Monday, 8 December 2025

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন এক অকুতোভয় তরুণী ডাক্তার। নাম—টি. এস. কনকা (T. S. Kanaka)।


ছোটখাটো গড়ন, পরনে সাদাসিধে শাড়ি। দেখে মনে হতো পাশের বাড়ির কোনো শান্ত মেয়ে। কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। তিনি শুধু একজন ডাক্তার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ইতিহাস।


টি. এস. কনকা ছিলেন এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের অন্যতম প্রথম নারী নিউরোসার্জন। যে যুগে নারীদের ডাক্তারি পড়াই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, সেই যুগে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল শাখা—ব্রেন সার্জারি।


তার এই লড়াইয়ের পেছনে ছিল এক করুণ ট্র্যাজেডি। ছোটবেলায় তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। তিনি যখন এমএস (Master of Surgery) ডিগ্রি শেষ করলেন, তখন হঠাৎ তার ৯ বছরের ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ল। চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল ভাইটি।


কনকা কিছুই করতে পারলেন না। এই অসহায়ত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি এক কঠিন শপথ নিলেন। তিনি বিয়ে করবেন না। সংসার করবেন না। নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করবেন মানুষের সেবায়।


কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। ষাটের দশকে ভারতের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য। প্রফেসররা বিশ্বাসই করতে চাইতেন না যে কোনো নারী ব্রেন সার্জারির মতো জটিল অপারেশন করতে পারে। তাকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতে দেওয়া হতো না, জরুরি বিভাগে কাজ দেওয়া হতো না।


কনকা হার মানলেন না। তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতেন। পরীক্ষায় তাকে বারবার ফেল করানো হতো, যাতে তিনি হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু তিনি ছিলেন জেদি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার দক্ষতা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিলেন।


১৯৬৮ সালে তিনি নিউরোসার্জারিতে এমসিএইচ (MCh) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ভারতের প্রথম সার্জন যিনি মস্তিষ্কে 'ক্রনিক ইলেকট্রোড ইমপ্লান্ট' (Chronic Electrode Implant) করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (Deep Brain Stimulation)-এর মতো জটিল অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন।


কনকা শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি নিজের জমানো টাকায় গড়ে তুলেছিলেন 'শ্রী সান্তানাকৃষ্ণ পদ্মাবতী হেলথ কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন'। সেখানে গরিব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হতো। তিনি তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম-এ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়েছেন।


তার জীবনের আরেকটি অবিশ্বাস্য দিক হলো রক্তদান। তিনি লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন সর্বোচ্চ সংখ্যক বার রক্তদানের জন্য। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ১৩৯ বার রক্ত দিয়েছিলেন! ভাবা যায়? যে মানুষটি নিজের ভাইকে বাঁচাতে পারেননি, তিনি নিজের রক্ত দিয়ে হাজারো অচেনা মানুষকে বাঁচিয়ে গেছেন।


টি. এস. কনকা ছিলেন এক নীরব কর্মযোগী। তিনি কখনো প্রচারের আলোয় আসেননি, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে কোটি কোটি টাকা কামাননি। তিনি আজীবন সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা করে গেছেন। ২০১৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।


তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক অসামান্য উদাহরণ। তার জীবন আমাদের শেখায়, জেদ আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে আটকাতে পারে না। একজন নারী হয়েও তিনি কীভাবে পুরুষশাসিত সমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি ভারতীয় নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণা।


সোর্স: ১/ Wikipedia: T. S. Kanaka

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...