Thursday, 27 July 2023

ত্রিপাক্ষিক দ্বন্ধ।

সম্রাট হর্ষবর্ধনের সময় থেকেই কনৌজ ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। তখন মালবরাজ দেবগুপ্ত, এবং বাংলার শাসক শশাঙ্ক কনৌজ অধিকার করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সমৃদ্ধ গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থানের জন্য কনৌজ ভারতীয় রাজাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পরে প্রায় একশো বছর ধরে উত্তর ভারতে কোন সাম্রাজ্যিক ঐক্য ছিল না। সেই সময় কাশ্মীর ও কামরূপের রাজারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জয় করে শক্তিশালী রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মালবের রাজা যশোবর্মন অল্প কিছুকাল কনৌজে রাজত্ব করেছিলেন, তবে কনৌজ ততদিনে নিজের পূর্ব গৌরব হারিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খৃষ্টীয় অষ্টম শতকের ভারতীয় রাজাদের মধ্যে এই ধারণা গড়ে উঠেছিল যে, কনৌজ-ই সার্বভৌম সাম্রাজ্যের প্রতীক। তাঁদের ধারণা ছিল যে, যিনি কনৌজ অধিকার করতে পারবেন, তিনিই সার্বভৌম সম্রাটের স্বীকৃতি পাবেন। ইতিহাস বলে যে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে ভারতের তিনদিকে তিনটি রাজশক্তির উদ্ভব হয়েছিল। অষ্টম শতকের মধ্যে রাষ্ট্রকূট রাজা দন্তিদুর্গ চালুক্য সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিয়ে সমগ্র দাক্ষিণাত্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রকূটরা অত্যন্ত পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন। দন্তিদুর্গের বংশধরদের মধ্যে ধ্রুব, তৃতীয় গোবিন্দ ও তৃতীয় ইন্দ্ৰ কনৌজ জয় করে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, ভারতের মধ্যবর্তীস্থলে অবস্থানের জন্যই রাষ্ট্রকূটরা দুই অঞ্চলের ওপরে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সময়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছিল।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত দ্বিতীয় পক্ষটি ছিলেন বাংলার পালরাজারা। অষ্টম শতকে বাংলা ও বিহার অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে তখন বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র ধর্মপাল বাংলাকে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনিই কনৌজকে কেন্দ্র করে পাল সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেখতে দেখতে পূর্বভারতে পালরাজারা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিব্বতের সঙ্গে পালরাজাদের সুসম্পর্ক ছিল, সেজন্য নিজেদের রাজ্যের উত্তর সীমান্ত নিয়ে তাঁদের কোনো চিন্তা ছিল না। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। ধর্মপাল ও তাঁর পুত্র দেবপাল বাংলার নেতৃত্বে এক বিশাল সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের তৃতীয় পক্ষটি ছিলেন রাজপুতনার প্রতিহাররা। ঐতিহাসিকদের মতে তাঁরা সম্ভবতঃ গুর্জর জাতির লোক ছিলেন, সেজন্য অতীতে তাঁদের গুর্জর-প্রতিহার বলা হত। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকূট রাজারা তাঁদের ‘দ্বাররক্ষক’ গোত্রীয় নিম্নবর্গের মানুষ বলে গণ্য করতেন। হতে পারে যে, প্রতিহাররা প্রথমে হয়ত রাজপ্রাসাদের কর্মচারী ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁরা রাজা হয়ে বসেছিলেন। পশ্চিমে আরবদের প্রতিহত করে প্রতিহাররা পূর্বদিকে নিজেদের রাজ্য সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। অষ্টম শতকের শেষদিকে রাজস্থান, কনৌজ, মালব ও গুজরাট জুড়ে তাঁদের একটা বিস্তৃত রাজ্য ছিল।

ভারতের তিনদিকের এই তিনশক্তি কনৌজ দখল করে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রায় দু’শো বছর ধরে সেই তিন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলেছিল (৭৫০-৯৫০ খৃষ্টাব্দ)। ওই ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয়লাভ করতে পারেনি। প্রথমদিকে প্রতিহাররা জয়ী হলেও আরব, পাল ও রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তাঁদের শক্তিক্ষয় হয়েছিল। তাঁরা কখনো দাক্ষিণাত্য জয়ের চেষ্টা করেন নি। একটা সময়ে তাঁদের অধীনস্থ সামন্ত রাজারা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে তাঁদের জয়ও শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অবশেষে খৃষ্টীয় একাদশ শতকের গোড়ার দিকে তুর্কিদের আক্রমণে কনৌজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে উক্ত ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কতগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেই দ্বন্দ্বে জড়িত তিনপক্ষই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি থেকে এসেছিলেন, তাঁদের কেউই ভারতের মধ্যদেশের রাজশক্তি ছিলেন না। উত্তর, পূর্ব ও দাক্ষিণাত্যের সমকালীন তিনশক্তিই গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত কনৌজ (মহোদয়) অধিকার করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একটা সময়ে পশ্চিম এশিয়ার জাতিগুলি ব্যাবিলনকে তাঁদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বলে গণ্য করত। জার্মানির জাতিগুলি রোম দখল করাকে সাম্রাজ্য দখল করবার সমান বলে ধরে নিয়েছিল। ঠিক তেমনি অষ্টম শতকের ভারতের তিন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিই কনৌজকে সাম্রাজ্যের ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে গণ্য করেছিল। তাঁরা কনৌজ অধিকার করবার জন্য যথেচ্ছ শক্তিক্ষয় করেছিল। শেষপর্যন্ত প্রতিহাররা সেই সংগ্রামে জয়ী হলেও কোনো শক্তিই নিরবচ্ছিন্নভাবে জয়লাভ করতে পারে নি; পাল ও রাষ্ট্রকূটরা কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। মোট কথা হল যে, ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের ইতিহাসে উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যায়।

বাংলার পালরাজাদের তাম্র অনুশাসনগুলিতে (খালিমপুর, মুঙ্গের) এবং বাদল স্তম্ভ লেখতে সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রতিহার রাজাদের দৌলতপুর ও বরা লেখ; এবং রাষ্ট্রকূটদের সনজান ও সিরপুর লেখগুলিতে সেই সংঘর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। সমকালীন গুজরাটি কবি সোদধালা, এবং বাঙালি কবি সন্ধ্যাকর নন্দীও তাঁদের লেখায় সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের দুই প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন - বাংলার পালরাজা ধর্মপাল ও দেবপাল এবং প্রতিহাররাজ বৎসরাজ, দ্বিতীয় নাগভট্ট ও ভোজ। বাংলার রাজা ধর্মপাল কনৌজ দখলের অভিপ্রায় নিয়ে পশ্চিমদিকে এগিয়ে গেলে প্রতিহাররাজ বৎসরাজ তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দোয়াবের কাছে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে ধর্মপাল পরাজিত হয়েছিলেন। এরপরে বৎসরাজ কনৌজে তাঁর প্রতিনিধি ইন্দ্ৰায়ুধকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজা ধ্রুব শক্তিসাম্য বজায় রাখবার জন্য হস্তক্ষেপ করেছিলেন, প্রতিহারদের সঙ্গে মালব ও গুজরাট নিয়ে তাঁদের বিরোধ ছিল। তিনি বৎসরাজকে পরাজিত করে বিতাড়িত করেছিলেন, এবং তারপরে ধর্মপালকে প্রতিহত করে পুনরায় দাক্ষিণাত্যে ফিরে গিয়েছিলেন। উত্তর ভারতে তাঁর সাময়িক জয় স্থায়ী হয়নি। এরপরে ধর্মপাল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ভাগলপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, ধর্মপাল বৎসরাজের প্রতিনিধি ইন্দ্রায়ুধকে বিতাড়িত করে তাঁর প্রতিনিধি চক্রায়ুধকে কনৌজে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। মুঙ্গের লেখতে বলা হয়েছে যে, ধর্মপাল সেই সময়ে উত্তর ভারতের অনেক জায়গা অধিকার করে নিয়েছিলেন, তিনি হিমালয়ের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। খালিমপুর লেখের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি কনৌজে এক বিরাট সভার আয়োজন করেছিলেন। তাতে ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, গান্ধার ও কীরের শাসকেরা উপস্থিত হয়েছিলেন। পাঞ্জাব, পূর্ব রাজপুতনা, মালব ও বেরারে ধর্মপালের আধিপত্য সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু ধর্মপালের সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। কারণ, এরপরেই প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্ট কনৌজ আক্রমণ করে অধিকার করে নিয়েছিলেন। যোধপুর লেখতে বলা হয়েছে যে, তখন দ্বিতীয় নাগভট্টের সঙ্গে তাঁর সামন্তরাজারা যোগ দিয়েছিলেন। তিনি চক্রায়ুধকে পরাজিত করে কনৌজ অধিকার করেছিলেন, এবং তারপরে সম্ভবতঃ তিনি পাল রাজ্যের মধ্যেও প্রবেশ করেছিলেন। পাল- প্রতিহার দ্বন্দ্ব চলাকালীনই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দ উত্তর ভারতে চলে এসেছিলেন। পাল-প্রতিহার দ্বন্দ্বের মাঝে হঠাৎ করে তৃতীয় গোবিন্দর হস্তক্ষেপের দুটি সম্ভাব্য কারণ ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন। সেগুলোর মধ্যে একটি হল যে, ধর্মপালের রানী রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা ছিলেন; এবং দ্বিতীয়টি হল যে, প্রতিহারদের জয়ের ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তৃতীয় গোবিন্দ বুন্দেলখণ্ডের যুদ্ধে প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্টকে পরাজিত করেছিলেন। তবে তৃতীয় গোবিন্দ শুধু প্রতিহার রাজাকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হননি, এরপরে তিনি ধর্মপাল ও তাঁর কনৌজের প্রতিনিধি চক্রায়ুধকেও পরাজিত করেছিলেন। সেই যুদ্ধের পরে তিনি দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে, ধর্মপাল পুনরায় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ধর্মপালের পরে তাঁর পুত্র দেবপাল সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন, এবং নাগভট্টের উত্তরাধিকারী রামভদ্র তাঁর হাতে পরাজিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটরাজ অমোঘবর্ষের একটি লেখতে বলা হয়েছে যে, তিনি নাকি বঙ্গ জয় করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, দেবপাল কখনোই কোনো রাষ্ট্রকূট রাজার কাছে পরাজিত হননি, উল্টে তিনি প্রতিহাররাজ ভোজকে পরাজিত করেছিলেন। ভোজ রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সংঘাতেও নিজের পরাজয় বরণ করে নিয়েছিলেন। দেবপালের পরে পালশক্তির অবনতি ঘটলে, সেটার সুযোগ নিয়ে প্রতিহাররাজ ভোজ কনৌজ অধিকার করেছিলেন। আর কনৌজ অধিকার করেই তিনি সোজা মগধে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অতিহাসিকদের মতে সম্ভবতঃ তিনি বঙ্গ জয় করেছিলেন, এছাড়া তিনি রাষ্ট্রকূটদের পরাজিত করে মালব ও গুজরাট অধিকার করেছিলেন। রাজা ভোজই প্রকৃতপক্ষে ‘উত্তরাপথস্বামী’ হতে পেরেছিলেন। ভোজের পুত্র মহীপাল বাংলা জয় করেছিলেন, তবে তিনি রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে সেই ঘটনা ঘটে, সেই পরাজয়ের ফলে প্রতিহার শক্তি হীনবল হয়ে পড়েছিল।

দু’শো বছর ধরে স্থায়ী হওয়া ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল, এবং সেটার রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর ছিল। তৎকালীন ভারতের তিনটি আঞ্চলিক শক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্রমাগতঃ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকবার ফলে একটা সময়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। প্রায় ঠিক একই সময়ে উক্ত তিনশক্তির পতন ঘটেছিল। ওই তিনশক্তিই প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। তিন বংশের রাজাদের কাছেই বিশাল সৈন্যবাহিনী ছিল, সেই বাহিনীর পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হত। সেই সামরিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁদের রাজস্ব বাড়াতে হয়েছিল, ফলে সাধারণ মানুষের ওপরে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, সেজন্যই তখন কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল। তাঁদের মতে পালরাজাদের আমলের কৈবর্ত বিদ্রোহ আসলে কৃষক বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে প্রাদেশিক শাসক ও সামন্তরাজারা বিদ্রোহ করে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। উক্ত তিনশক্তির সীমান্তে নেপাল, কামরূপ, কাশ্মীর, উৎকল প্রভৃতি স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ব উপকুলে চালুক্য ও গঙ্গাবংশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, এবং গুজরাটে সোলাঙ্কিরা তাঁদের নিজস্ব রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে তিনশক্তি এতটাই শক্তিক্ষয় করে ফেলেছিল যে, শেষপর্যন্ত তাঁদের কেউই আর সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। ভারতের সেই তিন উদীয়মান শক্তি আরব অনুপ্রবেশের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেনি। খৃষ্টীয় দশম শতকে ভারতে তুর্কি আক্রমণ শুরু হলে তাঁদের প্রতিহত করবার ক্ষমতাও তাঁদের উত্তরাধিকারী রাজ্যগুলির ছিল না। রাষ্ট্রকূটরা যদি নিজেদের উচ্চাশাকে সংযত রাখতেন, তাহলে দাক্ষিণাত্যে তাঁরা আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারতেন। প্রতিহাররা পশ্চিমে আরব, এবং পূর্বে পালদের প্রতিহত করতে গিয়ে নিজেদের দুর্বল করে ফেলেছিলেন। তাঁরা দাক্ষিণাত্য জয় করে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। আর বাংলার পালেরা পূর্বভারত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে হয়ত তাঁদের রাজ্যে কৈবর্ত বিদ্রোহ হত না, আর সেই ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে পাল রাজ্যও ভেঙে পড়ত না।

ঐতিহাসিকদের মতে ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ছিল অনাবশ্যক শক্তিক্ষয়। আরবীয় পরিব্রাজক মাসুদি খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে কনৌজে এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, কনৌজের প্রতিহার রাজা তখন রাষ্ট্রকূটদের শত্রু ছিলেন। দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নরপতিরা দুইপক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতেন, সেই সময়ে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে বিদেশী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১০১৮ খৃষ্টাব্দে তুর্কিরা কনৌজ অধিকার করে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তখন সারাদেশে অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, তারা আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিলেও, কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারে নি। তিনি শক্তির মধ্যেকার লড়াইয়ের ফলে শুধু ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থানীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণ গড়ে উঠেছিল। ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সামরিক শক্তিক্ষয় এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রের বিকাশ।

                           

(তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century, Upinder Singh.

২- Lords of the Deccan: Southern India from the Chalukyas to the Cholas, Anirudh Kanisetti.

৩- History of the Pala Dynasty Kings of Bengal (An Archival Study), Prashant Kashyap and Umesh Kumar Singh.)

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...