Friday, 11 October 2024

শাস্ত্রের কিছু কথা।

1) পিতৃপক্ষ।

   পিতৃপক্ষ ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা থেকে শুরু হয় এবং আশ্বিন মাসের অমাবস্যা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে, শুরু হবে দেবীপক্ষ। পিতৃ পক্ষে পূর্ব পুরুষদের স্মরণ করে, তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য শ্রাদ্ধ করা হয়। হরিদ্বার, গয়া,পুষ্কর ও প্রভাস(সোমনাথ) ইত্যাদি স্থানে পিণ্ডদান করলে পূর্বপুরুষরা প্রসন্ন হন এবং তৃপ্তিলাভ করেন। এই এক পক্ষকালকে তাই পিতৃপক্ষ বলা হয়।

    

      হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে; এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

  হিন্দু মহাকাব্য (যা হিন্দুশাস্ত্রের মধ্যে ইতিহাস নামে পরিচিত) অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃ লোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃ গণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করতে হয়।

মহাভারত অনুযায়ী, প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যু হলে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে, তাকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণই দান করেছেন, তিনি পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনোদিন খাদ্য প্রদান করেননি। তাই স্বর্গে তাকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তার পিতৃগণের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, তাই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে পিতৃগণকে স্বর্ণ প্রদান করেননি। এই কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। এই কাহিনির কোনো কোনো পাঠান্তরে, ইন্দ্রের বদলে যমকে দেখা যায়।

 মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাকে তার পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।

 গুরুত্বঃ------

পিতৃপক্ষে পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, "পুত্র বিনা মুক্তি নাই।"ধর্মগ্রন্থে গৃহস্থদের দেব, ভূত ও অতিথিদের সঙ্গে পিতৃ তর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[১] মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।

 বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ, তারা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন। শর্মার মতে, শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে পূর্ববর্তী তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়, তাদের নাম উচ্চারণ করা হয় এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়।।

   কিভাবে_পালন_করবেন_পিতৃপক্ষ :-*

১) যদি বৃষ্টি না হয় বা আকাশ যদি মেঘলা না থাকে তাহলে প্রতিদিন তর্পন করার চেষ্টা করবেন।

২) অনাথ শিশু ও গরীব দুঃখীদের ভোজন করা ও সাধ্যনুযায়ী কিছু দান করার চেষ্টা করবেন। 

৩) বাড়িতে যদি কখনো অপরিচিত কেউ এসে ভিক্ষা চাই বা ভোজনের কথা বলে তাহলে না করবেন না। ( ধর্মনুযায়ী অতিথি নারায়ন ) 

৪) ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদের দান করবেন।( সাধ্যমতো )

৫) যেকোনো পশুহত্যা থেকে বিরত থাকবেন।

৬) যেকোনো সেলাই কাজ থেকে বিরত থাকবেন। ( কর্ম হলে অন্য কথা ) 

আর সবসময় ভগবানের নাম নেবেন,ও প্রাথর্না করবেন। যেন আপনার পূর্বপুরুষের যেন মোক্ষ লাভ হয়।

2:- তর্পণঃ- 

হিন্দুশাস্ত্রে_তর্পণ_কি?

তর্পণ হল ধর্ম অনুযায়ী “ জলের দ্বারা কৃত পিতৃপুরুষ এবং দেবতাদের তৃপ্তি বিধায়ক একটি অনুষ্ঠান”, একে অনেকে পিতৃযজ্ঞও বলে থাকেন। এই যজ্ঞ অনুষ্ঠানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু,শিব প্রমুখ দেবতা, সনক-সনন্দ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সপ্তর্ষি, চতুর্দশ যম ও দ্বাদশ পূর্বপুরুষ (পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী, মাতামহী, প্রমাতামহী ও বৃদ্ধপ্রমাতামহী) এবং ত্রিভুবনের উদ্দেশ্যে জল দেওয়া হয়। পিতৃপক্ষের সময় তিলতর্পণ অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ তিল-মেশানো জলে তর্পণ হয়। তর্পণ শাস্ত্রমতে নিত্যকর্তব্য, তবে আজকের এই জেট যুগে রোজ বাপ-ঠাকুরদাদের স্মরণ করা সম্ভব হয় না বলে, লোকে পিতৃপক্ষে এবং বিশেষ করে - সর্বপিতৃ অমাবস্যায় (যে দিনটিকে আমরা ‘মহালয়া’ বলে থাকি) তিলতর্পণ করেই পিতৃকৃত্য সেরে থাকে।

  তর্পণ মানে খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কাবিজয়ের আগে এই দিনে এমনই করেছিলেন। সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে প্রয়াত পূর্বপুরুষকে স্মরণ করে, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করা হয়।

  এই সম্পর্কে একটি সুন্দর গল্প আছে –

     মহাভারতের যুদ্ধের সময়ে মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে খাবারের পরিবর্তে তাঁকে শুধু খেতে দেওয়া হল সোনা, আর অনেকরকমের ধনরত্ন। কর্ণ অবাক হয়ে এর কারন জিজ্ঞেস করেন ইন্দ্রকে (মতান্তরে যমরাজকে)। তখন ইন্দ্র তাঁকে বললেন – দেখ বাপু তুমি তো সারাজীবন শুধু সোনাদানা মানে ধনরত্ন বিলিয়েছ, পিতৃ পুরুষকে জল দাওনি, তাই তোমার জন্যে এই ব্যবস্থা। তখন মহাবীর কর্ণ বললেন – “এতে আমার কি দোষ? আমি তো আমার প্রকৃত পিতৃ পুরুষের কথা জানতে পারলাম এই সেদিন। 

এর আগে তো অধিরথকেই নিজের পিতা বলে জানতাম। যুদ্ধ শুরুর আগেরদিন রাতে মাতা কুন্তী এসে বললেন আমি নাকি তাঁর ছেলে, শ্রীকৃষ্ণও তাঁহাই বললেন। পরবর্তী কালে যুদ্ধে নিজের ভাইয়ের হাতেই মরতে হল, পিতৃ তর্পণের আর সুযোগ বা সময় পেলাম কই? ইন্দ্র বুঝতে পারলেন এতে কর্ণের কোন দোষ নেই। তাই তিনি কর্ণকে পনেরো দিনের জন্যে মর্ত্যলোকে ফিরে জাবার অনুমতি দিলেন আর বললেন এই এক পক্ষকাল তিনি যেন মর্ত্যলোকে অবস্থান করে পিতৃ পুরুষকে জল দেন, এতেই তাঁর পাপস্খালন হবে।

   যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দিলেন সেই পক্ষটি পরিচিত হল পিতৃপক্ষ নামে। সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষের সূচনা হয়। হিন্দু মতে, এই সময় আমাদের স্বর্গত পিতৃপুরুষগণ স্বর্গলোক ছেড়ে নেমে আসেন মর্ত্যলোকে, এই সময় প্রথম পক্ষেই হিন্দুদের পিতৃতর্পণ করতে হয়। মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। 

3)  নবরাত্র_ব্রত_ব্যাখ্যা

মহালয়া মানে পিতৃপক্ষের অবসান দেবী পক্ষের শুরু

 দেবী মহামায়ার আগমন আসন্ন বোঝায়।

   নবরাত্র ব্রত আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত। মা দুর্গা এই সময় অর্থাৎ আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ তিথি থেকে নবমী অবধি মোট ন'দিন নয়টি রূপ ধারণ করেন। পিতামহ ব্রহ্মা দেবীর এই নয়টি রূপের নামকরণ করেছিলেন। নয়টি নামের নয়টি বৈচিত্রময় রূপভেদ। এঁরা প্রত্যেকেই দেবীর নয়টি কায়াব্যূহ মূর্তি। নবদুর্গা নামে এঁরা বিশেষ পরিচিত। শ্রীশ্রী চন্ডীতে এই নয়টি নামের উল্লেখ আছে।

 নবদুর্গার_এই_নয়টি_নাম। দেবী_শৈলপুত্রী   ( পর্বতের কন্যা)

দেবী_ব্রহ্মচারিণী, (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং

 জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান )

 দেবী_চন্দ্রঘন্টা :- ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর 

বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি )

দেবী_কুষ্মান্ডা   :-( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি )

 দেবী_স্কন্দমাতা,  ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা )

দেবী_কাত্যায়নী, ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী )

 দেবী_কালরাত্রি, ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত )

মহাগৌরী (তিনি সন্তানবত্সলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং

 দেবী_মহাগৌরী, : নবরাত্রির অষ্টম রাতে দেবীর রূপ মহাগৌরি।দুর্গা নাকি আসলে কৃষ্ণবর্ণা | মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন গৌরবর্ণা | তাঁর নাম হয় মহাগৌরী | প্রচলিত বিশ্বাস, নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায় | সাদা পোশাক পরিহিতা, চার হাত বিশিষ্টা দেবীর বাহন ষাঁড় ।

দেবী_ সিদ্ধিদাত্রী*   :-( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন )

শ্রীশ্রীচন্ডীর দেবীকবচ অধ্যায়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোকে নবদুর্গার উল্লেখ আছে।  

প্রথমং শৈলপুত্রীতি দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী।

তৃতীয়ং চন্দ্রঘন্টেতি কুষ্মান্ডেতি চতুর্থকম্‌।।

পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা।

সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি চাষ্টমম্‌।।

নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গা প্রকীর্তিতাঃ।

উক্তোন্যেতানি নামানি ব্রহ্মনৈবমহাত্মানা।।

শ্রীশ্রীচন্ডীতেই প্রথম মহিষাসুরমর্দ্দিণী মাদুর্গার নয়টি রূপের বর্ণনা ও মহিমা প্রকাশিত।

4)  দেবি_মহামায়ার_দশমহাবিদ্যা।  

   দশমহাবিদ্যা  কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা।

 পণ্ডিতেরা বলেন, মা কালীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋকবেদের দেবীসূক্তে। শাক্তরা ঈশ্বরকে যে প্রকৃতি ও পুরুষ রূপে কল্পনা করেন, সেই প্রকৃতিই কালী। যিনি সৃষ্টি করেন, বিনাশও করেন। নারীসত্ত্বা বা দেবীসত্ত্বাকে কেন্দ্র করে যে একাধিক ধর্ম গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল দেবীভাগবত পুরাণ, যা শাক্তদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। মহাবিদ্যা শব্দকে বিশ্লেষণ করলে পাই মহা’ অর্থাৎ মহান, ‘বিদ্যা’ অর্থাৎ রূপ বা প্রকাশ। ‘মহাবিদ্যা’ অর্থাৎ বিশেষ রূপ বা প্রকাশ।

 নারায়ণের দশ অবতার যেমন সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ে বিষ্ণুর আত্মপ্রকাশ তেমনই শক্তির দশটি রূপের প্রত্যেকটিই নারায়ণের ওই অবতারগুলির নারীরূপ।

শক্তির এই দশ মহাবিদ্যা রূপ ধারণের পিছনে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনী। শিব ও সতীর বিবাহে মত ছিল না দক্ষ রাজার। তিনি শিবকে অপমান করার জন্য এক যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সেখানে সমস্ত দেবতাদের আমন্ত্রণ করা হলেও ডাক পেলেন না শিব ও সতী। এদিকে নারদের মুখে সেই বৃহৎ যজ্ঞের আয়োজনের কথা শুনে সতী বাপের বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরলেন। কিন্তু শিবও না ছোড় । তিনি বিনা আমন্ত্রণে সতীকে বাপের বাড়ি যেতে দেবেন না, কারণ তিনি জানেন সেখানে গেলে দক্ষরাজা কটুকথা শোনাবেন যাতে সতী অপমানিত হবেন।

সতী যখন দেখলেন শিব কিছুতেই তাঁকে যেতে দিতে রাজি নন তখন তিনি তৃতীয় নয়ন থেকে আগুন বের করে কালী রূপ ধারণ করলেন। এই হল প্রথম মহাবিদ্যা। সতীর ভয়ঙ্কর রূপ দেখে শিব এক একবার এক একদিকে পালাতে লাগলেন আর সতী প্রতিবার নতুনরূপে শিবকে ভয় দেখিয়ে বাপের বাড়ী যাবার অনুমতি আদায়ের চেষ্টা করলেন। এইভাবে সতী একে একে দশটি রূপে নিজের রূপের প্রকাশ মেলে ধরলেন শিবের কাছে।অবশেষে শিবের অনুমতি পাওয়া গেল। সতীর এই দশটি রূপই হল দশমহাবিদ্যা।

মহারাজ যুধিষ্ঠির বললেন---হে মধুসূদন! আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া একাদশীর নাম কি তা কৃপা করে আমাকে বলুন। 

শ্রীকৃষ্ণ বললেন--হে রাজন! আশ্বিন মাসের একাদশী 'ইন্দিরা' নামে পরিচিত। এই ব্রত পালনে মহাপাপ বিনষ্ট হয়। এমনকি কর্মবিপাকে যারা নিম্নযোনি লাভ করেছেন, সেই পূর্বপুরুষদেরও উত্তম গতি লাভ হয়। এই একাদশীর মাহাত্ম্য শোনামাত্রেই সামবেদীয় যজ্ঞ ফল লাভ করা যায়। 

হে রাজন! মাহিস্মতি নগরে ইন্দ্রসেন নামে এক প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। ধর্ম বিধি অনুসারে রাজ্য পালনে তিনি বিশেষ খ্যাতি সম্পন্ন ছিলেন। তার বিপুল ধনসম্পত্তি ছিল। পুত্র পৌত্রাদিসহ তিনি সুখে রাজ্য পরিচালনা করতেন। বিষ্ণু ভক্তি পরায়ন সেই রাজা নিরন্তর শ্রী গোবিন্দ নাম গানে মগ্ন থাকতেন। একদিন রাজা সুখে রাজসভায় বসে আছেন। এমন সময় দেবর্ষি নারদ স্বর্গ থেকে সেখানে এলেন। তাঁকে দর্শন করে রাজা হাত জোড় করে উঠে দাঁড়ালেন। দন্ডবৎ প্রণাম করে মুনিকে আসন, পাদ্য, অর্ঘ্য আদি ষোড়শোপচারে পূজা নিবেদন করলেন। তারপর বললেন---হে মুনিবর! আপনার দর্শন মাত্রই আমার যাবতীয় যজ্ঞ ফল লাভ হয়েছে। এখন আপনার আগমনের কারণ জানিয়ে আমাকে কৃতার্থ করুন।

দেবর্ষি নারদ বললেন---হে মহারাজ! অতি বিস্ময়কর এক কথা শ্রবণ করুন। আমি এক সময় যমলোকে গিয়েছিলাম। সেখানে যমরাজের রাজসভায়  বহু পুণ্যকারী আপনার পিতাকে দেখলাম। ব্রত ভঙ্গ পাপে তাকে সেখানে যেতে হয়েছে। হে রাজন! আপনার পিতা যে সংবাদ প্রেরণ করেছেন, আমি এখন তা আপনাকে বলছি।

তিনি বললেন ---হে ঋষিবর!  মাহিস্মতির ইন্দ্রসেন রাজা আমার পুত্র। তাকে বলবেন যে, আমি বহু পুণ্য অনুষ্ঠান করলেও কোনো কারণ বশত যমালয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। আপনি কৃপা করে তাকে ভয় সর্বপাপ নাশক ইন্দিরা একাদশী পালন করতে বলবেন। সেই ব্রত প্রভাবে আমি নিষ্পাপ হয়ে স্বর্গ লোকে যেতে পারবো।' এই কথা জানাবার জন্যই আমার আগমন। হে রাজন! আপনার পিতার মঙ্গল বিধানে আপনি যথাবিধি ইন্দিরা একাদশী পালন করুন। 

রাজা জিজ্ঞাসা করলেন--হে দেবর্ষি! সেই ইন্দিরা একাদশীর বিধি কি, কোন তিথি বা কোন পক্ষে এই ব্রত পালন করা কর্তব্য তা কৃপা করে আমাকে বলুন। দেবর্ষি উত্তর দিলেন--- হে মহারাজ! আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের দশমীর দিনে শ্রদ্ধা সহকারে প্রাতঃস্নান করবেন, মধ্যাহ্নে ভক্তি ভাবাপন্ন হয়ে পুনরায় স্নান করবেন এবং রাত্রি কালে ভূমিতে শয়ন করবেন। পরদিন একাদশীতে  প্রাতঃকৃত্যাদি সমাপণ করে নিরাহারে থাকবেন। ব্রতের নিয়মাবলী দৃঢ়ভাবে পালন করবেন। 'হে পুন্ডরীকাক্ষ! হে অচ্যুত! এশরণাগতের প্রতি কৃপা করুন'। এই ভাবে শ্রদ্ধা সহকারে শালগ্রাম পূজা করে পিতার উদ্দেশ্যে ব্রতের ফল অর্পণ করবেন। দ্বাদশীর দিন সকালে ভক্তিভরে শ্রী গোবিন্দের পূজা করে ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে অবশেষে নিজে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করবেন। হে রাজন! বিধি অনুসারে শ্রী হরি এবং ভক্তদের অর্চন করলে আপনার পিতৃবর্গ মুক্তিলাভ করে শীঘ্রই বৈকুণ্ঠে গমন করবেন। রাজাকে এই উপদেশ দিয়ে দেবর্ষি নারদ প্রস্থান করলেন। রাজা ইন্দ্রসেন  মুনির উপদেশ অনুসারে পুত্র পরিজন সহ ভক্তি সহকারে এই ব্রতের অনুষ্ঠান করলেন। তখন দেবলোক থেকে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগল এবং তার পিতাও বিষ্ণুলোকে গমন করলেন। তারপর রাজা ইন্দ্রসেন নিজপুত্রকে রাজ্য ভার অর্পণ করে নিজেও বিষ্ণুলোকে ফিরে গেলেন। এই ইন্দিরা একাদশীর মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণে মানুষ সকল পাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হয়।

 

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...