Monday, 13 November 2023

প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদা,ভারতের প্রথম সংবিধান লেখক।

 *সম্পুর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে  নিজের হাতে ভারতের সংবিধান লিখেছিলেন প্রেম বিহারী। তিনি নেহেরুকে বলেছিলেন,

 ” Not a single penny. By the grace of God I have all the  things and am quite happy with my life.*

*আমরা জানি ডক্টর আম্বেদকরই ভারতীয় সংবিধানের জনক। কিন্তু কজনের জানা আছে যে এই বিশাল সংবিধানটি সম্পূর্ণ হাতে লেখা হয়েছিল। পুরো সংবিধানটি লেখার জন্য কোনো রকম যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। এই বিশাল বইটি অর্থাৎ সম্পূর্ণ সংবিধানটাই নিজের হাতে ইটালিক স্টাইলে, ক্যালিগ্রাফি করে লিখেছিলেন প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদা নামে দিল্লীর এক বাসিন্দা। *প্রেম বিহারী ছিলেন ওই সময়ের একজন নামজাদা ক্যালিগ্রাফি রাইটার। তিনি ১৯০১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর দিল্লীর এক নামকরা হস্তাক্ষর গবেষকের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যুবক বয়েসেই তাঁর পিতা-মাতাকে হারান। তাঁর দাদু রাম প্রসাদ সাক্সেনা ও কাকা চতুর বিহারী নারায়ণ সাক্সেনার কাছে তিনি মানুষ হন। তাঁর দাদু রাম প্রসাদ একজন ক্যালিগ্রাফার ছিলেন। তিনি পার্শী ও ইংরেজি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের পার্শী ভাষা শেখাতেন।*

*দাদু সুন্দর হস্তাক্ষর করার জন্য প্রেম বিহারীকে ছোটবেলা থেকেই ক্যালিগ্রাফি আর্ট শেখাতেন। প্রেম বিহারী দিল্লীর সেন্ট স্টিফেন কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর দাদুর কাছে শেখা ক্যালিগ্রাফি আর্ট নিয়ে চর্চা করতে আরম্ভ করেন। ধীরে ধীরে সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য তাঁর নাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। যখন সংবিধান ছাপার জন্য তৈরী হয়ে গিয়েছে, তখন ভারতের তদকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু প্রেম বিহারীকে ডেকে পাঠান। নেহেরুর খুব ইচ্ছে ছিল সংবিধানটি ছাপার অক্ষরে না রেখে ইটালিক অক্ষরে ক্যালিগ্রাফি করে হাতে লেখার। সেই কারণেই তিনি প্রেম বিহারীকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। প্রেম বিহারী তাঁর কাছে আসার পর নেহেরুজী তাঁকে ইটালিক স্টাইলে সংবিধানটি হাতে লিখে দিতে বললেন এবং তিনি কি পারিশ্রমিক নেবেন তা জানতে চাইলেন।*

*প্রেম বিহারী নেহেরুজীকে বললেন

 ” Not a single penny. By the grace of God I have all the things and am quite happy with my life.” 

একথা বলার পর তিনি নেহেরুজীকে একটা অনুরোধ করেন

 “I have one reservation – that on every page of constitution I will write my name and on the last page I will write my name along with my grandfather’s name.”* 

*নেহেরুজী তাঁর এই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন। এই সংবিধান লেখার জন্য তাঁকে একটা ঘর দেওয়া হয়েছিল। যেখানে বসে প্রেমজী পুরো সংবিধানটির পান্ডুলিপিটা লিখেছিলেন। লেখা শুরু করার আগে প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদা নেহেরুজীর ইচ্ছানুযায়ী ২৯শে নভেম্বর ১৯৪৯ সালে তদকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী রাজেন্দ্র প্রসাদের সাথে শান্তিনিকেতনে আসেন। তাঁরা বিখ্যাত চিত্রকর নন্দলাল বসুর সাথে আলোচনা করে ঠিক করেন কিভাবে ও পাতার কতটা অংশ নিয়ে প্রেম বিহারী লিখবেন, পাতার বাকি ফাঁকা অংশে নন্দলাল বসু অলংকরণ করবেন।**নন্দলাল বসু ও শান্তিনিকেতনের তাঁর কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এই ফাঁকা অংশগুলোতে অনবদ্য চিত্রশৈলীতে ভরিয়ে তুলেছিলেন। মহেঞ্জদরোর সিলমোহর, রামায়ণ, মহাভারত, গৌতম বুদ্ধের জীবন, সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম প্রচার, বিক্রমাদিত্যের সভা, সম্রাট আকবর ও মুঘল সাম্রাজ্য, মহারানী লক্ষীবাঈ, টিপু সুলতান, গান্ধীজির আন্দোলন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের ও আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, ভারতের পাহাড়, সমুদ্র ও মরুভূমির সৌন্দর্যের রূপচিত্র সবই তাঁদের অঙ্কন অলংকরণে ফুটে উঠেছে। সব মিলে এ যেন ভারতের ইতিহাস ও ভূগোলের চিত্রিত রূপ। তাঁরা সংবিধানের বিষয়বস্তু ও অনুচ্ছেদ অনুযায়ী খুবই সুচিন্তিতভাবে চিত্রগুলি চিত্রায়ণ করেছিলেন। *ভারতীয় সংবিধানটি লিখতে প্রেম বিহারীর দরকার হয়েছিল ৪৩২টা পেন হোল্ডার আর তিনি ৩০৩ নম্বরের নিব ব্যবহার করেছিলেন । নিবগুলো ইংল্যান্ড ও চেকোস্লোভাকিয়া থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। নিবগুলো ওখানকার তৈরী করা নিব। ভারতের কনস্টিটিউশন হলের একটা ঘরে তিনি দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সমগ্র সংবিধানের পাণ্ডুলিপিটি লিখেছিলেন। সংবিধানটি লিখতে ২৫১ পাতা পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহার করতে হয়েছিল। সংবিধানটির ওজন ৩ কিলো ৭৫০ গ্রাম। সংবিধানটি দৈর্ঘ্যে ২২ ইঞ্চি আর প্রস্থে ১৬ ইঞ্চি।*

*১৬ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৬ সালে প্রেম বিহারীর মৃত্যু হয়। ভারতীয় সংবিধানটির মূল বইটি বর্তমানে দিল্লীর সংসদ ভবনের গ্রন্থাগারে স্বযত্নে সংরক্ষিত করা আছে। পরবর্তীকালে দেরাদুনের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে অল্প কিছু পুস্তক ছাপার হরফে প্রকাশিত করা হয়েছিল।*

ছবি:- সৌজন্যে ইন্টারনেট।



স্বরস্বতী পূজো

স্বরস্বতী পূজো কী ও কেনো?  

কোনো হিন্দুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, দেবী সরস্বতী কে ? বলবে, জ্ঞানের দেবী, বিদ্যার দেবী। আর ? আর কোনো তথ্য তার কাছে নেই। এরপর হয়তো দু’চার জন হিন্দু বলতে পারবে যে, সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী; কিন্তু এই জানাও যে ভুল এই লেখাটি পড়তে থাকলে তা এক সময় বুঝতে পারবেন।

আমরা যেমন- ব্যবসায়িক, বন্ধুত্ব বা বিবাহ এমনকি শিক্ষাগুরু ধরতে গেলেও তার সম্পর্কে ভালো করে জানার চেষ্টা করি এবং তারপর তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করি; তেমনি যখন কোনো দেব-দেবীর পূজা আমরা করবো, তখনও আমাদের উচিত সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে তার আরাধনা করা, তাহলেই কেবল আমাদের পূজ-প্রার্থনা সফল ও সার্থক হবে।

সরস্বতী পূজা সম্পর্কে যেহেতু এই লেখা, সেহেতু প্রথমেই যে প্রশ্নের মিমাংসা করতে হবে যে, দেবী সরস্বতী আসলে কে ? আবার আমরা সাধারণভাবে অনেকেই কোনো দেব-দেবীকে ছোট এবং কোনো দেব-দেবীকে বড় বলে মনে করি, কিন্তু কোনো দেব-দেবী ই যে ছোট বড় নয়, সকল দেব-দেবী ই যে সমান, এই লেখাটি পড়লে এই তত্ত্বেরওএকটা সংক্ষিপ্ত সমাধান পাবেন।

হিন্দুশাস্ত্র মতে, সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর হলো পরমব্রহ্ম, যাকে শুধু ব্রহ্মও বলা হয়। পরমাত্মারূপে এই ব্রহ্ম সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত, এই জন্যই হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, 

“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”

এর অর্থ হলো- সকলের মধ্যে ব্রহ্ম বিদ্যমান। - (ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৩/১৪/১, বেদান্ত দর্শন)

পরমব্রহ্ম, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, এই তিনটি রূপে তার কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তার নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তার নাম বিষ্ণু; যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তার নাম শিব বা মহেশ্বর। কিন্তু আমরা স্থূল দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করে ব্রহ্ম বা ঈশ্বরকে বিভক্ত করে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরে এই তিনভাগে বিভক্ত করেছি এবং এই তিনটি সত্ত্বাকে আলাদা আলাদা তিনটি রূপ দান করেছি। প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা কোনো সত্ত্বা নয়, এগুলো জাস্ট তিনটি নাম এবং এই তিনটি নাম পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের তিনটি কার্যকরী রূপের নাম মাত্র। ব্রহ্ম এবং ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ব্যাপারটা সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন, প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রীর হাতে তিনটি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে; তো যখন প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী যে মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করেন বা ফাইলে সই করেন, তখন তিনি কিন্তু সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা মূখ্যমন্ত্রী। ব্রহ্মও ঠিক সেরূপ, তিনি যখন যে কাজ করেন, তখন সেই রূপের নামে কাজটি করেন, সেই তিনটি নামই হলো- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এই ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার করার জন্য বলছি, অনেকে বা সকলেই জানেন, বিষ্ণু পালনকর্তা। তাহলে বিষ্ণুর অবতারদের তো যুদ্ধ, ধ্বংস, বিনাশ এই সব করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বিষ্ণুর আংশিক অবতার রাম কি যুদ্ধ করে রাবনের বংশকে বিনাশ করে নি ? বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণ কি নিজে কংস, শিশুপালকে হত্যা করে নি ? কৃষ্ণ কি ভীমের মাধ্যমে জরাসন্ধ, দুর্যোধনকে হত্যা করায় নি ? পাণ্ডবদের মাধ্যমে কুরুবংশকে ধ্বংস করে নি ? বিষ্ণু যদি কোনো আলাদা সত্ত্বা হতো আর তার কাজ শুধু যদি পালন করা হতো, তাহলে কি সে এই যুদ্ধ, বিনাশগুলো করতো ? আসলে এগুলো করিয়েছেন ব্রহ্ম, আমাদের শাস্ত্রকারা তাদেরকে শুধু বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কল্পনা করে ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। না হলে পৃথিবীতে এত বিষ্ণুর অবতার, সেই তুলনায় ব্রহ্মা ও শিবের কোনো অবতার নেই কেনো ? আসলে- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরতো আলাদাকেউ নয়। ব্রহ্ম, যখন সৃষ্টি করেন, তখন তারই নাম ব্রহ্মা; যখন তিনি পালন করেন, তখন তারই নাম বিষ্ণু এবং যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তারই নাম শিব বা মহেশ্বর; যে কথা একটু আগেই বলেছি এবং যে কথা বলা আছে গীতার এই শ্লোকে-

“অবিভক্তংচ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্।

ভূতভর্তৃ চ তজজ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ। ”অর্থ- পরমেশ্বরকে যদি যদিও সমস্ত ভূতে বিভক্তরূপে বোধ হয়, কিন্তু তিনি অবিভক্ত। যদিও তিনি সর্বভূতের পালক, তবু তাঁকে সংহার কর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলে জানবে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আলাদা আলাদা কেউ নয়, তারা একই ব্রহ্মের বিভিন্ন রূপ; এইব্রহ্ম যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করেন তখন তার নাম হয় ব্রহ্মা, আর যেহেতু যেকোনো কিছু সৃষ্টি করতেই লাগে জ্ঞান এবং প্রকৃতির নিয়ম হলো নারী ও পুরুষের মিলন ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হয় না, সৃষ্টি বলতে সাধারণ অর্থে এখানে মানুষকেই বোঝানো হচ্ছে, সেহেতু প্রকৃতির এই নিয়মকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই ব্রহ্মার নারীশক্তি হলো সরস্বতী, যাকে আমরা স্থূল অর্থে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে মনে করি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে কিছু নেই, এমন কি ব্রহ্মা বলেও আলাদা কোনো সত্ত্বা নেই, লেখক কর্তৃক গল্প-উপন্যাসে, একাধিক চরিত্র সৃষ্টির মতো সবই ব্রহ্মের খেলা, এখানে ব্রহ্মই সবকিছু । যা হোক, কোনো কিছু তৈরি বা সৃষ্টি করতে হলে যেমন লাগে জ্ঞান, তেমনি সৃষ্টিকে নিখুঁত করার জন্য নজর রাখতে হয় চারেদিকে, এই চারিদেকে দৃষ্টি রাখার জন্যই কল্পনা করা হয়েছে ব্রহ্মার চারটি মাথা এবং তার নারীশক্তি সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে জ্ঞানের দেবী হিসেবে।আজকের প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে, দেবী সরস্বতী আসলে কে ? উপরের আলোচনা থেকে। পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বরের সৃষ্টিকারী রূপের নাম ব্রহ্মা আর ব্রহ্মার নারী শক্তির নাম সরস্বতী; এর মানে হলো সরস্বতীই ব্রহ্মা, আর ব্রহ্মা মানেই পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর, অর্থাৎ সরস্বতীই পরমেশ্বর বা ঈশ্বর। সরস্বতীকে ছোটো দেবী হিসেবে এতদিন মনে করে এলেও সরস্বতী মোটেই কোনো ছোটো দেবী নয়;সরস্বতী, ঈশ্বরেরই একটা রূপের নাম এবং স্ত্রীলিঙ্গে স্বয়ং ঈশ্বরীরূপে সরস্বতীই পরমব্রহ্ম বা ঈশ্বর। এবার নজর দেওয়া যাক সরস্বতী পূজার বা সরস্বতী দেবীর সাথে থাকা অন্যান্য বিষয়গুলো দিকে–

দেবী সরস্বতীর গায়ের রং হয় সব সময় সাদা বা শ্বেত-শুভ্র জাতীয়, খেয়াল করে দেখবেন সরস্বতীর মূর্তিতে লাল কালো বা অন্য কোনো রং ব্যবহার করা হয় না। দেবী সরস্বতীর শুভ্রমূর্তি আসলে নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রতীক; এটা এই শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক ছেলে মেয়েকে হতে হবে নিষ্কলুষ নির্মল চরিত্রের অধিকারী; যে ছেলে মেয়ে বাল্যকাল থেকে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা করবে, সে যে সারা জীবন তার সকল কর্ম ও চিন্তায় নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে পারবে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই।

স্বরস্বতী পূজায় আর একটি অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে দেবী সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁস। রাজহাঁসকে প্রায় সবাই সরস্বতীর বাহন বলে মনে করে। কিন্তু দেব-দেবীর বাহন বলে কিছু হয় না। বাহন বলতে আমরা বুঝি যে বহন করে। কিন্তু দেব-দেবীরা এমনিতেই প্রত্যেকে সুপার পাওয়ারের শক্তি সম্পন্ন, কোথাও যেতে হলে তাদেরকে কারো বা কোনো কিছুর উপর ভরসা করতে হয় না। দেব-দেবীর বাহন বলা মানেই সেই দেব-দেবীর ক্ষমতাকে ছোটো করা। দেব-দেবীর বাহন তত্ত্বকে স্বীকার করলেই এই প্রশ্ন উঠবে যে, যে দেব-দেবী নিজেই কোথাও যেতে পারে না, সেই দেব-দেবীর আর কী ক্ষমতা আছে, আর তাদেরকে পূজা করেই বা কী লাভ ? তাই দেব-দেবীদের বাহন বলে কিছু নেই; তাহলে দেব-দেবীর বাহন বলতে আমরা এতদিন যা জেনে এসেছি এবং দেব-দেবীদের সাথে আর অন্য যা কিছু থাকে সেগুলো আসলে কিসের জন্য থাকে আর এগুলো থাকার কারণই বা কী ?

মূর্তি পূজা একধরণের প্রতীকী পূজা এবং প্রকৃত সত্য হচ্ছে, কোনো  কিন্তু প্রতিটি মূর্তির সাথে যে বিষয়গুলো জড়িত থাকে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু তথ্য বা শিক্ষা, আপনি যদি সেই বিষয়গুলোর প্রকৃত ব্যাখ্যা জানেন বা জানতে পারেন, তাহলেই কেবল সফল বা সার্থক হতে পারে আপনার পূজা এবং তা থেকে আপনি কিছু না কিছু ফল লাভ করতে পারেন।রাজহাসেঁর মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে, এক পাত্রে থাকা জলমিশ্রিত দুধের থেকে সে শুধুমাত্র দুধ শুষে নিতে পারে। সরস্বতী যেহেতু শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট পূজা, সেই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যেতে পারে যে, রাজহাসেঁর এই তথ্য শিক্ষার্থীদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সব কিছুই থাকবে, তার মধ্যে থেকে তোমাদেরকে শুধু ভালোটুকু শুষে নিতে হবে। অধিকাংশ হিন্দু ছেলে-মেয়েরা যে মেধাবী এবং চরিত্রবান বা চরিত্রবতী, সরস্বতী পূজা এবং তার রাজহাঁসজনিত এই শিক্ষাই তার কারণ। সরস্বতীর হাতে থাকে বীণা; এর কারণ হচ্ছে-হিন্দু ধর্ম হলো নাচ, গান সমৃদ্ধ শিল্পকলার ধর্ম; যা সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে সাপোর্ট করে। কারণ, প্রত্যেক ছেলে মেয়েই কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহন করে; সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে কেউ তার সেই প্রতিভাকে বিকাশ করতে পারে, কেউ পারে না, সেটা অন্য ব্যাপার; কিন্তু প্রকৃতির ধর্ম হিসেবে হিন্দু ধর্ম এই সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, এই কারণেই দেবী সরস্বতীর হাতের বীণা হচ্ছে সেই শিল্পকলার প্রতীক। আর এটা সুধীজন স্বীকৃত যে, যারা- নাচ, গান, কবিতা লেখা বা নাট্য চর্চার মতো শিল্পকলার সাথে জড়িত, তারা সাধারণত কখনো মিথ্যাও বলে না; চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ তো দূরের ব্যাপার। সাধারণ ভাবে সকল হিন্দুই যে সৎ প্রকৃতির এবং প্রত্যেক হিন্দু ছেলে মেয়েই যে শিল্পকলার কিছু না কিছু  জানে, এটাই তার অন্যতম কারণ।সরসস্বতীর হাতে থাকে পুস্তক এবং সরস্বতী পূজাতেও বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক দিতে হয়। পুস্তক যে জ্ঞানের আশ্রয়, এটা তো আর নতুন কোনো কথা নয়; একারণেই হিন্দুরা একটি জ্ঞান পিপাসু এবং জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি। এখনও যেকোনো স্কুলে যে কয়জন হিন্দু ছাত্র ছাত্রী পাবেন, দেখবেন তাদের মধ্যে ৯০% ই জিনিয়াস।বর্তমানে দেবী সরস্বতীকে দুই হাত বিশিষ্ট দেখা গেলেও দেবী সরস্বতীর মূল মূর্তি আসলে চার হাত বিশিষ্ট, এরকম ছবি আপনারা অনেকে জায়গায় দেখতে পেতে পারেন, সরস্বতীর মূল থিমের সাথে এই চার হাত ই মানানসই; কারণ হলো- পড়াশুনার পাশাপাশি কেউ যদি নাচ গান বা অন্য যে কোনো শিল্পকলায় এক্সপার্ট হতে চায়, তাকে দুই হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করলে চলবে না, তাকে চার হাতের শক্তি ও ব্যস্ততা নিয়ে কাজ করত হবে; বাস্তবে পড়াশুনার পাশাপাশি যারা বিভিন্ন শিল্পকলায় দক্ষ হয়ে ওঠে, তাদের জীবন এইরকম ব্যস্ততাতেই ভরা; একটু খোঁজ নিলেই আমার এই কথার সত্যতা বুঝতে পারবেন। অনেক কাঠামোতে দেখা যায়, সরস্বতী দেবী হাঁসের উপর বসে আছে আবার কোনো কাঠামোয় দেখা যায় পদ্মফুলের উপর; পদ্মফুলের উপ সরস্বতীর আসন ই সঠিক আসন। এর কারণ- পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মফুল হলো সফল ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতীক; এই কারণেই লেখা হয়েছে- “ফুলের মতো গড়বো মোরা মোদের এই জীবন” এই ধরণের কবিতা। এককথায় ফুলের বিকাশের সাথে মানুষের জীবনের বিকাশকে তুলনা করা হয়েছে। পূর্ণ বিকশিত একটি পদ্মফুলের উপর সরস্বতীর বসে থাকার মানে হলো- সরস্বতীর আদর্শকে লালন করে নিজের জীবনকে বিকশিত করতে পারলে সেই জীবনও ফুলের মতোই পবিত্র, সুন্দর, বিকশিত ও সমৃদ্ধ হবে।স্বয়ং ঈশ্বর হলেও স্বরস্বতী নারী মূর্তি অর্থাৎ মাতৃমূর্তি, এর কারণ হলো- পিতার চেয়ে মায়ের কাছে কোনো কথা বলা সহজ বা কোনো কিছু চাওয়া সহজ। সরস্বতীর পূজারীরা যেহেতু সাধারণভাবে শিশু বা বালক-বালিকা অর্থাৎ শিক্ষার্থী, তাই তারা যাতে সহজে নিজের মনের কথা নিজের মনের আকুতি, দেবী মায়ের কাছে জানাতে পারে, এজন্যই সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে মাতৃরূপে। এখানে একটি ছোট্ট তথ্য দিয়ে রাখি, বৌদ্ধরাও সরস্বতী পূজা করে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেবী সরস্বতীই যদি একমাত্র জ্ঞানদাত্রী হয়, তাহলে যারা সরস্বতীর পূজা করে না, যেমন- মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা; তারা কি জ্ঞান অর্জন করে না ?বাংলাদেশে, প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, ১৬ ডিসেম্বর এবং ২৬ মার্চেও জাতীয় স্মৃতিসৌধেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়, ভারতসহ অনেক দেশেই এমনটা করা হয়, এটা আসলে একপ্রকার পূজা। কিন্তু এই ফুল পেয়ে, যারা মরে গেছে, তাদের কি কোনো উপকার হয় ? এক কথায়, না। তারপরেও আমরা প্রতিবছর ঐসব অনুষ্ঠানের আয়োজন কেনো করি ?আসলে এই সব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু তথ্য, নতুন প্রজন্মের স্মৃতিতে ট্রান্সফার করা হয়, আর তাদের মধ্যে সেই সকল ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা হয়, যারা দেশ ও জাতির জন্য কিছুনা কিছু করেছে ? এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ একটি পরম্পরা তৈরি করে, যা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। কারণ, এই একদিনের শ্রদ্ধাবোধ মানুষের মস্তিষ্ক্যে এমন একটি প্রভাব ফেলে যা তাকে ঐ পরম্পরাটি বয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।আমরা শ্রদ্ধাভরে যখন কোনো দেব-দেবীর পূজা করি, তখন আমাদের ব্রেইন এর মধ্যে ঠিক এমনই একটি প্রভাব কাজ করে, যে প্রভাবটি ঐ পূজা ব্যতীত কিছুতেই সৃষ্টি হতো না। ব্রেইন এর মধ্যে এই যে প্রভাব, সেটি আসলে কিভাবে আমাদেরকে সাহায্য করে ?কোয়ান্টাম মেথডের সূত্রানূসারে যখন আমরা কোনো কিছু মনে প্রাণে চাই এবং বার বার চাই, তখন ব্রেইন সেটা আমাদেরকে পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে সেভাবে পরিচালিত করা শুরু করে এবং আমাদের চারপাশে সেইরকম পরিবেশ তৈরি করে। এভাবে ব্রেইন অবচেতনভাবে কাজ করেই আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুর কাছে পৌঁছে দেয়। এজন্যই আমরা যেটা বার বার ভাবি বা করতে চাই, খুব অসম্ভব কিছু না হলে সেটা আমরা পেয়েই যাই । আমাদের সকল পূজা প্রতীকী হলেও, পূজার মাধ্যমে আমাদের ঐকান্তিক চাওয়া, আমাদের ব্রেইন আসলে সেভাবেই পূরণ করে দেয়। কারণ, দেব-দেবীর কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা মূলত আমাদের মস্তিষ্ক্যে সেই বিষয়টি লোড করে দিই বা মস্তিষ্ক্যকে সেই নির্দেশনা দিই, আর আমাদের মস্তিষ্ক্য আমাদেরকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করতে থাকে এবং এভাবেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাই।এটা শুধু হিন্দুদের পূজা প্রার্থনার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো ধর্মের লোক তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনা করলেও তার ব্রেইন এর মাধ্যমে সে একই ফল পায় বা পাবে। তো যে ছেলে বা মেয়েটা সরস্বতীর কাছে সরল বিশ্বাসে এই প্রার্থনা করছে যে- মা, আমাকে জ্ঞান দাও, বুদ্ধি দাও; এই চাওয়ার ফলে সরস্বতীর উছিলায় তার ব্রেইন তাকে এমনভাবে পরিচালিত করে, যার ফলে তার বাড়তি কিছু জ্ঞান-বুদ্ধি লাভ হবেই। কারণ, যে বিদ্যালাভের জন্য প্রার্থনা করবে, সে বই নিয়ে দু চারদিন বেশি বা দুই চার ঘন্টা বেশি পড়বেই, সরস্বতীর উছিলায় কাজ হয় বা হবে এভাবেই; একইভাবে যে লোক, ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করছে, লক্ষ্মীর উছিলায় তার ব্রেইনও সেই লোককে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়াবে যাতে তার ভালো রোজগার হতে বাধ্য।  মানুষ তাদের বিশ্বাসের দেব-দেবী বা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে মূলত তাদের নিজেদের ব্রেইনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় বা তাদের চিন্তার ফলই তাদেরকে ফল দেয়।পৃথিবীর সব ছাত্রই চায় ভালো রেজাল্ট করতে, এর জন্য তারা পড়াশুনার পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী কামনা করে যেন তার পড়াশুনা ভালো হয় এবং পরীক্ষার ভালো করতে পারে; কোনো অলৌকিক সত্ত্বার কাছে কোনো প্রার্থনা করলে ও তাদের মনের এই কামনাই তাদেরকে পৌঁছে দেয়।যে যার মতো অর্জন করতে পারে জ্ঞান।এখন বিজ্ঞানের এইসব নিগূঢ় তথ্য সবার পক্ষে জানা সম্ভব হয় না আর সাধারণ সব লোকের পক্ষে এটা বোঝাও সম্ভব নয়। যারা এই বিজ্ঞান জানে বা বোঝে, তারা লক্ষ্মী স্বরস্বতীর পূজা না করেও নিজেদের ব্রেইনকে কমান্ড করে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে বিজ্ঞানের এই জ্ঞান পৌঁছে নি বা যাদের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়, তারা সরল বিশ্বাসে জ্ঞান বুদ্ধির জন্য যদি সরস্বতীর কাছে এবং ধনের জন্য লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করে। উল্লেখযোগ্য যে, যেকোনো দেব-দেবীর কাছে পূজার নামে প্রার্থনা করতে হবে আপনার নিজেকে এবং এই প্রার্থনা করতে হবে অবশ্যই মাতৃভাষায়। পুরোহিতকে দিয়ে যদি বাড়িতে পূজা করিয়ে নেন, আর আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি সেই দেব-দেবীর কাছে কোনো প্রার্থনা না করেন, তাহলে সেই পূজা পুরোটাই বেকার, শুধুই অর্থ খরচ। এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, যেকোনো পূজার জন্য আমরা যতসব আয়োজন করি, সেটা ঐ পূজাটাকে একটা অনুষ্ঠানে রূপ দিতে সাহায্য করে মাত্র; ফুল-জল-বেলপাতা ঐ দেব-দেবীর প্রতি আত্মসমর্পনের একটা প্রসেস মাত্র; কারণ, একমাত্র আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিই পারে অহংকারমুক্ত হয়ে প্রকৃত অর্থে প্রার্থনা বা কামনা জানাতে। এ কারণে আমরা যদি কোনো পূজার আয়োজন না করেও শুধু দেব-দেবীর মূর্তি বা তাদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে প্রতিদিন প্রার্থনা করি, পূজার মতো একই ফল লাভ হবে, যে পদ্ধতিতে প্রার্থনা করে- ইসলাম, খ্রিষ্ট এবং ইহুদি মতাবলম্বীরা।


সুতরাং এই আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, হিন্দুধর্ম ও কালচারের কোনো কিছুই অযথা বা নিরর্থক নয়, সব কিছুরই সুষ্পষ্ট কারণ এবং তার কার্যকারিতা অর্থাৎ উপকারিতা রয়েছে; এই সব তথ্য যারা জানে না, সেটা তাদের দুর্বলতা, কিন্তু সনাতন তথা হিন্দুধর্মের কোথাও কোনো দুর্বলতা নেই।স্বরস্বতী পূজা না হওয়া পর্যন্ত অনেকে কূল বা বোরোই ফল খায় না। তিথির ফেরে স্বরস্বতী পূজা হয় কোনো বছর পৌষ মাসের শেষে, কোনো বছর মাঘের মাঝামাঝি, আবার কোনো বছর হয় মাঘ মাসের শেষে। যে বছর পূজা পৌষ মাসের শেষে বা মাঘ মাসের মাঝামাঝি হয়, সেই বছর পূজা শেষ করে কুল বা বোরোই হয়তো বাজারে বা গাছে পাওয়া যায়, কিন্তু যে বছর পূজা মাঘের শেষে হয় সেই বছর পূজা শেষে খাওয়ার জন্য কুল পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই সরস্বতী পূজা না করে বোরোই খাবো না, এই ধরণের প্রতিজ্ঞা করলে আপনি শুধু বোরোই ফলের পুষ্টি থেকে বঞ্চিতই হবেন, আর ফলের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়ে যদি নিজের মেধা কমান তাহলে সরস্বতী মাতা আপনার উপর কোনোভাবেই খুশী হবে না। তাই পূজা না করে বোরোই খাবো না, এই ধরণের প্রতিজ্ঞা করার কোনো দরকারই নেই; কারণ, বোরোই অন্য ফলের মতোই একটি ফল। যে মৌসুমে যে ফল পাওয়া যায়, সেই মৌসুমে অনুষ্ঠিত পূজায় সাধারণত সেই ফল প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয়, সরস্বতী পূজায় বোরোই দেওয়াও সেই রকমই একটি ব্যাপার, সরস্বতী পূজায় যে বোরোই দিতেই হবে এমন কোনো বিধি নিষেধও নেই, তাই সরস্বতী পূজা না করে বোরোই না খাওয়ারও কোনো যুক্তি নেই এবং এর কোনো প্রয়োজনও নেই। বোরোই যখন থেকে গাছে ধরবে বা বাজারে পাওয়া যাবে তখনই থেকেই খাওয়া শুরু করবেন, এতে বোরোই ফলের পুষ্টির কারণে যদি আপনার মেধা বুদ্ধি বৃদ্ধি পায়, তাহলেই দেবী সরস্বতী আপনার উপর খুশি হবেন। দেহে পুষ্টির অভাব থাকলে মেধার বিকাশ ঠিক মতো হয় না, আর এমন হলে বছরে প্রত্যেকদিন সরস্বতীর পূজা করেও আপনার লাভ ঘটবে না। তাই পাওয়া মাত্র ইচ্ছা মতো বোরোই খান, আর পূজার দিন উপবাস থেকে ভক্তি সহকারে সরস্বতী পূজা করুন, দেবী মাতা আপনার উপরে সন্তুষ্ট হবেন।


সরস্বতী পূজায় কূল না খাওয়া সম্পর্কে যে গল্পটি সম্প্রতি নেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খেয়াল করে দেখবেন তার কোনো শাস্ত্রীয় রেফারেন্স নেই। ব্যাসদেবের জন্মের আগে থেকেই কূল বা বদরিকা ফলের গাছে ঘেরা বদরিকা আশ্রম ছিলো, জন্মের পর ব্যাসদেব সেখানেই যান এবং শিক্ষা লাভ করেন, আর কেউ কূল গাছের নিচে বসে থাকলে তার মাথায় পাকা কূল পড়তেই পারে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। 


তাছাড়া সাধনায় সিদ্ধি লাভের নির্দিষ্ট কোনো সময় হয় না, কিন্তু কূল বীজ লাগানোর পর তা থেকে ফল পেকে মাটিতে পড়ার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। তাই কূল বীজ লাগানোর পর, সেই কূল বীজ থেকে গাছ হয়ে, তাতে ফল ধরে সেই ফল মাথায় পড়লে সাধনায় সিদ্ধি লাভ হবে ব'লে- ব্যাসদেব, সরস্বতী এবং কূল না খাওয়ার যে গল্প ফাঁদা হয়েছে, আসলে সেটা একটা মিথ্যা প্রচার। এত কম এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সাধানায় সিদ্ধি লাভ করা একটা গাঁজাখোরি কল্পনা মাত্র। 

---------------------------:--------------------------

Thursday, 24 August 2023

ভগবান ইশ্বর দেবতা

 ভগবান , ঈশ্বর ও দেবতা


ঐশ্বর্যস্য সমগ্রস্য বীর্যস্য যশসঃ শ্রীয়ঃ । 

জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষণ্ণং ভগ ইতীঙ্গনা ।


অনুবাদঃ- ঐশ্বর্য্য, বীর্য্য,  যশ,শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য এই ছয়টি গুণকে(ষড়ৈশ্বর্য) একত্রে বলা হয় "ভগ" ।


ষড়ৈশ্বর্য কে আরো ব্যাখ্যা করলে মূলত যা বুঝায় তা হলো


১। ঐশ্বর্য = সত্যভাষণাদি শ্রেষ্ঠ গুণাবলী।

২। বীর্য্য = ব্রহ্মতেজ অর্থাৎ ব্রহ্মচর্যের যথাযথ পালন দ্বারা লব্ধ তেজ বা বল।

৩। যশ = ধার্মিক ও বিদ্বানদের নিকট প্রশংসিত হওয়া।

৪। শ্রী = অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য অর্থাৎ চারিত্রিক শুদ্ধতা বা পবিত্রতা।

৫। জ্ঞান = বেদাদি সত্য শাস্ত্রের অধ্যয়ন ও গুরুকৃপায় লব্ধ বিদ্যা, যা দ্বারা সত্য-অসত্য, ধর্ম-অধর্ম, নিত্য-অনিত্য ইত্যাদির ভেদ নির্ণয় করা যায়।

৬। বৈরাগ্য = স্ত্রী, পুত্র, ধন, মান ইত্যাদি বিষয়ের অর্থাৎ জাগতিক সুখের প্রতি মোহ বা আকর্ষণ না থাকা।


জ্ঞানশক্তিবলৈশ্বর্যবীর্যতেজাংস্যশোষতঃ।

ভগবচ্ছব্দবাচ্যানি বিনা হেয়ৈর্গুণাদিভিঃ।।


“যিনি পরম ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য--এই ষড়ৈশ্বর্য গুনযুক্ত তিনিই "ভগবান" পদবাচ্য।”


ভাবার্থঃ- যেভাবে কোন ব্যক্তি জ্ঞান ধারণ করলে তাঁকে বলা হয় জ্ঞানবান, কোন ব্যক্তি বল ধারণ করলে, তাকে বলা হয় বলবান। অনুরূপভাবে, যে কোনো ব্যক্তি যদি উক্ত ষড়ৈশ্বর্য বা "ভগ" -কে সম্পূর্ণরুপে ধারণ করেন, তিনিই "ভগবান" পদবাচ্য।


অর্থাৎ ষড়ৈশ্বর্যকে পূর্ণভাবে ধারণ করে যে কোন মানুষই ভগবান হতে পারবেন। কিন্তু, তাই বলে কখনওই ঈশ্বর হতে পারবেন না। ঈশ্বর এই ছয়গুণে সীমাবদ্ধ নন। তাঁর গুণ অনন্ত।

দেখবেন রাম কৃষ্ণ এনাদের ভগবান বলা হয় কোনদিন শুনেছেন ঈশ্বর কৃষ্ণ ঈশ্বর রাম এমনকি ভগবান রামকে পুরুষোত্তম বলা হয়েছে। মানে পুরুষদের মধ্যে উত্তম।


ঈশ্বর


যজুর্ব্বেদ - ৩৩|৩১ 

"ইন্দ্রং মিত্রং বরুণ মগ্নি মাহু, রথো দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান

 একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্ত্যগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ"


👉ঋগ্বেদ - ১|১৬৪|৪৬ 

অনুবাদ : এক সত্তা পরব্রহ্মকে জ্ঞানীরা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য, সুপর্ণ, গরুৎমান, যম, মাতরিশ্বা আদি বহু নামে অভিহিত করেন ।


ইশাবাস্যমিদ্ঁ সর্বম্ য়ত্কিঞ্চ জগত্যাম্ জগত্"

(য়জু০ ৪০|১)

অর্থাৎ - সেই ঈশ্বর এই সম্পূর্ণ জগতে ব্যাপ্ত হয়ে তাকে আচ্ছাদিত করে আছে।


ঈশ্বর তত্বের পরিভাষা করে মহর্ষি পতঞ্জলি জী বলেছেন -

"ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ"

(য়োগ দর্শন ১|২৪)

অর্থাৎ - অবিদ্যাদি ক্লেশ, পাপ-পুণ্য আদি কর্ম এবং তার ফল, বাসনা হতে পৃথক্ পুরুষ অর্থাৎ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডে  ব্যাপ্ত বিরাজমান চেতন তত্বটিকে ঈশ্বর বলে।


পরমাত্মা অর্থাৎ ঈশ্বর  জন্ম নেন  না, এবং মৃত্যু প্রাপ্তও হোন না🙏


♦️স পৰ্য্যগাচ্ছুক্রমকায়মব্রণমস্নাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্ কবিৰ্মনীষ। 

পরিভূঃ স্বয়ম্ভূর্যাথাতথ্যতোহর্থান্ব্যদধাচ্ছাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।।---যজুর্বেদ ৪০/৮


পদার্থঃ- (সঃ) পরমাত্মা (পরি) সব দিক হইতে (অগাৎ) ব্যাপ্ত আছেন (শুক্রম) সর্ব্বশক্তিমান (অকায়ম্) শরীর রহিত (অব্রণম্) ছিদ্র রহিত (অস্নাবিরম) স্নায়ু আদির বন্ধন রহিত (শুদ্ধম) দোষ রহিত (অপাপবিদ্ধম) পাপরহিত (কবিঃ) সৰ্ব্বজ্ঞ (মনীষি) অন্তর্যামী (পরিভূঃ) দুষ্টের দমন কর্তা (স্বয়ম্ভূ) জন্ম রহিত (যথাতথ্যতঃ) যথাযথভাবে (অর্থান্) সর্ব পদার্থের (বি) বিশেষ রূপে (অদধাৎ) বিধান করিয়াছেন (শাশ্বতীভ্যঃ) বিনাশ রহিত (প্রজাভ্যঃ) প্রজাদের জন্য।--যজুর্বেদ ৪০/৮


বঙ্গানুবাদঃ- পরমাত্মা সর্বব্যাপক, সর্বশক্তিমান, শরীর রহিত, রোগ রহিত, জন্ম রহিত, শুদ্ধ, নিষ্পাপ, সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, দুষ্টের দমন কর্তা ও অনাদি। তিনি তাহার শাশ্বত জীবের জন্য যথাযথ ফলের বিধান করেন।


#সনাতন_ধর্মে_দেব_দেবী_কত_প্রকার❓


"অষ্টৌ বসব একাদশ রুদ্রা দ্বাদশদিত্যাস্ত একত্রিংশদিন্দ্র

শ্চৈব প্রজাপতিশ্চ ত্রয়ত্রিংশা চিতি"

=[] বৃহদারন্যকোপনিষদ ৩/৯/২ []=


#অর্থাৎ - অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য এই কয় জন মিলিয়া একত্রিশ এবং ইন্দ্র ও প্রজাপতি মিলিয়া তেত্রিশ দেব ।


"ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভূতান্য শাম্যন্ প্রজাপতিঃ-

পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসীৎ"

=[] যজুর্বেদ ১৪/৩১ []=


#অর্থ : প্রকৃতির শাসক, প্রজার পালক সর্ব্বব্যাপক, সর্ব্বাধিপতি পরমাত্মার তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীল কর ।


‌৮ বসু ,১১ রুদ্র ,১২ আদিত্য ,ইন্দ্র ও প্রজাপতি এই হলো আমাদের তেত্রিশ টি দেবতা।


#এই ৩৩ টি দেবতার ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলোঃ-

৮ বসু কাকে বলে ও কি কি ?


উত্তর:- নিখিল পদার্থ এই সবের মধ্যেই আছে

তাই এদের বসু বলা হয়।


অগ্নিশ্চ পৃথিবীশ্চ বায়শ্চান্তিরিক্ষং চাদিত্যশ্চ দ্যৌশ্চ চন্দ্রমাশ্চ নক্ষত্রাণি চৈত্রে বসব

=[] বৃহদারন্যকোপনিষদ ৩/৯/৩ []=


#অর্থ : অগ্নি, পৃথিবী, বায়ু, অন্তরিক্ষ, আদিত্য, দ্যুলোক ,চন্দ্র, নক্ষত্র সকল ইহারা অষ্ট বসু ।


৮ টি বসু হলো:-


১ ) পৃথিবী

২ ) জল

৩ ) অগ্নি

৪ ) বায়ু

৫ ) আকাশ

৬ ) চন্দ্রমা

৭ ) সূর্য

৮ ) নক্ষত্র সমূহ

১১ রুদ্র কাকে বলে ও কি কি ?


#উত্তর : "দশমে পুরুষো প্রাণা আত্মৈকাদশন্তে"

=[] বৃহদারন্যকোপনিষদঃ ৩/৯/৪ []=


#অর্থ : পঞ্চ প্রাণ এবং পঞ্চ উপ প্রাণ এই দশ এবং এক জীবাত্মা মিলে একাদশ রুদ্র ।


#একাদশ রুদ্র গুলো হল :-

১: প্রাণ

২: অপান

৩: ব্যান

৪: উদান

৫: সমান

৬: নাগ

৭: কূর্ম

৮: কৃকল

৯: দেবদত্ত

১০: ধনঞ্জয়

১১: জীবাত্মা

#এই ১১টি দেহান্তকালে রোদন করে অর্থ্যাৎ এই ১১ টি সত্ত্বা যখন একটি মনুষ্যের দেহ থেকে বেরিয়ে যায় তখন সেই ব্যক্তির মৃত্যু হয় ফলে সবাই কান্না অর্থ্যাৎ রোদন করে ওঠে বলে ইহা দিগকে রুদ্র বলে ।


#দ্বাদশ আদিত্য কাকে বলে ও কি কি ?


#দ্বাদশ উত্তর : "দ্বাদশ বৈ মাস"

=[] বৃহদারন্যকোপনিষদ ৩/৯/৫ []=


অর্থ : বৎসরে বার মাস ১২ আদিত্য ।

#দ্বাদশ আদিত্য গুলো হলো-

১ ) চৈত্র

২ ) বৈশাখ

৩ ) জৈষ্ঠ

৪ ) আষাঢ়

৫ ) শ্রাবন

৬ ) ভাদ্রপদ

৭ ) আশ্বিন

৮ ) কার্ত্তিক

৯ ) মার্গশীর্ষ

১০ ) পৌষ

১১ ) মাঘ

১২ ) ফাল্গুন!!


১২ টি আদিত্য:- ১২ মাস সকলের আয়ু হরণ করে বলে এই সকলকে আদিত্য বলে পরম ব্রহ্ম ওম্!!

পরম পিতা  পরমেশ্বর সৃষ্টি উৎপত্তি সঙ্গে বেদ জ্ঞান প্রদান করলেন এবং সমস্ত সৃষ্টির কল্যাণ হেতু যজ্ঞের সৃষ্টি করলেন  ।পৃথিবীর সর্বপ্রকার উন্নতির মূলে যজ্ঞ। যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি যজ্ঞকে শ্রেষ্ঠতম কর্ম বলে অভিহিত করেছেন। পৃথিবীর যা কিছু কল্যাণমূলক কর্ম সে সবকে যজ্ঞ বলে। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী পঞ্চ মহাযজ্ঞের কথা বলেছেন ব্রম্ভযজ্ঞ, দেবযজ্ঞ (অগ্নিহোত্র )বলিবৈশ্বদেব যজ্ঞ,  পিতৃ যজ্ঞ, অতিথি যজ্ঞ,  যদি পৃথিবীর সমস্ত নর নারী এই পাঁচটি যজ্ঞ নিয়মিত  করে তাহলে পৃথিবীতে কোন রোগ শোক ,দুঃখ থাকেনা। এই পঞ্চ মহাযজ্ঞের  মধ্যেে  দেব যজ্ঞ বা অগ্নিহোত্র শ্রেষ্ঠ কেননা এই যজ্ঞে মনুষ্য ঘৃত, ঔষধি,সমীদা, সময়, বুদ্ধি ইত্যাদি দ্বারা নিজের ও সকলের উন্নতি আহুতি প্রদান করেন। এই অগ্নিহোত্র দ্বারা আমাদের সকলের শারীরিক আত্মিক ও সামাজিক দুঃখের নিরস এবং সবাই সুখ প্রাপ্ত হয়।

জগৎপিতা সৃষ্টিকর্তা পরমব্রহ্ম চিন্তা করলেন যে শ্বাস প্রশ্বাস দ্বারা এই বায়ুমণ্ডল অন্যান্য দুর্গন্ধযুক্ত ক্রিয়া দ্বারা এবং জলকে বিভিন্ন দূষিত করছে । তিনি সৃষ্টির আদিতে অগ্নি ,বায়ু, অঙ্গীরা,আদিত্য ঋষিদের মাধ্যমে মানব কল্যাণ হেতু বেদের অবতারণা করলেন এবং যজ্ঞ নামক কর্মের উপদেশ দিলেন । যজ্ঞ দ্বারা সমস্ত দেবতাদের সন্তুষ্ট  করার উপায়  ।যজ্ঞ থেকে উদ্ধিত সুগন্ধি ধোঁয়া অন্তরীক্ষে উপরে দ্যুলোক পৌছে যায়।বর্তমানে যজ্ঞ নিয়ে সারা বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন এবং তারা দেখতে পেয়েছেন যে যজ্ঞ করলে পরিবেশ শুদ্ধ হয় ক্ষতিকারক রোগ জীবাণু  ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। তার সাথে মানুষের মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি। মদ্যপানের নেশাও ত্যাগ করাতে পারে । বিভিন্ন  রোগের উপকার করে  যেমন সুগার ,থাইরয়েড, প্রেসার,ক্যান্সার। কৃষিকাজের উপকার হয়।


🕉সনাতন বৈদিক ধর্ম প্রচারে আমাদের বৈদিক চেতনা সংগঠনে আপনারা যুক্ত হতে পারেন।   আমাদের এই সংগঠনের কার্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই ।

১ সনাতন বৈদিক ধর্মের আমাদের যে জ্ঞান সেই জ্ঞান আমরা বিভিন্ন গ্রামের  মানুষকে দেব 

২ সনাতন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করে  আপনারাও আপনার এলাকার শিশুদেরও শিক্ষা দিতে পারেন যেমন ঈশ্বরের মূখ্য নাম 🕉 জপ , ঈশ্বর উপাসনা স্তুতি প্রার্থনা মন্ত্র ,গায়ত্রী মন্ত্র, মহা মৃত্যুঞ্জয় ,ধ্যান বা মেডিটেশন ,যোগ,আয়ুর্বেদ ।

৩ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে গায়ত্রী মন্ত্র শেখানো। 

৪ বৈদিক পরম্পরা যজ্ঞ শেখানো এবং প্রতিটি বাড়িতে যজ্ঞ করানোর জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা  

৫ গুরুকুল , গোশালা । সঠিকভাবে গুরুকুল শিক্ষায় শিক্ষিত যুবসমাজ ভারতবর্ষকে বিশ্বগুরু সনাতন ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। 

৬ দুস্থ ,অসহায় মানুষদের সেবা কাজ

৭সনাতন ধর্মের মূল গ্রন্থ বেদের উপর আলোচনা ও  প্রচার।

৮ শুদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ ক্রয় করতে পারেন আমরা ব্যবস্থা করে দেব

৯ ক্রিশ্চান মিশনারীদের যীশুবাবার নাম দিয়ে বিভিন্নভাবে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে সনাতন ধর্মের মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

১০ প্রকৃতিক পরিবেশ বাঁচাতে উদ্যোগ নেব।  

যদি আমাদের সংগঠনে যুক্ত হতে চান যোগাযোগ করবেন।

অনলাইনে যুক্ত থাকতে

আমাদের ফেসবুক পেজ ও  ইউটিউব চ্যানেল 

বৈদিক চেতনা /vaidic chetana


95641 56505,8145524726

এগুলি  লিফলেট আকারে আমরা 

সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা পেলে কোন সনাতন ধর্মের মানুষ নিজের ধর্ম ছেড়ে ধর্মান্তরিত হবেনা। তাই সবাইকে চেষ্টা করতে হবে সনাতন ধর্মকে জেনে আরো কিছু মানুষকে নিজের সনাতন ধর্ম সম্পর্কে সচেতন করা এটা সবার কর্তব্য।🙏🙏🙏


পুজো কমিটিকে আমাদের অনুরোধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় গান , বিভিন্ন মন্ত্র যেমন মহামৃত্যুঞ্জয় ,গায়ত্রী, হনুমান চালিশা, গীতার বাণী মাইক এ চালান।

মন্ত্র শুনলেও আপনাদের জীবনে   মানসিক শান্তি ও আনন্দ পাবেন।


ওম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ

 


যারা ভাবেন সে ধর্মে ধর্মে লড়াই হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ ভুল কারণ ধর্ম বলে যেগুলোকে ভাবছেন সেগুলো হচ্ছে মাজহাব বা রিলিজিয়ান এগুলি মানুষের তৈরি মত ।একমাত্র সনাতন বৈদিক হলো ধর্ম।🕉 

 *মনুর্ভব জনয়া দৈবং জনম্।

(ঋগ্বেদ ১০/৫৩/৬) 

অর্থঃ প্রকৃত মানুষ হও এবং অন্যকেও মানুষ হিসেবে গড়ে তোল।*


🔸পবিত্র বেদ;  আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমাদের আচরণ ও কার্যবিধি কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে সকল মানবজাতির সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করছি বৈদিক জীবনাচরণ পদ্ধতির সারমর্ম পবিত্র বেদের  কিছু মন্ত্র ও মন্ত্রাংশের ভাবানুবাদ। 🍂


🔸. একজন বৈদিকের প্রথম  লক্ষ্য থাকা উচিত তার চারিত্রিক উন্নয়ন।


ওঁ বিশ্বানি দেব সবিতর দুরিতানি পরাসুব।

যদ্ভদ্রং তন্ন আ সুব।।

(যজুর্বেদ ৩০.৩)

ভাবানুবাদ- হে পরমেশ্বর,আমি যাতে আমার খারাপ গুণসমূহ বর্জন করতে পারি এবং সদগুণ সমূহকে আয়ত্ত্ব করে নিজ চরিত্রের  উন্নতি ঘটাতে পারি।


🔸.  মাহিরভূর্মা পৃদাকুর নমস্ত

আতানানর্বা প্রেহি

(যজুর্বেদ ৬.১২)

অর্থাৎ হে মনুষ্য,হিংস্র বা উগ্র হয়ো না। নমনীয় ও সত্যনিষ্ঠ জ্ঞানী হও।


🔸. ম ভ্রাতা ভ্রাতরম্ অরত্যহ অথ

(অথর্ববেদ ৩.৩০.৩)

অর্থাৎ   ভাই-ভাই,ভাই-বোন এবং একজন আরেকজনের সাথে কখনো বিবাদ করোনা, কখনো অন্য কারো ক্ষতি করার চেষ্টা করোনা।


🔸.মিত্রস্যাহং চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে

  (যজুর্বেদ ৩৬.১৮)

অর্থাৎ সকল জীবকে মিত্রের চোখে দেখবে।


🔸.গরীব-দুঃখী ও বিপদগ্রস্তদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা বৈদিক ধর্মালম্বীর কর্তব্য।


শত হস্ত সমাহার,সহস্র হস্ত সং কীর

(অথর্ববেদ ৩.২৪.৫)

অনুবাদ-আয় করতে হাতটিকে শতটিতে বৃদ্ধি করো আর দান করতে তাকে সহস্রে রূপান্তরিত করো।


"সামর্থ্যবানদের উচিত গরীবদের দান করা।তাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া উচিত,মনে রাখা উচিত অর্থসম্পত্তি চিরস্থায়ী নয়।রথের চক্র যেমন উৰ্দ্ধাধোভাবে ঘূর্ণিত হয়, তদ্রূপ ধন কখন এক ব্যক্তির নিকট, কখন অপর ব্যক্তির নিকট গমণ করে, অর্থাৎ এক স্থানে চির কাল থাকে না!"

(ঋগ্বেদ ১০.১১৭.৫)


কেবলাঘো ভবতী কেবলাদী,যে দরিদ্রকে অভুক্ত রেখে নিজে ভোজন করে সে প্রকারান্তরে পাপ ই ভোজন করে।

(ঋগ্বেদ ১০.১১৭.৬)


🔸.জলদূষণ,বায়ুদূষণ,মাটি দূষণ করবেন না-


মাপোমৌস্রাদ্ধিহিন্স্রী

(যজুর্বেদ ৬.২২)

অর্থাৎ পুকুর,নদী,খাল,বনাঞ্চল এসব দূষিত বা ধ্বংস করোনা।


"বায়ুতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকি,একে দূষিত

করোনা।"

(যজুর্বেদ ৬.২৩)


পৃথ্বীম মা হিন্সিম অর্থাত্ মাটির দূষন

করোনা।

(যজুর্বেদ ১৩.১৮)


🔸.তেন ত্যাক্তেন ভূঞ্জীথা মা গৃধ কস্য স্বিদ্ধনম

(যজুর্বেদ ৪০.১)

অর্থাৎ পরের ধনে কখনো লোভ করোনা,ত্যাগের আদর্শ বজায় রেখে ভোগ করো।


🔸.যেকোন ধরনের অশ্লীলতা বৈদিক ধরমালম্বীদের জন্য বর্জনীয়-


অধঃ পশ্যস্ব মোপরি সন্তরাং পাদকৌ হর।

মা তে কশপ্লকৌ দৃশন্ স্ত্রী হি ব্রহ্মা বভূবিথ।।

(ঋগ্বেদ, ৮/৩৩/১৯)


অর্থাৎ, হে পুরুষ ও নারী,তোমরা ভদ্র ও সংযত হও,দৃষ্টি অবনত রাখো,পোশাক-পরিচ্ছেদ ও আচরণে অশ্লীলতা ও অসভ্যতা বর্জন করো।

(ঋগ্বেদ ৮.৩৩.১৯)


🔸.অশ্লীল কথা না বলা,শোনা বা দেখা নিয়ে পবিত্র বেদ এর উপদেশ


ওঁ ভদ্রং কর্ণেভি শৃনুয়াম

দেবা ভদ্রংপশ্যেমাক্ষ ভির্যজত্রা।

স্থিরৈরঙ্গৈস্তস্টুবাঁ সস্তনুভির্ব্যশে ম

দেবহিতং যদায়ুঃ।।

(যজুর্বেদ ২৫/১১)


অর্থাৎ, হে ঈশ্বর,আমরা যেন তোমার যজন করি,কান দিয়ে শ্লীল ও মঙ্গলময় কথাবার্তা শুনি,চোখ দিয়ে শ্লীল ও মঙ্গলময় দৃশ্য দেখি।তোমার আরাধনাতে যে আয়ুস্কাল ও সুদৃড় দেহ প্রয়োজন তা যেন আমরা প্রাপ্ত হই।


🔸. দেবানাম ভদ্রা সুমতির্ঋজুযতাং.... দেবানাং সখ্যামুপ...

(ঋগ্বেদ ১.৮৯.২)

অর্থাৎ বিদ্বান ও সচ্চরিত্র লোকেদের সাথে বন্ধুত্ব করো,দুশ্চরিত্রদের অসৎদের বর্জন করো।


🔸.কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভাগ্যকে গড়ে তোল-


অয়ং মে হস্তো ভগবানয়ং...

আমার এক হাতে কর্ম,অপর হাতে বিজয়

(ঋগ্বেদ ১০.৬০.১২)


🔸.তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু

(যজুর্বেদ ৩৪.১)

অর্থাৎ সর্বভূতের কল্যাণের মহৎ চিন্তায় নিজের মনস্থির করো।


🔸.সত্যবাদ্যতি ত্বং সৃজন্তু

(অথর্ববেদ ৪.১৬.৬)

অর্থাৎ নিজেকে সত্যবাদী হিসেবে সৃজন করো।


🔸.একজন বৈদিক ধর্মালম্বী সর্বভূতে সমদর্শী হবে।তার জন্যে কেউ ছোট নয়,কেউ বড় নয়।সকলেই এক অমৃতের সন্তান,সকলেই ভাই ভাই।


অজ্যেষ্ঠাসো অকনিষ্ঠাস

এতে সং ভ্রাতারো তাবৃধুঃ সৌভগায়

যুবা পিতা স্বপা রুদ্র

এযাং সুদুঘা পুশ্নিঃ সুদিনা মরুদ্ভঃ ॥

(ঋগবেদ ৫.৬০.৫)


বঙ্গানুবাদ : মানুষের মধ্যে কেহ বড় নয়, কেহ ছোট নয়।

ইহারা ভাই ভাই । সৌভাগ্য লাভের জন্য ইহারা প্রযত্ন করে । ইহাদের পিতা তরুণ শুভকর্ম ঈশ্বর এবং মাতা জননীরূপ প্রকৃতি। পুরুষার্থী সন্তানমাত্রই সৌভাগ্য প্রাপ্ত হন।


🔸.একজন বৈদিকের সপ্ত মর্যাদা-


সপ্ত মর্যাদা কবয়স্তস্তক্ষুস্তাসামেকামিদভ্যয়হুরো গাত্।।

(ঋগ্বেদ ১০.৫.৬)

"সপ্ত হল নিষেধসমূহ যা নির্দেশিত হয়েছে,জ্ঞানীগণ যাকে সবসময় এড়িয়ে চলেন,যেগুলো মানুষকে সর্বদাই বিপথগামী করে।"


কী সেই সপ্ত মহাপরাধসমূহ? মহর্ষি যাস্ক তাঁর নিরুক্ত সংহিতায় বর্ননা করেছেন,

"চুরি,অশ্লীলতা ও ব্যভিচার,হত্যা,ভ্রুণনিধন,অগ্নিসংযোগ,নেশা/ মদ্যপান,অসততা।"


🔸.বৈদিক ধর্ম মানবতার ধর্ম। এখানে কোন ধরনের অস্পৃশ্যতা প্রথার কোন সুযোগ নেই-


সমানী প্রপা সহ বোরন্নভাগঃ সমানে যোক্ত্রে সহ বো যুনজ্মি।

সমঞ্চোহগ্নিং সযপর্যতারা নাভিমিবাভিতঃ।।

(অথর্ববেদ ৩.৩০.৬)


অর্থাৎ,হে মনুষ্যগণ তোমাদের ভোজন ও আহার হোক একসাথে,একপাত্রে, তোমাদের সকলকে এক পবিত্র বন্ধনে যুক্ত করেছি,তোমরা সকলে এক হয়ে পরমাত্মার উপাসনা(যজ্ঞাদি,ধ্যান) করো ঠিক যেমন করে রথচক্রের চারদিকে অর থাকে!


🔸. সকল মানব একতাবদ্ধ হও,সকলে একসাথে পরস্পর মিত্র হও,সকলের মন,চিত্ত এক হোক,সকলে সুখী হোক।


(ঋগ্বেদ, মন্ডলঃ ১০, সুক্তঃ ১৯১,মন্ত্র ২,৩,৪)


সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।

দেবাভাগং য়থাপূর্বে সং জানানা উপাসতে।।২।।


অর্থঃ- প্রেমপূর্বক চল সবাই, যেন মোরা জ্ঞানী হই।

পূর্ব্বজ বিদ্বানদের অনুসরণে, কর্তব্য পালনে ব্রতী হই।।


সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।

সমানং মন্ত্রমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি।।৩।।


অর্থঃ- হোক মতামত সমান সবার, চিত্ত-মন সব এক হোক। একই মন্ত্রে যুক্ত সকলে, ভোগ্য পেয়ে সবে তৃপ্ত হোক।।


সমানী ব আকুতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।

সমানমস্তু বো মনো য়থা বঃ সু সহাসতি।।৪।।


অর্থঃ- হোক সবার হৃদয় তথা সংকল্প অবিরোধী সদা। মন ভরে উঠুক পূর্ণপ্রেমে, বৃদ্ধি হোক সুখ সম্পদা।।


▪️বৈদিক জীবনবিধি মেনে চলুন, মানব জীবনকে মহৎ, সুন্দর, শান্তিময় একটি ধরণী গড়ে তুলুন।🌸

Monday, 7 August 2023

তাজমহল।

 ইতিহাসে পড়ানো হয়েছে যে 1632 সালে তাজমহলের নির্মাণ কার্য শুরু হয়েছিল, আর প্রায় 1653 সালে এই নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ হয়েছিল, এবার ভাবুন মমতাজের মৃত্যু 1631 সালে হয়েছিল, তাহলে কি করে 1631 সালেই মুমতাজকে তাজমহলে কবর দেওয়া হল..? যখন তাজমহল তো 1632 সালে  সালে তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল..!! এইসব মিথ্যা ও মনগড়া কথা কাহিনী ইংরেজ ও মুসলিম ইতিহাসবিদরা, 18 শতাব্দীতে লিখে গেছে, আসলে 1632 সালে হিন্দু মন্দিরকে ইসলামী লুক দেওয়ার কাজ শুরু হয়, 1649 সালে এই শৈব মন্দিরের মুখ্য দরজায় কোরানের আয়াত খোদাই করে লেখা হয়, এই মুখ্য দারের ওপরে হিন্দু স্থাপত্যের নিদর্শন স্বরূপ ছোট গম্বুজের আকারে একটি মণ্ডপ আছে, এটি সৌন্দর্য বাড়ায়, চারিপাশে মিনার স্থাপন করা হয়েছে আর সামনে ফোয়ারা পুনরায় তৈরি করা হয়েছে, "J, A, MANDELSLO" মমতাজের মৃত্যুর 7 বছর পর তার ব্যক্তিগত পর্যটন বৃত্তান্তের পুস্তক "Voyages and Travels into East India" তে আগ্রার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তাজমহলের নির্মাণ কার্য নিয়ে কোন কথা উল্লেখ করেন নি, "টমহার্নিয়ের" বক্তব্য অনুযায়ী যদি 20 হাজার মজদুর 22 বছর পর্যন্ত তাজমহলের নির্মাণ কার্য করেছিল তাহলে "MANDELSLO" নিশ্চয়ই তার পুস্তকে তাজমহলের এই নির্মাণ কার্যের কথা উল্লেখ করতেন, তাজমহলের নদীর দিকের কাঠের দরজার একটি কাঠের টুকরো আমেরিকার ল্যাবরেটরীতে কার্বন টেস্ট করা হয়েছিল, এই কার্বন টেস্ট এর ফলে জানা যায় যে ওই কাঠের টুকরোটি সম্রাট শাহজাহানের সময়কালের থেকে 300 বছর পূর্বের, কারণ তাজমহলের দরজাকে 11তম শতাব্দী থেকে মুসলিম আক্রমণকারীদের দ্বারা অনেকবার ভেঙে খোলা হয়েছে এবং আবার বন্ধ করার জন্য অন্য দরজা লাগানো হয়েছে, তাজমহল আরো পুরনো হতে পারে, কারণ এই তাজমহল যাকে আমরা তেজোমহালয় বলি এই তেজোমহালয় সাল 1115 তে বানানো হয়েছিল, অর্থাৎ শাহজাহানের সময়কালে থেকে প্রায় 500 বছর পূর্বে বানানো হয়েছিল, তাজমহলের উপরে যে অষ্টধাতুর কলসটি রয়েছে সেটি সম্পূর্ণ ত্রিশূলের আকারে একটি ঘট, তার মধ্য দন্ডের শিখরভাগের আকৃতি একটি নারকোলের মতন, নারকোলের তলায় দুটি ঝুঁকে থাকা আমের পাতা আর তার নিচে কলসটিকে দেখানো হয়েছে, চন্দ্রাকারের দুটি বিন্দু এবং তার মধ্যভাগে নারকোলের উপরিভাগ মিলে ত্রিশূল আকারের মতো দেখতে লাগে, হিন্দু আর বৌদ্ধ মন্দিরের ও এইরকম কলস দেখতে পাওয়া যায়, কবরের উপরে যে গম্বুজ আছে তার মধ্যভাগে একটি অষ্টধাতুর শিকল ঝুলে রয়েছে, শিবলিঙ্গর ওপর জল ঢালার জন্য স্বর্ণ কলস এই অষ্টধাতুর শিকল দিয়ে ঝোলানো থাকতো, এইখানেই লর্ড কার্জন একটি বাতি লাগিয়ে দিয়েছিল যেটা আজও আছে, "কবরস্থান"কে "মহল" কেন বলা হয়েছিল, "মকবরা" বা "সমাধি"কে কেন মহল বলা হয়েছিল, এটা নিয়ে কেউ কি ভেবেছিল, কারণ আগের থেকে নির্মিত একটি মহলকে কবরস্থানে বদলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কবরস্থানে বদলে দেওয়ার সময় তার নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি, এই জায়গাতেই শাহজাহান ভুল করে গেছে, ওই সময়ের কোন সরকারি অথবা শাহী দস্তাবেজ অথবা খবরের কাগজে "তাজমহল" শব্দটির কোন উল্লেখ ছিল না, "মহল" শব্দটি কোন মুসলিম শব্দ নয়, আরব, ইরান, আফগানিস্তান প্রভৃতি জায়গায় এমন কোন মসজিদ অথবা কবরস্থান নেই যাদের নামের পরে এই "মহল" শব্দটি বসানো হয়েছে, যদি কেউ মনে করে এটার নাম ছিল "মমতাজ মহল" তাহলেও এটা ভুল বলা হবে কারণ শাহজাহানের বেগমের নাম ছিল "মমতাজ উল জামানি", যদি মমতাজের নামে এই নাম রাখা হয়েছিল তাহলে "মমতাজমহলের" আগে থেকে "মম"কে সরিয়ে "তাজ" বসিয়ে দেবার কোন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না, "ভিসেন্ট স্মিথ" তার লেখা "AKBAR THE GREAT MUGHAL" পুস্তকে লিখেছেন যে 1530 সালে আকবর আগ্রার উদ্যান সংলগ্ন মহলে তার বর্বর জীবন থেকে মুক্তি লাভ করেন, উদ্যান সংলগ্ন ওই মহলই তাজমহল ছিল, এটা এত বিশাল আর চমৎকার ছিল যে এর মতন মহল ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয়টি ছিল না, বাবরের কন্যা "গুলবদন" তার ঐতিহাসিক বিবরণীতে লিখেছেন যে"তাজ" সব সময় একটি "রহস্যময় মহল", তাজমহলের নির্মাণ রাজা "পরমারদিদেবের" শাসনকালে 1155 সালে অশ্বিনী শুক্লা পঞ্চমীতে রবিবার হয়েছিল, পরে মহম্মদ ঘোরী ও আরো অনেক মুসলিম লুটেরা, আক্রমণকারীরা তাজমহলের মুখ্য দরজা ভেঙে অনেকবার লুটেছিল, সেই মহল আজকের তাজমহল থেকে কয়েকগুণ বড় ছিল, এর তিনটি গম্বুজ ছিল, হিন্দুরা আবার পুনরায় তাজমহলকে সংস্কার করে কিন্তু বেশি দিন তারা এই মহলকে রক্ষা করতে পারে নি, "বাস্তুশাস্ত্র" নামক বিখ্যাত গ্রন্থে এই মহলের শিবলিঙ্গকে "তেজ লিঙ্গ" নামে বর্ণনা করা হয়েছে, তাজমহলে "তেজ লিঙ্গ" প্রতিষ্ঠিত ছিল সেই জন্য আমরা তাজমহলকে "তেজোমহালয়" নামে পড়েছি এবং জানি, সম্রাট শাহজাহানের সময় ইউরোপ দেশ থেকে আগত অনেক লোকেরাই এই মহলকে তাজ-এ-মহল নামে বর্ণনা করেছেন, যেটা শিব মন্দিরের পরম্পরাগত সংস্কৃত নাম "তেজোমহালয়" নামের সাথে মিল খায়, এর বিরুদ্ধে শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেব খুব সাবধানে পরম্পরাগত সংস্কৃত শব্দ না বসিয়ে সেই জায়গায় "মকবরা" অর্থাৎ সমাধি শব্দটির প্রয়োগ করেছিল, লেখক "পুরুষোত্তম নাগেশ ওকের" বক্তব্য অনুসারে হুমায়ুন, আকবর, মমতাজ, ইতমাতুদুল্লাহ, আর সফদরজঙ্গের মত শাহী ও দরবারেের আমলা লোকেদের সব সময়ই হিন্দু মহল বা মন্দিরে কবর দেওয়া হতো, তাজমহল হল তেজোমহালয় শিব মন্দির, এটা নিশ্চিত রূপে স্বীকার করতে হবে যে তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে তেজোমহালয়ের মন্দিরে মমতাজের মৃতদেহ কবর দেয়া হয়েছিল তার ওপর নিশ্চিত রূপে এই তাজমহল তৈরি করা হয়, তাজমহল শব্দটি হল তেজোমহালয়ের শব্দের অপভ্রংশ শব্দ যেটা শিব মন্দিরের ইঙ্গিত দেয়, তেজো মহালয় মন্দিরে "অগ্রেশরম মহাদেব" প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, লক্ষ্য করার মতন বিষয় হলো যে ভূগর্ভস্থ ঘরে যেখানে মমতাজকে সমাধিস্থ করা হয়েছে সেখানে শুধু শ্বেত পাথর লাগানো রয়েছে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ ঘরটির ছাদে ও দেয়ালে লতাপাতার কারুকার্য অংকন করা রয়েছে, এতে প্রমাণিত হয় যে মমতাজের সমাধিস্থ কামরাটিই হল মহাদেবের গর্ভগৃহ, শ্বেত পাথরের মধ্যে 108 টি কলস চিত্রিত আছে, হিন্দু ধর্মের পরম্পরা 108 সংখ্যাটিকে পবিত্র মানা হয়, তেজোমহালয় ওরফে তাজমহলকে "নাগনাগেশ্বর নাথ" নামেও বলা হত, কারণ মন্দিরের শিবলিঙ্গের জল প্রবাহের জায়গাটিকে নাগ বেষ্টনী দ্বারা বানানো হয়েছিল, এই মন্দির বিশাল আকারের মহল নিয়ে তৈরি ছিল, আগ্রাকে প্রাচীন কালে "অঙ্গীরা" বলা হতো, কারণ এটি "ঋষি অঙ্গীরার" তপভূমি ছিল, ঋষি অঙ্গীরা শিবের উপাসক ছিলেন, অনেক প্রাচীনকাল হইতেই আগ্রাতে পাঁচটি শিব মন্দির ছিল, এখানকার অধিবাসীরা প্রাচীনকাল থেকেই এই মন্দিরগুলিতে গিয়ে ভগবানের দর্শন ও পূজা করতেন, কিন্তু বর্তমানে কয়েক শতাব্দী ধরে শুধুমাত্র যথাক্রমে "বালকেশ্বর", "পৃথ্বীরাজ", "মনকামেশ্বর", ও "রাজরাজেশ্বর" নামক চারটি মন্দিরই অবশিষ্ট আছে, পঞ্চম শিব মন্দিরটি অনেক শতাব্দী আগে কবরস্থানে বদলে ফেলা হয়েছে, এটা নিশ্চিত রুপে যে ওই পঞ্চম শিব মন্দিরটি আগ্রার ইস্টদেব নাগরাজ  অগ্রেশ্বর মহাদেব নাগনাগেশ্বর ছিল যেটা ছিল তেজোমহালয় মন্দির, বর্তমানে তাজমহল,,,,

c.



Thursday, 27 July 2023

ত্রিপাক্ষিক দ্বন্ধ।

সম্রাট হর্ষবর্ধনের সময় থেকেই কনৌজ ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। তখন মালবরাজ দেবগুপ্ত, এবং বাংলার শাসক শশাঙ্ক কনৌজ অধিকার করবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সমৃদ্ধ গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থানের জন্য কনৌজ ভারতীয় রাজাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পরে প্রায় একশো বছর ধরে উত্তর ভারতে কোন সাম্রাজ্যিক ঐক্য ছিল না। সেই সময় কাশ্মীর ও কামরূপের রাজারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জয় করে শক্তিশালী রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মালবের রাজা যশোবর্মন অল্প কিছুকাল কনৌজে রাজত্ব করেছিলেন, তবে কনৌজ ততদিনে নিজের পূর্ব গৌরব হারিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও খৃষ্টীয় অষ্টম শতকের ভারতীয় রাজাদের মধ্যে এই ধারণা গড়ে উঠেছিল যে, কনৌজ-ই সার্বভৌম সাম্রাজ্যের প্রতীক। তাঁদের ধারণা ছিল যে, যিনি কনৌজ অধিকার করতে পারবেন, তিনিই সার্বভৌম সম্রাটের স্বীকৃতি পাবেন। ইতিহাস বলে যে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে ভারতের তিনদিকে তিনটি রাজশক্তির উদ্ভব হয়েছিল। অষ্টম শতকের মধ্যে রাষ্ট্রকূট রাজা দন্তিদুর্গ চালুক্য সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিয়ে সমগ্র দাক্ষিণাত্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্রকূটরা অত্যন্ত পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছিলেন। দন্তিদুর্গের বংশধরদের মধ্যে ধ্রুব, তৃতীয় গোবিন্দ ও তৃতীয় ইন্দ্ৰ কনৌজ জয় করে রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, ভারতের মধ্যবর্তীস্থলে অবস্থানের জন্যই রাষ্ট্রকূটরা দুই অঞ্চলের ওপরে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সময়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছিল।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত দ্বিতীয় পক্ষটি ছিলেন বাংলার পালরাজারা। অষ্টম শতকে বাংলা ও বিহার অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে তখন বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র ধর্মপাল বাংলাকে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনিই কনৌজকে কেন্দ্র করে পাল সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেখতে দেখতে পূর্বভারতে পালরাজারা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিব্বতের সঙ্গে পালরাজাদের সুসম্পর্ক ছিল, সেজন্য নিজেদের রাজ্যের উত্তর সীমান্ত নিয়ে তাঁদের কোনো চিন্তা ছিল না। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেও তাঁদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। ধর্মপাল ও তাঁর পুত্র দেবপাল বাংলার নেতৃত্বে এক বিশাল সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের তৃতীয় পক্ষটি ছিলেন রাজপুতনার প্রতিহাররা। ঐতিহাসিকদের মতে তাঁরা সম্ভবতঃ গুর্জর জাতির লোক ছিলেন, সেজন্য অতীতে তাঁদের গুর্জর-প্রতিহার বলা হত। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকূট রাজারা তাঁদের ‘দ্বাররক্ষক’ গোত্রীয় নিম্নবর্গের মানুষ বলে গণ্য করতেন। হতে পারে যে, প্রতিহাররা প্রথমে হয়ত রাজপ্রাসাদের কর্মচারী ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁরা রাজা হয়ে বসেছিলেন। পশ্চিমে আরবদের প্রতিহত করে প্রতিহাররা পূর্বদিকে নিজেদের রাজ্য সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। অষ্টম শতকের শেষদিকে রাজস্থান, কনৌজ, মালব ও গুজরাট জুড়ে তাঁদের একটা বিস্তৃত রাজ্য ছিল।

ভারতের তিনদিকের এই তিনশক্তি কনৌজ দখল করে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রায় দু’শো বছর ধরে সেই তিন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব চলেছিল (৭৫০-৯৫০ খৃষ্টাব্দ)। ওই ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত জয়লাভ করতে পারেনি। প্রথমদিকে প্রতিহাররা জয়ী হলেও আরব, পাল ও রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তাঁদের শক্তিক্ষয় হয়েছিল। তাঁরা কখনো দাক্ষিণাত্য জয়ের চেষ্টা করেন নি। একটা সময়ে তাঁদের অধীনস্থ সামন্ত রাজারা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে তাঁদের জয়ও শেষপর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অবশেষে খৃষ্টীয় একাদশ শতকের গোড়ার দিকে তুর্কিদের আক্রমণে কনৌজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাস থেকে উক্ত ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কতগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। সেই দ্বন্দ্বে জড়িত তিনপক্ষই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি থেকে এসেছিলেন, তাঁদের কেউই ভারতের মধ্যদেশের রাজশক্তি ছিলেন না। উত্তর, পূর্ব ও দাক্ষিণাত্যের সমকালীন তিনশক্তিই গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত কনৌজ (মহোদয়) অধিকার করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একটা সময়ে পশ্চিম এশিয়ার জাতিগুলি ব্যাবিলনকে তাঁদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বলে গণ্য করত। জার্মানির জাতিগুলি রোম দখল করাকে সাম্রাজ্য দখল করবার সমান বলে ধরে নিয়েছিল। ঠিক তেমনি অষ্টম শতকের ভারতের তিন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিই কনৌজকে সাম্রাজ্যের ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে গণ্য করেছিল। তাঁরা কনৌজ অধিকার করবার জন্য যথেচ্ছ শক্তিক্ষয় করেছিল। শেষপর্যন্ত প্রতিহাররা সেই সংগ্রামে জয়ী হলেও কোনো শক্তিই নিরবচ্ছিন্নভাবে জয়লাভ করতে পারে নি; পাল ও রাষ্ট্রকূটরা কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। মোট কথা হল যে, ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের ইতিহাসে উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যায়।

বাংলার পালরাজাদের তাম্র অনুশাসনগুলিতে (খালিমপুর, মুঙ্গের) এবং বাদল স্তম্ভ লেখতে সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে প্রতিহার রাজাদের দৌলতপুর ও বরা লেখ; এবং রাষ্ট্রকূটদের সনজান ও সিরপুর লেখগুলিতে সেই সংঘর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। সমকালীন গুজরাটি কবি সোদধালা, এবং বাঙালি কবি সন্ধ্যাকর নন্দীও তাঁদের লেখায় সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের দুই প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন - বাংলার পালরাজা ধর্মপাল ও দেবপাল এবং প্রতিহাররাজ বৎসরাজ, দ্বিতীয় নাগভট্ট ও ভোজ। বাংলার রাজা ধর্মপাল কনৌজ দখলের অভিপ্রায় নিয়ে পশ্চিমদিকে এগিয়ে গেলে প্রতিহাররাজ বৎসরাজ তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দোয়াবের কাছে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে ধর্মপাল পরাজিত হয়েছিলেন। এরপরে বৎসরাজ কনৌজে তাঁর প্রতিনিধি ইন্দ্ৰায়ুধকে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজা ধ্রুব শক্তিসাম্য বজায় রাখবার জন্য হস্তক্ষেপ করেছিলেন, প্রতিহারদের সঙ্গে মালব ও গুজরাট নিয়ে তাঁদের বিরোধ ছিল। তিনি বৎসরাজকে পরাজিত করে বিতাড়িত করেছিলেন, এবং তারপরে ধর্মপালকে প্রতিহত করে পুনরায় দাক্ষিণাত্যে ফিরে গিয়েছিলেন। উত্তর ভারতে তাঁর সাময়িক জয় স্থায়ী হয়নি। এরপরে ধর্মপাল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ভাগলপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, ধর্মপাল বৎসরাজের প্রতিনিধি ইন্দ্রায়ুধকে বিতাড়িত করে তাঁর প্রতিনিধি চক্রায়ুধকে কনৌজে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। মুঙ্গের লেখতে বলা হয়েছে যে, ধর্মপাল সেই সময়ে উত্তর ভারতের অনেক জায়গা অধিকার করে নিয়েছিলেন, তিনি হিমালয়ের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। খালিমপুর লেখের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি কনৌজে এক বিরাট সভার আয়োজন করেছিলেন। তাতে ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, গান্ধার ও কীরের শাসকেরা উপস্থিত হয়েছিলেন। পাঞ্জাব, পূর্ব রাজপুতনা, মালব ও বেরারে ধর্মপালের আধিপত্য সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু ধর্মপালের সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। কারণ, এরপরেই প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্ট কনৌজ আক্রমণ করে অধিকার করে নিয়েছিলেন। যোধপুর লেখতে বলা হয়েছে যে, তখন দ্বিতীয় নাগভট্টের সঙ্গে তাঁর সামন্তরাজারা যোগ দিয়েছিলেন। তিনি চক্রায়ুধকে পরাজিত করে কনৌজ অধিকার করেছিলেন, এবং তারপরে সম্ভবতঃ তিনি পাল রাজ্যের মধ্যেও প্রবেশ করেছিলেন। পাল- প্রতিহার দ্বন্দ্ব চলাকালীনই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দ উত্তর ভারতে চলে এসেছিলেন। পাল-প্রতিহার দ্বন্দ্বের মাঝে হঠাৎ করে তৃতীয় গোবিন্দর হস্তক্ষেপের দুটি সম্ভাব্য কারণ ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন। সেগুলোর মধ্যে একটি হল যে, ধর্মপালের রানী রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা ছিলেন; এবং দ্বিতীয়টি হল যে, প্রতিহারদের জয়ের ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তৃতীয় গোবিন্দ বুন্দেলখণ্ডের যুদ্ধে প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্টকে পরাজিত করেছিলেন। তবে তৃতীয় গোবিন্দ শুধু প্রতিহার রাজাকে পরাজিত করেই ক্ষান্ত হননি, এরপরে তিনি ধর্মপাল ও তাঁর কনৌজের প্রতিনিধি চক্রায়ুধকেও পরাজিত করেছিলেন। সেই যুদ্ধের পরে তিনি দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে, ধর্মপাল পুনরায় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। ধর্মপালের পরে তাঁর পুত্র দেবপাল সেই ত্রিপক্ষীয় সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন, এবং নাগভট্টের উত্তরাধিকারী রামভদ্র তাঁর হাতে পরাজিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রকূটরাজ অমোঘবর্ষের একটি লেখতে বলা হয়েছে যে, তিনি নাকি বঙ্গ জয় করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, দেবপাল কখনোই কোনো রাষ্ট্রকূট রাজার কাছে পরাজিত হননি, উল্টে তিনি প্রতিহাররাজ ভোজকে পরাজিত করেছিলেন। ভোজ রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সংঘাতেও নিজের পরাজয় বরণ করে নিয়েছিলেন। দেবপালের পরে পালশক্তির অবনতি ঘটলে, সেটার সুযোগ নিয়ে প্রতিহাররাজ ভোজ কনৌজ অধিকার করেছিলেন। আর কনৌজ অধিকার করেই তিনি সোজা মগধে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অতিহাসিকদের মতে সম্ভবতঃ তিনি বঙ্গ জয় করেছিলেন, এছাড়া তিনি রাষ্ট্রকূটদের পরাজিত করে মালব ও গুজরাট অধিকার করেছিলেন। রাজা ভোজই প্রকৃতপক্ষে ‘উত্তরাপথস্বামী’ হতে পেরেছিলেন। ভোজের পুত্র মহীপাল বাংলা জয় করেছিলেন, তবে তিনি রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে সেই ঘটনা ঘটে, সেই পরাজয়ের ফলে প্রতিহার শক্তি হীনবল হয়ে পড়েছিল।

দু’শো বছর ধরে স্থায়ী হওয়া ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল, এবং সেটার রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর ছিল। তৎকালীন ভারতের তিনটি আঞ্চলিক শক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্রমাগতঃ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকবার ফলে একটা সময়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। প্রায় ঠিক একই সময়ে উক্ত তিনশক্তির পতন ঘটেছিল। ওই তিনশক্তিই প্রায় সমশক্তিসম্পন্ন। তিন বংশের রাজাদের কাছেই বিশাল সৈন্যবাহিনী ছিল, সেই বাহিনীর পিছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হত। সেই সামরিক ব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁদের রাজস্ব বাড়াতে হয়েছিল, ফলে সাধারণ মানুষের ওপরে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, সেজন্যই তখন কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল। তাঁদের মতে পালরাজাদের আমলের কৈবর্ত বিদ্রোহ আসলে কৃষক বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে প্রাদেশিক শাসক ও সামন্তরাজারা বিদ্রোহ করে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। উক্ত তিনশক্তির সীমান্তে নেপাল, কামরূপ, কাশ্মীর, উৎকল প্রভৃতি স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ব উপকুলে চালুক্য ও গঙ্গাবংশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, এবং গুজরাটে সোলাঙ্কিরা তাঁদের নিজস্ব রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।

ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বে তিনশক্তি এতটাই শক্তিক্ষয় করে ফেলেছিল যে, শেষপর্যন্ত তাঁদের কেউই আর সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। ভারতের সেই তিন উদীয়মান শক্তি আরব অনুপ্রবেশের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেনি। খৃষ্টীয় দশম শতকে ভারতে তুর্কি আক্রমণ শুরু হলে তাঁদের প্রতিহত করবার ক্ষমতাও তাঁদের উত্তরাধিকারী রাজ্যগুলির ছিল না। রাষ্ট্রকূটরা যদি নিজেদের উচ্চাশাকে সংযত রাখতেন, তাহলে দাক্ষিণাত্যে তাঁরা আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারতেন। প্রতিহাররা পশ্চিমে আরব, এবং পূর্বে পালদের প্রতিহত করতে গিয়ে নিজেদের দুর্বল করে ফেলেছিলেন। তাঁরা দাক্ষিণাত্য জয় করে সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেন নি। আর বাংলার পালেরা পূর্বভারত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে হয়ত তাঁদের রাজ্যে কৈবর্ত বিদ্রোহ হত না, আর সেই ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে পাল রাজ্যও ভেঙে পড়ত না।

ঐতিহাসিকদের মতে ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ছিল অনাবশ্যক শক্তিক্ষয়। আরবীয় পরিব্রাজক মাসুদি খৃষ্টীয় দশম শতকের গোড়ার দিকে কনৌজে এসেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, কনৌজের প্রতিহার রাজা তখন রাষ্ট্রকূটদের শত্রু ছিলেন। দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নরপতিরা দুইপক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতেন, সেই সময়ে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে বিদেশী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১০১৮ খৃষ্টাব্দে তুর্কিরা কনৌজ অধিকার করে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তখন সারাদেশে অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, তারা আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিলেও, কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারে নি। তিনি শক্তির মধ্যেকার লড়াইয়ের ফলে শুধু ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থানীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণ গড়ে উঠেছিল। ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল ভারতের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, সামরিক শক্তিক্ষয় এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রের বিকাশ।

                           

(তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:

১- History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century, Upinder Singh.

২- Lords of the Deccan: Southern India from the Chalukyas to the Cholas, Anirudh Kanisetti.

৩- History of the Pala Dynasty Kings of Bengal (An Archival Study), Prashant Kashyap and Umesh Kumar Singh.)

Tuesday, 25 July 2023

রত্ন পাথর ও বিঞ্জান

 পাথর আসলে কী?

 *১.নীলা:-* 

নীলা কী? নীলা হল কপার সালফেটের কেলাস। CuSO4, 5H 2O হল এটার রাসায়নিক নাম। তামা আর সালফার ছাড়া এর মধ্যে অন্য কোনো ধাতু বা মেটাল নেই। বাকি যা আছে তা হল পাঁচ অণু জল।এবারে এটা কীভাবে গ্রহের গতিপথ বদলে দেবে সেটা নাসার গবেষকেরা কেউ-ই বলতে পারবেন না।

 *২।প্রবাল কী?* 

প্রবাল হল অ্যান্থজোয়া শ্রেনীভূক্ত সামুদ্রিক প্রাণী। এদের নিকটাত্মীয় হল সাগর কুসুম। এরা সাগর কুসুমের মতই পলিপ তৈরি করে, তবে সাধারণত এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। এরা প্রাণী হলেও, জীবনের পূর্ণবয়ষ্ক অবস্থায় সাগরতলে কোন দৃঢ় তলের উপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে গেড়ে বসে সেখানে নিজের দেহের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ( Ca CO3) নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে খোলস বা বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে। একটা প্রবাল পলিপের মৃত্যুর পরেও খোলসটি রয়ে যায় এবং তা অস্মীভূত হয়ে যেতে পারে। এরকম অস্মীভূত প্রবালের দেহাবশেষের উপর নতুন করে আবার প্রবাল বসতে পারে। এভাবে একটা কলোনি বহু প্রজন্ম ধরে চলার ফলে বড়সড় পাথুরে আকৃতি ধারণ করে। এভাবেই তৈরি হয় বড় প্রবাল দ্বীপ এবং প্রবাল প্রাচীর। অস্ট্রেলিয়ার সন্নিকটে গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর। রাসায়নিক ভাবে ক্যালসিয়াম কার্বনেটই হল প্রবাল।এবারে এই প্রবালের প্রস্তরীভূত দেহাবশেষ কীভাবে গ্রহের গতিপথ বদলে দিতে পারে সেটা নাসার গবেষকেরা কেউ-ই বলতে পারবেন না।

 *৩.মুক্ত কী?* 

ঝিনুকের মধ্যে তৈরি  মুক্ত আসলে 86 % calcium carbonate (CaCO3) 2 - 4 % জল. ~ 10 % conchiolin (an organic binding agent)। তাহলে দেখা যাচ্ছে মুক্তও প্রবালের মতোই রাসায়নিক ভাবে ক্যালসিয়াম কার্বনেটই। শামুক,ঝিনুকের খোলের প্রধান উপাদান এই ক্যালসিয়াম কার্বনেট।ক্যালসিয়াম কার্বনেট কীভাবে আকাশের গ্রহের গতিপথ বদলাবে? সবচেয়ে বড় কথা প্রবাল বা মুক্ত যে আসলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট এতটা জানেই না জ্যোতিষীরা।

 *৪.চুনি (Ruby) কি?* 

খনিজ বা বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম। Al2O3. লাল বা নীল রঙের। কীভাবে ভাগ্য পাল্টাবে এই এলুমিনিয়ামের যৌগ? আর যদি পারেই বদলাতে তাহলে আপনার আমার বাড়ির এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি, কড়াই,প্রেশারকুকার দিয়েই তো ভাগ্য বদলে ফেলা সম্ভব। 

 *৫.পান্না কি?* 

বেরিল(বেরিলিয়াম এলুমিনিয়াম সিলিকেট)

3Be.Al2O3 6SiO3. সবুজ রঙের স্বচ্ছ পদার্থ। এটাও সেই এলুমিনিয়ামের যৌগ।সঙ্গে আছে সিলিকন। যেটা বালিতে থাকে। তাহলে পান্না না নিয়ে এলুমিনিয়ামের হাঁড়িতে কিছু বালি নিলেই তো পান্নার কাজ হওয়া উচিত। 

 *৬.গোমেদ কি?* 

গোমেদ হল গারনেট।রাসায়নিক ভাবে এটা হল

3Mgo/CaO/MnO.Fe2O3/Cr2O3/Al2O3 3SiO3 অর্থাৎ এলুমিনিয়াম ছাড়া ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ক্যালশিয়াম ও লোহা আছে এতে। এটার রঙ লাল,বাদামি,কমলা হয়।এইসব মেটালগুলোর গ্রহের গতিপথ বদলানোর ক্ষমতা কীভাবে হল সেটা কোনো রসায়নবিদ বলতে বা ব্যাখ্যা করতে পারবেন না।জ্যোতিষীরা জন্মেও শোনেনি বা শেখেনি গোমেদের রাসায়নিক পরিচয়।

 *৭.পোখরাজ কি?* 

পোখরাজ হল টোপাজ।

Al2SiO4. স্বচ্ছ । এটাও সেই এলুমিনিয়ামের যৌগ। সঙ্গে আছে সিলিকন। যেটা বালিতে থাকে।

 *৮.ক্যাটস আই কি?* 

কোয়ার্টজ। SiO 2 সিলিকন ডাই অক্সাইড। এককথায় এটা বালিই। বালির রাসায়নিক রূপভেদ মাত্র। এর বদলে পকেটে কিছু বালি নিয়ে চলুন। একই রেজাল্ট পাওয়া উচিত।

 *৯.হিরে কি?*  

কার্বন বা C 

হিরে কার্বনের রূপভেদ মাত্র।তাই দামি হিরের বদলে এক টুকরো কয়লা সঙ্গে রাখলেও একই ফল পাওয়া উচিত।

 আমজনতা এত জেনে বুঝে গেলে রত্ন বা পাথর কীভাবে বিক্রি হবে? জ্যোতিষীদের ব্যবসা বা কুসংস্কার কীভাবে টিকে থাকবে?সাথে দেশের নামজাদা গ্রহরত্নের দোকানগুলোই বা রমরম করে চলবে কিভাবে ? কয়েক বছর আগে, নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে  টিভিতে, কাগজে বহুল বিজ্ঞাপন দেওয়া এক জ্যোতিষী ঘুমোতে ঘুমোতে নিজের খাটেই সিগারেটের আগুন থেকে পুড়ে মারা গেলেন। কোন পাথরই কাজ করেনি। আসলে জ্যোতিষী ব্যাপারটা মোটের ওপর বেঁচেই আছে আমার আপনার মনের দুর্বলতাকে পাথেয় করে ।

🙏🏼

Thursday, 20 July 2023

ভারতের গনতন্ত্রের ইতিহাস

 সকল পাঠকবৃন্দের প্রতি নমস্কার 🙏🏻। 


পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো ভারতবর্ষ।এই রাষ্ট্রে এখন ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় যথাক্রমে ৫৪৩ ও ২৪৫ টি আসন বিশিষ্ট। ভবিষ্যতে এই আসন সংখ্যা জনসংখ্যার তারতম্যের বিচারে বৃদ্ধি পেতে পারে। আজ নতুন ভারতের কাহিনী নয়, বরং প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যবাহী গৌরবময় কিছু ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে লিখছি:: চলুন    প্রিয় ভারতবাসীসহ ভারতকল্যাণের কামনাকারী বিশ্ববাসী, আজ ভারতের অতীতে ঘটে যাওয়া রোমাঞ্চকর ইতিহাস পড়া যাক....


প্রাচীন ভারতের দুটি গণতান্ত্রিক রাজ্য ছিল ১)মল্ল ২)বৃজি। অর্থাৎ যখন পুরো বিশ্ব গণতন্ত্র কী সে সম্পর্কে জানাতোই না, তখন ভারতের গণতন্ত্রের ধারণার উত্থান ঘটেছিল।


 আমরা এখন শাসনব্যবস্থা কেন্দ্র, রাজ্য এবং রাজ্যের মধ্যে জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত— এইভাবেই বিভক্ত ব্যবস্থা লক্ষ্য করে থাকি। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হলো, এই ধারণাই বিকাশলাভ করেছিল চোল সম্রাজ্যের সর্বোচ্চ স্তর থেকে গ্রামীণ স্তরে।


 যদি প্রশ্ন করেন চোল সম্রাজ্য কত বছর আগেকার, তবে এই প্রশ্নের উত্তর রসগোল্লা খাবার মতোই সহজ ও কোমল, উত্তর হলো ৮৪৮ সালে।চোল সম্রাজ্যের নৃপতিদের নৌশক্তিও ছিল প্রবল।এই নৌশক্তির বলে চোল নৃপতিরা বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া, মালোয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যাণ্ড ও লাওস বিজয়ে সক্ষম হয়েছিলেন। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে দেশীয় নৃপতিদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও দেশের অখণ্ডতার প্রশ্নে ভারতের চতুর্সীমা সুরক্ষার কাজটা উত্তর পশ্চিমে জাঠ ও রাজপুত, দক্ষিণে চোল ও চালুক্য, পূর্বে পাল সম্রাটরা দক্ষহাতেই করছিলেন।


এই প্রসঙ্গে এক টুকরো ইতিহাস বলি, একবার পালসম্রাট মহীপালের সঙ্গে চোলসম্রাট প্রথম রাজেন্দ্র চোলের মতবিরোধ ঘটেছিল, ফলে প্রথম রাজেন্দ্র চোল মহীপালের অহংকার চূর্ণ করে রাজ্যপাঠে মনোনিবেশ করানোর চেষ্টায় মহীপালকে পরাজিত করে গঙ্গোইকোণ্ডচোল নামে পরিচিত হয়েছিলেন। কিন্তু জয়লাভের পরেও প্রথম রাজেন্দ্র চোল মহীপালের রাজত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ প্রথম রাজেন্দ্র চোলের উদ্দেশ্য মহীপালকে পরাজিত করা ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজ্যপাঠে মনোনিবেশ করিয়ে পূর্বভারত রক্ষার দায়িত্ব স্মরণ করানো।কারণ মহীপাল সেই সময়ে শাসনকার্যের দিকে লক্ষ্য রাখার থেকেও বেশী আমোদ প্রমোদে সময় অতিবাহিত করতে শুরু করেছিলেন—যা একজন সুযোগ্য সম্রাটের পক্ষে শোভা পায় না। অনেকেই বলবে চোলরা বঙ্গদখলের মানসিকতায় আক্রমণ করেছিল, কিন্তু এই অভিযোগের সর্বৈব মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। বঙ্গদখলের মানসিকতাই যদি উদ্দেশ্য থাকতো, তবে পাল সম্রাট মহীপালকে পরাজিত করেও তার সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দিতেন না প্রথম রাজেন্দ্র চোল।


আমরা হয়তো পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রধান কৃতিত্ব গান্ধীজিকে দিয়েই নিজেদের বড়োই বিজ্ঞ ও পণ্ডিত প্রমাণ করতে চাই, কিন্তু তিনিও নিশ্চিত চোল সম্রাজ্যের ইতিহাস পড়েছিলেন।পড়া তো উচিত, জানা তো উচিত, আর যাই হোক তিনি তো একজন ব্যারিস্টার ছিলেন।ব্যারিস্টার হবার খাতিরে তাঁকে তো ভারতের প্রাচীন ইতিহাস জানতেন আশা করি।


যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা আজ লুটতরাজ মানসিকতার আঞ্চলিক নেতানেত্রীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকে প্রতিদিন অন্ততঃ আধাঘন্টা অন্তর অন্তর, সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল অতীতে দক্ষিণভারতেই বিস্তার লাভ করা চোল সম্রাজ্যে। কিছু দিন আগেই আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী যে #সিঙ্গোল দণ্ডটি রাজপুরোহিত দ্বারা গ্রহণ করলেন এই রাজদণ্ড গ্রহণের পরম্পরাই ছিল ঐতিহ্যবাহী সুপ্রাচীন চোল সম্রাজ্যের শাসন পরিচালনার প্রথম স্তর। অর্থাৎ আমাদের দেশ সঠিক পথেই হাঁটছে, অতীতের ঐতিহ্যময় ইতিহাসকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করেই।


আজ জানাবো প্রাচীন ভারতের ১৬টি মহাজনপদ( ষোড়শ মহাজনপদ) বর্তমানে কোন স্থানে অবস্থিত আছে ও তার নাম কী হয়েছে সেই সম্পর্কে.... চলুন জেনে নেওয়া যাক।

।। #ষোড়শ_মহাজনপদের_বর্তমান_ভারতে_অবস্থান।।

১)কাশী ( এখন অবস্থান বারাণসী)= কাশীর রাজধানী ছিল কাশীপুর

২)কোশল (এখন অবস্থান অযোধ্যা)= কোশলের রাজধানী অযোধ্যা

৩)অঙ্গ(এখন অবস্থান পূর্ব বিহার) = অঙ্গের রাজধানী ছিল চম্পাপুরী

৪)মগধ (এখন অবস্থান দক্ষিণ বিহার)= মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ বা পাটলিপুত্র

৫) বৃজি( এখন অবস্থান উত্তর বিহার)= বৃজির রাজধানী ছিল বৈশালী 

৬) মল্ল(এখন অবস্থান গোরক্ষপুর)= মল্লের রাজধানী ছিল কুশিনারা 

৭) বৎস(এখন অবস্থান প্রয়াগরাজ)= বৎসের রাজধানী ছিল কৌশাম্বী

৮) চেদি (এখন অবস্থান বুণ্ডেলখণ্ড)= চেদির রাজধানী ছিল সুক্তিমতি 

৯) কুরু(এখন অবস্থান দিল্লী)= কুরুর রাজধানী ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ 

১০) পাঞ্চাল(এখন অবস্থান রোহিলখণ্ড)= পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র ও কাম্বিল্য 

১১) মৎস্য(এখন অবস্থান জয়পুর)= মৎসের রাজধানী ছিল বিরাটনগর 

১২)শূরসেন (এখন অবস্থান মথুরা)= শূরসেন রাজধানী ছিল মথুরা 

১৩) অস্মক( এখন অবস্থান গোদাবরী উপত্যকা)= অস্মকের রাজধানী ছিল পোতলা 

১৪) অবন্তী (এখন অবস্থান মালব) = অবন্তীর রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী ও মাহেষ্মতী 

১৫)গান্ধার(এখন অবস্থান পেশোয়ার)= গান্ধারের রাজধানী ছিল তক্ষশীলা 

১৬) কম্বোজ(এখন অবস্থান পশ্চিম কাশ্মীর)= কম্বোজের রাজধানী ছিল রাজপুর 


সম্রাট অশোকের সময় ভারত বর্তমানের অবস্থান সুবিশাল ছিল। 

অখণ্ড ভারতের মানচিত্রের যে বর্তমানের স্থানগুলি আসবে সেগুলি হলো —

১) আফগানিস্তান(বর্তমান ইরানের একটা বৃহৎ অংশ সমেত) ২) পাকিস্তান(pok সমেত) ৩) আকসাই চিন ৪) তিব্বত ৫) নেপাল ৬) ভুটান ৭) বাংলাদেশ ৮) মায়ানমার ৯) থাইল্যাণ্ড ১০) লাওস ১১) কম্বোডিয়া ১২)ভিয়েতনাম ১৩) ইন্দোনেশিয়া ১৪) মালোয়েশিয়া ১৫) সুমাত্রা-জাভা ১৬) শ্রীলঙ্কা ১৭) ফিলিপাইন ১৮)মালদ্বীপ।আগের কিছু লেখায় এ সম্পর্কে লিখেছিলাম। কেহ কেহ মনে করেন বঙ্গ ভারতের অংশ ছিল না— একথা সবৈব মিথ্যা। বঙ্গদেশের নাম বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিপিটকেও উল্লেখ আছে এবং মহাভারতেও উল্লেখ আছে।এই বঙ্গের সম্রাট সমুদ্রসেন, চন্দ্রসেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। তৎকালীন পৌণ্ড্র ও অঙ্গ নামক ভারতের পূর্বদিকের দুটি রাজ্য ছিল। এই পৌণ্ড্রদেশের সম্রাট ছিলেন পৌণ্ড্রক বাসুদেব—যিনি তাঁর অপকর্মের জন্য শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিধন হয়েছিলেন এবং অঙ্গদেশের সম্রাট ছিলেন দুর্যোধনের মিত্র তথা পরশুরামের শিষ্য কুন্তীপুত্র কর্ণ। সুতরাং তৎকালীন ভারতের সুবিশালতা আজ ইউরোপীয় ও আফ্রিকান সাম্রাজ্যের চারগুণের অধিক ছিল—একথা সুদৃঢ় কণ্ঠে বলতে কোনো জড়তা না থাকাই উচিত। 


আর একটি ঐতিহাসিক কাহিনী বলি, জরাসন্ধের নাম সকলেই শুনে থাকবেন নিশ্চিত। এই জরাসন্ধের সময় ভারতের পূর্ব উত্তর প্রায় রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তাঁর।অতি অত্যাচারী জরাসন্ধের মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্য কুরুসাম্রাজ্যের অধীনে আসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঐ অঞ্চলে।এর পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে সুদূর বর্তমানের পশ্চিমে ইরান-আফগানিস্তান থেকে শুরু করে উত্তরে কাশ্মীর- তিব্বতসহ পূর্বে বাংলাদেশ, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া মালোয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যাণ্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ, এমনকি শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এখনকার অস্ট্রেলিয়া এবং এখনকার ভারতের পুরোটাই পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ যুধিষ্টিরের চক্রবর্তী সম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ভাবুন তো কী বিরাট ভারত ছিল !!! যুধিষ্ঠিরের পরে পরিক্ষিৎ জনমেজয় এমনকি চন্দ্রগুপ্ত, বিন্দুসার, অশোক, পৃথ্বীরাজ চৌহান ও যশপালের সময়েও এই অখণ্ড ভারতের ভিত্তি মজবুত ছিল। মহারাণাপ্রতাপের পূর্বপুরুষ বীর যোদ্ধা বাপ্পা রাওয়াল তো যুদ্ধ করতে করতে বর্তমান ইউরোপের প্রবেশদ্বার তুরস্ক অবধি জয়লাভ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন।এসব ইতিহাস ভারতবাসীকে জানতে দেওয়া হলোই বা কই ?? ভারত স্বাধীন হবার পর ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী শুধু নয় পরবর্তী ৫জন শিক্ষামন্ত্রী তো ভারতীয় ছিলই না।তাহলে ভারতীয় ঐতিহ্যময় বীরত্বের ইতিহাস লুপ্ত সুপ্ত হবে না তো কী জাগরিত হবে !!! একথা তো একজন দুধেবাচ্ছাও বুঝতে পারবে বলেই আশা করি।


এখন ইতিহাসের ঐ মহান পরিচ্ছেদকে সন্তর্পনে পরবর্তী সময়ে পুনঃজাগরণের জন্য হৃদয়ে রেখে এবার জেনে নেওয়া যাক মহাভারতের সময়কালে ভারতের রাজ্যগুলির বর্তমান অবস্থান নিয়ে—


১. কুরুরাষ্ট্র: মহাভারতের সবচেয়ে নামকরা রাজ্য।বর্তমান ভারতের দিল্লী, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ এবং উত্তর প্রদেশের পশ্চিম অংশ নিয়ে কুরু রাষ্ট্র ছিল।কুরুরাষ্ট্রের রাজধানী হস্তিনাপুর বর্তমান উত্তর প্রদেশের মীরাটের কাছেই অবস্থিত।


২. পাঞ্চাল প্রদেশ: পাঞ্চাল প্রদেশের উত্তরে হিমালয় এবং দুইটি অংশই বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত।অন্যদিকে রাজধানী অহিচ্ছত্র বর্তমানে রামনগর জেলার অন্তর্গত। 


৩. গান্ধার: আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী অববাহিকায় অবস্থিত এক সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। এর রাজধানী ছিল তক্ষশীলা—যা  বর্তমান রাওয়ালপিণ্ডি(এই নামটি বাপ্পা রাওয়ালের নাম অনুসারে হয়েছে)।তৎকালীন পুরো গান্ধার বর্তমানে পেশওয়ার প্রভিন্স, খাইবার পাখতুনখোয়া এর দক্ষিণে এবং পাঞ্জাবের উত্তরে অবস্থিত।


৪. শূরসেন রাজ্য :বর্তমানে পুরো রাজ্যটি উত্তর প্রদেশের অংশবিশেষ। শূরসেন প্রধান শহর ছিল মথুরা যা বর্তমানে মথুরাতেই ছিল।


৫. মৎস্যদেশ: মৎস্যদেশ বর্তমান জয়পুরের অতি সন্নিকটে ছিল। এর উত্তরের অংশ বর্তমান দক্ষিণ হরিয়ানার অংশ। এর রাজধানী বিরাট নগরী বর্তমানে বিরাটনগর হিসেবে পরিচিত।


৬. কুন্তিভোজ: বর্তমান রাজস্থানে কুন্তিভোজ রাজ্য অবস্থিত।


৭. কাশী : কাশী রাজ্যের রাজধানী ছিল কাশীপুর। যা বর্তমানে বারাণসী নামে সমধিক পরিচিত। এটি গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। কাশী রাজ্যটি উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত।


৮. অঙ্গ রাজ্য: অঙ্গ রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী ছিল চম্পাপুরী। বর্তমানে অঙ্গ দক্ষিণ-পশ্চিম বিহার, ঝাড়খন্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছুটা অঞ্চলজুড়ে আছে।


৯. মগধ: মগধের রাজধানী ছিল রাজগীর। বর্তমানে শহরটি পাটনার অন্তর্গত। আর পুরো রাজ্যটা বিহারের অন্তর্গত।


১০. বিদর্ভ : বিদর্ভ বর্তমান মহারাষ্ট্রের উত্তরপূর্ব নাগপুর ও অমরাবতী অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। বর্তমান মধ্যপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার সাথে তৎকালীন বিদর্ভের সীমানা সংযোগ ছিল।


১১. চেদি রাজ্য : তৎকালীন চেদি রাজ্যের কিছু অংশ বর্তমান উত্তর প্রদেশ এবং বাকি অংশ মধ্যপ্রদেশে পড়েছে।চেদি রাজ্যের রাজধানী শুক্তিমতী, এটি বর্তমান উত্তর প্রদেশের বান্দা প্রদেশের নিকটবর্তী।


১২. মদ্র দেশ : মদ্রদেশের রাজধানী ছিল সাগালা ।যা বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের শিয়ালকোট শহর। বর্তমান কাশ্মীরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে রাজ্যটি পূর্ব-পশ্চিম বরাবর বিস্তৃত ছিল।


১৩. নিষাদ রাজ্য : নিষাদ রাজ্যটির অবস্থান বর্তমান রাজেস্থানে ছিল


১৪  ইন্দ্রপ্রস্থ: এই নগরটির অবস্থান এখনকার নতুন দিল্লিতে ছিল


১৫ দ্বারকা: এই শহরটি এখন গুজরাটের নিকটে আরব সাগরে ডুবে আছে।


আবার কেহ কেহ বলছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের অংশ ছিল না। এমন কথা বলা আর গগনপুস্তক পড়া একই ব্যাপার। কারণ ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ নামটির কোনো অস্তিত্ব বিশ্বের মানচিত্রেই ছিল না। মহাভারতের সময়কালীন সময়ে প্রাকজ্যোতিষপুর নামক একটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। অঙ্গ বঙ্গ পৌণ্ড্র সুহ্ম কলিঙ্গ(যাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় উৎকল বলা হয়েছে) থাকলেও প্রাচীন কোনো গ্রন্থে ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ নামটির উল্লেখ নেই। আসলে ভারতের পূর্বে অঙ্গ বঙ্গ পৌণ্ড্র সুহ্ম রাজ্যগুলিই ছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সম্রাটের শাসনকালে নামের পরিবর্তন হলেও স্থান অপরিবর্তিত থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় এখন যেখানে ইরান সেটাই আগে নাম ছিল পারস্য, এখন যেখানে ভিয়েতনাম সেটার নাম ছিল চম্পা, এখন যেটি মালদ্বীপ সেটাই আগে নাম ছিল মালয়দ্বীপ

এমন বহু উদাহরণ আছে।কিন্তু ভারত নামটির উপস্থিতি সদা সর্বদা সেই গ্রিক রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মেগাস্থিনিসের লেখায় এবং টলেমি থেকে শুরু করে ইবন বতুতা, হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ কথাতেও পাওয়া যায়। সুতরাং একথা অমূলক নয় যে বাংলাদেশের শিকড় আসলে ভারত। ইতিহাসকে বদলে দেবার অপচেষ্টা হলেও সমগ্র বিশ্ব আজ ভারতের দিকে তাকিয়ে। সকলেই দেখছে পুনর্বার কীভাবে ভারত শির উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। যে ভারতের উপর বিদেশী হানাদারদের আগ্রাসী অপশাসনের কুঠারাঘাত হলেও, পুর্ণবিনাশ করার চেষ্টা হলেও, ভারত ক্রমশ বর্বরদের পৈচাশিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসাবে আজ আবার দেখাচ্ছে বেদজ্ঞানের অপরাশক্তির সঙ্গে পরাশক্তির স্বাভাবিক মেলবন্ধনে কীভাবে ক্ষমতাকে অর্জন করেও “বসুদেব কুটুম্বকম্”-এর শিক্ষায় গোটা দেশকে পরিচালনা করে ক্রমশ বিশ্বগুরু হতে হয়। 


ভারতের বহু মানুষ আজও রামায়ণ ও মহাভারতকে ঐতিহাসিক গ্রন্থ বলতে স্বীকার করেনা‌। এটাও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের ব্রেণ ওয়াশ করা অশিক্ষা ও আংশিক শিক্ষার সুদুর প্রসারী প্রভাব। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস জানতে রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ এবং অষ্টাদশ পুরাণ ও উপপুরাণগুলি যেমন সাহায্য করে তেমনিই মন্দির, সৌধ, প্রাসাদ, গুহা, নদী, শিলালিপি, মুদ্রা, স্তম্ভ ও সাহিত্যের উপাদান দারুণভাবে কার্যকর। যাঁরা ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের যোগ নেই বলে মনে করেন, তাঁদের বুদ্ধি হয় জং ধরেছে নয়তো অলসদানব ভর করেছে তাঁর শরীরে। শুধু সাহিত্য নয়, বিজ্ঞান ও ভূগোলের সঙ্গেও ইতিহাস সরাসরি যুক্ত। সুতরাং  ইতিহাস নিঃসন্দেহে এক উৎকৃষ্ট শাস্ত্র। তবে যাঁরা ভারতের ইতিহাসকে ভারত আক্রমণকারী বর্ণিত কাহিনীর আলোকে পড়বেন, তাঁরা হতদরিদ্র হতভাগ্য আত্মগৌরববর্জিত মনুষ্য ছাড়া আর কী বা হবেন !!! ভারতের ইতিহাস জানতে ভারতীয় দেশভক্ত লেখকের লেখা না পড়ে বিদেশী হানাদার মদতপুষ্ট কুলেখকদের লেখা পড়ার কী যৌক্তিকতা আছে ?? ভারতীয় ঐতিহাসিকের মধ্যে যেমন যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক মেগাস্থিনিস তৎকালীন ভারতীয় সামাজিকতার যে অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছিলেন তা তার ইণ্ডিকা গ্রন্থ অধ্যায়ণেই জানতে পারা যায়। আজ এখানেই সমাপ্তি করলাম। পরবর্তীতে আরার কোনো ঐতিহাসিক তথ্যযুক্ত রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে লিখবো। নমস্কার 🙏🏻

Sunday, 2 July 2023

বর্ণ ভেদের ভ্রান্ত ধারণা

 “চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।

(শ্রীমদ্ভগবত গীতার অধ্যায়- ৪, শ্লোক- ১৩)

অর্থাৎ কর্মগুণ অনুসারে মানুষদের চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। জন্মগুণ অনুসারে নয়। যার কারণে গাদির পুত্র বিশ্বামিত্র ছিলেন ব্রাহ্মণ যদিও গাদি ছিলেন ক্ষত্রিয়। আবার শুদ্রের পুত্র রত্নাকর ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করে হয়েছিলেন ব্রাহ্মণ। তার নাম হয়েছিল ঋষি বাল্মিকি এবং রচনা করেছিলেন রামায়ণের। এখানেই প্রমাণিত হয় যে একজন ক্ষত্রিয় বা শুদ্রের ছেলেও ব্রাহ্মণ হতে পারে।


``~ ধর্মগ্রন্থ এটাও বলে-🙏🚩

জন্ম জায়তে শুদ্রঃ 

সংস্কারঃ দ্বিজ উচ্চতে

বেদ পঠনাৎ ভবেত বিপ্র

ব্রহ্ম জ্ঞানেতী ইতি ব্রাহ্মণ। 

★অর্থাৎ, জন্ম মূহুর্তে সকলেই শুদ্র, সংস্কার দ্বারা দ্বিজ, জ্ঞান লাভে বিপ্র আর ব্রহ্মজ্ঞানে হয় ব্রাহ্মন। 

কিন্তু সাহার ঘরে কোনো শিশুর জন্ম হলে সাথে সাথেই আমরা তার নাম সাহা রেখে দেই। পালের ঘরে বাচ্চার জন্ম হলে সাথে সাথেই হয়ে যায় পাল। 

যদিও সাহা, পাল, দত্ত, ঘোস এসব এবং এমন বাকি সব টাইটেলের উল্লেখ্য বেদ বা গীতায় নেই। এগুলা সব মানুষের তৈরি জিনিস। কিন্তু বিয়ের সময় পালেরা পাল ছাড়া বিয়ে করে না। 

বিয়ের সময় আরো একটা জিনিস সবাই জানতে চায়। সেটা হচ্ছে গোত্র। হিন্দুদের অনেকগুলো গোত্র আছে। যেমন কাশ্যপ গোত্র, ভরদ্বাজ গোত্র, বিশ্বামিত্র গোত্র, শিব গোত্র, আলম্ব্যায়ন গোত্র ইত্যাদি। গোত্র শব্দটির অর্থ বংশ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়। কাশ্যপ একজন ঋষির নাম ছিলো এবং ঐ ঋষির পরবর্তী বংশধর যারা আছে তারা সবাই কাশ্যপ গোত্রের। একইভাবে আলিম্ম্যন একজন ঋষি ছিলেন যার পরবর্তী বংশধরদেরকে আমরা আলিম্মন্য গোত্রের বলে থাকি। কাশ্যপ ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ কিন্তু তার পরবর্তী প্রজন্ম ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শুদ্র, ক্ষত্রিয় সবই হয়েছে। যার কারণে আমরা অনেক শুদ্রকে বলতে দেখি যে তারা কাশ্যপ গোত্রের আবার অনেক ব্রাহ্মণও বলে যে তারা কাশ্যপ গোত্রের। তার মানে একই ঋষির সন্তানেরা ৪টি বর্ণেরই হয়েছে। তাহলে সাহার ছেলে শুধু সাহাই কেন হবে? পালের ছেলে শুধু পালই কেন হবে? ঘোষের ঘরে কোনো বাচ্চার জন্ম হলে সাথে সাথেই তার নামের সাথে ঘোষ টাইটেল কেন দিয়ে দেই।

★মনুসংহিতা এবং উপনিষদে একই গোত্রের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রায় সব সাহারাই আলিম্ম্যন গোত্রের। কিন্তু সাহারা সাহা ছাড়া বিয়ে করতে চায় না। তার মানে তারা আলিম্ম্যন গোত্রের হয়ে আলিম্ম্যান গোত্রের মধ্যেই বিয়ে করছে। এটা কি হিন্দু ধর্মের অবমাননা নয়? 


যারা জাত পাতে বিশ্বাসি তাদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা সবাই পরশুরামের উদাহরণ দিয়ে বলে যে, পরশুরাম বর্ণবাদি ছিলেন। তিনি ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র বিদ্যা শিখাতেন না। তাহলে আমরা কেন বর্ণ মানবো না। প্রথম কথা হচ্ছে, পরশুরাম ক্ষত্রিয়দের শেখাতেন না, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং তিনি শপথ করেছিলেন অধার্মিক ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করবেন। তাই তিনি অধার্মিক ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র বিদ্যা প্রদান করতেন না। কিন্তু যারা ধার্মিক ক্ষত্রিয় ছিলো তারা সবাই পরশুরামের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছে। ভীষ্ম, রুকমি সহ আরো অনেক ক্ষত্রিয় পরশুরামকে গুরু হিসেবে পেয়েছে। দেবব্রত ক্ষত্রিয় ছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন ধার্মিক এবং বিশ্বস্ত যার কারণে তিনি পরশুরামের শিষ্য হতে পেরেছিলেন। কর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে পরশুরামের কাছে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলো। সেই মিথ্যার শাস্তি ছিলো অভিশাপ। এখানে বর্ণবাদ নেই। বরং ধর্ম এবং অধর্মের ব্যাপার ছিলো। 


তাই নিজের নিন্ম মন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন এবং অন্যের উন্নত মানসিকতার সম্মান করুন,সমালোচনা না।

Saturday, 24 June 2023

মিহাইলো টোলোটোস

 পৃথিবীতে এ-ও কী সম্ভব!  জন্মালেন, বড় 

হলেন, ৮২ বছর  পর্যন্ত  বাঁচলেনও।  কিন্তু 

সারা জীবনের  এক মুহূর্তের জন্যও কোন

নারীকে  দেখলেন  না!  পৃথিবীতে  এমনই 

এক পুরুষ ছিলেন যিনি জীবদ্দশায় কোন

 নারীকে দেখেননি, নিজের  মা’কেও না!!


ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ‘ইউনিল্যাড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই ব্যক্তির নাম মিহাইলো টোলোটোস। তিনি ছিলেন গ্রিসের হালকিডিকির বাসিন্দা।


ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিহাইলো শুধুমাত্র বন্ধু-বান্ধবদের কাছে শুনে এবং বই পড়ে নারীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু কোনো নারীকে চাক্ষুষ করেননি। মনে করা হয় মিহাইলোর জন্ম ১৮৫৬ সালে। তাকে জন্ম দেওয়ার কিছু ক্ষণ পরই নাকি তার মা মারা যান। অনাথ হয়ে যান মিহাইলো।


মিহাইলোর মা মারা যাওয়ার পর গ্রিসের মাউন্ট অ্যাথোসের একটি মঠের সন্ন্যাসীরা তাকে দত্তক নেন। সন্ন্যাসীদের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন তিনি,  মিহাইলো যে শুধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে বড় হয়ে ছিলেন, তা নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি সন্ন্যাসীদের আদবকায়দা রপ্ত করেছিলেন। মঠের সন্ন্যাসীদের মত‌ো কঠোর জীবনযাপন করতেও শুরু করেছিলেন ছোটবেলা থেকেই। মিহাইলো যে মঠে থাকতেন, সেখানে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলা হত। তার মধ্যে অন্যতম ছিল, কোনো নারীকে মঠে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া।


শুধু নারী নয়, গরু, ভেড়াসহ যেকোনো গবাদি পশুকেও ওই মঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। গ্রিসের ওই মঠের শতাব্দীপ্রাচীন সেই প্রথা আজও বলবৎ রয়েছে! নারীদের মঠে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, সন্ন্যাসীরা সারা জীবন যাতে সঠিক ভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারেন তা সুনিশ্চিত করা।


তবে মঠের সন্ন্যাসীদের বহির্বিশ্বে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হত। ফলে তারা বাইরে গিয়ে প্রয়োজনে কোনো নারীর সঙ্গেও দেখা করতে পারতেন। কিন্তু মিহাইলো যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন তিনি নাকি কখনওই মাউন্ট অ্যাথোসের ওই মঠ ছেড়ে বাইরে যাননি। ১৯৩৮ সাল নাগাদ ৮২ বছর বয়সে মারা যান মিহাইলো।


মিহাইলোর মৃত্যুর পর মাউন্ট অ্যাথোসের সন্ন্যাসীরা নাকি তাকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে সমাধিস্থ করেছিলেন। মঠের সন্ন্যাসীরা মনে করতেন, মিহাইলোই বিশ্বের একমাত্র পুরুষ যিনি কখনও কোনো মহিলার মুখদর্শন করেননি। তাই সন্ন্যাসীদের মধ্যে তার সম্মান ছিল বেশি।শুধু নারীদেরই না, মিহাইলো কখনও ট্রেন, বিমান এমনকি কোনো সিনেমাও দেখেননি।


১৯৩৮ সালের ২৯ অক্টোবর ‘এডিনবার্গ ডেইলি কুরিয়ার’ সংবাদপত্রে মিহাইলোকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘জীবনে কোনো নারীকে না দেখেই মারা গিয়েছেন গ্রিসের সন্ন্যাসী’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল।


বর্তমানে মাউন্ট অ্যাথোস ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃত। লাখ লাখ দর্শকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে এই পর্বতমালা।

তবে এখনও মাউন্ট অ্যাথোসের মঠগুলো নারীদের প্রবেশ না করতে দেওয়ার কারণে অনেক বিতর্ক হয়েছে। এই নিয়মকে ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘প্রাচীন’ বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন।

মাউন্ট অ্যাথোসের কোলে ২০টি মঠ রয়েছে। যেগুলোতে বাস করেন প্রায় ২০ হাজার সন্ন্যাসী। ২০টি মঠের মধ্যে ১৭টিতে গ্রিসের সন্ন্যাসীরা বাস করেন। বাকি তিনটিতে বাস করেন সার্বিয়া, বুলগেরিয়া এবং রাশিয়ার সন্ন্যাসীরা।


Saturday, 10 June 2023

প্রাণায়াম

 প্রাণায়াম শব্দটি প্রাণ+আয়াম, প্রাণ দিয়ে গঠিত: বায়ু, শ্বাস;  আয়াম: সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।  প্রাণায়াম শব্দের অর্থ হল শ্বাসের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।  নিঃশ্বাসে শ্বসন (শ্বাস) এবং নিঃশ্বাস (প্রশ্বাস) আছে।  শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক, কোনো বাহ্যিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু এর ওপর সম্পূর্ণ আয়ত্ত পেতে হলে প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়।

 

 "তসমীন সতী স্বাস প্রশ্বাস যোগর্তি বিচেদঃ প্রণায়ামঃ"।


 এর জন্য শরীরে বাতাস ঠিক কীভাবে চলে তা জানতে হবে।  এর জন্য নাডিস নামে পরিচিত চ্যানেল/স্নায়ুগুলির একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বোঝার প্রয়োজন যা সারা শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।  এই টিউবুলার চ্যানেলগুলিকে প্রণায়াম করার জন্য শুদ্ধ করতে হবে।


 শরীরে ৭২ হাজার নাড়ী আছে।  তার মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ।  এগুলি হল ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না, সরস্বতী, কুহু, পায়স্বিনী, বরুণা, যশস্বিনী, বিশ্বোদরা, হস্তিজিহ্ভা, গান্ধারী, শানখিনি, অলম্বুষা এবং পুষা।  এই সুষুম্না, ইড়া এবং পিঙ্গলা একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে।  দেহের মধ্যে পদ্মের আকারে ছয়টি চক্র রয়েছে (এই চক্রগুলি শাক্ত কাজেও উল্লেখ করা হয়েছে)।  এগুলি হল মুলধারা, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ এবং অজ্ঞা একে অপরের উপরে, প্রথমটি নাভির নীচে এবং শেষটি মাথার উপরে।  সুষুম্না নাড়ী মুলধারাকে আজনার সাথে সংযুক্ত করে।  কুন্ডলিনী নামক একটি শক্তি কুন্ডলীকৃত সর্পের মত মুলধারায় শুয়ে আছে।  এটি সুষুম্না নাড়ীর মধ্য দিয়ে চলে।  এটি সমস্ত চক্রের মধ্য দিয়ে তার আটটি মুখ দিয়ে ব্রহ্মরান্ধ্র পর্যন্ত যায়, প্রতিটি প্রকৃতির একটি দিককে প্রতিনিধিত্ব করে।  


বায়ু, যা সাধারণত পাঁচ ধরনের হয়;  প্রাণ, আপান, ব্যান, উদান এবং সামান। চ্যানেলগুলিকে ইড়ার মাধ্যমে বায়ু দিয়ে শরীরকে পূর্ণ করে এবং এটিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধরে রেখে এবং পিঙ্গলা দিয়ে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে শুদ্ধ করতে হবে এবং এর বিপরীতে।  সমস্ত নাড়ি শুদ্ধ করার জন্য এটি তিন মাস ধরে তিনটি সন্ধ্যায় দুবার করতে হবে।  কুণ্ডলিনী একটি চাকায় শুয়ে আছে যার নাভিতে বারোটি স্পোক রয়েছে।


 প্রাণায়াম তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত: পুরক, রেচক এবং কুম্ভক।

 রেচক হল ডান নাকের ছিদ্র দিয়ে বায়ু নির্গত করা।  বাম নাকের ছিদ্র দিয়ে বায়ু শ্বাস নিতে হয় এবং একে পুরক বলা হয়।  ভিতরে বাতাস ধরে রাখাকে কুম্ভক বলে।  তিন বছর ধরে প্রাণায়াম অনুশীলন করলে বলা হয় যে কেউ হৃদয়ের পদ্মে অবস্থিত ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারে।


যোগের পঞ্চম উপাদান হল প্রত্যহার/সংবেদনশীল বস্তু থেকে ইন্দ্রিয় প্রত্যাহার।  যখন ইন্দ্রিয়গুলি তাদের বস্তু থেকে প্রত্যাহার করা হয় তখন তারা চিত্তার প্রকৃতিতে কাজ করবে


 "স্ব বিশ্য সংঘপ্রয়োগে চিত্ত রূপানুকারো ইভেন্দ্রিয়নাম প্রত্যহারঃ"।


 প্রত্যহার হল প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের বস্তু থেকে ইন্দ্রিয়গুলি প্রত্যাহার করা এবং ইশ্বরের উপর মন স্থাপন করা।  পদ্ম-সংহিতা প্রত্যাহারের মতে দেহের আঠারোটি মারমাতে মনকে ধরে রাখা।


যোগের ষষ্ঠ অঙ্গ হল ধরণ।  এটিকে শরীরের অন্যান্য অংশে অবিচলিতভাবে মনকে স্থির করা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।  এটি মনকে অন্যান্য বস্তুর সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত করবে।  


অহিরবুধ্ন্য-সংহিতা এই পর্যায়ে মনকে পরমাত্মানের উপর স্থির হতে বর্ণনা করেছেন।  পৌষকর সংহিতা পৃথকভাবে দুটি এবং পাঁচটি ধরণের কথা বলে।


সপ্তম অঙ্গ হল ধ্যান।  পতঞ্জলি এটিকে সম্পূর্ণরূপে একটি ধারণায় স্থির হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন


 "প্রত্যয়কতানাতা ধ্যানম"।


 প্যাঁচরাত্র অনুসারে পারদর্শীকে অবশ্যই জনার্দনের উপর মন স্থির করতে হবে, যিনি তাঁর চক্র রূপে আছেন।


 শেষ উপাদান হল সমাধি।  সমাধিকে এমন একটি স্তর হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যেখানে ধ্যান করা বস্তুটি এত শক্তিশালীভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যে আত্মার চেতনা হারিয়ে যাওয়ার মতো ভাল হয়ে যায়।


 "তদেওয়ার্থমাত্র নির্ভাসং স্বরুপ শূণ্যম ইব সমাধিঃ"।


 এ পর্যায়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে তন্ময়।  পদ্মসংহিতা অনুসারে এটি সেই পর্যায় যেখানে আত্মা এবং পরমাত্মান এক হয়ে যায়।  ধ্যান তখন রূপ নেয় "আমি পরম ব্রহ্মের সাথে এক"।  ব্যক্তিত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তার মন বৈকুণ্ঠে স্থির হয়ে যায়।

#############

Wednesday, 7 June 2023

ব্রাম্ভন

 ব্রাহ্মণের গলায় যে পৈতা থাকে তাতে কয়টা সুতো থাকে ?


 --- ৯ টা সুতো থাকে।

৯ টা সুতোর ৯টা গুণ যাকে বলে নবগুনে ব্রাহ্মণ । কিন্তু সেই গুণগুলো কী কী?

--- আসুন সবাই মিলে একবার দেখে আসি।।


1. সম  2. দম  3. তপ  4. শৌচ  5. ক্ষান্তী

6. আর্যনং  7.  জ্ঞানও  8. বিজ্ঞানও  9. আস্তীকও l


1.  সম = সম মানে সমান।যে ব্রাহ্মণ হবে সে সবাইকে সমান চখে দেখবে।কে উচ্চ, কে নীচ,

কে সুচী, কে মুচী ব্রাক্ষণের কাছে কোন ভেদাভেদ রাখলে হবে না।


2.  দম = দম মানে দমিয়ে রাখা বা দমন করা।

নিজের দেহের সমস্থ ইন্দ্রকে সকল সময় দমন করে রাখতে হবে


3.  তপ = তপ মানে তপস্যা করা। যে ব্রাহ্মণ হবে তাকে মাঝে মধ্যে তপস্যা করতে হবে।


4.  শৌচ = শৌচ মানে পবিত্রতা। মন এবং এই দেহটাকে সকল সময় পবিত্র রাখতে হবে।


5. ক্ষান্তী= ক্ষান্তী মানে ক্ষমা করা।ক্ষমা হচ্ছে পরম ধর্ম তাই।তাই যে যা অপরাধ করুক ব্রাহ্মণের চোখে সেটা অপরাধ দেখলে হবে না।সবাই ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখতে হবে।


6.  আর্যনং = আর্যনং মানে সরলতা ভাব। সকল সময় নিজের ভিতরে শিশুর মতন সরলতা ভাব রাখতে হবে।


7.  জ্ঞানও = জ্ঞানও মানে জ্ঞানের উপরে আরো জ্ঞান যারে বলে চৈতন্য জ্ঞান।ভিতরে মৌনভাব রেখে চৈতন্য জ্ঞান থাকতে হবে।


8.  বিজ্ঞানও = বিজ্ঞানও মানে সর্বশ্রেষ্ট জ্ঞান যেটাকে গীতা ভাগবতের জ্ঞান।যে ব্রাহ্মণ হবে তার ভিতরে গীতা ভাগবতের জ্ঞান সম্পূর্ণ রূপে থাকতে হবে এবং সেই জ্ঞানটাকে কাজে লাগাতে হবে এবং সকল যায়গার বিস্তার করতে হবে।

9.  আস্তিক্য = আস্তিক্য মানে যারা ধর্ম মানে বা ধর্মের প্রতি অটুট বিশ্বাস।যাদের ভিতরে বেশি বেশি পুণ্য সুকৃতি থাকে তাদের বলে আস্তিক্য।ব্রাহ্মণের ভিতরে এইটা অবশ্যই অবশ্যই  থাকতে হবে।

আর যারা ধর্ম মানে না বা ধর্মের প্রতি কোন বিশ্বাস নাই তাদের বলে নাস্তিক।

এই গুনগুলো যার মধ্যে থাকবে সেই ব্রাহ্মণ।

কিন্তু যদি এই গুণ আর জ্ঞান গুলো কোন একজন ব্রাহ্মণের ভিতরে না থাকে সে ব্রাহ্মণ নয়।

প্রতেকটা ব্রাহ্মণকে আগে ভাবতে হবে বা নিজেকে নিয়ে বার বার পর্যালোচনা করতে হবে।এই চতুর্বর্ণের ভিতরে ব্রাহ্মণ, কুলশ্রেষ্ট।তবে এত কুল রেখে কেন আজ আমি ব্রাহ্মণ কুলে এলাম।আর এসেই যখন গেছি তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী ??


শুধু ব্রাহ্মণ কেন? আমরা যে যেখানে যে কুলে যে অবস্থায় আছি আমদের সকলেরই ভাবা উচিৎ।


পূর্বে কথায় ছিলাম? কেনই বা এই দুঃখময় জগতে এলাম? এর পরেও বা আমরা কোথায় যাব?

আর একবার  যখন এসেই গিয়েছি।

তা হলে এখন আমাদের করনীয় কী ?আমাদের কর্তব্য কী ?আমাদের এই মানব জীবনের উদ্দেশ্য কী ?


এই গুলো ভাবা দরকার এবং ভাবলেই উত্তর  আসবে।


আবার ব্রাহ্মণদের সবথেকে বড় একটা জিনিস আছে সেইটা সকল সময় মাথায় রাখতে হবে - এইটা একদম ভুলে গেলে হবে না।


জ্ঞান =  অভিমানশূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, ক্ষমা, সহনশীলতা, সরলতা, গুরুসেবা, পিতা-মাতা সেবা,দেহের ও মনের শুচিতা, মনকে সংযত করা, সকল বিষয়ে বৈরাগ্য,অহংকার না করা,জন্ম,মৃত্যু জরা রোগ সুখ,দুঃখ,এ গুলতে আসক্তি না করা,পুত্র,স্ত্রী,গৃহে অনাসক্তি,ধীর মনে কর্তব্য কর্ম করা,ইষ্ট সেবা,একনিষ্ঠভাবে আমাতে ভক্তি করা,নির্জন স্থানে থাকা,লোকের মধ্যে থাকাকে অনাগ্ৰহ,আত্মতত্ব ও মোক্ষ বিষয়ে সর্বদা উপলব্ধি

সত্বগুন মানবের দুঃখ দূর করিয়া সুখ দেয়।

রজোগুন মানবকে কর্মে আসক্ত করে।

তমোগুন মানবের জ্ঞানকে ঢাকিয়া ভ্রমে পতিত করায়।

🙏🏼

গো অর্থে বিপত্তি।

 ▫️গরু ও গোমাংস সম্পর্কে সনাতন ধর্মের  মতামত কী ❓


🔸উত্তর : পৃথিবীর উপকারী প্রাণীর মধ্যে গরু অন্যতম। বৈদিক ঋষিগণ এই মহৎ প্রাণীকে হত্যা ও ভক্ষণ করা থেকে সর্বদা বিরত থাকতে বলেছেন। কিন্তু বর্তমান একটি শ্রেণি প্রচার করে যে বেদ গোমাংস ভক্ষণের অধিকার দিয়েছে। এই ভুল ধারণার পেছনে রয়েছে বেদের ভুল অনুবাদ। 'গো' শব্দটি দ্বারা সংস্কৃতে বিভিন্ন অর্থ বুঝায়। 


✅গো শব্দের অর্থ :-


গো (সংস্কৃত, গম+ও) গোরু, গরু (সংস্কৃত, গরূপ)। অর্থ হলোঃ— জ্ঞান, ঐশ্বর্য, ধনু, গাভি, ষাঁড়, বৃষ, নিরেট বোকা, মূর্খ প্রভৃতি। গো (বিশেষ্য পদ) গরু, গো-জাতি, পশু, স্বর্গ, রশ্মি, চন্দ্র, চক্ষু গোচর, পৃথিবী, জল, গৃহ,  গোপতি।


 গো মানে সর্বদা গরু অনুবাদ করাতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যা পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ মিথ্যা প্রপোগান্ডা চালাচ্ছে। অনেক হিন্দুধর্মবিদ বলে থাকেন যে এক সময় গোমাংস খাওয়া হতো পরে নিষিদ্ধ করা হয় কিন্তু এটা চরম ভুল ধারণা  নিচের সূত্রগুলো দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে আশা করি-


প্র নু বোচং চিকিতুষে জনায়,

মা গামনাগা মদিতিং বধিষ্ট ॥


✅ঋগ্বেদ, ৮/১০১/১৫


অনুবাদ : পরমেশ্বর উপদেশ দিচ্ছেন- আমি জ্ঞানবান পুরুষের নিকট বলিতেছি যে নিরপরাধ অহিংস পৃথিবী-সদৃশ গো জাতিকে হনন করিও না ।


▫️নিরুক্ত ২.১.৫.৪ [ অমরেশ্বর ঠাকুর অনুযায়ী ]  "গো" অর্থ পশু:- 


{ অথাপি পশুনামেহ ভবত্যেতস্মাদেব ৷৷ ৪৷


অথাপি (আর) [গো শব্দঃ] (গো শব্দ) ইহ (লোকে এবং বেদে)' পশু নাম (পশুর নাম) ভবতি (হয়) এতস্মাৎ এর (এই ধাতুদ্বয় হইতেই)।


“গো” শব্দ লোকে এবং বেদে পশু বুঝাইতেও প্রযুক্ত হয়। এই ‘গো' শব্দও পূর্ব্বোক্ত ধাতুদ্বয় হইতেই অর্থাৎ ‘গম্‌’ বা ‘গা’ ধাতু হইতেই নিষ্পন্ন। ইহার অর্থ—‘যে যায়’ (গচ্ছতীতি)। স্কন্দস্বামীর মতে ‘গা’ ধাতু স্তত্যর্থক, কাজেই ‘গা’ ধাতু নিষ্পন্ন পশুবোধক ‘গো’ শব্দেরও ব্যুৎপত্তি হইবে ‘গীয়তে সূয়তেহসৌ’–যে স্তুত হয় অর্থাৎ লোকে যাহার গুণকীৰ্ত্তন করে।


অনুবাদ—আর লোকে এবং বেদে ‘গো' শব্দ পশুনামও হয়, অর্থাৎ পশুবোধকও বটে; এই ধাতুদ্বয় (‘গম্‌' ধাতু ও ‘গা' ধাতু) হইতেই নিষ্পন্ন। }


অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গামশ্বং পুরুষং বধীঃ।


✅অথর্ববেদ ১০.১.২৯


অনুবাদ-নির্দোষদের হত্যা করা জঘন্যতম অপরাধ।কখনো মানুষ,গো-অশ্বাদিদের হত্যা করোনা।


মাতা রুদ্রাণাং দুহিতা বসূনাং স্বসাদিত্যানামমৃতস্য নাভিঃ।

প্রনুবোচং চিকিতুষে জনায়, মা গামনাগামদিতিং বধিষ্ট।।


✅ঋগ্বেদ ৮/১০১/১৫


গাভী রুদ্র ব্রহ্মচারী বিদ্বানগণের মাতা, নির্মাতা। দুষ্টের রোদনকর্তা বিদ্বান্, সৈনিক, সেনাপতি ইত্যাদিগণ গাভীকে মাতৃতুল্য পূজনীয়া বলে মনে করেন। গাভী বিদ্বান্ বসুগণের পুত্রী। সমাজের সংস্থাপক ব্যবস্থাপক প্রবন্ধক আদির জন্য গাভী পুত্রী-সমা পালনীয়া, রক্ষণীয়া রূপে স্বীকৃত। গাভী অমৃতের কেন্দ্র। গোরক্ষার দ্বারা চিরজীবন সমাজচেতনা লাভ হয়। গো নির্দোষ, নিষ্পাপ, অদিতি, অখণ্ডনীয়, অবধ্য সুতরাং তাকে হত্যা করো না।


সংজগ্মানা অবিভ্যুষিরস্মিন্ গোষ্ঠে করীষিণীঃ।

বিভ্রতীঃ সোম্যং মধ্বনমীবা উপেতন।।


✅অথর্ববেদ ৩/১৪/৩


অনুবাদঃ- এই গোশালায় ধেনু সকল নির্ভয়ে থাকুক, একসঙ্গে মিলিয়া বিচরণ করুক, গোময় উৎপন্ন করুক, অমৃতময় দুগ্ধ ধারণ করুক এবং নীরোগ হইয়া আমার নিকট আসুক।


যজুর্বেদে গোহত্যা নিষেধ-


অজস্রমিন্দুমরুষং ভুরণ্যুমগ্নিমীডে পূর্বচিত্তিং নমোভিঃ। স পর্বাভির্ঋতুশঃ কল্পমানো গাং মা হিংসীরদিতিং বিরাজম্।।


✅যজুর্বেদ ১৩/৪৩


অনুবাদঃ অক্ষয়, ঐশ্বর্য্যযুক্ত, অক্রোধ, পূর্বতন ঋষিদের দ্বারা গৃহীত অন্ন দ্বারা অগ্নিকে স্তুতি করি। হে অগ্নি, প্রতিপর্বে প্রতিঋতুতে কর্মের সম্পাদক, তুমি অদিতি, নিরীহ গোসমূহকে হত্যা করো না।


ইমং সাহস্রং শতধারমুৎসং বাচ্যমানং সরিরস্যমধ্যে।

ঘৃতং দুহানামদিতিং জনাযাগ্রে মা হিংসীঃ পরমে ব্যোমন্।।


✅যজুঃ ১৩/৪৯


অনুবাদঃ- এই গাভী মানুষের অসংখ্য সুখের সাধন, দুগ্ধের জন্য বিভিন্নভাবে পালনীয়া। গো, ঘৃত দুগ্ধ দাতৃ, অদিতি অখণ্ডনীয়া। হে মানব, একে হত্যা করো না।


▫️মহাভারতের শান্তিপর্বে বলা হয়েছে :- 


অঘ্ন্যা ইতি গাবাং নাম, ক্ব এতা হন্তুমর্হতি।

মহচ্চকারাকুশলং বৃষং গাং বা লভেত্তু যঃ।।


[মহা: শান্তিপর্বে ২৬২. ৪৭]


অনুবাদঃ গাভীর অপর নাম অঘ্ন্যা, এরা অবধ্যা। এই সকল গাভী ও বৃষকে হত্যা করে সে মহাপাপ করে।


▫️পশুদের  দুগ্ধ ও ওষুধি রস :- 


পুষ্টি পশুনাং পরি জগ্রভাহং চতুষ্পদাং দ্বিপদাং যচ্চ ধান্যম্

পয়ঃ পশুনাংরসমোষ ধীনাং বৃহস্পতিঃ সবিতা মে নি যাচ্ছাৎ


✅অথর্ব্ববেদ ১৯।৩১।৫


অর্থাৎ, চতুষ্পদ পশু,দ্বিপদ পশু এবং ধান্য হইতে আমরা পুষ্টি গ্রহণ করি।এজন্য সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর আমাদিগকে পশুর দুগ্ধ ও ঔষুধির রস প্রদান করিয়াছেন


▫️"গো" বা "পশু" ভক্ষণ নিষিদ্ধ:- 


স ধেন্বৈ চানুডুহশ্চ নাশ্নীয়াদ্ধেন্বনডুহৌ বা ইদং সর্বং বিভৃতস্তে দেবা। -


✅শতপথ ব্রাহ্মণ ৩/১/২/২১


গাভী ও ষাঁড় কদাপি ভক্ষণযোগ্য নয়


ए॒षा प॒शून्त्सं क्षि॑णाति क्र॒व्याद्भू॒त्वा व्यद्व॑री। उ॒तैनां॑ ब्र॒ह्मणे॑ दद्या॒त्तथा॑ स्यो॒ना शि॒वा स्या॑त् ॥


এষা পশূন্ত্সং ক্ষিণাতি কব্যাদ্ভূত্বা ব্যদ্বরী। উতৈনা ব্রহ্মণে দধাত্তথা স্যোনা শিবা স্যাত্।।


✅অথর্ববেদ ৩/২৮/২


পদার্থ- মনুষ্যের বুদ্ধি (এষা) যেই পাপ প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়ে (পশূন) পশুদের (সংক্ষিণাতি) হত্যা করে এবং (ব্যদ্বরী) শাস্ত্রবিরুদ্ধ আহার গ্রহণ করে (ক্রব্যাদ্)  মাংসভক্ষকে [অষ্ট্যা ২/২৫/২৫] (ভূত্বা) পরিণত হয় । (উত) নিশ্চয়ের সাথে মনুষ্য যদি (এনাম্) সেই পাপপ্রবৃত্তিযুক্ত বুদ্ধিকে (ব্রহ্মণে) ব্রহ্মের মধ্যে (দধাত্) সমর্পিত করে (তথা) তাহলে তার বুদ্ধি (স্যোনা) সুখদায়িনী ও (শিবা) কল্যাণী (স্যাত) হয়ে যায় অর্থ্যাৎ, সেই ব্যাক্তি নির্মল ও অহিংসক বুদ্ধিকে প্রাপ্ত করে। 


ক্ষুধে যো গাং বিকৃন্তন্তং ভিক্ষমাণঽউপ তিষ্ঠতি দুষ্কৃ॒তায় 


✅যজুর্বেদ ৩০।১৮ 


- ক্ষুধা তথা খাদ্যের জন্য যারা গো হত্যা করে তাদের দূর করো


যাতুধানান্ ন ৎবা রক্ষাংসি পৃতনাসু জিগ্যুঃ । সহমূরান্ অনু দহ ক্রব্যাদো মা তে হেত্যা মুক্ষত দৈব্যায়াঃ ॥


✅অথর্ববেদ  ৮.৩.১৮ ,  ৫.২৯.১১


অনুবাদঃ ( অগ্নে) হে বিদ্বান্ রাজন্ ! তুমি (যাতুধানান্) পীড়াদানকারীকে [প্রাণীগণ বা রোগসমূহকে ] (সনাৎ) নিত্য (মৃণসি) নষ্ট করো , (রক্ষাংসি) রাক্ষস তথা যাদের থেকে আমাদের রক্ষিত থাকা উচিৎ তাদের (ৎবা) তুমি (পৃতনাসু) সংগ্রামে (ন জিগ্যুঃ ) জয় লাভ করতে দাও না । (ক্রব্যাদঃ) মাংস ভক্ষকগণকে (সহমূরান্) [তাদের ] মূল [অথবা মূঢ় মনুষ্যগণ] সহিত (অনু দহ) ভস্ম করে দাও , (তে) তোমার (দৈব্যায়াঃ) দিব্য গুণযুক্ত (হেত্যাঃ) বজ্র তথা ন্যায়বিচার ও শৌর্যবীর্য দ্বারা (মা মুক্ষত) তারা রক্ষা পায় না ৷ 


[ ভাষ্যঃ পণ্ডিত ক্ষেমকরণ দাস ত্রিবেদী ,  পণ্ডিত জয়দেব শর্মা মীমাংসালঙ্কার, আর্যসমাজ ]


অর্থাৎ , আমাদের মাংসভক্ষণ করা তো উচিৎ নয় ।


▫️গো" বা "পশু"  হত্যার  শাস্তির বিধান :- 


অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে মা নো গামশ্বং পুরুষং বধীঃ।


✅অথর্ববেদ ১০.১.২৯


অনুবাদ-নির্দোষদের হত্যা করা জঘন্যতম অপরাধ।কখনো মানুষ,গো-অশ্বাদিদের হত্যা করোনা।


যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পূরুষম্।

তন্ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসি অবীরহা।।


✅অথর্ববেদ ১/১৬/৪


অনুবাদঃ যদি তুমি আমাদের গাভী সকল হত্যা কর, যদি আমাদের ঘোড়া ও পুরুষদের হত্যা কর, তাহলে তোমাকে সীসের গুলি করে ধ্বংস করা হবে যাতে, তুমি আমাদের কোন প্রকার ক্ষতি সাধন করতে না পারো।


🔸"গো" বা "পশু" মৃত্যুদণ্ড বিধান :-


যদি নো গাং হংসি যদ্যশ্বং যদি পূরুষম্ ।।

তাং ত্বা সীসেন বিধ্যামো যথা নোহসো অবীরহা ॥


✅অথর্ববেদ, ১/১৬/৪


অনুবাদ : যদি তুমি আমাদের গরু, অশ্ব ও প্রজাদিগকে হিংসা কর, তবে তোমাকে সীসকের গুলি দ্বারা বিদ্ধ করিব। আমাদের সমাজের মধ্যে বীরদের বিনাশকারী কেহই না থাকে ।


যঃ পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা সমঙ্ক্তে যো অশ্ব্যেন পশুনা যাতুধানঃ । যো অঘ্ন্যায়া ভরতি ক্ষীরমগ্নে তেষাং শীর্ষাণি হরসাপি বৃশ্চ ॥


✅ঋগ্বেদ ১০.৮৭.১৬


অনুবাদঃ (অগ্নে) হে তেজস্বী নায়ক ! (যঃ-যাতুধানঃ) যে যাতনা দানকারী দুষ্ট প্রাণী রয়েছে (পৌরুষেয়েণ ক্রবিষা) মনুষ্যগণের অভ্যন্তরের মাংস দ্বারা (সমঙ্ক্তে) নিজেকে পুষ্ট করে (যঃ-অশ্ব্যেন পশুনা) যে কিনা পশুসমূহের মধ্যে নিরপরাধ পশু দ্বারা নিজেকে উত্তমভাবে পরিপুষ্ট করে (যঃ-অঘ্ন্যায়াঃ ক্ষীরং ভরতি) যে  হত্যার অযোগ্য গোরুর দুগ্ধকে হরণ করে-নষ্ট করে-দূষিত করে (তেষাং শীর্ষাণি হরসা বৃশ্চ) তাদের শিরসমূহ তথা শিরবৎ বর্তমান প্রমুখ ব্যক্তিগণকে  হরণকারক শস্ত্র-অস্ত্রের ব্যবিহার দেয়ারা  ছিন্ন-ভিন্ন করো , নষ্ট করো  ॥১৬॥


[ ভাষ্যঃ স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক বিদ্যামার্তণ্ড, আর্যসমাজ ]


অর্থাৎ ,  মনুষ্যগণের বিবিধ অঙ্গ তথা আভ্যন্তরীন বস্তু দ্বারা নিজেকে পুষ্ট যেমন মানুষের অঙ্গ পাচার , কিংবা অঙ্গসমূহকে নষ্ট করে যেভাবে এখন কোমলমতি শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করানো হয় তারা এবং সেই যারা কিনা গোদুগ্ধাদি খাদ্যদ্রব্যকে নষ্ট করে  - দেশের শাসক , প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের উচিৎ তাদের সমূলে উৎপাটন করা ।


🔸মহাভারতে গাভীকে মাতা বলা হয়েছে:- 


"মাতরঃ সর্বভূতানাং গাবঃ"


✅মহাভারত অনুশাসন পর্ব ৬৯।৭ 


গাভীকে সমস্ত প্রাণীদের মাতা বলা হয়।


▫️বেদে পশু-প্রাণী সংরক্ষণের মাহাত্ম্য:- 


 পশূপান্হি 


✅যজুর্বেদঃ ১/১ 


পশুদের রক্ষা করো।


নমঃ শ্বভ্যঃ শ্বপতিভ্যশ্চ বো নমো॥


 ✅যজুর্বেদ ১৬।২৮


 - মানুষের উচিত  পশুদের অন্ন দ্বারা পালন করে তাদের দ্বারা উপকার নেবে এবং পশু রক্ষাকারীদেরও সৎকার করবে।


[ অর্থাৎ, পশুদের হত্যা না করে রক্ষা করতে বলা হয়েছে। ]


🔸চলুন সবাই মিলে  শ্রেয়:  মার্গের দিকে আসি


ওঁ অসতো মা সদ্গময়।

তমসো মা জ্যোতির্গময়।

মৃত্যোর্মামৃতং গময়। 


(✅বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৩।২৮


অর্থাৎ, অসত্য থেকে আমাকে সত্যে নিয়ে যাও, অন্ধকার থেকে আমাকে জ্যোতিতে/আলোতে নিয়ে যাও, মৃত্যু থেকে আমাকে অমৃতে নিয়ে যাও।


☀ সত্য স্বরূপে সনাতন ধর্মের জয় হোক 🌷


👏 লেখার মাধ্যমে যদি কোন ভূল হয় সবাই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।


☀ 🌷 জয় সনাতন ধর্মের জয় ☀🌷

নিরাকার ইশ্বর তত্ব

 বেদে নাকি এক ঈশ্বরের কথা বলা আছে 

তাহলে বিষ্ণু ,শিব, ব্রহ্মা , সরস্বতী  ,ইন্দ্র, অগ্নি, লক্ষি আদি এত দেব -দেবী কেন? 


➢ হ্যা, সনাতন ধর্ম মতে ঈশ্বর  এক ও অদ্বিতীয়।


♦ পবিত্র বেদে বলা আছে,


★সমেত বিশ্বে বাচসা পতিং দিব একো বিভুরতিথির্জননাম্। স পুর্ব্যো নুতনমাবিবাসত্তং বতেনিরনূ বাবৃত একমিত্পূরু।।

-[অথর্ববেদ ৭/২১/১]

পদার্থ - হে মানব! (বিশ্বে) তোমরা সবাই (দিবঃ) সেই প্রকাশের (পতিং) স্বামী পরামাত্মার কাছে (বচসা) [স্তব] বাণী সহিত (সম-এত) একত্রিত হয়ে আস। তিনি (একঃ) এক ও অদ্বিতীয়, (বিভু) সর্বব্যাপী এবং(জননাম্) সমগ্র জীবের (অতিথিঃ) অতিথি। (সঃ) তিনি (পূর্ব্যো) [জগতের] পূর্ব হতেই বিদ্যমান।তিনিই (নুতনম্) নব জগতকে ( আবিবাসত্) প্রকট ও ব্যাপ্ত করেন এবং (তম্) সেই (একম্) এক পরমাত্মার কাছেই (পূরু) নানান প্রকারের (বর্ত্তনিঃ) মার্গ বা লোক (অনুবাবৃতে) পৌঁছায় ।


★যঃ প্রাণতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব।যঈশেঅস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায হবিষা বিধেম।।

-[যজুর্বেদ ২৩/৩]

পদার্থ- (মহিত্বা) নীজ মহিমাই (যঃ) যিনি (নিমিষতঃ) এই নেত্র দ্বারা দর্শনকারী (প্রাণতঃ) প্রাণ ধারণকারী (জগতঃ) জগতের (এক ইত্) এক ও অদ্বিতীয় (রাজা বভূব) অধীশ্বর। (অস্য) এই (দ্বিপদঃ চতুষ্পদ) দ্বিপদী চতুষ্পদী সমস্ত প্রাণীসমূহের (যঃ) যিনি (ঈশে) প্রভু (কস্মৈ) সেই আনন্দস্বরূপ (দেবায) প্রকাশস্বরূপ পরমেশ্বরকে (হবিষা) প্রেম,ভক্তি ও নানা সামগ্রী দ্বারা (বিধেম) পূজা করি।


★য এক ইৎ তমু ষ্টুহি কৃষ্টীনাং বিচর্যণিঃ

পতির্জজ্ঞে বৃষক্রতুঃ।।

-[ঋগ্বেদ. ৬/৪৫/১৬]

পদার্থ - হে মানব! (যঃ) যিনি (এক ইত্)  এক ও অদ্বিতীয় (কৃষ্টিনাম)  মনুষ্যদের (পতি) পালক (বিচর্ষণিঃ) সর্বদ্রষ্টা (বৃষক্রতু জজ্ঞে) ও সর্বশক্তিমান (তম্ উ) কেবল সেই পরমেশ্বরেরই (স্তুহি) উপাসনা  কর।


★এভাবে বেদের অসংখ্য মন্ত্রে কেবল এক ঈশ্বরের কথা পাওয়া যায়। উপরন্তু আমাদের উপনিষদ - দর্শনেও একইভাবে একেশ্বরের কথাই বলা আছে। এবং সনাতনধর্ম হল পৃথিবীর সর্বপ্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম।


♦এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঈশ্বর যদি একজনই হবেন

তাহলে এত দেব-দেবী কেন?


উত্তর- পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে 

বিষ্ণু, শিব , ব্রহ্মা, ইন্দ্র ,অগ্নি, সরস্বতী, লক্ষি  ইত্যাদি 

- এগুলো মোটেও কোন মানুষের মত দেখতে আলাদা আলাদা দেব- দেবী বা দেবতা না। এগুলো হচ্ছে সেই এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই  বিভিন্ন গুনবাচক নাম। 


পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্র  এই সম্পর্কে বলছে,


★ এক পরমসত্য ঈশ্বরকেই জ্ঞানিগণ ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, দিব্য, সুপর্ণা, বরুণ, গরুৎমান, মাতারিশ্ব, যমসহ প্রভৃতি নামে অভিহিত করে থাকেন। 

- (ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬)


★সেই পরমাত্মাই অগ্নি, আদিত্য, প্রজাপতি, ব্রহ্মা , আপ, বায়ু, শুক্র ও চন্দ্রমা। 

- (যজুর্বেদ ৩২/১)


★ হে সর্বজ্ঞ পরমাত্মা (অগ্নি) আপনি ইন্দ্র, আপনিই বিষ্ণু এবং আপনিই ব্রহ্মা।

- (ঋগ্বেদ ২/১/৩)


★তিনি আর্যমা, তিনি বরুণ,তিনিই রুদ্র, তিনি মহাদেব।

- (অথর্ববেদ ১৩/৪/৪)


★আপনি ব্রহ্মা, রুদ্র, বরুণ, অগ্নি, মনু, শিব, ধাতা, বিধাতা, ও হষ্টা এবং আপনি সর্ব্বদর্শী প্রভু। স্থাবর ও জঙ্গম সমস্ত প্রাণী আপনা হইতে জন্মিয়াছে, এবং আপনিই এই সমগ্র সচরাচর ত্রিভুবন সৃষ্টি করিয়াছেন।

-(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ১৩/৪০৫-৪০৬)


★তুমি বায়ু, যম, অগ্নি, চন্দ্র, প্রজাপতি ব্রহ্মা, অতএব তোমাকে আমি সহস্রবার প্রণাম করি এবং পুনরায় নমস্কার করি। 

- (ভগবদগীতা ১১/৩৯)


★এছাড়াও পবিত্র গীতায় বলা আছে,

"আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য "

- (ভগবদ গীতা ১৫/১৫)

জ্ঞাতব্য শব্দের অর্থ হচ্ছে আলোচ্য বিষয়

অর্থ্যাৎ, সমস্ত বেদে ইন্দ্র,অগ্নি, বিষ্ণু, শিব সহ প্রভৃতি নামে সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মা সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।


♦ এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মার নানা গুণকে তুলে ধরতেই তাকে এইরূপ অসংখ্য নামে পবিত্র বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রে সম্মোধন করা হয়েছে। যেমন,


বিষ্ণু - পরমাত্মা সর্বব্যাপী বলে তার নাম "বিষ্ণু"।

ব্রহ্মা - পরামাত্মা সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা বলে তার নাম "ব্রহ্মা "।

শিব  -  পরমাত্মা কল্যাণস্বরূপ বলে তার নাম "শিব "।

সরস্বতী- পরমাত্মা জ্ঞানস্বরূপ বলে তার নাম"সরস্বতী"।

লক্ষি - পরামাত্মা সমগ্র জগতকে দর্শন ও তিনি এই জগতকে দর্শনীয় করেই নির্মাণ করেছেন বলে তার নাম "লক্ষি"। 

ইন্দ্র -  পরামাত্মা নিখিল ঐশ্বর্যশালী বলে তার নাম "ইন্দ্র"।

অগ্নি - পরামাত্মা সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ, প্রকাশস্বরূপ বলে তার নাম অগ্নি। 


মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী তার অমর গ্রন্থ সত্যার্থ প্রকাশের প্রথম সমুল্লাশে এক ও নিরাকার পরমাত্মার এরকম ১০০ টি নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 


পরমাত্মার এই অসংখ্য নামের মধ্যে "ওম্ " হল সর্বশ্রেষ্ঠ।

পবিত্র বেদে পরমাত্মা বলছেন,

★ অহম্ ওম্ খং ব্রহ্ম (যজুর্বেদ ৪০/১৭)

আমি আকাশের ন্যায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ব্রহ্ম " ওম্ "।


 উপনিষদে বলা আছে, 

★ সমস্ত বেদ যার স্বরূপকে বর্ণনা করে, যার উদ্দেশ্যে সমস্ত তপস্যা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে লাভের জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করে, সেই ব্রহ্মের স্বরূপ হল "ওম্"।

-(কঠোপনিষদ ১/২/১৫)

★ ব্রহ্মকে লাভ করার যত উপায় রয়েছে তার মধ্যে ওম্ -কারই সর্বশ্রেষ্ঠ। এটিই ব্রহ্মের প্রকৃষ্ট জ্ঞাপক। এটিই ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়। 

-(কঠোপনিষদ ১/২/১৭)


অতএব, পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, রুদ্র,মহাদেব, সরস্বতী, লক্ষি, ইন্দ্র,অগ্নি ইত্যাদি এগুলো মোটেও আলাদা আলাদা মানুষের মত দেখতে কোন দেব - দেবী না। এগুলো এক ও অদ্বিতীয়, নিরাকার ঈশ্বরেরই বিভিন্ন গুণবাচক নাম। 


মূলত পরবর্তী সময়ে রচিত বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোতেই এক ঈশ্বরের এই বিভিন্ন নামগুলোকে বিভিন্ন মানুষের মত দেখতে পৃথক দেব-দেবী হিসেবে দেখিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব ও কল্পকাহিনীর অবতারণা করে হিন্দু সমাজকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। 


কিন্তু, সনাতনধর্মে যেকোন বেদবিরুদ্ধ গ্রন্থই সরাসরি নিষিদ্ধ(মনু ১২/৯৫,৯৬)। তাই আমাদের সকল হিন্দুদের এই বেদবিরুদ্ধ পুরাণগুলোকে ত্যাগ করে পবিত্র বেদ ও গীতা, উপনিষদাদি বৈদিক শাস্ত্রের মান্যতাই ফিরে যাওয়া উচিত।  


(এখানে আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার যে, প্রয়োগভেদে এই শব্দগুলোর অন্যান্য অর্থও রয়েছে। যেমন, পরমাত্মা পক্ষে  "ইন্দ্র " অর্থ সর্ব ঐশ্বর্যের অধিকারী। উপরন্তু প্রয়োগভেদে বিদ্যুৎ, শাসক ও বিভিন্ন অর্থেও ইন্দ্র শব্দটি ব্যবহৃত হয়। পরামাত্মা পক্ষে "অগ্নি" অর্থ সর্বজ্ঞ, জ্ঞানস্বরূপ। প্রয়োগভেদে অগ্নি শব্দটি আগুন,তাপ, অগ্রণী নেতা ইত্যাদি অর্থ বোঝাতেও প্রযুক্ত হয়।) 


♦পবিত্র বেদে দেবতা সম্পর্কে ও বলা হয়েছে যে 


★ত্রয়স্ত্রিং শতাস্তুবত ভূতান্য শাম্যন্ প্রজাপতিঃ ।

পরমেষ্ঠ্যধিপতিরাসীৎ।।

(যজুর্বেদ ১৪।৩১)

অর্থ- জগতের প্রভু,সৃষ্টির পালক,সর্ব্বব্যাপী,পরমাত্মার তেত্রিশ ভৌতিক দেব শক্তির অনুশীলন কর। 


(শতপথ ব্রাহ্মন ১৪/৫ ) এ বলা আছে  দেবতা ৩৩  টি যারা ঈশ্বরের মহিমাকে প্রকাশ করে। এগুলো হল, 


★আটটি বসু 

[তাপ( Heat), গ্রহসমূহ(Planets), সুর্য(Sun) ও অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ(Stars), উপগ্রহসমূহ(Satellites), অন্তরিক্ষ (Space), রশ্নি (Rays of etherial space), বায়ু (Atmospheres)]


★এগারটি রুদ্র 

[ দেহের দশ জীবনিশক্তি ও একটি হল জীবাত্মা ]


★বারটি আদিত্য 

[ বছরের বার মাস ]


★একটি ইন্দ্র  [ বিদ্যুৎ (Electricity) ]  ও 


★একটি প্রজাপতি [ যজ্ঞ(Yajna) ]


অতএব, দেবতা মানেই কোন মানুষের মত দেখতে কাল্পনিক সত্ত্বা না। ৩৩ প্রকার দেবতার মধ্যে জীবাত্মা ব্যতিত বাকি সবই এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন সৃষ্টিমাত্র। 


♦এবার আসি দ্বিতীয় আলোচনায়।

 বেদাদি বৈদিক শাস্ত্রে বলা হচ্ছে,


★ পরমাত্মা "অকায়েম" বা শরীররহিত। 

( যজুর্বেদ ৪০/৮, ঈশোপনিষদ ৮)


★তার কোন রুপ নেই। 

(কথোপনিষদ ১/৩/১৫)


★সেই পরমাত্মা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক তথাপি তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত। 

(ভগবদগীতা ১৩/১৫)


★পরমেশ্বর শরীররহিত, ইন্দ্রিয়রহিত। তার সমান বা তার থেকে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই, তার নানা প্রকার শ্রেষ্ঠ শক্তি, স্বরূপভূত জ্ঞানরূপ শক্তি এবং ক্রিয়াশক্তির বিষয় শ্রুতিতেও কীর্তিত হয়েছে।

-(শেতাশ্বতর উপনিষদ - ৬/৮)


★যিনি অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, অগোত্র, অবর্ণ এবং অচক্ষু , অশ্রোত্র, হস্তপাদশূন্য, নিত্য, বিভু, সর্বব্যাপী এবং অতিসূক্ষ্ম, সেই অব্যয় এবং সর্বভূতের কারনকে ধীরগণ সর্বত্র দেখতে পান। 

(মুন্ডকোপনিষদ ১/১/৬)


★পরমেশ্বরের হাত নেই পরন্তু নিজ শক্তিরূপ হাত দ্বারা সবকিছু রচনা ও ধারণ করেন। পা নেই তবুও সর্বব্যাপী হওয়াই সবার চেয়ে অধিক বেগবান, গতিশীল। কোন চক্ষু গোলক নাই পরন্তু সবাইকে যথাযথ দেখেন, কান নেই কিন্তু শুনতে পারেন। তিনি সমস্ত জগৎ কে যথাযথভাবে জানেন কিন্তু তাকে কেউ জানে না। তাহাকে সবথেকে শ্রেষ্ঠ, সব থেকে মহান  বলা হয়। 

(শেতাশ্বতরপনিষদ ৩/১৯)


♦উক্ত Reference গুলো প্রমাণ করে যে সনাতনধর্মমতে ঈশ্বর নিরাকার। 


তবে ঈশ্বরকে সাকারভাবে উপাসনা করা কি সঠিক ?


উঃ-এক, নিরাকার এবং অসীম ঈশ্বর এই জগতের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। তিনি যদি সাকার হয়েও থাকেন সেই সর্বত্র পরিব্যাপ্ত ঈশ্বরের অসীম আকৃতিকে  একটি ছোট্ট মূর্তিতে রূপ দেওয়া কোন মানুষের পক্ষে কখনোই সম্ভব না।


তবে কোন ব্যাক্তি যদি হৃদয়ে নিহিত ভক্তি থেকে নিরাকার ঈশ্বরকে কোন সাকার রূপে কল্পনা করে উপাসনা করে থাকে। তাতে কোন সমস্যা দেখি না। কেননা, পরমাত্মা জানেন যে এই সমস্তকিছুর উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই।

ও৩ম্ 

ব্রহ্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম স্মরণ করে নিরাকারবাদ সিরিজ আরম্ভ করলাম।


নিরাকারের স্বরূপ কী?‌‌ নিরাকার বলতে আপনি কী বোঝেন? বায়ু আদিকে আমরা দেখতে পাই না, এরা কি নিরাকার? 


নিরাকার = নিঃ + আকার, অর্থাৎ আকারের অভাব। যাঁর কোনো আকার থাকা সম্ভব নয়, তিনিই নিরাকার। আকার কোথা থেকে আসে? আমাদের চারপাশে যত বস্তু আছে, যাদের আমরা দেখতে পাই বা পাই না, সবই‌ আকারযুক্ত। যেমন: গোরু, ছাগল, আম, জাম কিংবা চেয়ার টেবিল সবারই আকার আছে, সবাই অণু, পরমাণু, কণিকা দ্বারাই নির্মিত। আমাদের চোখের স্থূলতার বা দূরত্বের দরুণ আমরা দেখতে পাই না, অথচ তারাও অণু পরমাণু আদি দ্বারা নির্মিত। যেমন: আমরা কোলকাতা থেকে শিলিগুড়ি থাকা কোন ব্যক্তিকে দেখতে পারব না। আবার মহাবিশ্বের দূরবর্তী নীহারিকা, নক্ষত্রপুঞ্জ আদিও আমরা দেখতে পাই না। আবার নানা অণুজীব বা বায়ুকণা আছে, আমরা সেগুলোকে দেখতে পাই না। তবে এইসব বস্তুই পদার্থ, এদের আকার রয়েছে। এদের মূল তত্ত্ব বা উপাদান হলো পরমাণু বা নানা কণিকা। বৈশেষিক দর্শনে এই জগতের সব বস্তুর মূল উপাদানের নাম 'পরমাণু' [ বৈশেষিক মতে পরমাণু অবিভাজ্য। এখন আমরা পরিভাষাগতভাবে পরমাণু বলতে atom বুঝিয়ে থাকলেও বৈশেষিক অনুযায়ী সর্বোচ্চ অবিভাজ্য কণিকাই পরমাণু]।


এই পরমাণু বা কোনো পারমাণবিক কণিকাও অনাদি উপাদান নয়, কারণ পরমাণুর সৃষ্টি, ধ্বংস আছে; বিকার আছে, পরিবর্তন আছে। পরমাণুর মূল অর্থাৎ ভরযুক্ত সকল কণিকার মূলভূত উপাদান হলো শক্তি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, শক্তি থেকেই ভরের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ এই সমগ্র জগৎ মূলত অচেতন শক্তির বিকার। সাংখ্য দর্শনে এই শক্তিকেই অভিহিত করা হয়েছে "কারণ প্রকৃতি" নামে। এই জগতের সব উপাদান ও আমাদের আত্মা (চেতনা)‌ ব্যতীত শরীর জড় প্রকৃতির বিকার নানা তত্ত্বের দ্বারা নির্মিত, যাদের আকার আকৃতি রয়েছে। 

সত্ত্বরজস্তমসাংসাম্যাবস্থা প্রকৃতিঃ ।প্রকৃতের্মহানমহতোহহঙ্কারঃ ।অহঙ্কারাৎ পঞ্চতন্মাত্রাণ্যুভয়মিন্দ্রিয়ং-তন্মাত্রেভ্যঃস্হূলভূতানিপুরুষঃ ইতি পঞ্চবিংশতির্গণঃ।। সাংখ্য ১।৬১


যেহেতু সব আকার আকৃতির উৎস প্রকৃতি, এসব বস্তু দ্বারা নির্মিত না, অর্থাৎ জড় প্রকৃতির বিকার নয়, বরং প্রকৃতির মতোই অনাদি বাকি দুই তত্ত্ব ঈশ্বর ও জীবাত্মা নিরাকার। 


ঈশ্বরের নিরাকারত্বের শাস্ত্রীয় প্রমাণ কোথায়?


বেদ,  বৈদিক ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদ্ এবং ষড়দর্শন  মতে ঈশ্বর নিরাকার। 

প্রত্যক্ষ নিরাকারবোধক কিছু শ্রুতিবাক্যসমূহ-


যজুর্বেদ ৪০।৮ (ঈশ উপনিষদ্, ৮ম শ্রুতি) (অকায়ম্ বা শরীর রহিত)

কেন  উপনিষদ ১।৩ (ঈশ্বরকে চোখে দেখা যায় না)

কেন  উপনিষদ ১।৭ (লোকে যেসব দৃশ্যমান বস্তুর উপাসনা করে, তারা ব্রহ্ম বা ঈশ্বর নয়)

কঠ উপনিষদ  ১।২।২২(অশরীরী বা শরীরবিহীন)

কঠ উপনিষদ   ১।৩।১৫(অরূপ বা রূপহীন)

কঠ উপনিষদ  ২।৩।৮(অলিঙ্গ বা লিঙ্গ বা চিহ্নবিহীন)

কঠ উপনিষদ  ২।৩।৯(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না)

কঠ  উপনিষদ  ২।৩।১২(ব্রহ্ম-বাক্য, মন, চক্ষুর অগোচর)

প্রশ্ন  উপনিষদ ৪।১০(অশরীরী)

মুণ্ডক উপনিষদ  ১।১।৬(অপাণিপাদম্ অচক্ষুশোত্রম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত, পা, চক্ষু,‌ কর্ণ নেই।)

মুণ্ডক উপনিষদ  ২।১।২(অমূর্ত)

মুণ্ডক  উপনিষদ ৩।১।৭(অচিন্ত্যরূপ বা ব্রহ্মের রূপ চিন্তা করা সম্ভব নয়)

মুণ্ডক উপনিষদ ৩।১।৮(চক্ষু দিয়ে দেখা যায় না।)

তৈত্তিরীয়  উপনিষদ ২।৭।২(ব্রহ্ম দর্শনাতীত এবং অশরীরী)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ২।১৫ (জন্মরহিত)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৩।১০‌ (অরূপ বা রূপহীন)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৩।১৯ (অপাণিপাদম্ অর্থাৎ ব্রহ্মের হাত পা নেই)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।১ (বর্ণ রহিত)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ  ৪।১৯ (মূর্তি বা প্রতিমা নেই)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।২০ (চক্ষু আদি‌ দ্বারা দেখা যায় না এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৪।২১ (জন্মরহিত)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৫।১৪ (অশরীরী)

শ্বেতাশ্বতর  উপনিষদ ৬।৮ (ব্রহ্মের শরীর এবং ইন্দ্রিয় নেই)

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ  ৬।৯ (লিঙ্গ বা চিহ্ন নেই এবং তাঁর কোন জনক বা পিতা নেই)


ব্রহ্মের নিরাকারত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকা অসম্ভব। এর আরেকটি কারণ ব্রহ্ম তিন কালে‌‌ একরস বা অপরিবর্তিত। আমরা জানি, প্রকৃতির নির্মিত সকল‌ পদার্থেরই বিকার বা পরিবর্তন রয়েছে। বিকার‌ মোট ছয় প্রকার, উৎপত্তি, স্থিতি, বৃদ্ধি, রুগ্নতা, ক্ষয় এবং বিনাশ। ব্রহ্মের শরীর থাকলে ব্রহ্মের পক্ষে তিনকালে একরস হওয়া সম্ভব নয়।


সারসংক্ষেপ- নিরাকার‌ হল আকারের‌ অভাব। সব আকারের উৎস প্রকৃতি থেকেই নির্মিত এই জগতের নানা পদার্থ। আমাদের‌ দেহস্থিত ইন্দ্রিয়, মন আদিও প্রকৃতির বিকার। দেহস্থিত ইন্দ্রিয় আর পদার্থের কারণভূত মূল তত্ত্ব এক থাকায়, আমরা পদার্থের নানা ধর্মকে আমরা দেখতে পাই, স্বাদ গ্রহণ করি, শুনতে পাই, স্পর্শ করে অনুধাবন করতে পারি, আঘ্রাণ নিতে পারি। প্রকৃতি ব্যতীত অন্য দুই সৎ ও অনাদি তত্ত্ব ব্রহ্ম ও জীবাত্মার কোনো আকার বা শরীর নেই।

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...