Saturday, 24 June 2023

মিহাইলো টোলোটোস

 পৃথিবীতে এ-ও কী সম্ভব!  জন্মালেন, বড় 

হলেন, ৮২ বছর  পর্যন্ত  বাঁচলেনও।  কিন্তু 

সারা জীবনের  এক মুহূর্তের জন্যও কোন

নারীকে  দেখলেন  না!  পৃথিবীতে  এমনই 

এক পুরুষ ছিলেন যিনি জীবদ্দশায় কোন

 নারীকে দেখেননি, নিজের  মা’কেও না!!


ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ‘ইউনিল্যাড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই ব্যক্তির নাম মিহাইলো টোলোটোস। তিনি ছিলেন গ্রিসের হালকিডিকির বাসিন্দা।


ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিহাইলো শুধুমাত্র বন্ধু-বান্ধবদের কাছে শুনে এবং বই পড়ে নারীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু কোনো নারীকে চাক্ষুষ করেননি। মনে করা হয় মিহাইলোর জন্ম ১৮৫৬ সালে। তাকে জন্ম দেওয়ার কিছু ক্ষণ পরই নাকি তার মা মারা যান। অনাথ হয়ে যান মিহাইলো।


মিহাইলোর মা মারা যাওয়ার পর গ্রিসের মাউন্ট অ্যাথোসের একটি মঠের সন্ন্যাসীরা তাকে দত্তক নেন। সন্ন্যাসীদের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন তিনি,  মিহাইলো যে শুধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে বড় হয়ে ছিলেন, তা নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি সন্ন্যাসীদের আদবকায়দা রপ্ত করেছিলেন। মঠের সন্ন্যাসীদের মত‌ো কঠোর জীবনযাপন করতেও শুরু করেছিলেন ছোটবেলা থেকেই। মিহাইলো যে মঠে থাকতেন, সেখানে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলা হত। তার মধ্যে অন্যতম ছিল, কোনো নারীকে মঠে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া।


শুধু নারী নয়, গরু, ভেড়াসহ যেকোনো গবাদি পশুকেও ওই মঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। গ্রিসের ওই মঠের শতাব্দীপ্রাচীন সেই প্রথা আজও বলবৎ রয়েছে! নারীদের মঠে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, সন্ন্যাসীরা সারা জীবন যাতে সঠিক ভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারেন তা সুনিশ্চিত করা।


তবে মঠের সন্ন্যাসীদের বহির্বিশ্বে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হত। ফলে তারা বাইরে গিয়ে প্রয়োজনে কোনো নারীর সঙ্গেও দেখা করতে পারতেন। কিন্তু মিহাইলো যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন তিনি নাকি কখনওই মাউন্ট অ্যাথোসের ওই মঠ ছেড়ে বাইরে যাননি। ১৯৩৮ সাল নাগাদ ৮২ বছর বয়সে মারা যান মিহাইলো।


মিহাইলোর মৃত্যুর পর মাউন্ট অ্যাথোসের সন্ন্যাসীরা নাকি তাকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে সমাধিস্থ করেছিলেন। মঠের সন্ন্যাসীরা মনে করতেন, মিহাইলোই বিশ্বের একমাত্র পুরুষ যিনি কখনও কোনো মহিলার মুখদর্শন করেননি। তাই সন্ন্যাসীদের মধ্যে তার সম্মান ছিল বেশি।শুধু নারীদেরই না, মিহাইলো কখনও ট্রেন, বিমান এমনকি কোনো সিনেমাও দেখেননি।


১৯৩৮ সালের ২৯ অক্টোবর ‘এডিনবার্গ ডেইলি কুরিয়ার’ সংবাদপত্রে মিহাইলোকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘জীবনে কোনো নারীকে না দেখেই মারা গিয়েছেন গ্রিসের সন্ন্যাসী’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল।


বর্তমানে মাউন্ট অ্যাথোস ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃত। লাখ লাখ দর্শকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে এই পর্বতমালা।

তবে এখনও মাউন্ট অ্যাথোসের মঠগুলো নারীদের প্রবেশ না করতে দেওয়ার কারণে অনেক বিতর্ক হয়েছে। এই নিয়মকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘প্রাচীন’ বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন।

মাউন্ট অ্যাথোসের কোলে ২০টি মঠ রয়েছে। যেগুলোতে বাস করেন প্রায় ২০ হাজার সন্ন্যাসী। ২০টি মঠের মধ্যে ১৭টিতে গ্রিসের সন্ন্যাসীরা বাস করেন। বাকি তিনটিতে বাস করেন সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং রাশিয়ার সন্ন্যাসীরা।


Saturday, 10 June 2023

প্রাণায়াম

 প্রাণায়াম শব্দটি প্রাণ+আয়াম, প্রাণ দিয়ে গঠিত: বায়ু, শ্বাস;  আয়াম: সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।  প্রাণায়াম শব্দের অর্থ হল শ্বাসের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।  নিঃশ্বাসে শ্বসন (শ্বাস) এবং নিঃশ্বাস (প্রশ্বাস) আছে।  শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক, কোনো বাহ্যিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু এর ওপর সম্পূর্ণ আয়ত্ত পেতে হলে প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়।

 

 "তসমীন সতী স্বাস প্রশ্বাস যোগর্তি বিচেদঃ প্রণায়ামঃ"।


 এর জন্য শরীরে বাতাস ঠিক কীভাবে চলে তা জানতে হবে।  এর জন্য নাডিস নামে পরিচিত চ্যানেল/স্নায়ুগুলির একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বোঝার প্রয়োজন যা সারা শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  এই টিউবুলার চ্যানেলগুলিকে প্রণায়াম করার জন্য শুদ্ধ করতে হবে।


 শরীরে ৭২ হাজার নাড়ী আছে।  তার মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ।  এগুলি হল ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, সরস্বতী, কুহু, পায়স্বিনী, বরুণা, যশস্বিনী, বিশ্বোদরা, হস্তিজিহ্ভা, গান্ধারী, শানখিনি, অলম্বুষা এবং পুষা।  এই সুষুম্না, ইড়া এবং পিঙ্গলা একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে।  দেহের মধ্যে পদ্মের আকারে ছয়টি চক্র রয়েছে (এই চক্রগুলি শাক্ত কাজেও উল্লেখ করা হয়েছে)।  এগুলি হল মুলধারা, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ এবং অজ্ঞা একে অপরের উপরে, প্রথমটি নাভির নীচে এবং শেষটি মাথার উপরে।  সুষুম্না নাড়ী মুলধারাকে আজনার সাথে সংযুক্ত করে।  কুন্ডলিনী নামক একটি শক্তি কুন্ডলীকৃত সর্পের মত মুলধারায় শুয়ে আছে।  এটি সুষুম্না নাড়ীর মধ্য দিয়ে চলে।  এটি সমস্ত চক্রের মধ্য দিয়ে তার আটটি মুখ দিয়ে ব্রহ্মরান্ধ্র পর্যন্ত যায়, প্রতিটি প্রকৃতির একটি দিককে প্রতিনিধিত্ব করে।  


বায়ু, যা সাধারণত পাঁচ ধরনের হয়;  প্রাণ, আপান, ব্যান, উদান এবং সামান। চ্যানেলগুলিকে ইড়ার মাধ্যমে বায়ু দিয়ে শরীরকে পূর্ণ করে এবং এটিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধরে রেখে এবং পিঙ্গলা দিয়ে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে শুদ্ধ করতে হবে এবং এর বিপরীতে।  সমস্ত নাড়ি শুদ্ধ করার জন্য এটি তিন মাস ধরে তিনটি সন্ধ্যায় দুবার করতে হবে।  কুণ্ডলিনী একটি চাকায় শুয়ে আছে যার নাভিতে বারোটি স্পোক রয়েছে।


 প্রাণায়াম তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত: পুরক, রেচক এবং কুম্ভক।

 রেচক হল ডান নাকের ছিদ্র দিয়ে বায়ু নির্গত করা।  বাম নাকের ছিদ্র দিয়ে বায়ু শ্বাস নিতে হয় এবং একে পুরক বলা হয়।  ভিতরে বাতাস ধরে রাখাকে কুম্ভক বলে।  তিন বছর ধরে প্রাণায়াম অনুশীলন করলে বলা হয় যে কেউ হৃদয়ের পদ্মে অবস্থিত ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে।


যোগের পঞ্চম উপাদান হল প্রত্যহার/সংবেদনশীল বস্তু থেকে ইন্দ্রিয় প্রত্যাহার।  যখন ইন্দ্রিয়গুলি তাদের বস্তু থেকে প্রত্যাহার করা হয় তখন তারা চিত্তার প্রকৃতিতে কাজ করবে


 "স্ব বিশ্য সংঘপ্রয়োগে চিত্ত রূপানুকারো ইভেন্দ্রিয়নাম প্রত্যহারঃ"।


 প্রত্যহার হল প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়গুলি প্রত্যাহার করা এবং ইশ্বরের উপর মন স্থাপন করা।  পদ্ম-সংহিতা প্রত্যাহারের মতে দেহের আঠারোটি মারমাতে মনকে ধরে রাখা।


যোগের ষষ্ঠ অঙ্গ হল ধরণ।  এটিকে শরীরের অন্যান্য অংশে অবিচলিতভাবে মনকে স্থির করা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।  এটি মনকে অন্যান্য বস্তুর সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত করবে।  


অহিরবুধ্ন্য-সংহিতা এই পর্যায়ে মনকে পরমাত্মানের উপর স্থির হতে বর্ণনা করেছেন।  পৌষকর সংহিতা পৃথকভাবে দুটি এবং পাঁচটি ধরণের কথা বলে।


সপ্তম অঙ্গ হল ধ্যান।  পতঞ্জলি এটিকে সম্পূর্ণরূপে একটি ধারণায় স্থির হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন


 "প্রত্যয়কতানাতা ধ্যানম"।


 প্যাঁচরাত্র অনুসারে পারদর্শীকে অবশ্যই জনার্দনের উপর মন স্থির করতে হবে, যিনি তাঁর চক্র রূপে আছেন।


 শেষ উপাদান হল সমাধি।  সমাধিকে এমন একটি স্তর হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যেখানে ধ্যান করা বস্তুটি এত শক্তিশালীভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যে আত্মার চেতনা হারিয়ে যাওয়ার মতো ভাল হয়ে যায়।


 "তদেওয়ার্থমাত্র নির্ভাসং স্বরুপ শূণ্যম ইব সমাধিঃ"।


 এ পর্যায়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে তন্ময়।  পদ্মসংহিতা অনুসারে এটি সেই পর্যায় যেখানে আত্মা এবং পরমাত্মান এক হয়ে যায়।  ধ্যান তখন রূপ নেয় "আমি পরম ব্রহ্মের সাথে এক"।  ব্যক্তিত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তার মন বৈকুণ্ঠে স্থির হয়ে যায়।

#############

Wednesday, 7 June 2023

ব্রাম্ভন

 ব্রাহ্মণের গলায় যে পৈতা থাকে তাতে কয়টা সুতো থাকে ?


 --- ৯ টা সুতো থাকে।

৯ টা সুতোর ৯টা গুণ যাকে বলে নবগুনে ব্রাহ্মণ । কিন্তু সেই গুণগুলো কী কী?

--- আসুন সবাই মিলে একবার দেখে আসি।।


1. সম  2. দম  3. তপ  4. শৌচ  5. ক্ষান্তী

6. আর্যনং  7.  জ্ঞানও  8. বিজ্ঞানও  9. আস্তীকও l


1.  সম = সম মানে সমান।যে ব্রাহ্মণ হবে সে সবাইকে সমান চখে দেখবে।কে উচ্চ, কে নীচ,

কে সুচী, কে মুচী ব্রাক্ষণের কাছে কোন ভেদাভেদ রাখলে হবে না।


2.  দম = দম মানে দমিয়ে রাখা বা দমন করা।

নিজের দেহের সমস্থ ইন্দ্রকে সকল সময় দমন করে রাখতে হবে


3.  তপ = তপ মানে তপস্যা করা। যে ব্রাহ্মণ হবে তাকে মাঝে মধ্যে তপস্যা করতে হবে।


4.  শৌচ = শৌচ মানে পবিত্রতা। মন এবং এই দেহটাকে সকল সময় পবিত্র রাখতে হবে।


5. ক্ষান্তী= ক্ষান্তী মানে ক্ষমা করা।ক্ষমা হচ্ছে পরম ধর্ম তাই।তাই যে যা অপরাধ করুক ব্রাহ্মণের চোখে সেটা অপরাধ দেখলে হবে না।সবাই ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখতে হবে।


6.  আর্যনং = আর্যনং মানে সরলতা ভাব। সকল সময় নিজের ভিতরে শিশুর মতন সরলতা ভাব রাখতে হবে।


7.  জ্ঞানও = জ্ঞানও মানে জ্ঞানের উপরে আরো জ্ঞান যারে বলে চৈতন্য জ্ঞান।ভিতরে মৌনভাব রেখে চৈতন্য জ্ঞান থাকতে হবে।


8.  বিজ্ঞানও = বিজ্ঞানও মানে সর্বশ্রেষ্ট জ্ঞান যেটাকে গীতা ভাগবতের জ্ঞান।যে ব্রাহ্মণ হবে তার ভিতরে গীতা ভাগবতের জ্ঞান সম্পূর্ণ রূপে থাকতে হবে এবং সেই জ্ঞানটাকে কাজে লাগাতে হবে এবং সকল যায়গার বিস্তার করতে হবে।

9.  আস্তিক্য = আস্তিক্য মানে যারা ধর্ম মানে বা ধর্মের প্রতি অটুট বিশ্বাস।যাদের ভিতরে বেশি বেশি পুণ্য সুকৃতি থাকে তাদের বলে আস্তিক্য।ব্রাহ্মণের ভিতরে এইটা অবশ্যই অবশ্যই  থাকতে হবে।

আর যারা ধর্ম মানে না বা ধর্মের প্রতি কোন বিশ্বাস নাই তাদের বলে নাস্তিক।

এই গুনগুলো যার মধ্যে থাকবে সেই ব্রাহ্মণ।

কিন্তু যদি এই গুণ আর জ্ঞান গুলো কোন একজন ব্রাহ্মণের ভিতরে না থাকে সে ব্রাহ্মণ নয়।

প্রতেকটা ব্রাহ্মণকে আগে ভাবতে হবে বা নিজেকে নিয়ে বার বার পর্যালোচনা করতে হবে।এই চতুর্বর্ণের ভিতরে ব্রাহ্মণ, কুলশ্রেষ্ট।তবে এত কুল রেখে কেন আজ আমি ব্রাহ্মণ কুলে এলাম।আর এসেই যখন গেছি তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী ??


শুধু ব্রাহ্মণ কেন? আমরা যে যেখানে যে কুলে যে অবস্থায় আছি আমদের সকলেরই ভাবা উচিৎ।


পূর্বে কথায় ছিলাম? কেনই বা এই দুঃখময় জগতে এলাম? এর পরেও বা আমরা কোথায় যাব?

আর একবার  যখন এসেই গিয়েছি।

তা হলে এখন আমাদের করনীয় কী ?আমাদের কর্তব্য কী ?আমাদের এই মানব জীবনের উদ্দেশ্য কী ?


এই গুলো ভাবা দরকার এবং ভাবলেই উত্তর  আসবে।


আবার ব্রাহ্মণদের সবথেকে বড় একটা জিনিস আছে সেইটা সকল সময় মাথায় রাখতে হবে - এইটা একদম ভুলে গেলে হবে না।


জ্ঞান =  অভিমানশূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, ক্ষমা, সহনশীলতা, সরলতা, গুরুসেবা, পিতা-মাতা সেবা,দেহের ও মনের শুচিতা, মনকে সংযত করা, সকল বিষয়ে বৈরাগ্য,অহংকার না করা,জন্ম,মৃত্যু জরা রোগ সুখ,দুঃখ,এ গুলতে আসক্তি না করা,পুত্র,স্ত্রী,গৃহে অনাসক্তি,ধীর মনে কর্তব্য কর্ম করা,ইষ্ট সেবা,একনিষ্ঠভাবে আমাতে ভক্তি করা,নির্জন স্থানে থাকা,লোকের মধ্যে থাকাকে অনাগ্ৰহ,আত্মতত্ব ও মোক্ষ বিষয়ে সর্বদা উপলব্ধি

সত্বগুন মানবের দুঃখ দূর করিয়া সুখ দেয়।

রজোগুন মানবকে কর্মে আসক্ত করে।

তমোগুন মানবের জ্ঞানকে ঢাকিয়া ভ্রমে পতিত করায়।

🙏🏼

গো অর্থে বিপত্তি।

 ▫️গরু ও গোমাংস সম্পর্কে সনাতন ধর্মের  মতামত কী ❓


🔸উত্তর : পৃথিবীর উপকারী প্রাণীর মধ্যে গরু অন্যতম। বৈদিক ঋষিগণ এই মহৎ প্রাণীকে হত্যা ও ভক্ষণ করা থেকে সর্বদা বিরত থাকতে বলেছেন। কিন্তু বর্তমান একটি শ্রেণি প্রচার করে যে বেদ গোমাংস ভক্ষণের অধিকার দিয়েছে। এই ভুল ধারণার পেছনে রয়েছে বেদের ভুল অনুবাদ। 'গো' শব্দটি দ্বারা সংস্কৃতে বিভিন্ন অর্থ বুঝায়। 


✅গো শব্দের অর্থ :-


গো (সংস্কৃত, গম+ও) গোরু, গরু (সংস্কৃত, গরূপ)। অর্থ হলোঃ— জ্ঞান, ঐশ্বর্য, ধনু, গাভি, ষাঁড়, বৃষ, নিরেট বোকা, মূর্খ প্রভৃতি। গো (বিশেষ্য পদ) গরু, গো-জাতি, পশু, স্বর্গ, রশ্মি, চন্দ্র, চক্ষু গোচর, পৃথিবী, জল, গৃহ,  গোপতি।


 গো মানে সর্বদা গরু অনুবাদ করাতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যা পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ মিথ্যা প্রপোগান্ডা চালাচ্ছে। অনেক হিন্দুধর্মবিদ বলে থাকেন যে এক সময় গোমাংস খাওয়া হতো পরে নিষিদ্ধ করা হয় কিন্তু এটা চরম ভুল ধারণা  নিচের সূত্রগুলো দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে আশা করি-


প্র নু বোচং চিকিতুষে জনায়,

মা গামনাগা মদিতিং বধিষ্ট ॥


✅ঋগ্বেদ, ৮/১০১/১৫


অনুবাদ : পরমেশ্বর উপদেশ দিচ্ছেন- আমি জ্ঞানবান পুরুষের নিকট বলিতেছি যে নিরপরাধ অহিংস পৃথিবী-সদৃশ গো জাতিকে হনন করিও না ।


▫️নিরুক্ত ২.১.৫.৪ [ অমরেশ্বর ঠাকুর অনুযায়ী ]  "গো" অর্থ পশু:- 


{ অথাপি পশুনামেহ ভবত্যেতস্মাদেব ৷৷ ৪৷


অথাপি (আর) [গো শব্দঃ] (গো শব্দ) ইহ (লোকে এবং বেদে)' পশু নাম (পশুর নাম) ভবতি (হয়) এতস্মাৎ এর (এই ধাতুদ্বয় হইতেই)।


“গো” শব্দ লোকে এবং বেদে পশু বুঝাইতেও প্রযুক্ত হয়। এই ‘গো' শব্দও পূর্ব্বোক্ত ধাতুদ্বয় হইতেই অর্থাৎ ‘গম্‌’ বা ‘গা’ ধাতু হইতেই নিষ্পন্ন। ইহার অর্থ—‘যে যায়’ (গচ্ছতীতি)। স্কন্দস্বামীর মতে ‘গা’ ধাতু স্তত্যর্থক, কাজেই ‘গা’ ধাতু নিষ্পন্ন পশুবোধক ‘গো’ শব্দেরও ব্যুৎপত্তি হইবে ‘গীয়তে সূয়তেহসৌ’–যে স্তুত হয় অর্থাৎ লোকে যাহার গুণকীৰ্ত্তন করে।


অনুবাদ—আর লোকে এবং বেদে ‘গো' শব্দ পশুনামও হয়, অর্থাৎ পশুবোধকও বটে; এই ধাতুদ্বয় (‘গম্‌' ধাতু ও ‘গা' ধাতু) হইতেই নিষ্পন্ন। }


অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গামশ্বং পুরুষং বধীঃ।


✅অথর্ববেদ ১০.১.২৯


অনুবাদ-নির্দোষদের হত্যা করা জঘন্যতম অপরাধ।কখনো মানুষ,গো-অশ্বাদিদের হত্যা করোনা।


মাতা রুদ্রাণাং দুহিতা বসূনাং স্বসাদিত্যানামমৃতস্য নাভিঃ।

প্রনুবোচং চিকিতুষে জনায়, মা গামনাগামদিতিং বধিষ্ট।।


✅ঋগ্বেদ ৮/১০১/১৫


গাভী রুদ্র ব্রহ্মচারী বিদ্বানগণের মাতা, নির্মাতা। দুষ্টের রোদনকর্তা বিদ্বান্, সৈনিক, সেনাপতি ইত্যাদিগণ গাভীকে মাতৃতুল্য পূজনীয়া বলে মনে করেন। গাভী বিদ্বান্ বসুগণের পুত্রী। সমাজের সংস্থাপক ব্যবস্থাপক প্রবন্ধক আদির জন্য গাভী পুত্রী-সমা পালনীয়া, রক্ষণীয়া রূপে স্বীকৃত। গাভী অমৃতের কেন্দ্র। গোরক্ষার দ্বারা চিরজীবন সমাজচেতনা লাভ হয়। গো নির্দোষ, নিষ্পাপ, অদিতি, অখণ্ডনীয়, অবধ্য সুতরাং তাকে হত্যা করো না।


সংজগ্মানা অবিভ্যুষিরস্মিন্ গোষ্ঠে করীষিণীঃ।

বিভ্রতীঃ সোম্যং মধ্বনমীবা উপেতন।।


✅অথর্ববেদ ৩/১৪/৩


অনুবাদঃ- এই গোশালায় ধেনু সকল নির্ভয়ে থাকুক, একসঙ্গে মিলিয়া বিচরণ করুক, গোময় উৎপন্ন করুক, অমৃতময় দুগ্ধ ধারণ করুক এবং নীরোগ হইয়া আমার নিকট আসুক।


যজুর্বেদে গোহত্যা নিষেধ-


অজস্রমিন্দুমরুষং ভুরণ্যুমগ্নিমীডে পূর্বচিত্তিং নমোভিঃ। স পর্বাভির্ঋতুশঃ কল্পমানো গাং মা হিংসীরদিতিং বিরাজম্।।


✅যজুর্বেদ ১৩/৪৩


অনুবাদঃ অক্ষয়, ঐশ্বর্য্যযুক্ত, অক্রোধ, পূর্বতন ঋষিদের দ্বারা গৃহীত অন্ন দ্বারা অগ্নিকে স্তুতি করি। হে অগ্নি, প্রতিপর্বে প্রতিঋতুতে কর্মের সম্পাদক, তুমি অদিতি, নিরীহ গোসমূহকে হত্যা করো না।


ইমং সাহস্রং শতধারমুৎসং বাচ্যমানং সরিরস্যমধ্যে।

ঘৃতং দুহানামদিতিং জনাযাগ্রে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমন্।।


✅যজুঃ ১৩/৪৯


অনুবাদঃ- এই গাভী মানুষের অসংখ্য সুখের সাধন, দুগ্ধের জন্য বিভিন্নভাবে পালনীয়া। গো, ঘৃত দুগ্ধ দাতৃ, অদিতি অখণ্ডনীয়া। হে মানব, একে হত্যা করো না।


▫️মহাভারতের শান্তিপর্বে বলা হয়েছে :- 


অঘ্ন্যা ইতি গাবাং নাম, ক্ব এতা হন্তুমর্হতি।

মহচ্চকারাকুশলং বৃষং গাং বা লভেত্তু যঃ।।


[মহা: শান্তিপর্বে ২৬২. ৪৭]


অনুবাদঃ গাভীর অপর নাম অঘ্ন্যা, এরা অবধ্যা। এই সকল গাভী ও বৃষকে হত্যা করে সে মহাপাপ করে।


▫️পশুদের  দুগ্ধ ও ওষুধি রস :- 


পুষ্টি পশুনাং পরি জগ্রভাহং চতুষ্পদাং দ্বিপদাং যচ্চ ধান্যম্

পয়ঃ পশুনাংরসমোষ ধীনাং বৃহস্পতিঃ সবিতা মে নি যাচ্ছাৎ


✅অথর্ব্ববেদ ১৯।৩১।৫


অর্থাৎ, চতুষ্পদ পশু,দ্বিপদ পশু এবং ধান্য হইতে আমরা পুষ্টি গ্রহণ করি।এজন্য সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর আমাদিগকে পশুর দুগ্ধ ও ঔষুধির রস প্রদান করিয়াছেন


▫️"গো" বা "পশু" ভক্ষণ নিষিদ্ধ:- 


স ধেন্বৈ চানুডুহশ্চ নাশ্নীয়াদ্ধেন্বনডুহৌ বা ইদং সর্বং বিভৃতস্তে দেবা। -


✅শতপথ ব্রাহ্মণ ৩/১/২/২১


গাভী ও ষাঁড় কদাপি ভক্ষণযোগ্য নয়


ए॒षा प॒शून्त्सं क्षि॑णाति क्र॒व्याद्भू॒त्वा व्यद्व॑री। उ॒तैनां॑ ब्र॒ह्मणे॑ दद्या॒त्तथा॑ स्यो॒ना शि॒वा स्या॑त् ॥


এষা পশূন্ত্সং ক্ষিণাতি কব্যাদ্ভূত্বা ব্যদ্বরী। উতৈনা ব্রহ্মণে দধাত্তথা স্যোনা শিবা স্যাত্।।


✅অথর্ববেদ ৩/২৮/২


পদার্থ- মনুষ্যের বুদ্ধি (এষা) যেই পাপ প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়ে (পশূন) পশুদের (সংক্ষিণাতি) হত্যা করে এবং (ব্যদ্বরী) শাস্ত্রবিরুদ্ধ আহার গ্রহণ করে (ক্রব্যাদ্)  মাংসভক্ষকে [অষ্ট্যা ২/২৫/২৫] (ভূত্বা) পরিণত হয় । (উত) নিশ্চয়ের সাথে মনুষ্য যদি (এনাম্) সেই পাপপ্রবৃত্তিযুক্ত বুদ্ধিকে (ব্রহ্মণে) ব্রহ্মের মধ্যে (দধাত্) সমর্পিত করে (তথা) তাহলে তার বুদ্ধি (স্যোনা) সুখদায়িনী ও (শিবা) কল্যাণী (স্যাত) হয়ে যায় অর্থ্যাৎ, সেই ব্যাক্তি নির্মল ও অহিংসক বুদ্ধিকে প্রাপ্ত করে। 


ক্ষুধে যো গাং বিকৃন্তন্তং ভিক্ষমাণঽউপ তিষ্ঠতি দুষ্কৃ॒তায় 


✅যজুর্বেদ ৩০।১৮ 


- ক্ষুধা তথা খাদ্যের জন্য যারা গো হত্যা করে তাদের দূর করো


যাতুধানান্ ন ৎবা রক্ষাংসি পৃতনাসু জিগ্যুঃ । সহমূরান্ অনু দহ ক্রব্যাদো মা তে হেত্যা মুক্ষত দৈব্যায়াঃ ॥


✅অথর্ববেদ  ৮.৩.১৮ ,  ৫.২৯.১১


অনুবাদঃ ( অগ্নে) হে বিদ্বান্ রাজন্ ! তুমি (যাতুধানান্) পীড়াদানকারীকে [প্রাণীগণ বা রোগসমূহকে ] (সনাৎ) নিত্য (মৃণসি) নষ্ট করো , (রক্ষাংসি) রাক্ষস তথা যাদের থেকে আমাদের রক্ষিত থাকা উচিৎ তাদের (ৎবা) তুমি (পৃতনাসু) সংগ্রামে (ন জিগ্যুঃ ) জয় লাভ করতে দাও না । (ক্রব্যাদঃ) মাংস ভক্ষকগণকে (সহমূরান্) [তাদের ] মূল [অথবা মূঢ় মনুষ্যগণ] সহিত (অনু দহ) ভস্ম করে দাও , (তে) তোমার (দৈব্যায়াঃ) দিব্য গুণযুক্ত (হেত্যাঃ) বজ্র তথা ন্যায়বিচার ও শৌর্যবীর্য দ্বারা (মা মুক্ষত) তারা রক্ষা পায় না ৷ 


[ ভাষ্যঃ পণ্ডিত ক্ষেমকরণ দাস ত্রিবেদী ,  পণ্ডিত জয়দেব শর্মা মীমাংসালঙ্কার, আর্যসমাজ ]


অর্থাৎ , আমাদের মাংসভক্ষণ করা তো উচিৎ নয় ।


▫️গো" বা "পশু"  হত্যার  শাস্তির বিধান :- 


অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গামশ্বং পুরুষং বধীঃ।


✅অথর্ববেদ ১০.১.২৯


অনুবাদ-নির্দোষদের হত্যা করা জঘন্যতম অপরাধ।কখনো মানুষ,গো-অশ্বাদিদের হত্যা করোনা।


যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পূরুষম্।

তন্ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসি অবীরহা।।


✅অথর্ববেদ ১/১৬/৪


অনুবাদঃ যদি তুমি আমাদের গাভী সকল হত্যা কর, যদি আমাদের ঘোড়া ও পুরুষদের হত্যা কর, তাহলে তোমাকে সীসের গুলি করে ধ্বংস করা হবে যাতে, তুমি আমাদের কোন প্রকার ক্ষতি সাধন করতে না পারো।


🔸"গো" বা "পশু" মৃত্যুদণ্ড বিধান :-


যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পূরুষম্ ।।

তাং ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসো অবীরহা ॥


✅অথর্ববেদ, ১/১৬/৪


অনুবাদ : যদি তুমি আমাদের গরু, অশ্ব ও প্রজাদিগকে হিংসা কর, তবে তোমাকে সীসকের গুলি দ্বারা বিদ্ধ করিব। আমাদের সমাজের মধ্যে বীরদের বিনাশকারী কেহই না থাকে ।


যঃ পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা সমঙ্ক্তে যো অশ্ব্যেন পশুনা যাতুধানঃ । যো অঘ্ন্যায়া ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ ॥


✅ঋগ্বেদ ১০.৮৭.১৬


অনুবাদঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক ! (যঃ-যাতুধানঃ) যে যাতনা দানকারী দুষ্ট প্রাণী রয়েছে (পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা) মনুষ্যগণের অভ্যন্তরের মাংস দ্বারা (সমঙ্ক্তে) নিজেকে পুষ্ট করে (যঃ-অশ্ব্যেন পশুনা) যে কিনা পশুসমূহের মধ্যে নিরপরাধ পশু দ্বারা নিজেকে উত্তমভাবে পরিপুষ্ট করে (যঃ-অঘ্ন্যায়াঃ ক্ষীরং ভরতি) যে  হত্যার অযোগ্য গোরুর দুগ্ধকে হরণ করে-নষ্ট করে-দূষিত করে (তেষাং শীর্ষাণি হরসা বৃশ্চ) তাদের শিরসমূহ তথা শিরবৎ বর্তমান প্রমুখ ব্যক্তিগণকে  হরণকারক শস্ত্র-অস্ত্রের ব্যবিহার দেয়ারা  ছিন্ন-ভিন্ন করো , নষ্ট করো  ॥১৬॥


[ ভাষ্যঃ স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক বিদ্যামার্তণ্ড, আর্যসমাজ ]


অর্থাৎ ,  মনুষ্যগণের বিবিধ অঙ্গ তথা আভ্যন্তরীন বস্তু দ্বারা নিজেকে পুষ্ট যেমন মানুষের অঙ্গ পাচার , কিংবা অঙ্গসমূহকে নষ্ট করে যেভাবে এখন কোমলমতি শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করানো হয় তারা এবং সেই যারা কিনা গোদুগ্ধাদি খাদ্যদ্রব্যকে নষ্ট করে  - দেশের শাসক , প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের উচিৎ তাদের সমূলে উৎপাটন করা ।


🔸মহাভারতে গাভীকে মাতা বলা হয়েছে:- 


"মাতরঃ সর্বভূতানাং গাবঃ"


✅মহাভারত অনুশাসন পর্ব ৬৯।৭ 


গাভীকে সমস্ত প্রাণীদের মাতা বলা হয়।


▫️বেদে পশু-প্রাণী সংরক্ষণের মাহাত্ম্য:- 


 পশূপান্হি 


✅যজুর্বেদঃ ১/১ 


পশুদের রক্ষা করো।


নমঃ শ্বভ্যঃ শ্বপতিভ্যশ্চ বো নমো॥


 ✅যজুর্বেদ ১৬।২৮


 - মানুষের উচিত  পশুদের অন্ন দ্বারা পালন করে তাদের দ্বারা উপকার নেবে এবং পশু রক্ষাকারীদেরও সৎকার করবে।


[ অর্থাৎ, পশুদের হত্যা না করে রক্ষা করতে বলা হয়েছে। ]


🔸চলুন সবাই মিলে  শ্রেয়:  মার্গের দিকে আসি


ওঁ অসতো মা সদ্গময়।

তমসো মা জ্যোতির্গময়।

মৃত্যোর্মামৃতং গময়। 


(✅বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৩।২৮


অর্থাৎ, অসত্য থেকে আমাকে সত্যে নিয়ে যাও, অন্ধকার থেকে আমাকে জ্যোতিতে/আলোতে নিয়ে যাও, মৃত্যু থেকে আমাকে অমৃতে নিয়ে যাও।


☀ সত্য স্বরূপে সনাতন ধর্মের জয় হোক 🌷


👏 লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।


☀ 🌷 জয় সনাতন ধর্মের জয় ☀🌷

নিরাকার ইশ্বর তত্ব

 বেদে নাকি এক ঈশ্বরের কথা বলা আছে 

তাহলে বিষ্ণু ,শিব, ব্রহ্মা , সরস্বতী  ,ইন্দ্র, অগ্নি, লক্ষি আদি এত দেব -দেবী কেন? 


➢ হ্যা, সনাতন ধর্ম মতে ঈশ্বর  এক ও অদ্বিতীয়।


♦ পবিত্র বেদে বলা আছে,


★সমেত বিশ্বে বাচসা পতিং দিব একো বিভুরতিথির্জননাম্। স পুর্ব্যো নুতনমাবিবাসত্তং বতেনিরনূ বাবৃত একমিত্পূরু।।

-[অথর্ববেদ ৭/২১/১]

পদার্থ - হে মানব! (বিশ্বে) তোমরা সবাই (দিবঃ) সেই প্রকাশের (পতিং) স্বামী পরামাত্মার কাছে (বচসা) [স্তব] বাণী সহিত (সম-এত) একত্রিত হয়ে আস। তিনি (একঃ) এক ও অদ্বিতীয়, (বিভু) সর্বব্যাপী এবং(জননাম্) সমগ্র জীবের (অতিথিঃ) অতিথি। (সঃ) তিনি (পূর্ব্যো) [জগতের] পূর্ব হতেই বিদ্যমান।তিনিই (নুতনম্) নব জগতকে ( আবিবাসত্) প্রকট ও ব্যাপ্ত করেন এবং (তম্) সেই (একম্) এক পরমাত্মার কাছেই (পূরু) নানান প্রকারের (বর্ত্তনিঃ) মার্গ বা লোক (অনুবাবৃতে) পৌঁছায় ।


★যঃ প্রাণতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব।যঈশেঅস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায হবিষা বিধেম।।

-[যজুর্বেদ ২৩/৩]

পদার্থ- (মহিত্বা) নীজ মহিমাই (যঃ) যিনি (নিমিষতঃ) এই নেত্র দ্বারা দর্শনকারী (প্রাণতঃ) প্রাণ ধারণকারী (জগতঃ) জগতের (এক ইত্) এক ও অদ্বিতীয় (রাজা বভূব) অধীশ্বর। (অস্য) এই (দ্বিপদঃ চতুষ্পদ) দ্বিপদী চতুষ্পদী সমস্ত প্রাণীসমূহের (যঃ) যিনি (ঈশে) প্রভু (কস্মৈ) সেই আনন্দস্বরূপ (দেবায) প্রকাশস্বরূপ পরমেশ্বরকে (হবিষা) প্রেম,ভক্তি ও নানা সামগ্রী দ্বারা (বিধেম) পূজা করি।


★য এক ইৎ তমু ষ্টুহি কৃষ্টীনাং বিচর্যণিঃ

পতির্জজ্ঞে বৃষক্রতুঃ।।

-[ঋগ্বেদ. ৬/৪৫/১৬]

পদার্থ - হে মানব! (যঃ) যিনি (এক ইত্)  এক ও অদ্বিতীয় (কৃষ্টিনাম)  মনুষ্যদের (পতি) পালক (বিচর্ষণিঃ) সর্বদ্রষ্টা (বৃষক্রতু জজ্ঞে) ও সর্বশক্তিমান (তম্ উ) কেবল সেই পরমেশ্বরেরই (স্তুহি) উপাসনা  কর।


★এভাবে বেদের অসংখ্য মন্ত্রে কেবল এক ঈশ্বরের কথা পাওয়া যায়। উপরন্তু আমাদের উপনিষদ - দর্শনেও একইভাবে একেশ্বরের কথাই বলা আছে। এবং সনাতনধর্ম হল পৃথিবীর সর্বপ্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম।


♦এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঈশ্বর যদি একজনই হবেন

তাহলে এত দেব-দেবী কেন?


উত্তর- পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে 

বিষ্ণু, শিব , ব্রহ্মা, ইন্দ্র ,অগ্নি, সরস্বতী, লক্ষি  ইত্যাদি 

- এগুলো মোটেও কোন মানুষের মত দেখতে আলাদা আলাদা দেব- দেবী বা দেবতা না। এগুলো হচ্ছে সেই এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই  বিভিন্ন গুনবাচক নাম। 


পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র  এই সম্পর্কে বলছে,


★ এক পরমসত্য ঈশ্বরকেই জ্ঞানিগণ ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, দিব্য, সুপর্ণা, বরুণ, গরুৎমান, মাতারিশ্ব, যমসহ প্রভৃতি নামে অভিহিত করে থাকেন। 

- (ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬)


★সেই পরমাত্মাই অগ্নি, আদিত্য, প্রজাপতি, ব্রহ্মা , আপ, বায়ু, শুক্র ও চন্দ্রমা। 

- (যজুর্বেদ ৩২/১)


★ হে সর্বজ্ঞ পরমাত্মা (অগ্নি) আপনি ইন্দ্র, আপনিই বিষ্ণু এবং আপনিই ব্রহ্মা।

- (ঋগ্বেদ ২/১/৩)


★তিনি আর্যমা, তিনি বরুণ,তিনিই রুদ্র, তিনি মহাদেব।

- (অথর্ববেদ ১৩/৪/৪)


★আপনি ব্রহ্মা, রুদ্র, বরুণ, অগ্নি, মনু, শিব, ধাতা, বিধাতা, ও হষ্টা এবং আপনি সর্ব্বদর্শী প্রভু। স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত প্রাণী আপনা হইতে জন্মিয়াছে, এবং আপনিই এই সমগ্র সচরাচর ত্রিভুবন সৃষ্টি করিয়াছেন।

-(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ১৩/৪০৫-৪০৬)


★তুমি বায়ু, যম, অগ্নি, চন্দ্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা, অতএব তোমাকে আমি সহস্রবার প্রণাম করি এবং পুনরায় নমস্কার করি। 

- (ভগবদগীতা ১১/৩৯)


★এছাড়াও পবিত্র গীতায় বলা আছে,

"আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য "

- (ভগবদ গীতা ১৫/১৫)

জ্ঞাতব্য শব্দের অর্থ হচ্ছে আলোচ্য বিষয়

অর্থ্যাৎ, সমস্ত বেদে ইন্দ্র,অগ্নি, বিষ্ণু, শিব সহ প্রভৃতি নামে সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মা সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।


♦ এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মার নানা গুণকে তুলে ধরতেই তাকে এইরূপ অসংখ্য নামে পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রে সম্মোধন করা হয়েছে। যেমন,


বিষ্ণু - পরমাত্মা সর্বব্যাপী বলে তার নাম "বিষ্ণু"।

ব্রহ্মা - পরামাত্মা সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা বলে তার নাম "ব্রহ্মা "।

শিব  -  পরমাত্মা কল্যাণস্বরূপ বলে তার নাম "শিব "।

সরস্বতী- পরমাত্মা জ্ঞানস্বরূপ বলে তার নাম"সরস্বতী"।

লক্ষি - পরামাত্মা সমগ্র জগতকে দর্শন ও তিনি এই জগতকে দর্শনীয় করেই নির্মাণ করেছেন বলে তার নাম "লক্ষি"। 

ইন্দ্র -  পরামাত্মা নিখিল ঐশ্বর্যশালী বলে তার নাম "ইন্দ্র"।

অগ্নি - পরামাত্মা সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ, প্রকাশস্বরূপ বলে তার নাম অগ্নি। 


মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তার অমর গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশের প্রথম সমুল্লাশে এক ও নিরাকার পরমাত্মার এরকম ১০০ টি নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 


পরমাত্মার এই অসংখ্য নামের মধ্যে "ওম্ " হল সর্বশ্রেষ্ঠ।

পবিত্র বেদে পরমাত্মা বলছেন,

★ অহম্ ওম্ খং ব্রহ্ম (যজুর্বেদ ৪০/১৭)

আমি আকাশের ন্যায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ব্রহ্ম " ওম্ "।


 উপনিষদে বলা আছে, 

★ সমস্ত বেদ যার স্বরূপকে বর্ণনা করে, যার উদ্দেশ্যে সমস্ত তপস্যা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে লাভের জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করে, সেই ব্রহ্মের স্বরূপ হল "ওম্"।

-(কঠোপনিষদ ১/২/১৫)

★ ব্রহ্মকে লাভ করার যত উপায় রয়েছে তার মধ্যে ওম্ -কারই সর্বশ্রেষ্ঠ। এটিই ব্রহ্মের প্রকৃষ্ট জ্ঞাপক। এটিই ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়। 

-(কঠোপনিষদ ১/২/১৭)


অতএব, পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, রুদ্র,মহাদেব, সরস্বতী, লক্ষি, ইন্দ্র,অগ্নি ইত্যাদি এগুলো মোটেও আলাদা আলাদা মানুষের মত দেখতে কোন দেব - দেবী না। এগুলো এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই বিভিন্ন গুণবাচক নাম। 


মূলত পরবর্তী সময়ে রচিত বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোতেই এক ঈশ্বরের এই বিভিন্ন নামগুলোকে বিভিন্ন মানুষের মত দেখতে পৃথক দেব-দেবী হিসেবে দেখিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ও কল্পকাহিনীর অবতারণা করে হিন্দু সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। 


কিন্তু, সনাতনধর্মে যেকোন বেদবিরুদ্ধ গ্রন্থই সরাসরি নিষিদ্ধ(মনু ১২/৯৫,৯৬)। তাই আমাদের সকল হিন্দুদের এই বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোকে ত্যাগ করে পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রের মান্যতাই ফিরে যাওয়া উচিত।  


(এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার যে, প্রয়োগভেদে এই শব্দগুলোর অন্যান্য অর্থও রয়েছে। যেমন, পরমাত্মা পক্ষে  "ইন্দ্র " অর্থ সর্ব ঐশ্বর্যের অধিকারী। উপরন্তু প্রয়োগভেদে বিদ্যুৎ, শাসক ও বিভিন্ন অর্থেও ইন্দ্র শব্দটি ব্যবহৃত হয়। পরামাত্মা পক্ষে "অগ্নি" অর্থ সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ। প্রয়োগভেদে অগ্নি শব্দটি আগুন,তাপ, অগ্রণী নেতা ইত্যাদি অর্থ বোঝাতেও প্রযুক্ত হয়।) 


♦পবিত্র বেদে দেবতা সম্পর্কে ও বলা হয়েছে যে 


★ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভূতান্য শাম্যন্ প্রজাপতিঃ ।

পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসীৎ।।

(যজুর্বেদ ১৪।৩১)

অর্থ- জগতের প্রভু,সৃষ্টির পালক,সর্ব্বব্যাপী,পরমাত্মার তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীলন কর। 


(শতপথ ব্রাহ্মন ১৪/৫ ) এ বলা আছে  দেবতা ৩৩  টি যারা ঈশ্বরের মহিমাকে প্রকাশ করে। এগুলো হল, 


★আটটি বসু 

[তাপ( Heat), গ্রহসমূহ(Planets), সুর্য(Sun) ও অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ(Stars), উপগ্রহসমূহ(Satellites), অন্তরিক্ষ (Space), রশ্নি (Rays of etherial space), বায়ু (Atmospheres)]


★এগারটি রুদ্র 

[ দেহের দশ জীবনিশক্তি ও একটি হল জীবাত্মা ]


★বারটি আদিত্য 

[ বছরের বার মাস ]


★একটি ইন্দ্র  [ বিদ্যুৎ (Electricity) ]  ও 


★একটি প্রজাপতি [ যজ্ঞ(Yajna) ]


অতএব, দেবতা মানেই কোন মানুষের মত দেখতে কাল্পনিক সত্ত্বা না। ৩৩ প্রকার দেবতার মধ্যে জীবাত্মা ব্যতিত বাকি সবই এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন সৃষ্টিমাত্র। 


♦এবার আসি দ্বিতীয় আলোচনায়।

 বেদাদি বৈদিক শাস্ত্রে বলা হচ্ছে,


★ পরমাত্মা "অকায়েম" বা শরীররহিত। 

( যজুর্বেদ ৪০/৮, ঈশোপনিষদ ৮)


★তার কোন রুপ নেই। 

(কথোপনিষদ ১/৩/১৫)


★সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক তথাপি তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত। 

(ভগবদগীতা ১৩/১৫)


★পরমেশ্বর শরীররহিত, ইন্দ্রিয়রহিত। তার সমান বা তার থেকে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই, তার নানা প্রকার শ্রেষ্ঠ শক্তি, স্বরূপভূত জ্ঞানরূপ শক্তি এবং ক্রিয়াশক্তির বিষয় শ্রুতিতেও কীর্তিত হয়েছে।

-(শেতাশ্বতর উপনিষদ - ৬/৮)


★যিনি অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, অগোত্র, অবর্ণ এবং অচক্ষু , অশ্রোত্র, হস্তপাদশূন্য, নিত্য, বিভু, সর্বব্যাপী এবং অতিসূক্ষ্ম, সেই অব্যয় এবং সর্বভূতের কারনকে ধীরগণ সর্বত্র দেখতে পান। 

(মুন্ডকোপনিষদ ১/১/৬)


★পরমেশ্বরের হাত নেই পরন্তু নিজ শক্তিরূপ হাত দ্বারা সবকিছু রচনা ও ধারণ করেন। পা নেই তবুও সর্বব্যাপী হওয়াই সবার চেয়ে অধিক বেগবান, গতিশীল। কোন চক্ষু গোলক নাই পরন্তু সবাইকে যথাযথ দেখেন, কান নেই কিন্তু শুনতে পারেন। তিনি সমস্ত জগৎ কে যথাযথভাবে জানেন কিন্তু তাকে কেউ জানে না। তাহাকে সবথেকে শ্রেষ্ঠ, সব থেকে মহান  বলা হয়। 

(শেতাশ্বতরপনিষদ ৩/১৯)


♦উক্ত Reference গুলো প্রমাণ করে যে সনাতনধর্মমতে ঈশ্বর নিরাকার। 


তবে ঈশ্বরকে সাকারভাবে উপাসনা করা কি সঠিক ?


উঃ-এক, নিরাকার এবং অসীম ঈশ্বর এই জগতের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তিনি যদি সাকার হয়েও থাকেন সেই সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ঈশ্বরের অসীম আকৃতিকে  একটি ছোট্ট মূর্তিতে রূপ দেওয়া কোন মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব না।


তবে কোন ব্যাক্তি যদি হৃদয়ে নিহিত ভক্তি থেকে নিরাকার ঈশ্বরকে কোন সাকার রূপে কল্পনা করে উপাসনা করে থাকে। তাতে কোন সমস্যা দেখি না। কেননা, পরমাত্মা জানেন যে এই সমস্তকিছুর উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই।

ও৩ম্ 

ব্রহ্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম স্মরণ করে নিরাকারবাদ সিরিজ আরম্ভ করলাম।


নিরাকারের স্বরূপ কী?‌‌ নিরাকার বলতে আপনি কী বোঝেন? বায়ু আদিকে আমরা দেখতে পাই না, এরা কি নিরাকার? 


নিরাকার = নিঃ + আকার, অর্থাৎ আকারের অভাব। যাঁর কোনো আকার থাকা সম্ভব নয়, তিনিই নিরাকার। আকার কোথা থেকে আসে? আমাদের চারপাশে যত বস্তু আছে, যাদের আমরা দেখতে পাই বা পাই না, সবই‌ আকারযুক্ত। যেমন: গোরু, ছাগল, আম, জাম কিংবা চেয়ার টেবিল সবারই আকার আছে, সবাই অণু, পরমাণু, কণিকা দ্বারাই নির্মিত। আমাদের চোখের স্থূলতার বা দূরত্বের দরুণ আমরা দেখতে পাই না, অথচ তারাও অণু পরমাণু আদি দ্বারা নির্মিত। যেমন: আমরা কোলকাতা থেকে শিলিগুড়ি থাকা কোন ব্যক্তিকে দেখতে পারব না। আবার মহাবিশ্বের দূরবর্তী নীহারিকা, নক্ষত্রপুঞ্জ আদিও আমরা দেখতে পাই না। আবার নানা অণুজীব বা বায়ুকণা আছে, আমরা সেগুলোকে দেখতে পাই না। তবে এইসব বস্তুই পদার্থ, এদের আকার রয়েছে। এদের মূল তত্ত্ব বা উপাদান হলো পরমাণু বা নানা কণিকা। বৈশেষিক দর্শনে এই জগতের সব বস্তুর মূল উপাদানের নাম 'পরমাণু' [ বৈশেষিক মতে পরমাণু অবিভাজ্য। এখন আমরা পরিভাষাগতভাবে পরমাণু বলতে atom বুঝিয়ে থাকলেও বৈশেষিক অনুযায়ী সর্বোচ্চ অবিভাজ্য কণিকাই পরমাণু]।


এই পরমাণু বা কোনো পারমাণবিক কণিকাও অনাদি উপাদান নয়, কারণ পরমাণুর সৃষ্টি, ধ্বংস আছে; বিকার আছে, পরিবর্তন আছে। পরমাণুর মূল অর্থাৎ ভরযুক্ত সকল কণিকার মূলভূত উপাদান হলো শক্তি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, শক্তি থেকেই ভরের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ এই সমগ্র জগৎ মূলত অচেতন শক্তির বিকার। সাংখ্য দর্শনে এই শক্তিকেই অভিহিত করা হয়েছে "কারণ প্রকৃতি" নামে। এই জগতের সব উপাদান ও আমাদের আত্মা (চেতনা)‌ ব্যতীত শরীর জড় প্রকৃতির বিকার নানা তত্ত্বের দ্বারা নির্মিত, যাদের আকার আকৃতি রয়েছে। 

সত্ত্বরজস্তমসাংসাম্যাবস্থা প্রকৃতিঃ ।প্রকৃতের্মহানমহতোহহঙ্কারঃ ।অহঙ্কারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণ্যুভয়মিন্দ্রিয়ং-তন্মাত্রেভ্যঃস্হূলভূতানিপুরুষঃ ইতি পঞ্চবিংশতির্গণঃ।। সাংখ্য ১।৬১


যেহেতু সব আকার আকৃতির উৎস প্রকৃতি, এসব বস্তু দ্বারা নির্মিত না, অর্থাৎ জড় প্রকৃতির বিকার নয়, বরং প্রকৃতির মতোই অনাদি বাকি দুই তত্ত্ব ঈশ্বর ও জীবাত্মা নিরাকার। 


ঈশ্বরের নিরাকারত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণ কোথায়?


বেদ,  বৈদিক ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদ্ এবং ষড়দর্শন  মতে ঈশ্বর নিরাকার। 

প্রত্যক্ষ নিরাকারবোধক কিছু শ্রুতিবাক্যসমূহ-


যজুর্বেদ ৪০।৮ (ঈশ উপনিষদ্, ৮ম শ্রুতি) (অকায়ম্ বা শরীর রহিত)

কেন  উপনিষদ ১।৩ (ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না)

কেন  উপনিষদ ১।৭ (লোকে যেসব দৃশ্যমান বস্তুর উপাসনা করে, তারা ব্রহ্ম বা ঈশ্বর নয়)

কঠ উপনিষদ  ১।২।২২(অশরীরী বা শরীরবিহীন)

কঠ উপনিষদ   ১।৩।১৫(অরূপ বা রূপহীন)

কঠ উপনিষদ  ২।৩।৮(অলিঙ্গ বা লিঙ্গ বা চিহ্নবিহীন)

কঠ উপনিষদ  ২।৩।৯(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না)

কঠ  উপনিষদ  ২।৩।১২(ব্রহ্ম-বাক্য, মন, চক্ষুর অগোচর)

প্রশ্ন  উপনিষদ ৪।১০(অশরীরী)

মুণ্ডক উপনিষদ  ১।১।৬(অপাণিপাদম্ অচক্ষুশোত্রম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত, পা, চক্ষু,‌ কর্ণ নেই।)

মুণ্ডক উপনিষদ  ২।১।২(অমূর্ত)

মুণ্ডক  উপনিষদ ৩।১।৭(অচিন্ত্যরূপ বা ব্রহ্মের রূপ চিন্তা করা সম্ভব নয়)

মুণ্ডক উপনিষদ ৩।১।৮(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না।)

তৈত্তিরীয়  উপনিষদ ২।৭।২(ব্রহ্ম দর্শনাতীত এবং অশরীরী)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ২।১৫ (জন্মরহিত)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৩।১০‌ (অরূপ বা রূপহীন)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৩।১৯ (অপাণিপাদম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত পা নেই)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।১ (বর্ণ রহিত)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ  ৪।১৯ (মূর্তি বা প্রতিমা নেই)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।২০ (চক্ষু আদি‌ দ্বারা দেখা যায় না এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।২১ (জন্মরহিত)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৫।১৪ (অশরীরী)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৬।৮ (ব্রহ্মের শরীর এবং ইন্দ্রিয় নেই)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৬।৯ (লিঙ্গ বা চিহ্ন নেই এবং তাঁর কোন জনক বা পিতা নেই)


ব্রহ্মের নিরাকারত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকা অসম্ভব। এর আরেকটি কারণ ব্রহ্ম তিন কালে‌‌ একরস বা অপরিবর্তিত। আমরা জানি, প্রকৃতির নির্মিত সকল‌ পদার্থেরই বিকার বা পরিবর্তন রয়েছে। বিকার‌ মোট ছয় প্রকার, উৎপত্তি, স্থিতি, বৃদ্ধি, রুগ্নতা, ক্ষয় এবং বিনাশ। ব্রহ্মের শরীর থাকলে ব্রহ্মের পক্ষে তিনকালে একরস হওয়া সম্ভব নয়।


সারসংক্ষেপ- নিরাকার‌ হল আকারের‌ অভাব। সব আকারের উৎস প্রকৃতি থেকেই নির্মিত এই জগতের নানা পদার্থ। আমাদের‌ দেহস্থিত ইন্দ্রিয়, মন আদিও প্রকৃতির বিকার। দেহস্থিত ইন্দ্রিয় আর পদার্থের কারণভূত মূল তত্ত্ব এক থাকায়, আমরা পদার্থের নানা ধর্মকে আমরা দেখতে পাই, স্বাদ গ্রহণ করি, শুনতে পাই, স্পর্শ করে অনুধাবন করতে পারি, আঘ্রাণ নিতে পারি। প্রকৃতি ব্যতীত অন্য দুই সৎ ও অনাদি তত্ত্ব ব্রহ্ম ও জীবাত্মার কোনো আকার বা শরীর নেই।

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...