপনার আমার বাড়ির এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি, কড়াই,প্রেশারকুকার দিয়েই তো ভাগ্য বদলে ফেলা সম্ভব। 

 *৫.পান্না কি?* 

বেরিল(বেরিলিয়াম এলুমিনিয়াম সিলিকেট)

3Be.Al2O3 6SiO3. সবুজ রঙের স্বচ্ছ পদার্থ। এটাও সেই এলুমিনিয়ামের যৌগ।সঙ্গে আছে সিলিকন। যেটা বালিতে থাকে। তাহলে পান্না না নিয়ে এলুমিনিয়ামের হাঁড়িতে কিছু বালি নিলেই তো পান্নার কাজ হওয়া উচিত। 

 *৬.গোমেদ কি?* 

গোমেদ হল গারনেট।রাসায়নিক ভাবে এটা হল

3Mgo/CaO/MnO.Fe2O3/Cr2O3/Al2O3 3SiO3 অর্থাৎ এলুমিনিয়াম ছাড়া ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ক্যালশিয়াম ও লোহা আছে এতে। এটার রঙ লাল,বাদামি,কমলা হয়।এইসব মেটালগুলোর গ্রহের গতিপথ বদলানোর ক্ষমতা কীভাবে হল সেটা কোনো রসায়নবিদ বলতে বা ব্যাখ্যা করতে পারবেন না।জ্যোতিষীরা জন্মেও শোনেনি বা শেখেনি গোমেদের রাসায়নিক পরিচয়।

 *৭.পোখরাজ কি?* 

পোখরাজ হল টোপাজ।

Al2SiO4. স্বচ্ছ । এটাও সেই এলুমিনিয়ামের যৌগ। সঙ্গে আছে সিলিকন। যেটা বালিতে থাকে।

 *৮.ক্যাটস আই কি?* 

কোয়ার্টজ। SiO 2 সিলিকন ডাই অক্সাইড। এককথায় এটা বালিই। বালির রাসায়নিক রূপভেদ মাত্র। এর বদলে পকেটে কিছু বালি নিয়ে চলুন। একই রেজাল্ট পাওয়া উচিত।

 *৯.হিরে কি?*  

কার্বন বা C 

হিরে কার্বনের রূপভেদ মাত্র।তাই দামি হিরের বদলে এক টুকরো কয়লা সঙ্গে রাখলেও একই ফল পাওয়া উচিত।

 আমজনতা এত জেনে বুঝে গেলে রত্ন বা পাথর কীভাবে বিক্রি হবে? জ্যোতিষীদের ব্যবসা বা কুসংস্কার কীভাবে টিকে থাকবে?সাথে দেশের নামজাদা গ্রহরত্নের দোকানগুলোই বা রমরম করে চলবে কিভাবে ? কয়েক বছর আগে, নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে  টিভিতে, কাগজে বহুল বিজ্ঞাপন দেওয়া এক জ্যোতিষী ঘুমোতে ঘুমোতে নিজের খাটেই সিগারেটের আগুন থেকে পুড়ে মারা গেলেন। কোন পাথরই কাজ করেনি। আসলে জ্যোতিষী ব্যাপারটা মোটের ওপর বেঁচেই আছে আমার আপনার মনের দুর্বলতাকে পাথেয় করে ।

🙏🏼

Thursday, 20 July 2023

ভারতের গনতন্ত্রের ইতিহাস

 সকল পাঠকবৃন্দের প্রতি নমস্কার 🙏🏻। 


পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো ভারতবর্ষ।এই রাষ্ট্রে এখন ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় যথাক্রমে ৫৪৩ ও ২৪৫ টি আসন বিশিষ্ট। ভবিষ্যতে এই আসন সংখ্যা জনসংখ্যার তারতম্যের বিচারে বৃদ্ধি পেতে পারে। আজ নতুন ভারতের কাহিনী নয়, বরং প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যবাহী গৌরবময় কিছু ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে লিখছি:: চলুন    প্রিয় ভারতবাসীসহ ভারতকল্যাণের কামনাকারী বিশ্ববাসী, আজ ভারতের অতীতে ঘটে যাওয়া রোমাঞ্চকর ইতিহাস পড়া যাক....


প্রাচীন ভারতের দুটি গণতান্ত্রিক রাজ্য ছিল ১)মল্ল ২)বৃজি। অর্থাৎ যখন পুরো বিশ্ব গণতন্ত্র কী সে সম্পর্কে জানাতোই না, তখন ভারতের গণতন্ত্রের ধারণার উত্থান ঘটেছিল।


 আমরা এখন শাসনব্যবস্থা কেন্দ্র, রাজ্য এবং রাজ্যের মধ্যে জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত— এইভাবেই বিভক্ত ব্যবস্থা লক্ষ্য করে থাকি। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হলো, এই ধারণাই বিকাশলাভ করেছিল চোল সম্রাজ্যের সর্বোচ্চ স্তর থেকে গ্রামীণ স্তরে।


 যদি প্রশ্ন করেন চোল সম্রাজ্য কত বছর আগেকার, তবে এই প্রশ্নের উত্তর রসগোল্লা খাবার মতোই সহজ ও কোমল, উত্তর হলো ৮৪৮ সালে।চোল সম্রাজ্যের নৃপতিদের নৌশক্তিও ছিল প্রবল।এই নৌশক্তির বলে চোল নৃপতিরা বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া, মালোয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যাণ্ড ও লাওস বিজয়ে সক্ষম হয়েছিলেন। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে দেশীয় নৃপতিদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে ভারতের চতুর্সীমা সুরক্ষার কাজটা উত্তর পশ্চিমে জাঠ ও রাজপুত, দক্ষিণে চোল ও চালুক্য, পূর্বে পাল সম্রাটরা দক্ষহাতেই করছিলেন।


এই প্রসঙ্গে এক টুকরো ইতিহাস বলি, একবার পালসম্রাট মহীপালের সঙ্গে চোলসম্রাট প্রথম রাজেন্দ্র চোলের মতবিরোধ ঘটেছিল, ফলে প্রথম রাজেন্দ্র চোল মহীপালের অহংকার চূর্ণ করে রাজ্যপাঠে মনোনিবেশ করানোর চেষ্টায় মহীপালকে পরাজিত করে গঙ্গোইকোণ্ডচোল নামে পরিচিত হয়েছিলেন। কিন্তু জয়লাভের পরেও প্রথম রাজেন্দ্র চোল মহীপালের রাজত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ প্রথম রাজেন্দ্র চোলের উদ্দেশ্য মহীপালকে পরাজিত করা ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজ্যপাঠে মনোনিবেশ করিয়ে পূর্বভারত রক্ষার দায়িত্ব স্মরণ করানো।কারণ মহীপাল সেই সময়ে শাসনকার্যের দিকে লক্ষ্য রাখার থেকেও বেশী আমোদ প্রমোদে সময় অতিবাহিত করতে শুরু করেছিলেন—যা একজন সুযোগ্য সম্রাটের পক্ষে শোভা পায় না। অনেকেই বলবে চোলরা বঙ্গদখলের মানসিকতায় আক্রমণ করেছিল, কিন্তু এই অভিযোগের সর্বৈব মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। বঙ্গদখলের মানসিকতাই যদি উদ্দেশ্য থাকতো, তবে পাল সম্রাট মহীপালকে পরাজিত করেও তার সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দিতেন না প্রথম রাজেন্দ্র চোল।


আমরা হয়তো পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রধান কৃতিত্ব গান্ধীজিকে দিয়েই নিজেদের বড়োই বিজ্ঞ ও পণ্ডিত প্রমাণ করতে চাই, কিন্তু তিনিও নিশ্চিত চোল সম্রাজ্যের ইতিহাস পড়েছিলেন।পড়া তো উচিত, জানা তো উচিত, আর যাই হোক তিনি তো একজন ব্যারিস্টার ছিলেন।ব্যারিস্টার হবার খাতিরে তাঁকে তো ভারতের প্রাচীন ইতিহাস জানতেন আশা করি।


যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা আজ লুটতরাজ মানসিকতার আঞ্চলিক নেতানেত্রীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকে প্রতিদিন অন্ততঃ আধাঘন্টা অন্তর অন্তর, সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল অতীতে দক্ষিণভারতেই বিস্তার লাভ করা চোল সম্রাজ্যে। কিছু দিন আগেই আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী যে #সিঙ্গোল দণ্ডটি রাজপুরোহিত দ্বারা গ্রহণ করলেন এই রাজদণ্ড গ্রহণের পরম্পরাই ছিল ঐতিহ্যবাহী সুপ্রাচীন চোল সম্রাজ্যের শাসন পরিচালনার প্রথম স্তর। অর্থাৎ আমাদের দেশ সঠিক পথেই হাঁটছে, অতীতের ঐতিহ্যময় ইতিহাসকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করেই।


আজ জানাবো প্রাচীন ভারতের ১৬টি মহাজনপদ( ষোড়শ মহাজনপদ) বর্তমানে কোন স্থানে অবস্থিত আছে ও তার নাম কী হয়েছে সেই সম্পর্কে.... চলুন জেনে নেওয়া যাক।

।। #ষোড়শ_মহাজনপদের_বর্তমান_ভারতে_অবস্থান।।

১)কাশী ( এখন অবস্থান বারাণসী)= কাশীর রাজধানী ছিল কাশীপুর

২)কোশল (এখন অবস্থান অযোধ্যা)= কোশলের রাজধানী অযোধ্যা

৩)অঙ্গ(এখন অবস্থান পূর্ব বিহার) = অঙ্গের রাজধানী ছিল চম্পাপুরী

৪)মগধ (এখন অবস্থান দক্ষিণ বিহার)= মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ বা পাটলিপুত্র

৫) বৃজি( এখন অবস্থান উত্তর বিহার)= বৃজির রাজধানী ছিল বৈশালী 

৬) মল্ল(এখন অবস্থান গোরক্ষপুর)= মল্লের রাজধানী ছিল কুশিনারা 

৭) বৎস(এখন অবস্থান প্রয়াগরাজ)= বৎসের রাজধানী ছিল কৌশাম্বী

৮) চেদি (এখন অবস্থান বুণ্ডেলখণ্ড)= চেদির রাজধানী ছিল সুক্তিমতি 

৯) কুরু(এখন অবস্থান দিল্লী)= কুরুর রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ 

১০) পাঞ্চাল(এখন অবস্থান রোহিলখণ্ড)= পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র ও কাম্বিল্য 

১১) মৎস্য(এখন অবস্থান জয়পুর)= মৎসের রাজধানী ছিল বিরাটনগর 

১২)শূরসেন (এখন অবস্থান মথুরা)= শূরসেন রাজধানী ছিল মথুরা 

১৩) অস্মক( এখন অবস্থান গোদাবরী উপত্যকা)= অস্মকের রাজধানী ছিল পোতলা 

১৪) অবন্তী (এখন অবস্থান মালব) = অবন্তীর রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী ও মাহেষ্মতী 

১৫)গান্ধার(এখন অবস্থান পেশোয়ার)= গান্ধারের রাজধানী ছিল তক্ষশীলা 

১৬) কম্বোজ(এখন অবস্থান পশ্চিম কাশ্মীর)= কম্বোজের রাজধানী ছিল রাজপুর 


সম্রাট অশোকের সময় ভারত বর্তমানের অবস্থান সুবিশাল ছিল। 

অখণ্ড ভারতের মানচিত্রের যে বর্তমানের স্থানগুলি আসবে সেগুলি হলো —

১) আফগানিস্তান(বর্তমান ইরানের একটা বৃহৎ অংশ সমেত) ২) পাকিস্তান(pok সমেত) ৩) আকসাই চিন ৪) তিব্বত ৫) নেপাল ৬) ভুটান ৭) বাংলাদেশ ৮) মায়ানমার ৯) থাইল্যাণ্ড ১০) লাওস ১১) কম্বোডিয়া ১২)ভিয়েতনাম ১৩) ইন্দোনেশিয়া ১৪) মালোয়েশিয়া ১৫) সুমাত্রা-জাভা ১৬) শ্রীলঙ্কা ১৭) ফিলিপাইন ১৮)মালদ্বীপ।আগের কিছু লেখায় এ সম্পর্কে লিখেছিলাম। কেহ কেহ মনে করেন বঙ্গ ভারতের অংশ ছিল না— একথা সবৈব মিথ্যা। বঙ্গদেশের নাম বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিপিটকেও উল্লেখ আছে এবং মহাভারতেও উল্লেখ আছে।এই বঙ্গের সম্রাট সমুদ্রসেন, চন্দ্রসেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। তৎকালীন পৌণ্ড্র ও অঙ্গ নামক ভারতের পূর্বদিকের দুটি রাজ্য ছিল। এই পৌণ্ড্রদেশের সম্রাট ছিলেন পৌণ্ড্রক বাসুদেব—যিনি তাঁর অপকর্মের জন্য শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিধন হয়েছিলেন এবং অঙ্গদেশের সম্রাট ছিলেন দুর্যোধনের মিত্র তথা পরশুরামের শিষ্য কুন্তীপুত্র কর্ণ। সুতরাং তৎকালীন ভারতের সুবিশালতা আজ ইউরোপীয় ও আফ্রিকান সাম্রাজ্যের চারগুণের অধিক ছিল—একথা সুদৃঢ় কণ্ঠে বলতে কোনো জড়তা না থাকাই উচিত। 


আর একটি ঐতিহাসিক কাহিনী বলি, জরাসন্ধের নাম সকলেই শুনে থাকবেন নিশ্চিত। এই জরাসন্ধের সময় ভারতের পূর্ব উত্তর প্রায় রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তাঁর।অতি অত্যাচারী জরাসন্ধের মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্য কুরুসাম্রাজ্যের অধীনে আসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঐ অঞ্চলে।এর পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে সুদূর বর্তমানের পশ্চিমে ইরান-আফগানিস্তান থেকে শুরু করে উত্তরে কাশ্মীর- তিব্বতসহ পূর্বে বাংলাদেশ, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া মালোয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যাণ্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ, এমনকি শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এখনকার অস্ট্রেলিয়া এবং এখনকার ভারতের পুরোটাই পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ যুধিষ্টিরের চক্রবর্তী সম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ভাবুন তো কী বিরাট ভারত ছিল !!! যুধিষ্ঠিরের পরে পরিক্ষিৎ জনমেজয় এমনকি চন্দ্রগুপ্ত, বিন্দুসার, অশোক, পৃথ্বীরাজ চৌহান ও যশপালের সময়েও এই অখণ্ড ভারতের ভিত্তি মজবুত ছিল। মহারাণাপ্রতাপের পূর্বপুরুষ বীর যোদ্ধা বাপ্পা রাওয়াল তো যুদ্ধ করতে করতে বর্তমান ইউরোপের প্রবেশদ্বার তুরস্ক অবধি জয়লাভ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন।এসব ইতিহাস ভারতবাসীকে জানতে দেওয়া হলোই বা কই ?? ভারত স্বাধীন হবার পর ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী শুধু নয় পরবর্তী ৫জন শিক্ষামন্ত্রী তো ভারতীয় ছিলই না।তাহলে ভারতীয় ঐতিহ্যময় বীরত্বের ইতিহাস লুপ্ত সুপ্ত হবে না তো কী জাগরিত হবে !!! একথা তো একজন দুধেবাচ্ছাও বুঝতে পারবে বলেই আশা করি।


এখন ইতিহাসের ঐ মহান পরিচ্ছেদকে সন্তর্পনে পরবর্তী সময়ে পুনঃজাগরণের জন্য হৃদয়ে রেখে এবার জেনে নেওয়া যাক মহাভারতের সময়কালে ভারতের রাজ্যগুলির বর্তমান অবস্থান নিয়ে—


১. কুরুরাষ্ট্র: মহাভারতের সবচেয়ে নামকরা রাজ্য।বর্তমান ভারতের দিল্লী, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ এবং উত্তর প্রদেশের পশ্চিম অংশ নিয়ে কুরু রাষ্ট্র ছিল।কুরুরাষ্ট্রের রাজধানী হস্তিনাপুর বর্তমান উত্তর প্রদেশের মীরাটের কাছেই অবস্থিত।


২. পাঞ্চাল প্রদেশ: পাঞ্চাল প্রদেশের উত্তরে হিমালয় এবং দুইটি অংশই বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত।অন্যদিকে রাজধানী অহিচ্ছত্র বর্তমানে রামনগর জেলার অন্তর্গত। 


৩. গান্ধার: আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী অববাহিকায় অবস্থিত এক সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। এর রাজধানী ছিল তক্ষশীলা—যা  বর্তমান রাওয়ালপিণ্ডি(এই নামটি বাপ্পা রাওয়ালের নাম অনুসারে হয়েছে)।তৎকালীন পুরো গান্ধার বর্তমানে পেশওয়ার প্রভিন্স, খাইবার পাখতুনখোয়া এর দক্ষিণে এবং পাঞ্জাবের উত্তরে অবস্থিত।


৪. শূরসেন রাজ্য :বর্তমানে পুরো রাজ্যটি উত্তর প্রদেশের অংশবিশেষ। শূরসেন প্রধান শহর ছিল মথুরা যা বর্তমানে মথুরাতেই ছিল।


৫. মৎস্যদেশ: মৎস্যদেশ বর্তমান জয়পুরের অতি সন্নিকটে ছিল। এর উত্তরের অংশ বর্তমান দক্ষিণ হরিয়ানার অংশ। এর রাজধানী বিরাট নগরী বর্তমানে বিরাটনগর হিসেবে পরিচিত।


৬. কুন্তিভোজ: বর্তমান রাজস্থানে কুন্তিভোজ রাজ্য অবস্থিত।


৭. কাশী : কাশী রাজ্যের রাজধানী ছিল কাশীপুর। যা বর্তমানে বারাণসী নামে সমধিক পরিচিত। এটি গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। কাশী রাজ্যটি উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত।


৮. অঙ্গ রাজ্য: অঙ্গ রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী ছিল চম্পাপুরী। বর্তমানে অঙ্গ দক্ষিণ-পশ্চিম বিহার, ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছুটা অঞ্চলজুড়ে আছে।


৯. মগধ: মগধের রাজধানী ছিল রাজগীর। বর্তমানে শহরটি পাটনার অন্তর্গত। আর পুরো রাজ্যটা বিহারের অন্তর্গত।


১০. বিদর্ভ : বিদর্ভ বর্তমান মহারাষ্ট্রের উত্তরপূর্ব নাগপুর ও অমরাবতী অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। বর্তমান মধ্যপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার সাথে তৎকালীন বিদর্ভের সীমানা সংযোগ ছিল।


১১. চেদি রাজ্য : তৎকালীন চেদি রাজ্যের কিছু অংশ বর্তমান উত্তর প্রদেশ এবং বাকি অংশ মধ্যপ্রদেশে পড়েছে।চেদি রাজ্যের রাজধানী শুক্তিমতী, এটি বর্তমান উত্তর প্রদেশের বান্দা প্রদেশের নিকটবর্তী।


১২. মদ্র দেশ : মদ্রদেশের রাজধানী ছিল সাগালা ।যা বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের শিয়ালকোট শহর। বর্তমান কাশ্মীরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে রাজ্যটি পূর্ব-পশ্চিম বরাবর বিস্তৃত ছিল।


১৩. নিষাদ রাজ্য : নিষাদ রাজ্যটির অবস্থান বর্তমান রাজেস্থানে ছিল


১৪  ইন্দ্রপ্রস্থ: এই নগরটির অবস্থান এখনকার নতুন দিল্লিতে ছিল


১৫ দ্বারকা: এই শহরটি এখন গুজরাটের নিকটে আরব সাগরে ডুবে আছে।


আবার কেহ কেহ বলছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের অংশ ছিল না। এমন কথা বলা আর গগনপুস্তক পড়া একই ব্যাপার। কারণ ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ নামটির কোনো অস্তিত্ব বিশ্বের মানচিত্রেই ছিল না। মহাভারতের সময়কালীন সময়ে প্রাকজ্যোতিষপুর নামক একটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। অঙ্গ বঙ্গ পৌণ্ড্র সুহ্ম কলিঙ্গ(যাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় উৎকল বলা হয়েছে) থাকলেও প্রাচীন কোনো গ্রন্থে ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ নামটির উল্লেখ নেই। আসলে ভারতের পূর্বে অঙ্গ বঙ্গ পৌণ্ড্র সুহ্ম রাজ্যগুলিই ছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সম্রাটের শাসনকালে নামের পরিবর্তন হলেও স্থান অপরিবর্তিত থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় এখন যেখানে ইরান সেটাই আগে নাম ছিল পারস্য, এখন যেখানে ভিয়েতনাম সেটার নাম ছিল চম্পা, এখন যেটি মালদ্বীপ সেটাই আগে নাম ছিল মালয়দ্বীপ

এমন বহু উদাহরণ আছে।কিন্তু ভারত নামটির উপস্থিতি সদা সর্বদা সেই গ্রিক রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মেগাস্থিনিসের লেখায় এবং টলেমি থেকে শুরু করে ইবন বতুতা, হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ কথাতেও পাওয়া যায়। সুতরাং একথা অমূলক নয় যে বাংলাদেশের শিকড় আসলে ভারত। ইতিহাসকে বদলে দেবার অপচেষ্টা হলেও সমগ্র বিশ্ব আজ ভারতের দিকে তাকিয়ে। সকলেই দেখছে পুনর্বার কীভাবে ভারত শির উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। যে ভারতের উপর বিদেশী হানাদারদের আগ্রাসী অপশাসনের কুঠারাঘাত হলেও, পুর্ণবিনাশ করার চেষ্টা হলেও, ভারত ক্রমশ বর্বরদের পৈচাশিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসাবে আজ আবার দেখাচ্ছে বেদজ্ঞানের অপরাশক্তির সঙ্গে পরাশক্তির স্বাভাবিক মেলবন্ধনে কীভাবে ক্ষমতাকে অর্জন করেও “বসুদেব কুটুম্বকম্”-এর শিক্ষায় গোটা দেশকে পরিচালনা করে ক্রমশ বিশ্বগুরু হতে হয়। 


ভারতের বহু মানুষ আজও রামায়ণ ও মহাভারতকে ঐতিহাসিক গ্রন্থ বলতে স্বীকার করেনা‌। এটাও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের ব্রেণ ওয়াশ করা অশিক্ষা ও আংশিক শিক্ষার সুদুর প্রসারী প্রভাব। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস জানতে রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ এবং অষ্টাদশ পুরাণ ও উপপুরাণগুলি যেমন সাহায্য করে তেমনিই মন্দির, সৌধ, প্রাসাদ, গুহা, নদী, শিলালিপি, মুদ্রা, স্তম্ভ ও সাহিত্যের উপাদান দারুণভাবে কার্যকর। যাঁরা ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের যোগ নেই বলে মনে করেন, তাঁদের বুদ্ধি হয় জং ধরেছে নয়তো অলসদানব ভর করেছে তাঁর শরীরে। শুধু সাহিত্য নয়, বিজ্ঞান ও ভূগোলের সঙ্গেও ইতিহাস সরাসরি যুক্ত। সুতরাং  ইতিহাস নিঃসন্দেহে এক উৎকৃষ্ট শাস্ত্র। তবে যাঁরা ভারতের ইতিহাসকে ভারত আক্রমণকারী বর্ণিত কাহিনীর আলোকে পড়বেন, তাঁরা হতদরিদ্র হতভাগ্য আত্মগৌরববর্জিত মনুষ্য ছাড়া আর কী বা হবেন !!! ভারতের ইতিহাস জানতে ভারতীয় দেশভক্ত লেখকের লেখা না পড়ে বিদেশী হানাদার মদতপুষ্ট কুলেখকদের লেখা পড়ার কী যৌক্তিকতা আছে ?? ভারতীয় ঐতিহাসিকের মধ্যে যেমন যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক মেগাস্থিনিস তৎকালীন ভারতীয় সামাজিকতার যে অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছিলেন তা তার ইণ্ডিকা গ্রন্থ অধ্যায়ণেই জানতে পারা যায়। আজ এখানেই সমাপ্তি করলাম। পরবর্তীতে আরার কোনো ঐতিহাসিক তথ্যযুক্ত রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে লিখবো। নমস্কার 🙏🏻

Sunday, 2 July 2023

বর্ণ ভেদের ভ্রান্ত ধারণা

 “চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।

(শ্রীমদ্ভগবত গীতার অধ্যায়- ৪, শ্লোক- ১৩)

অর্থাৎ কর্মগুণ অনুসারে মানুষদের চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। জন্মগুণ অনুসারে নয়। যার কারণে গাদির পুত্র বিশ্বামিত্র ছিলেন ব্রাহ্মণ যদিও গাদি ছিলেন ক্ষত্রিয়। আবার শুদ্রের পুত্র রত্নাকর ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করে হয়েছিলেন ব্রাহ্মণ। তার নাম হয়েছিল ঋষি বাল্মিকি এবং রচনা করেছিলেন রামায়ণের। এখানেই প্রমাণিত হয় যে একজন ক্ষত্রিয় বা শুদ্রের ছেলেও ব্রাহ্মণ হতে পারে।


``~ ধর্মগ্রন্থ এটাও বলে-🙏🚩

জন্ম জায়তে শুদ্রঃ 

সংস্কারঃ দ্বিজ উচ্চতে

বেদ পঠনাৎ ভবেত বিপ্র

ব্রহ্ম জ্ঞানেতী ইতি ব্রাহ্মণ। 

★অর্থাৎ, জন্ম মূহুর্তে সকলেই শুদ্র, সংস্কার দ্বারা দ্বিজ, জ্ঞান লাভে বিপ্র আর ব্রহ্মজ্ঞানে হয় ব্রাহ্মন। 

কিন্তু সাহার ঘরে কোনো শিশুর জন্ম হলে সাথে সাথেই আমরা তার নাম সাহা রেখে দেই। পালের ঘরে বাচ্চার জন্ম হলে সাথে সাথেই হয়ে যায় পাল। 

যদিও সাহা, পাল, দত্ত, ঘোস এসব এবং এমন বাকি সব টাইটেলের উল্লেখ্য বেদ বা গীতায় নেই। এগুলা সব মানুষের তৈরি জিনিস। কিন্তু বিয়ের সময় পালেরা পাল ছাড়া বিয়ে করে না। 

বিয়ের সময় আরো একটা জিনিস সবাই জানতে চায়। সেটা হচ্ছে গোত্র। হিন্দুদের অনেকগুলো গোত্র আছে। যেমন কাশ্যপ গোত্র, ভরদ্বাজ গোত্র, বিশ্বামিত্র গোত্র, শিব গোত্র, আলম্ব্যায়ন গোত্র ইত্যাদি। গোত্র শব্দটির অর্থ বংশ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়। কাশ্যপ একজন ঋষির নাম ছিলো এবং ঐ ঋষির পরবর্তী বংশধর যারা আছে তারা সবাই কাশ্যপ গোত্রের। একইভাবে আলিম্ম্যন একজন ঋষি ছিলেন যার পরবর্তী বংশধরদেরকে আমরা আলিম্মন্য গোত্রের বলে থাকি। কাশ্যপ ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ কিন্তু তার পরবর্তী প্রজন্ম ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্র, ক্ষত্রিয় সবই হয়েছে। যার কারণে আমরা অনেক শুদ্রকে বলতে দেখি যে তারা কাশ্যপ গোত্রের আবার অনেক ব্রাহ্মণও বলে যে তারা কাশ্যপ গোত্রের। তার মানে একই ঋষির সন্তানেরা ৪টি বর্ণেরই হয়েছে। তাহলে সাহার ছেলে শুধু সাহাই কেন হবে? পালের ছেলে শুধু পালই কেন হবে? ঘোষের ঘরে কোনো বাচ্চার জন্ম হলে সাথে সাথেই তার নামের সাথে ঘোষ টাইটেল কেন দিয়ে দেই।

★মনুসংহিতা এবং উপনিষদে একই গোত্রের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় সব সাহারাই আলিম্ম্যন গোত্রের। কিন্তু সাহারা সাহা ছাড়া বিয়ে করতে চায় না। তার মানে তারা আলিম্ম্যন গোত্রের হয়ে আলিম্ম্যান গোত্রের মধ্যেই বিয়ে করছে। এটা কি হিন্দু ধর্মের অবমাননা নয়? 


যারা জাত পাতে বিশ্বাসি তাদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা সবাই পরশুরামের উদাহরণ দিয়ে বলে যে, পরশুরাম বর্ণবাদি ছিলেন। তিনি ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র বিদ্যা শিখাতেন না। তাহলে আমরা কেন বর্ণ মানবো না। প্রথম কথা হচ্ছে, পরশুরাম ক্ষত্রিয়দের শেখাতেন না, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং তিনি শপথ করেছিলেন অধার্মিক ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করবেন। তাই তিনি অধার্মিক ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র বিদ্যা প্রদান করতেন না। কিন্তু যারা ধার্মিক ক্ষত্রিয় ছিলো তারা সবাই পরশুরামের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছে। ভীষ্ম, রুকমি সহ আরো অনেক ক্ষত্রিয় পরশুরামকে গুরু হিসেবে পেয়েছে। দেবব্রত ক্ষত্রিয় ছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন ধার্মিক এবং বিশ্বস্ত যার কারণে তিনি পরশুরামের শিষ্য হতে পেরেছিলেন। কর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে পরশুরামের কাছে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলো। সেই মিথ্যার শাস্তি ছিলো অভিশাপ। এখানে বর্ণবাদ নেই। বরং ধর্ম এবং অধর্মের ব্যাপার ছিলো। 


তাই নিজের নিন্ম মন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন এবং অন্যের উন্নত মানসিকতার সম্মান করুন,সমালোচনা না।

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...