Monday, 8 December 2025

ক্যাপ্টেন শালিনী সিং

 ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১। কাশ্মীরের ডোডায় তখন গুলির লড়াই চলছে। ৮ রাষ্ট্রীয় রাইফেলস-এর দুর্ধর্ষ অফিসার মেজর অবিনাশ সিং ভাদৌরিয়া একাই ৪ জন জঙ্গিকে খতম করলেন। কিন্তু শেষমেশ শত্রুর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তার শরীর। দেশের জন্য প্রাণ দিলেন ২৯ বছরের এক টগবগে যুবক।


কানপুরে তখন অপেক্ষা করছিলেন তার স্ত্রী শালিনী সিং। বয়স মাত্র ২৩। কোলে ২ বছরের ছেলে ধ্রুব। শালিনী জানতেন না তার জগত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাকে বলা হয়েছিল অবিনাশ আহত। তিনি লাল শাড়ি পরে, সেজেগুজে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন স্বামীকে দেখতে। কিন্তু সেখানে এসে নামল কফিনে মোড়ানো মেজর অবিনাশের নিথর দেহ।


মুহূর্তের মধ্যে শালিনীর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। আত্মীয়-স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কেউ কেউ করুণার চোখে তাকাচ্ছিল। একজন সাধারণ রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, যিনি কখনো একা বাইরে বের হননি, তিনি এখন কী করবেন? কিন্তু শালিনী সেই করুণা চাননি। স্বামীর চিতাগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন, "অবিনাশ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, আমি তার সেই ইউনিফর্মটাকেই আমার বাঁচার সম্বল করব।"


সবাই তাকে পাগল ভাবল। কারণ শালিনী ছিলেন শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল, তার ওপর কিছুদিন আগেই সি-সেকশন অপারেশনের মাধ্যমে তার ছেলে হয়েছে। শরীরের সেলাইগুলোও তখনো পুরোপুরি শুকায়নি। কিন্তু মনের জোরের কাছে শরীরের ব্যথা হার মানল।


শুরু হলো এক অমানবিক লড়াই। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে তিনি এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউতে ডাক পেলেন। কোলের শিশু ধ্রুবকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে তিনি গেলেন এলাহাবাদে। প্রতি রাতে বাচ্চার জন্য কাঁদতেন, কিন্তু সকালে চোখ মুছে আবার লাইনে দাঁড়াতেন। তিনি পাস করলেন।


২০০২ সালের মার্চে তিনি যোগ দিলেন চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি (OTA)-তে। শাড়ি-চুড়ি ছেড়ে পরলেন ভারী বুট আর ইউনিফর্ম। ট্রেনিং ছিল নরক যন্ত্রণার মতো। দৌড়াতে গিয়ে তিনি পড়ে যেতেন, পায়ে ফাটল ধরত, ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তার পুরুষ সহকর্মীরা যখন সহজে ড্রিল করত, শালিনী তখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতেন। তার মনে একটাই কথা বাজত— "এটা অবিনাশের জন্য, এটা ধ্রুবর জন্য।"


৭ সেপ্টেম্বর, ২০০২। মেজর অবিনাশের মৃত্যুর ঠিক ২১ দিন আগে, তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর ঠিক আগে—শালিনী সিং কমিশন পেলেন। তিনি হলেন ক্যাপ্টেন শালিনী সিং। পাসিং আউট প্যারেডে যখন তিনি মার্চ করছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসে হাততালি দিচ্ছিল তার ৩ বছরের ছেলে ধ্রুব, যার পরনে ছিল বাবার মতো ছোট এক ইউনিফর্ম।


শালিনীকে পোস্টিং দেওয়া হলো রাজস্থান সীমান্তে, অর্ডন্যান্স করপস-এ। তখন পার্লামেন্ট হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি (অপারেশন পরাক্রম) চলছে। বারুদের গন্ধ আর উত্তপ্ত বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে শালিনী প্রমাণ করলেন, তিনি আর সেই লাজুক গৃহবধূ নেই, তিনি এখন দেশের পাহারাদার।


২০০২ সালের অক্টোবরে এক ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখল ভারত। রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের হাত থেকে মেজর অবিনাশের মরণোত্তর ‘কীর্তি চক্র’ (Kirti Chakra) গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠলেন তার স্ত্রী। কিন্তু বিধবা বেশে নয়, ভারতীয় সেনার ফুল ইউনিফর্মে, অফিসার হিসেবে। স্যালুট জানিয়ে তিনি স্বামীর মেডেল গ্রহণ করলেন।


২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। এরপর তিনি কর্পোরেট জগত এবং সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েও তিনি হাল ছাড়েননি, সুস্থ হয়ে ম্যারাথন দৌড়েছেন, মিসেস ইন্ডিয়া ক্লাসিক খেতাব জিতেছেন।


ক্যাপ্টেন শালিনী সিংয়ের গল্প কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন যখন আপনাকে আছড়ে ফেলে দেবে, তখন উঠে দাঁড়ানোটাই আসল বীরত্ব। স্বামীর অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তিনি হয়ে উঠেছেন হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা।


স্যালুট ক্যাপ্টেন শালিনী সিং।


Source:

১. The Better India (মে ২১, ২০১৮) - "Lost Husband in War, Escaped Death Twice: Capt Shalini's Incredible Journey". 

২. The Week (জানুয়ারি ৩০, ২০২২) - "Captain Shalini Singh: From young widow to wearing the olive green with pride".

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...