Monday, 8 December 2025

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন এক অকুতোভয় তরুণী ডাক্তার। নাম—টি. এস. কনকা (T. S. Kanaka)।


ছোটখাটো গড়ন, পরনে সাদাসিধে শাড়ি। দেখে মনে হতো পাশের বাড়ির কোনো শান্ত মেয়ে। কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। তিনি শুধু একজন ডাক্তার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ইতিহাস।


টি. এস. কনকা ছিলেন এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের অন্যতম প্রথম নারী নিউরোসার্জন। যে যুগে নারীদের ডাক্তারি পড়াই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, সেই যুগে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল শাখা—ব্রেন সার্জারি।


তার এই লড়াইয়ের পেছনে ছিল এক করুণ ট্র্যাজেডি। ছোটবেলায় তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। তিনি যখন এমএস (Master of Surgery) ডিগ্রি শেষ করলেন, তখন হঠাৎ তার ৯ বছরের ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ল। চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল ভাইটি।


কনকা কিছুই করতে পারলেন না। এই অসহায়ত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি এক কঠিন শপথ নিলেন। তিনি বিয়ে করবেন না। সংসার করবেন না। নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করবেন মানুষের সেবায়।


কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। ষাটের দশকে ভারতের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য। প্রফেসররা বিশ্বাসই করতে চাইতেন না যে কোনো নারী ব্রেন সার্জারির মতো জটিল অপারেশন করতে পারে। তাকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতে দেওয়া হতো না, জরুরি বিভাগে কাজ দেওয়া হতো না।


কনকা হার মানলেন না। তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতেন। পরীক্ষায় তাকে বারবার ফেল করানো হতো, যাতে তিনি হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু তিনি ছিলেন জেদি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার দক্ষতা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিলেন।


১৯৬৮ সালে তিনি নিউরোসার্জারিতে এমসিএইচ (MCh) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ভারতের প্রথম সার্জন যিনি মস্তিষ্কে 'ক্রনিক ইলেকট্রোড ইমপ্লান্ট' (Chronic Electrode Implant) করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (Deep Brain Stimulation)-এর মতো জটিল অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন।


কনকা শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি নিজের জমানো টাকায় গড়ে তুলেছিলেন 'শ্রী সান্তানাকৃষ্ণ পদ্মাবতী হেলথ কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন'। সেখানে গরিব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হতো। তিনি তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম-এ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়েছেন।


তার জীবনের আরেকটি অবিশ্বাস্য দিক হলো রক্তদান। তিনি লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন সর্বোচ্চ সংখ্যক বার রক্তদানের জন্য। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ১৩৯ বার রক্ত দিয়েছিলেন! ভাবা যায়? যে মানুষটি নিজের ভাইকে বাঁচাতে পারেননি, তিনি নিজের রক্ত দিয়ে হাজারো অচেনা মানুষকে বাঁচিয়ে গেছেন।


টি. এস. কনকা ছিলেন এক নীরব কর্মযোগী। তিনি কখনো প্রচারের আলোয় আসেননি, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে কোটি কোটি টাকা কামাননি। তিনি আজীবন সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা করে গেছেন। ২০১৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।


তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক অসামান্য উদাহরণ। তার জীবন আমাদের শেখায়, জেদ আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে আটকাতে পারে না। একজন নারী হয়েও তিনি কীভাবে পুরুষশাসিত সমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি ভারতীয় নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণা।


সোর্স: ১/ Wikipedia: T. S. Kanaka

মেজর মোহিত শর্মা

 কুপওয়ারা, কাশ্মীর। ২০০৩ সাল।


উপত্যকার এক গোপন আস্তানায় বসে আছে হিজবুল মুজাহিদীনের দুই কুখ্যাত কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার। তারা অপেক্ষা করছে তাদের নতুন রিক্রুট বা সদস্যের জন্য। খবর এসেছে, এক কাশ্মীরি যুবক তাদের দলে যোগ দিতে চায়, যার চোখে ভারতের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলছে।


কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। ভেতরে ঢুকল এক যুবক। পরনে নোংরা ফিরান (কাশ্মীরি আলখাল্লা), মুখভর্তি লম্বা দাড়ি, কাঁধ পর্যন্ত নামানো উশকোখুশকো চুল। চোখেমুখে তীব্র ঘৃণা। নাম তার— ইফতিকার ভাট।


জঙ্গিরা তাকে সন্দেহ করেছিল। তারা তাকে পরীক্ষা করল, প্রশ্ন করল। কিন্তু ইফতিকার ভাটের কাশ্মীরি ভাষা, তার বাচনভঙ্গি এবং স্থানীয় কালচার সম্পর্কে জ্ঞান এতটাই নিখুঁত ছিল যে জঙ্গিদের সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না। তারা ভাবল, তারা এক নতুন ‘জিহাদি’ পেয়েছে। তারা ইফতিকারকে বুকে জড়িয়ে ধরল।


কিন্তু তারা জানত না, এই ইফতিকারের আলখাল্লার নিচেই লুকিয়ে আছে ইন্ডিয়ান আর্মির ইউনিফর্মের অদৃশ্য বর্ম। তারা জানত না, এই যুবক আসলে মেজর মোহিত শর্মা, ১ প্যারা (স্পেশাল ফোর্সেস)-এর এক দুর্ধর্ষ কমান্ডো।


শুরু হলো মোহিতের আন্ডারকভার অপারেশন। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এটা ছিল বাস্তবের এক মরণখেলা। মেজর মোহিত শর্মা দিনের পর দিন জঙ্গিদের সাথে কাটালেন। তাদের সাথে এক থালায় খাবার খেলেন, একই ঘরে ঘুমালেন। জঙ্গিরা তাঁর সামনেই ভারতের সেনার ওপর হামলার ছক কষত, আর মোহিত মনে মনে সেই ম্যাপ এঁকে নিতেন। প্রতিটা মুহূর্ত ছিল শ্বাসরূদ্ধকর। রাতে ঘুমানোর সময়ও তিনি সজাগ থাকতেন, কারণ ঘুমের ঘোরে যদি মুখ দিয়ে একটাও হিন্দি বা ইংরেজি শব্দ বেরিয়ে যায়, তাহলে সেখানেই মৃত্যু নিশ্চিত।


অবশেষে এল সেই রাত। জঙ্গিরা পরিকল্পনা করল তারা ভারতীয় সেনার একটি চেকপোস্টে হামলা চালাবে। মেজর মোহিত বুঝলেন, আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখন অ্যাকশনের সময়।


গভীর রাতে যখন জঙ্গিরা অসতর্ক, মোহিত শর্মা তাঁর গোপন নাইন-এমএম পিস্তলটি বের করলেন। চোখের পলকে তিনি গুলি চালালেন। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে। দুই হিজবুল কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার— কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তাদের রক্তে ভেসে গেল মেঝের কার্পেট।


কাজ শেষ করে মোহিত শর্মা ঠিক সেভাবেই ছায়ার মতো বেরিয়ে এলেন, যেভাবে ঢুকেছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরে ওই পুরো জঙ্গি নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল। এই অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘সেনা মেডেল’ দেওয়া হয়।


কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। ২০০৯ সাল। ২১ মার্চ। আবার সেই কুপওয়ারার জঙ্গল। হাফরুদা ফরেস্ট।


খবর এল জঙ্গিরা আবার জড়ো হয়েছে। এবার আর ইফতিকার ভাট নয়, মেজর মোহিত শর্মা নিজের আসল পরিচয়ে, ইউনিফর্ম পরে টিম নিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন। শুরু হলো ভয়ংকর এনকাউন্টার। জঙ্গিরা ওপরের পজিশন থেকে গুলি চালাচ্ছিল। মোহিতের টিমের কয়েকজন আহত হলেন।


নিজের সঙ্গীদের বাঁচাতে মেজর মোহিত শর্মা খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলেন। তিনি একাই জঙ্গিদের এনগেজ করলেন। গুলি তাঁর বুকে লাগল, শরীরে ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কিন্তু তিনি থামলেন না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে তিনি দুই জঙ্গিকে খতম করলেন এবং তাঁর টিমকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন।


মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যখন উদ্ধার করা হলো, দেখা গেল তাঁর হাতের মুঠো তখনও শক্ত করে ধরা আছে রাইফেলটা। তিনি ছিলেন সেই বিরল অফিসারদের একজন, যিনি শত্রুকে ধোঁকা দিয়েও মেরেছেন আবার সম্মুখ সমরে বুক চিতিয়েও মেরেছেন। ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সামরিক সম্মান ‘অশোক চক্র’ প্রদান করে।


আজও প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের ট্রেনিংয়ে নতুন কমান্ডোদের ইফতিকার ভাটের গল্প শোনানো হয়। শেখানো হয়— ইউনিফর্ম শুধু শরীরে থাকে না, ইউনিফর্ম থাকে কলিজায়।


স্যালুট মেজর মোহিত শর্মা!


Source & Disclaimer:


তথ্যসূত্র: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অশোক চক্র সাইটেশন (Official Citation), India Today আর্কাইভ এবং মেজর মোহিত শর্মার জীবনীমূলক বিভিন্ন ডকুমেন্টারি।


(বিশেষ দ্রষ্টব্য: মেজর মোহিত শর্মা ১ প্যারা এসএফ-এর অফিসার ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি ইফতিকার ভাট ছদ্মনামে হিজবুল মুজাহিদীনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন এবং দুই জঙ্গিকে হত্যা করেছিলেন— এটি একটি সত্য ঘটনা। ২০০৯ সালে তিনি কুপওয়ারায় শহীদ হন এবং অশোক চক্র পান।)

ক্যাপ্টেন শালিনী সিং

 ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১। কাশ্মীরের ডোডায় তখন গুলির লড়াই চলছে। ৮ রাষ্ট্রীয় রাইফেলস-এর দুর্ধর্ষ অফিসার মেজর অবিনাশ সিং ভাদৌরিয়া একাই ৪ জন জঙ্গিকে খতম করলেন। কিন্তু শেষমেশ শত্রুর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তার শরীর। দেশের জন্য প্রাণ দিলেন ২৯ বছরের এক টগবগে যুবক।


কানপুরে তখন অপেক্ষা করছিলেন তার স্ত্রী শালিনী সিং। বয়স মাত্র ২৩। কোলে ২ বছরের ছেলে ধ্রুব। শালিনী জানতেন না তার জগত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাকে বলা হয়েছিল অবিনাশ আহত। তিনি লাল শাড়ি পরে, সেজেগুজে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন স্বামীকে দেখতে। কিন্তু সেখানে এসে নামল কফিনে মোড়ানো মেজর অবিনাশের নিথর দেহ।


মুহূর্তের মধ্যে শালিনীর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। আত্মীয়-স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কেউ কেউ করুণার চোখে তাকাচ্ছিল। একজন সাধারণ রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, যিনি কখনো একা বাইরে বের হননি, তিনি এখন কী করবেন? কিন্তু শালিনী সেই করুণা চাননি। স্বামীর চিতাগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন, "অবিনাশ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, আমি তার সেই ইউনিফর্মটাকেই আমার বাঁচার সম্বল করব।"


সবাই তাকে পাগল ভাবল। কারণ শালিনী ছিলেন শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল, তার ওপর কিছুদিন আগেই সি-সেকশন অপারেশনের মাধ্যমে তার ছেলে হয়েছে। শরীরের সেলাইগুলোও তখনো পুরোপুরি শুকায়নি। কিন্তু মনের জোরের কাছে শরীরের ব্যথা হার মানল।


শুরু হলো এক অমানবিক লড়াই। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে তিনি এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউতে ডাক পেলেন। কোলের শিশু ধ্রুবকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে তিনি গেলেন এলাহাবাদে। প্রতি রাতে বাচ্চার জন্য কাঁদতেন, কিন্তু সকালে চোখ মুছে আবার লাইনে দাঁড়াতেন। তিনি পাস করলেন।


২০০২ সালের মার্চে তিনি যোগ দিলেন চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি (OTA)-তে। শাড়ি-চুড়ি ছেড়ে পরলেন ভারী বুট আর ইউনিফর্ম। ট্রেনিং ছিল নরক যন্ত্রণার মতো। দৌড়াতে গিয়ে তিনি পড়ে যেতেন, পায়ে ফাটল ধরত, ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তার পুরুষ সহকর্মীরা যখন সহজে ড্রিল করত, শালিনী তখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতেন। তার মনে একটাই কথা বাজত— "এটা অবিনাশের জন্য, এটা ধ্রুবর জন্য।"


৭ সেপ্টেম্বর, ২০০২। মেজর অবিনাশের মৃত্যুর ঠিক ২১ দিন আগে, তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর ঠিক আগে—শালিনী সিং কমিশন পেলেন। তিনি হলেন ক্যাপ্টেন শালিনী সিং। পাসিং আউট প্যারেডে যখন তিনি মার্চ করছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসে হাততালি দিচ্ছিল তার ৩ বছরের ছেলে ধ্রুব, যার পরনে ছিল বাবার মতো ছোট এক ইউনিফর্ম।


শালিনীকে পোস্টিং দেওয়া হলো রাজস্থান সীমান্তে, অর্ডন্যান্স করপস-এ। তখন পার্লামেন্ট হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি (অপারেশন পরাক্রম) চলছে। বারুদের গন্ধ আর উত্তপ্ত বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে শালিনী প্রমাণ করলেন, তিনি আর সেই লাজুক গৃহবধূ নেই, তিনি এখন দেশের পাহারাদার।


২০০২ সালের অক্টোবরে এক ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখল ভারত। রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের হাত থেকে মেজর অবিনাশের মরণোত্তর ‘কীর্তি চক্র’ (Kirti Chakra) গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠলেন তার স্ত্রী। কিন্তু বিধবা বেশে নয়, ভারতীয় সেনার ফুল ইউনিফর্মে, অফিসার হিসেবে। স্যালুট জানিয়ে তিনি স্বামীর মেডেল গ্রহণ করলেন।


২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। এরপর তিনি কর্পোরেট জগত এবং সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েও তিনি হাল ছাড়েননি, সুস্থ হয়ে ম্যারাথন দৌড়েছেন, মিসেস ইন্ডিয়া ক্লাসিক খেতাব জিতেছেন।


ক্যাপ্টেন শালিনী সিংয়ের গল্প কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন যখন আপনাকে আছড়ে ফেলে দেবে, তখন উঠে দাঁড়ানোটাই আসল বীরত্ব। স্বামীর অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তিনি হয়ে উঠেছেন হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা।


স্যালুট ক্যাপ্টেন শালিনী সিং।


Source:

১. The Better India (মে ২১, ২০১৮) - "Lost Husband in War, Escaped Death Twice: Capt Shalini's Incredible Journey". 

২. The Week (জানুয়ারি ৩০, ২০২২) - "Captain Shalini Singh: From young widow to wearing the olive green with pride".

IPS ছায়া শর্মা

 দিল্লি, ডিসেম্বর ২০১২।

শহর এমন ঠান্ডা আগে কম দেখেছে—কিন্তু সেই শীতের রাতে যা ঘটেছিল, তা তাপমাত্রার নয়, বিবেকের কম্পন বাড়িয়েছিল।


রাত ১১টার পর, দক্ষিণ দিল্লির একটি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল বিশৃঙ্খলা। সাইরেন, চিৎকার, মিডিয়ার কল—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য আতঙ্ক শহরটাকে পুরো গ্রাস করেছিল।

সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই ডাকা হল একজন অফিসারকে।


আইপিএস ছায়া শর্মা।


একটা ফোন কল, আর তাঁর নিদ্রাহীন রাত শুরু।

দুইটি শরীর—নগ্ন, রক্তাক্ত, অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিহ্নে ভরা।

ঘটনার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়াচ্ছেন, গাড়ির জানালার বাইরে দিল্লির আলো ঝাপসা হয়ে যেতেই তাঁর ভেতরটা কঠোর হয়ে উঠেছিল।


কিন্তু এ কেবল এক রাতের গল্প নয়।

এ গল্পের শুরু তারও বহু আগে।


একজন "ছোটোখাটো", "নরম", "বেশি যুবতী" পুলিশ অফিসারকে দেখে অনেকেই ভেবেছিল—

"এ কি পারবে?"

তিনি শুনেছেন।

মুখে হাসিখুশি রেখেছেন।

তারপর একের পর এক তদন্তে দেখিয়েছেন—

দেহের আকার নয়, সাহসের পরিমাণই পুলিশিংয়ের আসল মাপ।


একসময় দিল্লির ভাঙা মহল্লা, জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশের ডাস্টবিন, রাতের হাসপাতাল—এসব তাঁর নিত্য সঙ্গী।

গুম হয়ে যাওয়া বাচ্চা, পাচার হওয়া কিশোরী, মারধর খাওয়া নারী—তিনি শুনেছেন সব গল্পই।

প্রতিটা রিপোর্টের পেছনে তিনি দেখেছেন "মানুষ", "সংখ্যা" নয়।


কিন্তু ডিসেম্বর ২০১২-এর সেই রাত বদলে দিল সবকিছু।


নির্ভয়া কেস।


দেশ কেঁদে উঠেছিল।

রাস্তা নামল হাজার হাজার মানুষ।

কিন্তু তদন্তের রুমে বসে ছিলেন একজন নারী—

যার গলায় কোনো কাঁপুনি নেই,

চোখে কোনো ভয় নেই,

আর নিজের কাছে শুধু একটাই কথা—

"এই কেস ফেলে রাখলে চলবে না।"


৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিনি চিহ্নিত করলেন বাস, ড্রাইভার, টিম।


শহরের সিসিটিভিগুলো কাঁপা আলো দেখাচ্ছিল মাত্র—তার ভেতর থেকে তিনি চিনলেন সাদা বাসটার চলার পথ।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটেজ দেখে তিনি ধরলেন কোথায় থেমেছে বাস, কে উঠেছে, কে নেমেছে।


পুলিশ টিমরা ছুটল রাজস্থান, ইউপি, বিহার—

আর ছায়া শর্মা নিজে দাঁড়ালেন কন্ট্রোলের কেন্দ্রে।

মিডিয়া তেড়ে আসছে, রাজনীতি ঘুরছে, দেশ উত্তাল—

কিন্তু তাঁর ডায়েরির পাতায় লিখে তৈরি হল একেকটা নাম।


আর তিন দিন পর সে নামগুলো গ্রেফতার হয়ে গেল।


দেশ যেন নিঃশ্বাস নিতে পারল একটু।


কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কারণ Delhi Crime সিরিজে আমাদের যা দেখানো হয়েছে, বাস্তব জীবন ছিল তার থেকেও বেশি ভারী।


তার আগেই তিনি ছিলেন ‘বেবি ফলক’ কেসের তদন্তে—

দুই বছরের শিশুর দেহে এমন নিষ্ঠুরতা, তিনি নিজেও কেঁপে গিয়েছিলেন ভিতর থেকে।

কিন্তু কাঁদেননি।

কারণ তাঁর চোখে জল মানে অপরাধীর সুযোগ।


তিনি ট্র্যাফিকিং চক্র ভেঙেছেন।

তিনি দিল্লি জুড়ে এমন নেটওয়ার্ক ধরেছেন যারা শিশুদের বিক্রি করে দিত।

তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে বাচ্চার কপালে হাত রেখে বেরিয়েছেন—আর বাইরে এসে নিজের টিমকে বলেছেন—

"এই শিশুর অপমানের জবাব চাই।"


যাদের চোখে পুলিশ মানে লাঠি আর সাইরেন,

তারা ছায়া শর্মাকে দেখে শিখল—

পুলিশ মানে মানবিকতা এবং দৃঢ়তা দুটোই।


তারপর তিনি গেলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে, আবার ফিরলেন ইকোনমিক অফেন্সেস উইং (EOW)।

ব্যাংক জালিয়াতি, কোটি টাকার প্রতারণা, মাফিয়াদের রুট—সব জায়গায় তাঁর সই মানে ছিল একটাই—

"চাপ কমাও না, কাজ কমাও না।"


তিনি পেলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

কিন্তু আসল পুরস্কার?

নির্ভয়ার মা যখন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—

“ম্যাডাম, ওদের ছাড়বেন না।”


সেই এক বাক্যই তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।


আজ Delhi Crime তাঁকে পৃথিবীর সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু যারা আসল কেসগুলো দেখেছে, তাদের কাছে তিনি কেবল একটাই—

দিল্লির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা আলো।


Source:

১. BW PoliceWorld (ডিসেম্বর ২৩, ২০২১) - "IPS officer Chhaya Sharma who cracked Nirbhaya case in 72 hours". 

২. The Better India (ডিসেম্বর ০১, ২০২৫) - "The Real Story Behind Delhi Crime 3: How an IPS Officer Led India Through Its Toughest Cases".

Thursday, 12 June 2025

শহীদ নলিনী বাগচি

 "Don't disturb me-Let me die in peace."

"আমাকে বিরক্ত করবেন না, শান্তিতে মরতে দিন।"

  --- শহীদ_নলিনী বাগচি  


--- মুর্শিদাবাদ বাসীর গর্ব দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের বীর বিপ্লবী যোদ্ধা নিলীন বাগচি যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন জীবনের শেষ কথাটি বলছেন।  

       বিপ্লবী লড়াইরত যুবকদের মুখে মুখে ঘুরতো " Don't distrub me, Let me die in peace". নলিনী বাগচী বাংলা তথা ভারতের অগ্নিযুগের একটি কালজয়ী নাম, যে নাম একসময়ে বিপ্লবী যুবকদের প্রাণে শুধু প্রেরণার সঞ্চার করতো তাই নয়, দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য আত্মবলিদানের প্রেরণাও মজ্জায় মজ্জায় জাগিয়ে তুলেছিল। অগ্নি যুগাকাশে তিনি ছিলেন মধ্যাহ্ন গগনে প্রদীপ্ত সূর্যের মতো তেজস্বী। সেই যুগের বীর বিপ্লবীরা যাকে 'স্কলার 'ওরফে 'পাবলিশার' বলে জানতেন। অনুশীলন গোষ্ঠীর অন্যতম বিপ্লবী নায়ক ছিলেন তিনি।                     

       ১৮৯৬ সালে  মহান বীর বিপ্লবী শহীদ নলিনী বাগচী মুর্শিদাবাদ জেলার সামসেরগঞ্জ ব্লকের ধুলিয়ানে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ভূবন মোহন বাগচী ধুলিয়ান কাঞ্চনতলা এস্টেটে সেরেস্তার কাজ করতেন । তাঁর আদি নিবাস ছিল নদীয়ার শিকারপুরে। নলিনীর শিক্ষা জীবন শুরু হয় কাঞ্চনতলা উচ্চবিদ্যালয়ে । ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী। সেই ছোটবেলা থেকেই সততা, তেজস্বিতা, নির্ভীকতা ছিল তাঁর মধ্যে বিদ্যমান । হঠাৎ করেই পিতার অকাল মৃত্যু হয়। ফলে পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক দুর্দশা । নলিনী মায়ের উপর অভিমান করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে চলে যায় পাকুড়ে। সেখানে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাকুড় স্কুলে ভর্তি হয় ও ফ্রি-তে পড়াশোনা, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। ঐ স্কুল থেকেই নলিনী ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরে কিছু শুভানুধ্যায়ীর প্রচেষ্টায় তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে আই এ ভর্তি হন। কুমার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা চলতে থাকে। এই কুমার হস্টেলেই বীর বিপ্লবী নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন থেকেছেন।

            বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ তৎকালীন বিপ্লবীদের একটা প্রধান প্রাণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।এইসময় কয়েকজন বিপ্লবীর সংস্পর্শে এলেন নলিনী বাগচী। এখানেই তিনি উপলব্ধি করলেন--- দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লড়াই, স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইয়ে নিজেকে যুক্ত না করলে ছাত্র জীবনের পরিপূর্ণতা এবং মনুষ্যত্ব লাভ করা যায় না। যোগদান করলেন অনুশীলন সমিতিতে। দীক্ষিত হলেন বিপ্লবী মন্ত্রে। প্রতিজ্ঞা করলেন সংগ্রামময় জীবনের। বাংলার সংগ্রামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র সংগ্রাম দ্বারা ইংরেজ শাসনকে উচ্ছেদ করার দৃঢ় সংকল্পে নলিনী ও তাঁর সতীর্থরা এখন বদ্ধপরিকর । মুলত তাঁরই উদ্যোগে ছাত্রাবাস ও শহরের নানা স্থানে গুপ্ত সমিতি তৈরি গড়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নলিনী দলের নেতৃত্ব দিতে থাকলেন বিপ্লবীদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠলেন। পুলিশের সন্দেহের তালিকায় পড়লেন তিনি। অনুশীলন সমিতিতে তার কর্মকাণ্ড চরম পর্যায়ে পৌঁছালে পুলিশের নিকট তিনি একজন 'ভয়ঙ্কর ব্যক্তি' রূপে ওয়ান্টেড তালিকায় চিহ্নিত হয়ে গেলেন । ফলে পুলিশের গ্রেফতারি এড়াতে হবে।  এজন্য বাংলা ও বাংলার বাইরে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন। ফলস্বরূপ বিভিন্ন জায়গায় তিনি বিপ্লবী ক্রিয়া কর্ম ছড়াতে থাকলেন। বাংলার বাইরে বিপ্লবী লড়াইয়ের শক্তি বৃদ্ধি করতে ভর্তি হলেন বিহারের মুজঃফরপুর কলেজে। সেখানেও পুলিশের কুনজরে পড়লেন।  ফলে এই কলেজ ছেড়ে চললেন  বাঁকিপুর কলেজে। এখানেও তাঁর লক্ষ্য লড়াইয়ের মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া। এবং তিনি করতে থাকলেন। তিনি গোপনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিহারের বিপ্লবী দলের সঙ্গে বাংলার অনুশীলন সমিতির সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস চালিয়ে যেতে থাকেন। এরই মাঝে একসময় নলিনী তাঁর সতীর্থ সুধীর কুমার সিংহ এবং বঙ্কিমচন্দ্র মিত্রকে সঙ্গে নিয়ে দানাপুর কেল্লাস্থ ভারতীয় সৈনিকদের বিদ্রোহ ঘটানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কোনও রকমে কলকাতায় পালিয়ে আসেন ।                             

       এদিকে কলকাতার কুখ্যাত Deputy super in tendent - বসন্ত চ্যাটার্জিকে হত্যা করেন বিপ্লবী প্রবোধ বিশ্বাস। ফলে কলকাতায় শুরু হয় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতিতে ব্যাপক ধরপাকড় এবং বেপরোয়া অত্যাচার। অবস্থা বেগতিক দেখে সমিতির নেতৃস্থানীয় কর্মীদের নির্দেশে নলিনী বাগচি সহ বেশ কয়েকজন বিপ্লবী পাড়ি দিলেন গৌহাটির নিরাপদ আস্তানায় এবং সেখান থেকেই তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন । ১৯১৮ সালের ৯ জানুয়ারি গৌহাটির গোপন ডেরা বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলে। শুরু হয় এক অসম খণ্ডযুদ্ধ হয়। তারা সেখান থেকে অনেকেই পালিয়ে যান। যদিও বিপ্লবী প্রভাস লাহিড়ি ও মণীন্দ্রনাথ রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

           পুলিশের তাড়া খেয়ে ক্ষুধার্ত  তৃষ্ণার্ত বিপ্লবীরা আশ্রয় নিলেন নবগ্রহ পাহাড়ে, কিন্তু সেখানেও পৌঁছে গেল ইংরেজের বিশাল পুলিশ বাহিনী। ফলে আবারও শুরু হলো  এক প্রবল সম্মুখসমর। দলনেতার নির্দেশে নলিনী বাগচী ও প্রবোধ দাশগুপ্ত  কোনোক্রমে সেখান থেকে পালিয়ে যান। ক্লান্ত অবসন্ন ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত ভারত মাতার দুই বীর সন্তান পায়ে হেঁটে জঙ্গল পাহাড় পাঁচ দিন চার রাত্রি চলার পর ছদ্মবেশে পুনরায় ফিরে এলেন মুজঃফরপুরে।যোগাযোগ করতে থাকেন বিপ্লবীদের সাথে। পরে ফিরে আসেন কলকাতার গোপন ডেরায়। এবার ঢাকা অনুশীলন সমিতির নেতৃত্বের ভার পড়লো নলিনী বাগচির উপর । দলের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছদ্মবেশে তিনি ও বিপ্লবী তারিনী মজুমদার পৌঁছলেন ঢাকার এক গোপন আস্তানায় । অতি সাবধানে গোপনে তাঁরা তাঁদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন।             অবশেষে এল সেই চরমতম মুহূর্ত রাত্রি ১৫ জুন, ১৯১৮ সাল।

         কলতাবাজারের গোপন আস্তানায় মাত্র তিন জন বিপ্লবী।নলিনী বাগচি, তারিনী মজুমদার এবং হরিচৈতন্য দে। সঙ্গে মাত্র তিনটি দেশীয় পিস্তল ও কিছু কার্তুজ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এক বিশাল সশস্ত্র ইংরেজ পুলিশ বাহিনী চারদিক থেকে বাড়িটিকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে এক অসম যুদ্ধ, অখণ্ড লড়াই। এ এক মরণপণ লড়াই। মাত্র তিনটি দেশীয় পিস্তলের গুলি, যা শৃঙ্খলিত দেশ মাতৃকার এক একটা পাঁজরের হাড়, আর অপরদিক থেকে অসংখ্য রাইফেলের ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ধেয়ে আসছে। যেন ধেয়ে আসছে মৃত্যু শেল। বীরবিক্রমে লড়াই করতে করতে একসময় বিপ্লবী তারিনী মজুমদার গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। বিপ্লবী হরিচৈতন্য দে পুলিশের গুলির আঘাতে সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বৃটিশ শাসকের রক্ষাকারী বাহিনীর তিন পুলিশকর্মী নিহত ও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হল। তবুও চলছে লড়াই। এ যেন সেই যুদ্ধ যা বলছে " জীবনের শেষ রক্তবিন্দুটাও দিয়ে যাবো দেশের শৃঙ্খল ছিন্ন করতে, এ মোর অহংকার।" এই অসম যুদ্ধক্ষেত্রে একদিকে নলিনী একাকী নিঃসঙ্গ, চোখের সামনে পরে আছে দুই বিপ্লবী সাথীর নিথর দেহ অন্যদিকে বিশাল রণসাজে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী। তাঁর সারা শরীর গুলিবিদ্ধ, তাজা গরম রক্তে ভেসে যাচ্ছে পরিধেয় বস্ত্র। রক্তে তখন গোটা চত্বর লালে লাল। তবুও তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্নিবৃষ্টি করে চলেছেন। শত্রু পক্ষের করা অবিরাম গোলাবর্ষণ গুরুতর আহত অবস্থায় একসময় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ঘরের ভেতর থেকে পিস্তল চালানো থেমে গেলে পুলিশ বাহিনী ঘরে ঢুকে দেখল--- গুলিবিদ্ধ তিন যুবক ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে, লাল রক্তে রক্তা ভেসে যাচ্ছে ঘরময়, একজন নিহত, দুইজন গুরুতর আহত-সংজ্ঞাহীন। সেই অবস্থায় পুলিশ তাদেরকে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে   নিয়ে যায় তাঁদের বাঁচিয়ে তুলে বিপ্লবী দলের গোপন খবর আদায় করতে। জ্ঞান ফিরলে পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জানতে চায় - পরিচয়, গোপন পরিকল্পনার কথা, অন্যান্য সাথীদের কথা, গোপন ডেরার খবর। তাদের প্রশ্নের সদুত্তর না পেয়ে তারা নলিনী বাগচীর উপর অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে। নলিনী বাগচী শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলেন "Don't disturb me. Let me die in peace" ১৬ জুন ১৯১৮ এক রণক্লান্ত যোদ্ধার জীবনের শেষ দিন। সাথে সাথে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো হাজার হাজার যুবক প্রাণের মনিকোঠায় দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের আলোক শিখা। হাসপাতালের একটি নিভৃত কক্ষে ভারত মাতার বীর সন্তান নলিনীর দেহটা যেন একটি বারের জন্যে কেঁপে উঠল-শেষ! সব শেষ! অপলক হয়ে গেল তাঁর দৃষ্টি -সব স্থির শান্ত। এক তরতাজা দেশপ্রেমিক তরুণ যুবক নলিনী বাগচীর নিভে গেল জীবন প্রদীপ। তাঁর ঐ মৃত লাশটা যেন আমাদের বলে গেলো "রক্তের দাম দিতে শিখ বন্ধু।" অপর সঙ্গী হরিচৈতন্য দে'কে দশ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ড দেয় বৃটিশ শাসক। বৃটিশদের হাত থেকে আজ আমরা মুক্ত একথা ঠিক। দেশ মাতার শৃঙ্খল মোচন করে তাঁরা রক্তের বিনিময়ে চেয়েছিলেন শোষণহীন, নিপীড়নহীন, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা। এই বীর বিপ্লবী যোদ্ধাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা কি আজ আমরা সত্যিই পেয়েছি? তা আজ ভাবার সময় এসেছে। ভারতমাতার এই বীর সন্তান আমাদের জেলার উজ্জ্বল নক্ষত্র শহীদ অনালোচিত নলিনী বাগচির জীবনকে জানা এবং জানানোর একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস।

Tuesday, 20 May 2025

বাঁকুড়ার এক্তেশ্বর মহাদেব

 অদ্ভুত এক স্বরূপ দেবাদীদেব মহাদেবের , দেখার ইচ্ছে হলে বাঁকুড়ার এক্তেশ্বর শিব মন্দিরে একবার আসতেই হবে । জানুন এই মন্দির সম্পর্কে দু চার কথা -


এক্তেশ্বর মন্দির নামে একটি শিব মন্দিরের নামানুসারে "এক্তেশ্বর " নামটির উৎপত্তি ঘটেছে। বিষ্ণুপুরের রাজা এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। ল্যাটেরাইটে নির্মিত এই মন্দিরটিতে পরবর্তীকালে বেলেপাথর ও ইঁটের কাজ যুক্ত হয়। প্রতি বছর চৈত্র মাসে চরক পূজা এই মন্দিরে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।


এক্তেশ্বর মন্দিরে শিবের একটি একপদ মূর্তি পূজিত হয়। এই ধরনের শিবমূর্তি অন্য কোনও শিব মন্দিরে দেখা যায় না।


মন্দিরটিরও স্বকীয় একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটির কাঠামো অত্যন্ত দৃঢ়, যা বাংলার অন্যান্য মন্দিরে সাধারণত দেখা যায় না। মন্দিরটি বাংলার নিজস্ব শৈলীতেও নির্মিত হয়নি। চূড়াটি সম্ভবত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই এটিকে দেখলে অসম্পূর্ণ মনে হয়।


অনেকে মনে করেন, এক্তেশ্বর মন্দিরে পূজিত দেবতা হলেন একপদেশ্বর। তবে বর্তমান বিগ্রহটি একপদেশ্বরের নয়। পূর্বে একপদেশ্বরের মূর্তি ছিল কিনা সে সম্পর্কেও নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। কিংবদন্তি অনুসারে, বিষ্ণুপুর ও সামন্তভূম রাজ্যের মধ্যে সীমান্ত-সংক্রান্ত বিবাদের নিষ্পত্তি করার জন্য স্বয়ং শিব ধ্যানে বসেছিলেন এবং এক্তেশ্বরের মূর্তিতে দুই রাজ্যের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দণ্ডায়মান হন।


তথ্যসূত্র :

O’Malley, L.S.S., ICS, Bankura, Bengal District Gazetteers, pp. 195–199, 1995 reprint, first published 1908, Government of West Bengal


 "Abodes of Shiva"। Temple Net। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৮-১৫।

 

ঘোষ, বিনয়। "পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি" ১ম অংশ, ১৯৭৬-এর সংস্করণ, পৃ. ৩৬৮, প্রকাশ ভবন।


 Ghosh, Binoy, p. 367




অথর্ব বেদের বিষ্ময়

 এই ছবিটি আজ থেকে প্রায় ১০,০০০বছরের পুরোনো অথর্ববেদ থেকে পাওয়া প্রাচীন ভারতীয় শরীর বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার নিদর্শন।

অথর্ববেদের(১০.২.১১) শ্লোকে রক্তের সংবহন তন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হচ্ছে: এই রক্তবর্ণের তরলটি কি ও কি উপাদান দ্বারা গঠিত এবং এর কাজ কি?

রক্তের উপাদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে রক্তের উপাদান হিসেবে লৌহের উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংবহন পদ্ধতির ব্যাখ্যা করা  হয়েছে।


Wednesday, 30 April 2025

অজানা বাংলার বীর ।

 আপনারা তো সবাই ডায়মন্ড হারবার বেড়াতে যান, সপ্তাহান্তে ফুর্তি করতে। কখনো ট্রেনে গেলে চোখে পড়েছে ন্যাতড়া (Netra) নামের স্টেশনটা? জায়গাটার নাম শুনেছেন হয়ত, বা শোনেন নি। বাংলার আঞ্চলিক আর গর্বের ইতিহাসকে ভুলে যাওয়াই মনে হয় আত্মঘাতী লিবারেলদের কাজ। বাবার হইল আবার জ্বর সারিল ঔষধে পড়া, ইতিহাসকে ইসলামিস্ট লেখকদের চোখ দিয়ে পড়া, বাঙালি হিন্দু তাই ভুলে গেছে ন্যাতড়ার মিত্রদের মন্দিরের কথা। কাদের চক্রান্তে চাপা পড়ে রইল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজা নেত্রমিত্রর লড়ায়ের কাহিনী? প্রবল পরাক্রান্ত সাহসী হিন্দু রাজা নেত্র মিত্রের কথা কোনো ইতিহাস বইতে লেখা হয়েছে? আমাদের তো চোখে পড়েনি।  

নেত্র মিত্রের নামেই আজকের ন্যাতড়া। কে ছিলেন এই নেত্র মিত্র? 

একটু পিছিয়ে যেতে হবে এবার। বাংলায় পর্তুগীজ জলদস্যুদের আগমনের কাহিনী থেকেই শুরু করা যাক। 

১৫১৭ সাল থেকে গোয়া থেকে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথে বাংলায় যাত্রা শুরু করে। জোয়াও ডি সিলভারিয়া পরিচালিত চারটি জাহাজের একটি বহর ৯ মে ১৫১৮ সালে চট্টগ্রামে নোঙর করে। ১৫৩৭ সালে তাদের চট্টগ্রামে (তদানীন্তন নাম xetigam) বাণিজ্য করার অনুমতি দেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। কর্ণফুলীর তীরে বন্দর করে পর্তুগিজরা বাংলায় বাণিজ্য শুরু করে। চট্টগ্রাম আর সপ্তগ্রাম হয়ে উঠলো বাংলায় পর্তুগিজদের প্রধান বাণিজ্য স্থল। এই বনিকদের সাথে আরেকটি মার্সেনারী গোষ্ঠীও বাংলায় ঢুকে পড়ে, তারা জলদস্যু। জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোস, তাঁর বিখ্যাত বই History of the Portuguese in Bengal -এ লিখেছেন, এরা ছিল মূলত গোয়া এবং অন্যান্য স্থান থেকে আগত এবং পলাতক অপরাধপ্রবণ লোকজন।

১৫৩৩ সালে মার্টিম এফোনসো দে মেলো (Martim Affonso de Mello) চট্টগ্রাম যান। প্রথানুযায়ী তিনি এক দূতের মাধ্যমে নানাবিধ বহুমূল্য উপহার ভেটস্বরূপ গৌড়ের নবাবের কাছে পাঠান। বলা হয় যে এই ভেটের মধ্যে এমন কিছু উপহার ছিল যা পূর্বে পর্তুগিজরা নবাবেরই এক জাহাজ থেকে লুঠ করেছিল। নবাব তা চিনতে পেরে সেই দূতকে বন্দী করেন এবং সৈন্য পাঠিয়ে চট্টগ্রামে মার্টিম এফোনসোর দলের অর্ধেককে হত্যা করেন এবং মার্টিম এফোনসো সহ বাকি অর্ধেককে বন্দী করেন। মার্টিমের প্রধান সেনাপতি কলাপী পেড্রো ছিল দক্ষ নাবিক ও নৌযোদ্ধা। সে কোনোক্রমে পালায় এবং নিজের জলদস্যু দল গড়ে তোলে। তার প্রধান ঘাঁটি হয় অধুনা দক্ষিণ ২৪ পরগণার কুলপী বন্দর। শুনেই বুঝতে পারছেন কুলপী নামটি জলদস্যু কলাপীর সাথে সংযুক্ত।

এর কিছুদিন পরই বাঙলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল শুরু হল। ১৫৩৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীন বিহারের শাসনকর্তা শের শাহ সুরি বঙ্গ আক্রমণ করেন। সুলতান মাহমুদ শাহ গোয়ার পর্তুগিজ গভর্নরের কাছে দূত পাঠিয়ে সাহায্য প্রার্থণা করলেন। এর ফলেই পর্তুগিজদের অবাধ চলাচল শুরু হল বাংলায় আর কলাপী পেড্রোর মত জলদস্যুদের লুঠের রাস্তা খুলে গেল বাংলার বুকে। 

এই কলাপী পেড্রো ছিল অসম্ভব অত্যাচারী ও ধূর্ত। নারীলোলুপতা, লুঠতরাজ এসব বদগুণ তো ছিলই। গঙ্গার  উপকূলবর্তী গ্রামগুলিতে হানা দিয়ে একের পর এক জনপদ জ্বালিয়ে দিত, শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধা কেউ তার নিষ্ঠুরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে দাস হিসাবে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাচার করত দস্যুরা। এই ভয়ংকর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্থানীয় রাজা নেত্র মিত্র। 

The Unsung Warriors of Medieval Bengal গ্রন্থে বিশিষ্ট গবেষক দেবোত্তম চক্রবর্তী লিখেছেন নেত্র মিত্র ছিলেন প্রজাপালক ও সুশাসক। সবচেয়ে বড় কথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। ১৫৩৯ সন নাগাদ, উত্তরে বিবিরহাট ফলতা থেকে দক্ষিণে কাকদ্বীপ অব্দি বিস্তীর্ণ ছিল তাঁর হিন্দু সাম্রাজ্য। তাদের কূলদেব বিষ্ণুমন্দিরে বৃহৎ স্বর্ণ মূর্তি পূজিত হতো। স্থানীয় জেলে, সদগোপ, কৈবর্ত ও আদিবাসী যুবকদের নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন নেত্র মিত্র। সেই আমলে আক্রমণের আগাম সতর্কতা হিসাবে মশাল সংকেত প্রচলন করেন গ্রামের মানুষদের নিয়ে।

স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার The Early History of Bengal  (১৯২৪) বইতে জানিয়েছেন কলাপী পেড্রোর সেনাবাহিনীর প্রধান ছিল রোজারিও, নুনিশ, গোমেজ, পেড্রা প্রমুখ কুখ্যাত জলদস্যুরা। 

ত্রৈমাসিক আঞ্চলিক জ্ঞানচর্চ্চা পত্রিকার শ্রাবণ-ভাদ্র, ১৪১৩ সংখ্যায় ‘সুন্দরবনের অকথিত ইতিহাস’ প্রবন্ধে শ্রী রক্তানুপম চক্রবর্তী লিখেছেন কলাপী পেড্রো সাধারণত গভীর রাতে হানা দিতো অসুরক্ষিত জনপদে। এরকমই এক রাত্রে জলদস্যুদের দল যখন নূরপুরের কাছে শ্রীফলবেড়িয়া গ্রামে নোঙ্গর করে তখন অতর্কিতে তাদের ওপরেই হামলা চালায় নেত্রমিত্রের বাহিনী। সেদিন প্রায় কেউই প্রান নিয়ে ফিরতে পারেনি। জল জঙ্গলে বেড়ে ওঠা বাদাবনের বাঘ আর বিষধর সাপের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা বাঙালী অকুতোভয় যোদ্ধারা সেদিন দেখিয়ে দিয়েছিল নৌযুদ্ধ কাকে বলে। ভাগীরথী রাঙা হয়ে ওঠে জলদস্যুদের রক্তে। মশাল হাতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন নেত্র মিত্র স্বয়ং। এই ঘটনার কয়েক মাস পরে আবারো হামলা চালায় কলাপী পেড্রোর সেনারা। সেবারও তাদের প্রতিরোধ করেন নেত্র মিত্র। তাঁর কূলদেবতা বিষ্ণুর আশীর্বাদে তিনি জয়ী হন। তবে বুঝতে পারেন জলদস্যুদের মূল আস্তানা কুলপীতে। তাই শিকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেললে আর তারা মাথাচাড়া দিতে পারবেনা। নেত্র মিত্রের প্রধান সেনাপতি সাহেবুল্লা খানকে সেই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। এতদিনের বিশ্বস্ত সহেবুল্লা সামান্য উপঢৌকনের লোভে নিজেকে বিকিয়ে দেবে সরলপ্রান বীর নেত্র মিত্র ভাবতেও পারেননি। সময়টা ১৫৪০ সাল। তিনি যখন ধারণা করছেন যে জলদস্যুদের উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে তখনই তারা পূনরায় আক্রমণ করে। প্রতিরোধের কোনো সুযোগ না দিয়ে দেশীয় বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় নেত্র মিত্রের রাজবাড়ি দখল করে তারা। তারপর শুরু হয় গণহত্যা। ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয় মিত্র রাজবাড়ি, নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয় তাঁর সাম্রাজ্য। অগনিত নারী শিশুকে বন্দী করে এবং নির্বিচারে হত্যা করে রাজপরিবারের মানুষদের। নেত্র মিত্র বংশের কূলপুরোহিত মন্দির রক্ষার্থে শহীদ হন। রাজার অবর্তমানে, পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে কয়েক মাসের মধ্যেই এলাকার অনেক সমৃদ্ধশালী জনপদ জনশূন্য হয়ে যায়।

Portuguese in Bengal: A History Beyond Slave Trade বই থেকে জানা যাচ্ছে যে সেসময় সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গে মিত্রদের মন্দির ছিল সবচেয়ে সম্পদশালী, ধনরত্নে পরিপূর্ণ। সমস্ত সম্পদ লুঠ করে মন্দিরটি একেবারে ধ্বংস করে চলে যায় পর্তুগীজ দস্যুরা। কলাপী পেড্রোর কি হল তা সঠিকভাবে আর জানা যায়নি, ইতিহাসবিদেরা এ বিষয়ে নীরব। অসমর্থিত সূত্রে শোনা গেছিল সে বজ্রাঘাতে মারা যায়। পরবর্তীকালে এর প্রায় অর্ধ শতক পরে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য এই পর্তুগীজ দস্যুদের ব্যবহার করেই অপ্রতিরোধ্য ও সুবৃহৎ নৌবহর গড়ে তুলবেন, সে কথা ইতিহাস লিখে গেছে। কেবল হারিয়ে গেছেন নেত্র মিত্র। হারিয়ে গেছে মিত্রদের প্রাচীন গৌরবময় মন্দির। 

এই ন্যাতড়ার গৌরবময় মিত্র বংশের বংশধররা কিন্তু আজও আছেন। সূদূর মহারাষ্ট্রে বসে নিরলসভাবে বাংলার গৌরবজ্জ্বল হিন্দু বীরদের কথা লিখে যাচ্ছেন দেবশ্রী মিত্র, যিনি সেই নেত্র মিত্রের বংশধর। নিজস্ব এনজিও চালান, পথশিশুদের জন্য ক্রাউড ফান্ডিং, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য রক্তদান শিবির আয়োজন, কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ী ফেরার ব্যবস্থা এমন অনেক কিছু করেও তিনি থাকেন অন্তরালে। তাঁর একাধিক বই হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, মারাঠা বীরদের কথা, দক্ষিনী রাজাদের প্রতিরোধের কাহিনী, জওহরব্রতের ইতিহাস। তাঁর লেখা  আমাদের শোনিত উত্তপ্ত করে। বাংলার এমনই দুর্ভাগ্য, সাংস্কৃতির পীঠস্থান বইপ্রেমী বাঙালীরা শ্রীমতি মিত্রের বই অনুবাদের সাহস অব্দি করেনি। জানিনা কার অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে তাঁর লেখাপত্র বাংলায় প্রকাশিত হয়না।  

ডায়মন্ড হারবারের পরিত্যক্ত জলদস্যু ফোর্ট তো অনেকেই দেখতে যান, কেউ কি কখনো ন্যাতড়ার মিত্র রাজ বংশের মন্দিরের কথা বলেন? বলেন না। কেউ কি শুনেছেন জনদরদী রাজা নেত্র মিত্রের কথা? না না এবং না।

( কঠোরভাবে সংগ্রহীত)

Thursday, 16 January 2025

অজানা কথা

 খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বছর পরে 

লেখা ভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রের অন্য

তম সেরা গ্রন্থ ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়’-এ শ্লোকে 

একুশ দিনের লকডাউনের বিষয়টিও 

স্পষ্ট করা আছে।আর আমাদের 

আয়ু-র্বেদকে  আশ্রয়  করে   করোনা  রোধে 

পৃথিবীর অনেক দেশ এগিয়ে আসছে। 

করোনা-হানা ঠেকাতে ঘরবন্দি করে রাখা, অর্থাৎ আইসোলেশন, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মেনে চলা, বার বার হাত ধোয়া, জীবাণুনাশক দিয়ে স্নান— এই অভ্যাসগুলো আমরা ক্রমে রপ্ত করে উঠেছি। কিন্তু এই অভ্যাসগুলো ভারতে নতুন নয়, বরং সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো। ভারতীয় আয়ুর্বেদের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যিশুখ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই আইসোলেশন, পরিচ্ছন্ন থাকা, এমনকি, ২১ দিন গৃহবন্দি থাকার নিদানও রয়েছে।

চরক সংহিতার রচনাকাল গুপ্ত যুগ বা ৩০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের বলে মনে করা হয়। যার প্রচলিত সংস্করণটি ১০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দের ভিতর রচিত বলেই দাবি গবেষকদের। সেখানে বিমানস্থান তৃতীয় অধ্যায়ে এপিডেমিক বা ‘জনপদ ধ্বংসনীয় বিমান’ নামের একটি অংশ রয়েছে। করোনা রুখতে ২০২০-তে দাঁড়িয়ে আমরা যে সব উপায় অবলম্বন করছি, তার অধিকাংশই সেখানে বর্ণিত। ‘জনপদ ধ্বংসনীয়’ অর্থাৎ গোটা সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে এমন রোগের হানা ঘটলে কী ভাবে তার প্রতিকার সম্ভব, তা লেখা রয়েছে। 

এই অধ্যায়েই ১২-১৮ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘রাসায়নানাং বিধিবচ্চোপযোগঃ প্রশস্যতে’। অর্থাৎ রোগ প্রতিবিধানে বার বার গরম জলে স্নান ও নিজেকে রাসায়নিক দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাখলে ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করলে ভাইরাসকে মেরে ফেলা সহজ হয়। এখনও করোনা করোনা ঠেকাতে নানা ওষুধের প্রয়োগ ও বার বার পরিচ্ছন্ন থাকতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যানিটাইজার ব্যবহার ও ভাল করে হাত-পা-মুখ বার বার পরিষ্কার করার যে নিদান এখন চিকিৎসকরা দিচ্ছেন, তা খ্রিস্টের জন্মের ৩০০-৫০০ বছর আগেই চরক জানিয়ে গিয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বছর পরে লেখা ভারতীয় আয়ুর্বেদশাস্ত্রের অন্যতম সেরা গ্রন্থ ‘অষ্টাঙ্গহৃদয়’-এর শ্লোকে ২১ দিনের লকডাউনের বিষয়টিও স্পষ্ট করা আছে। সেখান ৬৫ লম্বর শ্লোকে লেখা রয়েছে, ‘একবিংশোতিরাত্রেন বিষং শ্যাম্যতি সর্বথা’। অর্থাৎ যে কোনও বিষের (জীবাণু) প্রভাব কমে ২১তম দিনে। অর্থাৎ, বিষ বা জীবাণুতে আক্রান্ত রোগীকে ২১ দিন ঘরবন্দি রাখলে সে বিষ আর বাইরে সংক্রামিত করতে পারে না ও একুশতম দিনে এসে বিষের উপশম ঘটে। ফলে, আজকের পৃথিবীর লকডাউনের ধারণাও নতুন নয়। বরং ভারতীয় আয়ুর্বেদ তা অনেক আগেই নিদান দিয়ে রেখেছে।

কল্যাণীর বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসক লোপামুদ্রা ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘প্রাচীনকালের আয়ুর্বেদ চিকিৎসক চরক-সুশ্রুতের কথাই এখন মডার্ন মেডিসিন ঘুরিয়ে বলছে। মহামারি বা অতিমারি ঠেকাতে রোগীর পরিবারশুদ্ধকে আলাদা করে রাখার রীতি আয়ুর্বেদশাস্ত্রেই রয়েছে। শুধু চরক সংহিতা নয়, অষ্টাঙ্গহৃদয়তেও এমন নানা উপায় বর্ণিত আছে, যা মহামারি বা অতিমারির সময় বিশেষ ভাবে কাজে লাগে।’’

যেমন: ‘চরক সংহিতা’র টিকাকার চক্রপানি দত্ত রোগের তিন প্রকার কারণসমূহ বলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম, ‘অভিষঙ্গজ হেতু’। অর্থাৎ ভাইরাসের আক্রমণ। এই অভিষঙ্গজ বিষয়ে ‘সুশ্রুত সংহিতা’-র ৬ নং অধ্যায়ের ৩২ ও ৩৩ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘‘প্রসঙ্গাদ গাত্রসংস্পর্শাৎ নিশ্বাসাৎ সহভোজনাৎ।/ সহশয্যাসনশ্চাপি বস্ত্রমাল্যানুলেপনাৎ।।’’ অর্থাৎ ভাইরাস আক্রান্তকে ছোঁয়ার মাধ্যমে, তার হাঁচি-কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমে, তাঁর সঙ্গে বসবাস, একই থালায় খাওয়া, একই বিছানায় শোওয়ার মতো কাজ করলে সুস্থ মানুষও তাঁর সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এই শ্লোকেই শেষের দিকের পঙ‌্ক্তিতে বলা হয়েছে, ‘‘ঔপসর্গিক রোগশ্চ সংক্রমন্তি নরানরং।’’ অর্থাৎ, উপসর্গগুলি এক জনের থেকে অন্য জনে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংয়ের ধারণাটিও এখান থেকেই পাওয়া। চরক সংহিতার তিস্রৈষণীয় অধ্যায়ে তিন প্রকার ইমিউনিটি-র (আয়ুর্বেদের ভাষায় ‘বল’) কথা রয়েছে— বলমিতি সহজং, কালজং ও যুক্তিবৃতঞ্চ। যে কোনও ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে দেহের জন্মগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কাল বা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও টিকার মাধ্যমে অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। করোনা থেকে মুক্তি পেতেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কথাই বলছেন আধুনিক চিকিৎসকরা।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ও গবেষক সুজন সরকারের মতে, ‘‘ভারতীয় এই আয়ুর্বেদকে আশ্রয় করে করোনা রোধে পৃথিবীর অনেক দেশই এগিয়ে এসেছে। এক সময় চরক ও সুশ্রুত সংহিতা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হত। তখনই এই দুই গ্রন্থের প্রতিলিপি ও অনুবাদ পাড়ি দেয় চিন, তিব্বত ও অন্যান্য পূর্ব এশীয় দেশে। তাই সে সব দেশে ভারতীয় আয়ুর্বেদের প্রভাব রয়েছে। আজ করোনা ঠেকাতে তাই চিনও সেই সব প্রাচীন গ্রন্থের নিদান আঁকড়ে মোকাবিলা করছে। ভারত-সহ গোটা বিশ্বও সেই পথেই হাঁটছে। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র যে সব উপায়ের কথা বলছে, তা মূলত সনাতনী আয়ুর্বেদ থেকেই নেওয়া, কেবল তার প্রয়োগে আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। তখন কাপড় বা সুতিবস্ত্র দিয়ে নাক-মুখ চাপা দেওয়া কথা বলা হয়েছে, এখন তা-ই মাস্ক। জল ও বায়ুবাহিত ভাইরাস মারতে বার বার গরম জলে স্নান ও গরম জল পান করার বিধানও রয়েছে এখানে।’’

এ কালের করোনা প্রতিরোধ ও রোগের প্রকার নির্ণয়ের বীজ আসলে পড়ে রয়েছে সাড়ে 

তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ভারতীয় আয়ুর্বেদে।

গোত্র

































 সনাতন ধর্মে হিন্দুদের গোত্র।

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...