Monday, 8 December 2025

মেজর মোহিত শর্মা

 কুপওয়ারা, কাশ্মীর। ২০০৩ সাল।


উপত্যকার এক গোপন আস্তানায় বসে আছে হিজবুল মুজাহিদীনের দুই কুখ্যাত কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার। তারা অপেক্ষা করছে তাদের নতুন রিক্রুট বা সদস্যের জন্য। খবর এসেছে, এক কাশ্মীরি যুবক তাদের দলে যোগ দিতে চায়, যার চোখে ভারতের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলছে।


কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। ভেতরে ঢুকল এক যুবক। পরনে নোংরা ফিরান (কাশ্মীরি আলখাল্লা), মুখভর্তি লম্বা দাড়ি, কাঁধ পর্যন্ত নামানো উশকোখুশকো চুল। চোখেমুখে তীব্র ঘৃণা। নাম তার— ইফতিকার ভাট।


জঙ্গিরা তাকে সন্দেহ করেছিল। তারা তাকে পরীক্ষা করল, প্রশ্ন করল। কিন্তু ইফতিকার ভাটের কাশ্মীরি ভাষা, তার বাচনভঙ্গি এবং স্থানীয় কালচার সম্পর্কে জ্ঞান এতটাই নিখুঁত ছিল যে জঙ্গিদের সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না। তারা ভাবল, তারা এক নতুন ‘জিহাদি’ পেয়েছে। তারা ইফতিকারকে বুকে জড়িয়ে ধরল।


কিন্তু তারা জানত না, এই ইফতিকারের আলখাল্লার নিচেই লুকিয়ে আছে ইন্ডিয়ান আর্মির ইউনিফর্মের অদৃশ্য বর্ম। তারা জানত না, এই যুবক আসলে মেজর মোহিত শর্মা, ১ প্যারা (স্পেশাল ফোর্সেস)-এর এক দুর্ধর্ষ কমান্ডো।


শুরু হলো মোহিতের আন্ডারকভার অপারেশন। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এটা ছিল বাস্তবের এক মরণখেলা। মেজর মোহিত শর্মা দিনের পর দিন জঙ্গিদের সাথে কাটালেন। তাদের সাথে এক থালায় খাবার খেলেন, একই ঘরে ঘুমালেন। জঙ্গিরা তাঁর সামনেই ভারতের সেনার ওপর হামলার ছক কষত, আর মোহিত মনে মনে সেই ম্যাপ এঁকে নিতেন। প্রতিটা মুহূর্ত ছিল শ্বাসরূদ্ধকর। রাতে ঘুমানোর সময়ও তিনি সজাগ থাকতেন, কারণ ঘুমের ঘোরে যদি মুখ দিয়ে একটাও হিন্দি বা ইংরেজি শব্দ বেরিয়ে যায়, তাহলে সেখানেই মৃত্যু নিশ্চিত।


অবশেষে এল সেই রাত। জঙ্গিরা পরিকল্পনা করল তারা ভারতীয় সেনার একটি চেকপোস্টে হামলা চালাবে। মেজর মোহিত বুঝলেন, আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখন অ্যাকশনের সময়।


গভীর রাতে যখন জঙ্গিরা অসতর্ক, মোহিত শর্মা তাঁর গোপন নাইন-এমএম পিস্তলটি বের করলেন। চোখের পলকে তিনি গুলি চালালেন। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে। দুই হিজবুল কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার— কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তাদের রক্তে ভেসে গেল মেঝের কার্পেট।


কাজ শেষ করে মোহিত শর্মা ঠিক সেভাবেই ছায়ার মতো বেরিয়ে এলেন, যেভাবে ঢুকেছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরে ওই পুরো জঙ্গি নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল। এই অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘সেনা মেডেল’ দেওয়া হয়।


কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। ২০০৯ সাল। ২১ মার্চ। আবার সেই কুপওয়ারার জঙ্গল। হাফরুদা ফরেস্ট।


খবর এল জঙ্গিরা আবার জড়ো হয়েছে। এবার আর ইফতিকার ভাট নয়, মেজর মোহিত শর্মা নিজের আসল পরিচয়ে, ইউনিফর্ম পরে টিম নিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন। শুরু হলো ভয়ংকর এনকাউন্টার। জঙ্গিরা ওপরের পজিশন থেকে গুলি চালাচ্ছিল। মোহিতের টিমের কয়েকজন আহত হলেন।


নিজের সঙ্গীদের বাঁচাতে মেজর মোহিত শর্মা খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলেন। তিনি একাই জঙ্গিদের এনগেজ করলেন। গুলি তাঁর বুকে লাগল, শরীরে ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কিন্তু তিনি থামলেন না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে তিনি দুই জঙ্গিকে খতম করলেন এবং তাঁর টিমকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন।


মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যখন উদ্ধার করা হলো, দেখা গেল তাঁর হাতের মুঠো তখনও শক্ত করে ধরা আছে রাইফেলটা। তিনি ছিলেন সেই বিরল অফিসারদের একজন, যিনি শত্রুকে ধোঁকা দিয়েও মেরেছেন আবার সম্মুখ সমরে বুক চিতিয়েও মেরেছেন। ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সামরিক সম্মান ‘অশোক চক্র’ প্রদান করে।


আজও প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের ট্রেনিংয়ে নতুন কমান্ডোদের ইফতিকার ভাটের গল্প শোনানো হয়। শেখানো হয়— ইউনিফর্ম শুধু শরীরে থাকে না, ইউনিফর্ম থাকে কলিজায়।


স্যালুট মেজর মোহিত শর্মা!


Source & Disclaimer:


তথ্যসূত্র: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অশোক চক্র সাইটেশন (Official Citation), India Today আর্কাইভ এবং মেজর মোহিত শর্মার জীবনীমূলক বিভিন্ন ডকুমেন্টারি।


(বিশেষ দ্রষ্টব্য: মেজর মোহিত শর্মা ১ প্যারা এসএফ-এর অফিসার ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি ইফতিকার ভাট ছদ্মনামে হিজবুল মুজাহিদীনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন এবং দুই জঙ্গিকে হত্যা করেছিলেন— এটি একটি সত্য ঘটনা। ২০০৯ সালে তিনি কুপওয়ারায় শহীদ হন এবং অশোক চক্র পান।)

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...