বিষয়: তৈমুর লঙের ভারত আক্রমণ ও ভারতের বীর যোদ্ধাদের হাতে তৈমুরের পরাজয় - হিন্দু সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ
(যুগ: মধ্যযুগ, সময়কাল: ১৩৯৮ - ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দ)
ইতিহাসে আমাদের পড়ানো হয় তৈমুরের ভারত আক্রমণ ও এদেশের মাটিতে তার হত্যালীলার কাহিনি। কিন্তু তৈমুরের শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হয়েছিল সেটা আমাদের পড়ানো হয় না। আমরা কি কোনোদিনও জানতে পেরেছি যে এই ভারতবর্ষের বীর সন্তানদের হাতেই তৈমুরের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল ?
মধ্য এশিয়ার সমরখন্ডের তুর্কি নেতা আমির তার্ঘির পুত্র তৈমুর লঙের জন্ম হয় ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে। তৈমুর লঙ ছিল মুঘল আক্রমণকারী বাবরের পিতামহের পিতামহ (great great grandfather) - তাকে মুঘলদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়; তার বংশ ‘তিমুরিদ’ বংশ নামে পরিচিত।
তৈমুর ভারত আক্রমণের পূর্বে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশ আক্রমণ করে ও ধ্বংস করে এবং তৎকালীন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ বা প্রায় এক কোটি সত্তর লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। সবশেষে তার নজর এসে পড়ে সভ্য ও সমৃদ্ধ ভারতবর্ষের উপর।
দিল্লীতে তখন তুঘলক বংশের সুলতানদের শাসনকাল, তুঘলকবংশীয় শেষ সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনকালে ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর দিল্লী আক্রমণ করে ও তুঘলক বংশের পতন হয়। এখানে সে ব্যাপক হত্যালীলা চালায় - তখনকার কোনো কোনো নথি অনুযায়ী পুরুষ, মহিলা, শিশুসহ প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষের অধিক মানুষকে তৈমুর নির্বিচারে হত্যা করে! নানা স্থানে মৃতদের খুলির স্তূপ বানানো হয়।
এই ব্যাপক ও নৃশংস গণহত্যা প্রতিরোধ করতে মিরাটের গুর্জর রাজার তত্ত্বাবধানে একটা পঞ্চায়েত গঠিত হয় (যা ‘সর্বখাপ পঞ্চায়েত’ নামেও পরিচিত, এটা ছিল একটা প্রজাতান্ত্রিক সংগঠন ও এর রাজধানী বর্তমানের উত্তরপ্রদেশের মুজাফ্ফর নগরের শোরামে অবস্থিত। এই খাপ পঞ্চায়েত তার ইতিহাস বিভন্ন সময় নানা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, এর মধ্যে তৈমুর, খলজি, বাবর, নাদির শাহ, আবদালি, মারাঠা এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও আছে।) ও অধুনা উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে এক বিশাল অরাজকীয় বাহিনী গড়ে ওঠে।
যোগরাজ সিং পওয়ার এই বাহিনীর সর্বোচ্চ অধিনায়ক নির্বাচিত হন। যোগরাজ ছিলেন সে যুগের এক অতি পরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা। বিভিন্ন উপকথা থেকে জানা যায় যে তাঁর উচ্চতা ছিল প্রায় সাত ফুট নয় ইঞ্চি! তাঁর বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র এত ভারী ছিল যে আজকের দিনের কেউ তা তুলতেও পারবে না! তিনি তাঁর ভারী তলোয়ারের এক কোপে তৈমুরের সেনাবাহিনীর বহু সৈন্যের ধর থেকে মাথা নামিয়ে দেন।
ঐ বাহিনীর অপর দুই সেনাপ্রধান ছিলেন ধুলা ভাঙ্গী (বাল্মীকি) ও হরবীর সিং গুলিয়া (জাঠ)।
অন্যান্য সেনানায়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - গজে সিং জাঠ গাটওয়ালা, তুহিরাম রাজপুত, নেধা রাওয়া, সরযূ ব্রাহ্মণ, উমরা তাগা (ত্যাগী), দুর্জনপাল আহীর।
উপসেনাপ্রধানদের মধ্যে ছিলেন - কুন্দন জাঠ, ধারী গাদারিয়া, ভন্ধু সইনি, হুল্লা নাই, ভানা জুলাহা (হরিজন), আমান সিং পান্ডির (রাজপুত), নাথু পরদার (রাজপুত), ধুল্লা (ধান্ধী) জাঠ, যিনি হিসার থেকে দাদরি ও মুলতান পর্যন্ত আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন, মামচাঁদ গুর্জর, ফালওয়া কাহার। এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন বর্ণ থেকে আরও কুড়ি জন সহকারী সেনানায়ক নিয়োগ করা হয়েছিল।
এছাড়াও এই বাহিনীতে ছিল রামপেয়ারী চৌহানের (গুর্জর) নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার নারীর এক বিশাল প্রমীলা বাহিনী।
দুটি বিশেষ কারণে এই ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ -
এক, এইসময় ভারতীয় সমাজের সর্বস্তরের তথা সব বর্ণের মানুষ স্বেচ্ছায় একত্রিত হয়ে ও বাহিনী গঠন করে বহিরাগত বর্বরদের প্রতিরোধ করে।
দুই, সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথম শুধুমাত্র নারীদের দ্বারা গঠিত রামপেয়ারীর নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার সদস্যার বাহিনী কোনো লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে ও বিজয়ও লাভ করে।
কৃতি কবি চন্দ্রভট্ট এই সংগ্রামের কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
● দিল্লীর সংঘর্ষ: একবার তৈমুরের বাহিনী দিল্লীতে লুটপাট চালাচ্ছিল এবং পুরুষ, মহিলা, শিশুসহ সবাইকে তলোয়ারের কোপে হত্যা করছিল।
এইসময় মধ্যরাতে যোগরাজের নেতৃত্বাধীন কুড়ি হাজার সেনার বাহিনী তৈমুরের বাহান্ন হাজার সেনার উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে ও তাদের নয় হাজার সেনাকে হত্যা করে। যমুনা নদীতে তাদের মৃতদেহ ভেসে যায়। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে এই বীর বাহিনী শহরের বাইরে চলে যায়। এইভাবে তিনদিন ধরে লড়াই চলে।
তৈমুর এতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়, সে কখনও এমন প্রতি-আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি; তাই সে এই গেরিলা বাহিনীকে ধ্বংস করতে দিল্লী ছেড়ে মিরাটের দিকে ধেয়ে যায় ।
● মিরাটের সংঘর্ষ: এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী ও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র সমেত তৈমুর মিরাটে উপস্থিত হয়। কিন্তু এখানেও সে প্রচন্ড প্রতি-আক্রমণের মুখে পড়ে। সারাদিন প্রবল যুদ্ধ করার পর রাতে যখনই তৈমুরের বাহিনী বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থামত তখনই যোগরাজের সেনা তাদের আক্রমণ করে উৎখাত করত।
রামপেয়ারীর নেতৃত্বাধীন বীরাঙ্গনারা স্বদেশী যোদ্ধাদের খাদ্য ও অস্ত্রের যোগান দিতেন। তাঁরা শত্রুপক্ষের যোগানও লুঠ করতেন।
পাঁচশো অশ্বারোহী সংবাদবাহক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই বিশাল বাহিনীর মধ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের কাজ করত। তৈমুরের সেনাবাহিনীর কাছে যাতে কোনো খাদ্য পৌঁছাতে না পারে গুর্জর মহিলারা সেটা সুনিশ্চিত করেন।
অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তৈমুর শেষ পর্যন্ত যোগরাজের জন্মভূমি হরিদ্বারের দিকে গমন করে, উদ্দেশ্য ভারতীয় প্রতিরোধ বাহিনীর শীর্ষনেতাকে হত্যা করা।
● হরিদ্বারের সংঘর্ষ: এবার তৈমুর হরিদ্বারে পৌঁছালে সেখানেও সে গুর্জরদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। যাইহোক সে হরিদ্বারের পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে জ্বালাপুরে এসে পৌঁছায়। সেখানে হরিদ্বারের পুণ্যভূমিতে তৈমুর নরাধমের পদার্পণ আটকাতে তিনটে বড় লড়াই হয়।
প্রথমে হরবীর সিং গুলিয়া পঁচিশ হাজার সেনা নিয়ে তৈমুরের সুবিশাল বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তৈমুর তার বেশ কয়েকজন সেরা সৈন্য ও অশ্বারোহীদের দ্বারা পরিবৃত ছিল, হরবীর এই বেষ্টনী ভেদ করে তৈমুরের একদম কাছে পৌঁছে যান ও তার বক্ষদেশে বল্লম দ্বারা আঘাত করেন।
তৈমুর তার ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়ে যাচ্ছিল, সেসময় তার সেনাপতি খিজরা তাকে রক্ষা করে।
হরবীর তৈমুরের বাহিনীর আক্রমণে প্রভূত পরিমাণে আহত হন ও যুদ্ধক্ষেত্রে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে যান। যোগরাজ পরে তাঁকে উদ্ধার করলেও কিছু সময় পর হরবীর দেহত্যাগ করেন।
এরপর দ্বিতীয়বার তৈমুরের বাহিনীর উপর আক্রমণ নেমে আসে হরিদ্বারের জঙ্গলে। ধুলা ধারধী তাঁর নেতৃত্বাধীন মাত্র একশো নব্বইজন সৈন্যের একটা ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে তৈমুরের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করেন ও তাদের এক বিশাল অংশকে হত্যা করেন। অতি বীরের মত লড়াই করে একশো নব্বইজনই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর তৈমুর শেষবারের মত হরিদ্বার ধ্বংস করার জন্য আক্রমণে উদ্যত হলে সর্বশেষ লড়াইয়ে যোগরাজ, রামপেয়ারী এবং তাঁদের সহযোদ্ধারা বীরদর্পে সেই আক্রমণ প্রতিহত করেন। তৈমুরের সেনাবাহিনীকে তারা প্রচন্ড শক্তিতে আক্রমণ করেন। তাদের শক্তি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত নরাধমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়।
কথিত আছে, এই সর্বশেষ লড়াইয়ে যোগরাজ দেহে পঁয়তাল্লিশটি আঘাত পান কিন্তু তবুও তিনি মনের জোরে তাঁর সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। এর ফলেই তাঁরা গঙ্গার পবিত্র তীর তৈমুরের স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন।
পরাজিত তৈমুর পাহাড়ের পথ দিয়ে পালিয়ে যায়, তার ভারত আক্রমণ ও লুঠের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।। এই দেশের মাটি থেকে তার নির্গমন নিশ্চিত করতে তার সেনাবাহিনীকে হরিদ্বার থেকে অম্বালা পর্যন্ত ধাওয়া করা হয়। তৈমুর ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি এবং পরবর্তী দেড়শো বছর আর কেউ ভারতে আক্রমণের উদ্দেশ্যে আসেনি।
ভারতীয় সেনারা এই যুদ্ধে প্রায় সত্তর হাজার বর্বরকে হত্যা করে।
যে পাঁচ জন সেনানায়ক তৈমুরের যুদ্ধবাজ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ শেষে জীবিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে যোগরাজ ছিলেন একজন, পরবর্তীকালে তিনি জাবেরা রাজ্যের পত্তন করেন।
তথ্যসূত্র:
১. The Royal Gurjars: Their contribution to India - Naunihal Singh, Anmol Publications
২. History of Origin of Some Clans in India - Mangal Sen Jindal (1992)
৩. Conquest of Tamerlane - Cothburn O'Neal (Avon,1952. ASIN: B000PM1IG8)
৪. Uttarakhand ka Itihaas bhag 4 - Dr. Shiv Prasad Dabral, Veer Gatha Press, Dogadda, Pauri Garhwal
৫. Garwal ka Itihaas - HariKrishna Ratauri
৬. Garwal Ancient and Modern - Dr Pritam
৭. Himalayan Folklore - Oakley & Gairola
৮. Gazetteer of British Garwal - H.G. Walton
৯. Prachin Bharat ka Itihaas - Vimal Chandra
১০. Early Chauhan dynasties - Dhasrath Sharma
১১. Ancient History and Civilization - Shailendra Nath Sen
ছবি পরিচিতি:
১. তৈমুর লঙ
২. যোগরাজ সিং পওয়ার
✍️ অজানা
( অজানা ভারতবর্ষ Discover India 🇮🇳)
No comments:
Post a Comment