Monday, 8 December 2025

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন এক অকুতোভয় তরুণী ডাক্তার। নাম—টি. এস. কনকা (T. S. Kanaka)।


ছোটখাটো গড়ন, পরনে সাদাসিধে শাড়ি। দেখে মনে হতো পাশের বাড়ির কোনো শান্ত মেয়ে। কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। তিনি শুধু একজন ডাক্তার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ইতিহাস।


টি. এস. কনকা ছিলেন এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের অন্যতম প্রথম নারী নিউরোসার্জন। যে যুগে নারীদের ডাক্তারি পড়াই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, সেই যুগে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল শাখা—ব্রেন সার্জারি।


তার এই লড়াইয়ের পেছনে ছিল এক করুণ ট্র্যাজেডি। ছোটবেলায় তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। তিনি যখন এমএস (Master of Surgery) ডিগ্রি শেষ করলেন, তখন হঠাৎ তার ৯ বছরের ছোট ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ল। চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল ভাইটি।


কনকা কিছুই করতে পারলেন না। এই অসহায়ত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি এক কঠিন শপথ নিলেন। তিনি বিয়ে করবেন না। সংসার করবেন না। নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করবেন মানুষের সেবায়।


কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। ষাটের দশকে ভারতের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য। প্রফেসররা বিশ্বাসই করতে চাইতেন না যে কোনো নারী ব্রেন সার্জারির মতো জটিল অপারেশন করতে পারে। তাকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতে দেওয়া হতো না, জরুরি বিভাগে কাজ দেওয়া হতো না।


কনকা হার মানলেন না। তিনি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতেন। পরীক্ষায় তাকে বারবার ফেল করানো হতো, যাতে তিনি হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু তিনি ছিলেন জেদি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার দক্ষতা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দিলেন।


১৯৬৮ সালে তিনি নিউরোসার্জারিতে এমসিএইচ (MCh) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ভারতের প্রথম সার্জন যিনি মস্তিষ্কে 'ক্রনিক ইলেকট্রোড ইমপ্লান্ট' (Chronic Electrode Implant) করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন (Deep Brain Stimulation)-এর মতো জটিল অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন।


কনকা শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি নিজের জমানো টাকায় গড়ে তুলেছিলেন 'শ্রী সান্তানাকৃষ্ণ পদ্মাবতী হেলথ কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন'। সেখানে গরিব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হতো। তিনি তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম-এ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়েছেন।


তার জীবনের আরেকটি অবিশ্বাস্য দিক হলো রক্তদান। তিনি লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন সর্বোচ্চ সংখ্যক বার রক্তদানের জন্য। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ১৩৯ বার রক্ত দিয়েছিলেন! ভাবা যায়? যে মানুষটি নিজের ভাইকে বাঁচাতে পারেননি, তিনি নিজের রক্ত দিয়ে হাজারো অচেনা মানুষকে বাঁচিয়ে গেছেন।


টি. এস. কনকা ছিলেন এক নীরব কর্মযোগী। তিনি কখনো প্রচারের আলোয় আসেননি, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে কোটি কোটি টাকা কামাননি। তিনি আজীবন সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা করে গেছেন। ২০১৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।


তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক অসামান্য উদাহরণ। তার জীবন আমাদের শেখায়, জেদ আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই মানুষকে আটকাতে পারে না। একজন নারী হয়েও তিনি কীভাবে পুরুষশাসিত সমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি ভারতীয় নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণা।


সোর্স: ১/ Wikipedia: T. S. Kanaka

মেজর মোহিত শর্মা

 কুপওয়ারা, কাশ্মীর। ২০০৩ সাল।


উপত্যকার এক গোপন আস্তানায় বসে আছে হিজবুল মুজাহিদীনের দুই কুখ্যাত কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার। তারা অপেক্ষা করছে তাদের নতুন রিক্রুট বা সদস্যের জন্য। খবর এসেছে, এক কাশ্মীরি যুবক তাদের দলে যোগ দিতে চায়, যার চোখে ভারতের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলছে।


কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। ভেতরে ঢুকল এক যুবক। পরনে নোংরা ফিরান (কাশ্মীরি আলখাল্লা), মুখভর্তি লম্বা দাড়ি, কাঁধ পর্যন্ত নামানো উশকোখুশকো চুল। চোখেমুখে তীব্র ঘৃণা। নাম তার— ইফতিকার ভাট।


জঙ্গিরা তাকে সন্দেহ করেছিল। তারা তাকে পরীক্ষা করল, প্রশ্ন করল। কিন্তু ইফতিকার ভাটের কাশ্মীরি ভাষা, তার বাচনভঙ্গি এবং স্থানীয় কালচার সম্পর্কে জ্ঞান এতটাই নিখুঁত ছিল যে জঙ্গিদের সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না। তারা ভাবল, তারা এক নতুন ‘জিহাদি’ পেয়েছে। তারা ইফতিকারকে বুকে জড়িয়ে ধরল।


কিন্তু তারা জানত না, এই ইফতিকারের আলখাল্লার নিচেই লুকিয়ে আছে ইন্ডিয়ান আর্মির ইউনিফর্মের অদৃশ্য বর্ম। তারা জানত না, এই যুবক আসলে মেজর মোহিত শর্মা, ১ প্যারা (স্পেশাল ফোর্সেস)-এর এক দুর্ধর্ষ কমান্ডো।


শুরু হলো মোহিতের আন্ডারকভার অপারেশন। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, এটা ছিল বাস্তবের এক মরণখেলা। মেজর মোহিত শর্মা দিনের পর দিন জঙ্গিদের সাথে কাটালেন। তাদের সাথে এক থালায় খাবার খেলেন, একই ঘরে ঘুমালেন। জঙ্গিরা তাঁর সামনেই ভারতের সেনার ওপর হামলার ছক কষত, আর মোহিত মনে মনে সেই ম্যাপ এঁকে নিতেন। প্রতিটা মুহূর্ত ছিল শ্বাসরূদ্ধকর। রাতে ঘুমানোর সময়ও তিনি সজাগ থাকতেন, কারণ ঘুমের ঘোরে যদি মুখ দিয়ে একটাও হিন্দি বা ইংরেজি শব্দ বেরিয়ে যায়, তাহলে সেখানেই মৃত্যু নিশ্চিত।


অবশেষে এল সেই রাত। জঙ্গিরা পরিকল্পনা করল তারা ভারতীয় সেনার একটি চেকপোস্টে হামলা চালাবে। মেজর মোহিত বুঝলেন, আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখন অ্যাকশনের সময়।


গভীর রাতে যখন জঙ্গিরা অসতর্ক, মোহিত শর্মা তাঁর গোপন নাইন-এমএম পিস্তলটি বের করলেন। চোখের পলকে তিনি গুলি চালালেন। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে। দুই হিজবুল কমান্ডার— আবু তোরা এবং আবু সবজার— কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তাদের রক্তে ভেসে গেল মেঝের কার্পেট।


কাজ শেষ করে মোহিত শর্মা ঠিক সেভাবেই ছায়ার মতো বেরিয়ে এলেন, যেভাবে ঢুকেছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরে ওই পুরো জঙ্গি নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছিল। এই অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘সেনা মেডেল’ দেওয়া হয়।


কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। ২০০৯ সাল। ২১ মার্চ। আবার সেই কুপওয়ারার জঙ্গল। হাফরুদা ফরেস্ট।


খবর এল জঙ্গিরা আবার জড়ো হয়েছে। এবার আর ইফতিকার ভাট নয়, মেজর মোহিত শর্মা নিজের আসল পরিচয়ে, ইউনিফর্ম পরে টিম নিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন। শুরু হলো ভয়ংকর এনকাউন্টার। জঙ্গিরা ওপরের পজিশন থেকে গুলি চালাচ্ছিল। মোহিতের টিমের কয়েকজন আহত হলেন।


নিজের সঙ্গীদের বাঁচাতে মেজর মোহিত শর্মা খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলেন। তিনি একাই জঙ্গিদের এনগেজ করলেন। গুলি তাঁর বুকে লাগল, শরীরে ঝাঁঝরা হয়ে গেল। কিন্তু তিনি থামলেন না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে তিনি দুই জঙ্গিকে খতম করলেন এবং তাঁর টিমকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন।


মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যখন উদ্ধার করা হলো, দেখা গেল তাঁর হাতের মুঠো তখনও শক্ত করে ধরা আছে রাইফেলটা। তিনি ছিলেন সেই বিরল অফিসারদের একজন, যিনি শত্রুকে ধোঁকা দিয়েও মেরেছেন আবার সম্মুখ সমরে বুক চিতিয়েও মেরেছেন। ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন সামরিক সম্মান ‘অশোক চক্র’ প্রদান করে।


আজও প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের ট্রেনিংয়ে নতুন কমান্ডোদের ইফতিকার ভাটের গল্প শোনানো হয়। শেখানো হয়— ইউনিফর্ম শুধু শরীরে থাকে না, ইউনিফর্ম থাকে কলিজায়।


স্যালুট মেজর মোহিত শর্মা!


Source & Disclaimer:


তথ্যসূত্র: ভারতীয় সেনাবাহিনীর অশোক চক্র সাইটেশন (Official Citation), India Today আর্কাইভ এবং মেজর মোহিত শর্মার জীবনীমূলক বিভিন্ন ডকুমেন্টারি।


(বিশেষ দ্রষ্টব্য: মেজর মোহিত শর্মা ১ প্যারা এসএফ-এর অফিসার ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি ইফতিকার ভাট ছদ্মনামে হিজবুল মুজাহিদীনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন এবং দুই জঙ্গিকে হত্যা করেছিলেন— এটি একটি সত্য ঘটনা। ২০০৯ সালে তিনি কুপওয়ারায় শহীদ হন এবং অশোক চক্র পান।)

ক্যাপ্টেন শালিনী সিং

 ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১। কাশ্মীরের ডোডায় তখন গুলির লড়াই চলছে। ৮ রাষ্ট্রীয় রাইফেলস-এর দুর্ধর্ষ অফিসার মেজর অবিনাশ সিং ভাদৌরিয়া একাই ৪ জন জঙ্গিকে খতম করলেন। কিন্তু শেষমেশ শত্রুর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তার শরীর। দেশের জন্য প্রাণ দিলেন ২৯ বছরের এক টগবগে যুবক।


কানপুরে তখন অপেক্ষা করছিলেন তার স্ত্রী শালিনী সিং। বয়স মাত্র ২৩। কোলে ২ বছরের ছেলে ধ্রুব। শালিনী জানতেন না তার জগত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাকে বলা হয়েছিল অবিনাশ আহত। তিনি লাল শাড়ি পরে, সেজেগুজে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন স্বামীকে দেখতে। কিন্তু সেখানে এসে নামল কফিনে মোড়ানো মেজর অবিনাশের নিথর দেহ।


মুহূর্তের মধ্যে শালিনীর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। আত্মীয়-স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কেউ কেউ করুণার চোখে তাকাচ্ছিল। একজন সাধারণ রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, যিনি কখনো একা বাইরে বের হননি, তিনি এখন কী করবেন? কিন্তু শালিনী সেই করুণা চাননি। স্বামীর চিতাগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন, "অবিনাশ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, আমি তার সেই ইউনিফর্মটাকেই আমার বাঁচার সম্বল করব।"


সবাই তাকে পাগল ভাবল। কারণ শালিনী ছিলেন শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল, তার ওপর কিছুদিন আগেই সি-সেকশন অপারেশনের মাধ্যমে তার ছেলে হয়েছে। শরীরের সেলাইগুলোও তখনো পুরোপুরি শুকায়নি। কিন্তু মনের জোরের কাছে শরীরের ব্যথা হার মানল।


শুরু হলো এক অমানবিক লড়াই। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে তিনি এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউতে ডাক পেলেন। কোলের শিশু ধ্রুবকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে তিনি গেলেন এলাহাবাদে। প্রতি রাতে বাচ্চার জন্য কাঁদতেন, কিন্তু সকালে চোখ মুছে আবার লাইনে দাঁড়াতেন। তিনি পাস করলেন।


২০০২ সালের মার্চে তিনি যোগ দিলেন চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি (OTA)-তে। শাড়ি-চুড়ি ছেড়ে পরলেন ভারী বুট আর ইউনিফর্ম। ট্রেনিং ছিল নরক যন্ত্রণার মতো। দৌড়াতে গিয়ে তিনি পড়ে যেতেন, পায়ে ফাটল ধরত, ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তার পুরুষ সহকর্মীরা যখন সহজে ড্রিল করত, শালিনী তখন দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতেন। তার মনে একটাই কথা বাজত— "এটা অবিনাশের জন্য, এটা ধ্রুবর জন্য।"


৭ সেপ্টেম্বর, ২০০২। মেজর অবিনাশের মৃত্যুর ঠিক ২১ দিন আগে, তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর ঠিক আগে—শালিনী সিং কমিশন পেলেন। তিনি হলেন ক্যাপ্টেন শালিনী সিং। পাসিং আউট প্যারেডে যখন তিনি মার্চ করছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসে হাততালি দিচ্ছিল তার ৩ বছরের ছেলে ধ্রুব, যার পরনে ছিল বাবার মতো ছোট এক ইউনিফর্ম।


শালিনীকে পোস্টিং দেওয়া হলো রাজস্থান সীমান্তে, অর্ডন্যান্স করপস-এ। তখন পার্লামেন্ট হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি (অপারেশন পরাক্রম) চলছে। বারুদের গন্ধ আর উত্তপ্ত বালির মধ্যে দাঁড়িয়ে শালিনী প্রমাণ করলেন, তিনি আর সেই লাজুক গৃহবধূ নেই, তিনি এখন দেশের পাহারাদার।


২০০২ সালের অক্টোবরে এক ঐতিহাসিক দৃশ্য দেখল ভারত। রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের হাত থেকে মেজর অবিনাশের মরণোত্তর ‘কীর্তি চক্র’ (Kirti Chakra) গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠলেন তার স্ত্রী। কিন্তু বিধবা বেশে নয়, ভারতীয় সেনার ফুল ইউনিফর্মে, অফিসার হিসেবে। স্যালুট জানিয়ে তিনি স্বামীর মেডেল গ্রহণ করলেন।


২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। এরপর তিনি কর্পোরেট জগত এবং সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েও তিনি হাল ছাড়েননি, সুস্থ হয়ে ম্যারাথন দৌড়েছেন, মিসেস ইন্ডিয়া ক্লাসিক খেতাব জিতেছেন।


ক্যাপ্টেন শালিনী সিংয়ের গল্প কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন যখন আপনাকে আছড়ে ফেলে দেবে, তখন উঠে দাঁড়ানোটাই আসল বীরত্ব। স্বামীর অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তিনি হয়ে উঠেছেন হাজারো নারীর অনুপ্রেরণা।


স্যালুট ক্যাপ্টেন শালিনী সিং।


Source:

১. The Better India (মে ২১, ২০১৮) - "Lost Husband in War, Escaped Death Twice: Capt Shalini's Incredible Journey". 

২. The Week (জানুয়ারি ৩০, ২০২২) - "Captain Shalini Singh: From young widow to wearing the olive green with pride".

IPS ছায়া শর্মা

 দিল্লি, ডিসেম্বর ২০১২।

শহর এমন ঠান্ডা আগে কম দেখেছে—কিন্তু সেই শীতের রাতে যা ঘটেছিল, তা তাপমাত্রার নয়, বিবেকের কম্পন বাড়িয়েছিল।


রাত ১১টার পর, দক্ষিণ দিল্লির একটি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল বিশৃঙ্খলা। সাইরেন, চিৎকার, মিডিয়ার কল—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য আতঙ্ক শহরটাকে পুরো গ্রাস করেছিল।

সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই ডাকা হল একজন অফিসারকে।


আইপিএস ছায়া শর্মা।


একটা ফোন কল, আর তাঁর নিদ্রাহীন রাত শুরু।

দুইটি শরীর—নগ্ন, রক্তাক্ত, অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিহ্নে ভরা।

ঘটনার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়াচ্ছেন, গাড়ির জানালার বাইরে দিল্লির আলো ঝাপসা হয়ে যেতেই তাঁর ভেতরটা কঠোর হয়ে উঠেছিল।


কিন্তু এ কেবল এক রাতের গল্প নয়।

এ গল্পের শুরু তারও বহু আগে।


একজন "ছোটোখাটো", "নরম", "বেশি যুবতী" পুলিশ অফিসারকে দেখে অনেকেই ভেবেছিল—

"এ কি পারবে?"

তিনি শুনেছেন।

মুখে হাসিখুশি রেখেছেন।

তারপর একের পর এক তদন্তে দেখিয়েছেন—

দেহের আকার নয়, সাহসের পরিমাণই পুলিশিংয়ের আসল মাপ।


একসময় দিল্লির ভাঙা মহল্লা, জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশের ডাস্টবিন, রাতের হাসপাতাল—এসব তাঁর নিত্য সঙ্গী।

গুম হয়ে যাওয়া বাচ্চা, পাচার হওয়া কিশোরী, মারধর খাওয়া নারী—তিনি শুনেছেন সব গল্পই।

প্রতিটা রিপোর্টের পেছনে তিনি দেখেছেন "মানুষ", "সংখ্যা" নয়।


কিন্তু ডিসেম্বর ২০১২-এর সেই রাত বদলে দিল সবকিছু।


নির্ভয়া কেস।


দেশ কেঁদে উঠেছিল।

রাস্তা নামল হাজার হাজার মানুষ।

কিন্তু তদন্তের রুমে বসে ছিলেন একজন নারী—

যার গলায় কোনো কাঁপুনি নেই,

চোখে কোনো ভয় নেই,

আর নিজের কাছে শুধু একটাই কথা—

"এই কেস ফেলে রাখলে চলবে না।"


৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিনি চিহ্নিত করলেন বাস, ড্রাইভার, টিম।


শহরের সিসিটিভিগুলো কাঁপা আলো দেখাচ্ছিল মাত্র—তার ভেতর থেকে তিনি চিনলেন সাদা বাসটার চলার পথ।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটেজ দেখে তিনি ধরলেন কোথায় থেমেছে বাস, কে উঠেছে, কে নেমেছে।


পুলিশ টিমরা ছুটল রাজস্থান, ইউপি, বিহার—

আর ছায়া শর্মা নিজে দাঁড়ালেন কন্ট্রোলের কেন্দ্রে।

মিডিয়া তেড়ে আসছে, রাজনীতি ঘুরছে, দেশ উত্তাল—

কিন্তু তাঁর ডায়েরির পাতায় লিখে তৈরি হল একেকটা নাম।


আর তিন দিন পর সে নামগুলো গ্রেফতার হয়ে গেল।


দেশ যেন নিঃশ্বাস নিতে পারল একটু।


কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কারণ Delhi Crime সিরিজে আমাদের যা দেখানো হয়েছে, বাস্তব জীবন ছিল তার থেকেও বেশি ভারী।


তার আগেই তিনি ছিলেন ‘বেবি ফলক’ কেসের তদন্তে—

দুই বছরের শিশুর দেহে এমন নিষ্ঠুরতা, তিনি নিজেও কেঁপে গিয়েছিলেন ভিতর থেকে।

কিন্তু কাঁদেননি।

কারণ তাঁর চোখে জল মানে অপরাধীর সুযোগ।


তিনি ট্র্যাফিকিং চক্র ভেঙেছেন।

তিনি দিল্লি জুড়ে এমন নেটওয়ার্ক ধরেছেন যারা শিশুদের বিক্রি করে দিত।

তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে বাচ্চার কপালে হাত রেখে বেরিয়েছেন—আর বাইরে এসে নিজের টিমকে বলেছেন—

"এই শিশুর অপমানের জবাব চাই।"


যাদের চোখে পুলিশ মানে লাঠি আর সাইরেন,

তারা ছায়া শর্মাকে দেখে শিখল—

পুলিশ মানে মানবিকতা এবং দৃঢ়তা দুটোই।


তারপর তিনি গেলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে, আবার ফিরলেন ইকোনমিক অফেন্সেস উইং (EOW)।

ব্যাংক জালিয়াতি, কোটি টাকার প্রতারণা, মাফিয়াদের রুট—সব জায়গায় তাঁর সই মানে ছিল একটাই—

"চাপ কমাও না, কাজ কমাও না।"


তিনি পেলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

কিন্তু আসল পুরস্কার?

নির্ভয়ার মা যখন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—

“ম্যাডাম, ওদের ছাড়বেন না।”


সেই এক বাক্যই তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।


আজ Delhi Crime তাঁকে পৃথিবীর সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু যারা আসল কেসগুলো দেখেছে, তাদের কাছে তিনি কেবল একটাই—

দিল্লির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা আলো।


Source:

১. BW PoliceWorld (ডিসেম্বর ২৩, ২০২১) - "IPS officer Chhaya Sharma who cracked Nirbhaya case in 72 hours". 

২. The Better India (ডিসেম্বর ০১, ২০২৫) - "The Real Story Behind Delhi Crime 3: How an IPS Officer Led India Through Its Toughest Cases".

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...