হৈ হৈ করে শুরু হয়ে গেল শারদীয়া দূর্গা পূজো। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মা দূর্গার মর্তলোকে আগমন ঘটলো।আবার সময়ের স্রোতের ধারার নিয়ম মেনে পূজোও হতে চললো সমাধা।বিসর্জনের করুণ সূর আর মায়ের নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথেই আবার শুরু হলো প্রতীক্ষার শুরু।নষ্টালজিক জাতি বাঙালী।উৎসব মূখরতা ই এজাতির যেন হৃদস্পন্দনের এক আরক।পরম্পরায় উৎসব পালন এ জাতির আজকের নয় সুদীর্ঘকাল থেকে চলে আসা এক ঐতিহ্য।যদিও সংস্কার আর ঐতিহ্য এই জাতির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দোরগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।তাতেও হুঁশ নেই এই জাতির।কারণ অনুকরণের অনুরনন আজ এজাতির মজ্জায় সমাহিত।সাথে দোসর সেকুলারিজিম নামক এক মারণ ব্যাধি আজ এই জাতিকে ধীরে ধীরে পুরোটাই গ্রাস করতে বসেছে।ঠিক ঠিকানা নেই ভবিষ্যতের।অতীতের থেকে শিক্ষা লাভ এ জাতির কাছে বাচালতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তবু সই যদ্দিন এভাবে চলে চলুক।ফুটুস যখন হবে তখন না হয় অপরের ঘাড়ে দোষারোপ করে এজাতি নিজের আত্মশ্লাঘার কিছুটা না হয় উপশমের প্রচেষ্টা করবে।যাই হোক ধান ভানতে শিবের গাজন গেয়ে বোধহয় লাভ বেশী হবে না।তাই এবার মূল বিষয়ে যাওয়া যাক।
হিন্দু সনাতন ধর্মের বর্ণনা অনুযায়ী শরৎ কালে অকাল বোধন নিয়ে নানান মতবাদ মতভেদ রয়েছে।সেসব নিয়ে কচকচানি করতে তৈরিই হয়ে বসে আছেন সমাজের কেষ্টুবিষ্টু রা।কেউ করবে এই পূজো কে কেন্দ্র করে নিজেদের সেকুলারিত্বের উদারতার প্রমাণ জাহির।তো কেউ আবার তুচ্ছ তাচ্ছিল্য সহ যোগে এই পূজোকে নিয়ে নিজেদের খিল্লী প্রকাশ করবে।যাতে প্রমাণ পাবে নিজেদের ধর্মের প্রতি ভক্তির পূর্ণ পরিচয়।
যাক গে স সব তো চলতেই থাকবে।কারণ যে সমাজ অবক্ষয় আর অনুকরণে আসক্ত সেই সমাজে এমন মৌরসীপাট্টা কারীদের মুন্সিয়ানা যে ধীরে ধীরে একটা সংস্কৃতিকে গয়া গঙ্গাঁ করার প্রচেষ্টা করবে সেটাই স্বাভাবিক।
যাই হোক চলুন আজ একটু অন্য বিচার ধারাতে এই পূজোর একটু বিশ্লেষণ করা যাক না হয়।যদিও এই বিশ্লেষণ পড়লে অনেকেই তেড়ে ফূঁড়ে উঠে বলতেই পারেন,এসব মামদোবাজী কোথায় পেলেন?এসব ধম্মে কোথায় আছে দেখান।না হলে ধম্মের নামে এমন বলদা মার্কা লেখা লিখে মানুষ কে বিভ্রান্ত করবেন না।
তা তাদের উদ্দ্যেশ্যে একটাই কথা বলার আছে।আর তা হলো ধর্ম কথাটির অর্থ আর পূজা কথাটির অর্থ আগে সঠিক অর্থ উদ্বার করে দিন সাধারণ মানুষের কাছে।তবেই মালুম হবে আপনাদের পান্ডিত্য।আমরা হলুম গিয়ে
ক-অক্ষর গোমাংস শ্রেণীর মানুষ।আমাদের আর আপনাদের মাঝে তফাৎ যে থাকতেই হবে।
যাই হোক।আমার মত নিরক্ষর মানুষের মতে ধর্ম(ধ+র+ম)এই শব্দটির সহজ অর্থ হলো ধরনে রহিত মঙ্গলময়।অর্থাৎ যার ধারণে জগতের মঙ্গল হয়।এর পরে আসি "পূজা" এর অর্থ বিশ্লেষণে।আমার মত নিরক্ষরের কাছে পূজার অর্থ হলো(পূ+জা)পূর্ণ,জাগরন, অর্থাৎ মানব কূলের অন্তরের মনুষ্যতা পূরণের শর্ত গুলির অন্তর থেকে পূর্ণ জাগরিত করা।যার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের রিপু সকলের দমন হয়ে একজন মানুষের মনুষ্যত্ব লাভের পথের উন্মোচন ঘটে।
যাই হোক,পূজো ও ধর্ম এর সাথে অঙ্গাঙ্গিক ভাবে যেটা জড়িত থাকা সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সেটি হলো অন্তর থেকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি ভাব।মন ও মুখ যতক্ষণ না এক হচ্ছে ততক্ষণ কি পূজোর পূর্ণ শর্ত পূরণ হয়?এই নিয়ে যদি নিজের মধ্যে দ্বন্ধ উপস্থিত হয় তাহলে মন কে সংযত করে তার থেকে উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করতে পারেন।উত্তর পেলেও পেতে পারেন।কারণ পূজোর মূল উদ্দ্যেশ্য ই হল মনের স্থিরতা তৈরি করা আর সেটি মনন,চিন্তনের দ্বারাই।তাই হয়ত পূজোর পদ্ধতি ও আচার, আচরণ দেখলে সহজ মনে হতেই পারে।কিন্তু বাস্তবে যখন ই দর্শক নিজেকে পূজোর যোগ্য করার প্রচেষ্টা করবেন, তখনই তিনি টের পাবেন বিষয়টির গুরুত্ব জীবনের সাথে কতটুকু অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত।
এবার আসা যাক আরেকটি বিষয়ে।যেটি আমার মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।অথচ এটির সম্বন্ধে আমরা বিশেষ ভাবে চিন্তাই করে দেখিনি কখনো।কারণ চোখের সামনে এমন ই অনেক জিনিস হাজারটা প্রতিনিয়ত ই ঘটে চলে।যাকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চাই না।কারণ হয়ত ওসব নিয়ে ভাবিও না আমরা।যাই হোক,চলুন এবার তেমন ই একটি বিষয় কে একটু নিজেদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে চলুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখি। সনাতন ধর্ম অনুসারে আমরা হিন্দুরা দেখে থাকি মাটির মৃন্ময়ীমূর্তি কে প্রস্তুত অর্থাৎ গড়তে বাঁশ,খড়,মাটি প্রাথমিক উপাদান এবং এগুলি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে পরিগনিত হয়।এর পেছনে কারণ টা কি?এটা আমরা কতজন ভেবে দেখি?ওই যে বলা হলো অনেক সাধারণ বিষয় আমাদের চোখের সামনে থাকলেও আমরা সেগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে অবকাশ হয়ত পাই না।কারণ মূখ্য বিষয় থেকে আমরা সরে গিয়ে গৌন বিষয়ে মনোযোগ দিতেই হয়ত বেশী পছন্দ করি।মৃন্ময়ী মায়ের মূর্তি পূজো হবে।আর সেই পূজো উপলক্ষ্য করে আমরা বেশীর ভাগ মানুষ ই ছুটি পাবো রোজকার কর্মব্যাস্ত জীবন থেকে।এটাই হয়ত আমাদের মূল চিন্তার জগত কে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে।তাই হয়ত বাকি বিষয়গুলো আমরা চিন্তা করার সুযোগ পাই না।
যাই হোক এবার না হয়।এই বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবা যাক।
মূলত পূজোর আরেক অর্থ হলো শ্রদ্ধা প্রকাশ।অর্থাৎ পূজো করা মানেই শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হয় পূজিতা/ পূজক মূর্তিকে।সেই শর্ত অনুযায়ী সনাতন ধর্মের মূল যেখানে প্রকৃতি সেখানে প্রকৃতির সমস্ত কিছুকেই,
বিশেষ করে যে সকল প্রাকৃতিক বস্তু থেকে মানুষ উপকৃত হন জীবনের প্রতিটি পদে পদে,সেই সকল কেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজোর মাধ্যমে শ্রদ্ধা ও সম্মান ঞ্জাপন করে থাকেন। এই ক্ষেত্রে বাঁশ হলো ঠিক তেমন ই এক প্রাকৃতিক উদ্ভিদ।যা মানব জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত থাকে চিরকাল।কারণ আগেকার দিনে মানুষের জন্মের পরেই মানব শিশুকে তার জন্মদাত্রীর থেকে নাড়ী কাটতে বাঁশের কঞ্চিই ব্যাবহ্যার করা হত গ্রাম বাংলায়।শুধু নাড়ী কাটাই নয়।বাঁশ হলো আগেকার দিনে মানুষের আচ্ছাদনের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করত।মানুষ বাড়ী বাঁনাতে বাঁশের খুঁটি আর বাঁশের কঞ্চি কেটে বাঁশের চালাতে বাড়ীর ছাদের কাঠামো বানিয়ে নিত।আবার এই বাঁশের খাটুলিতে করেই মানুষের জীবনের শেষ যাত্রা সমাধা হতো।এমন কি আজো গ্রামাঞ্চলে বাঁশ ছাড়া অনেক মানুষের অন্তোষ্টি ক্রিয়া সমাধা হয় না।তাই বাঁশ কে সম্মান জানাতে তা দিয়ে দেব দেবীর প্রতিমার কাঠামো বানানো হয়ে থাকে।এরপর আসে খড়।আমরা সকলেই জানি গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ই শস্যের ব্যাবহ্যার ছাড়া মানুষের জীবন অসম্পূর্ণ।আর গ্রামীন অর্থনীতি তে ধান,গম বিশেষ গুরুত্ব রাখে।আবার এই শস্য দানা বের করে নেওয়ার পর ঔষধি গাছের যে অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকে,সেটি আগেকার দিনে মানুষের মাথার আচ্ছাদন হিসেবে ব্যাবহ্যার করা হতো।এমন কি আজো অনেক গ্রামেই মাটির বাড়ীতে খড়ের চালা বাড়ীও দেখা যায়।এর সাথে এই খড় আবার সমাজে প্রানীকূলের বিশেষ করে গৃহপালিত প্রাণী কূলের ক্ষুধা নিবৃত্তি করে থাকে।তাই যে ঔষধি গাছ সমাজে জীব কূলের উপকার করে তার পুরো জীবদ্দশাতে ও তার জীবদ্দশার পরেও,তাই সেই খড় অর্থাৎ জীবনের আরেক গুরুত্ব পূর্ণ উপকারী বস্তুটি কে দিয়ে বাঁশের কাঠামোর ওপর জড়িয়ে পূজ্য দেবদেবীর মূর্তির রুপ দান করে সেই ঔষধি গাছটিকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো হয়।এর পরে আসে মাটি।এক কথায় বলতে গেলে জীবজগতের জীবন মাটির অস্তিত্ব ছাড়া পুরোই অসম্পূর্ণ।কারণ জন্মের পর থেকে জীবনের অন্তিম যাত্রা পর্যন্ত মাটি ছাড়া জীবের জীবন অচল।তাই তো মাটির অন্য নাম মা।কারণ সন্তান মাকে ত্যাগ করলেও মা কখনো তাঁর সন্তান কে ত্যাগ করেন না।তাই সেই মাটি দিয়েই পূজ্য দেবদেবীর প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়।তাই পূজোর জন্য মূর্তি নির্মাণ করতে এই তিনটি বস্তুর অত্যন্ত প্রয়োজন হয়।এর পর আসে মূর্তিতে রং করা ও শিল্প কলার ছোঁয়া।যেহেতু সনাতন ধর্ম অনুসারে শিল্পচর্চা ১৬ কলার এক কলা তাই এই কলাকে ও পূজোর মাধ্যমে শ্রদ্ধা ভক্তি ও সম্মাণ প্রদান করা হয়।
এর পরে আসা যাক।মা দশভূজার দশটি ভূজে( হস্ত)র বিষয়ে।যেহেতু সনাতন ধর্ম অনুসারে বিশ্বাস করা হয় দিক রয়েছে দশটি।তাই মা দূর্গ্গার দশটি হাতের অর্থ তিনি সকল জীব জগত কে দশদিক অর্থাৎ সমস্ত দিক থেকে রক্ষা করবেন সমস্ত অমঙ্গল থেকে। মায়ের ত্রিনয়নের অর্থ তিনটি স্বত্বার পরিচয়।স্বত্ব তম, রজঃ।মা ত্রিশূল ধারণ করেন এবং সিংহের ওপর অবস্থান করেন।আবার এই সিংহ মহিষের ওপর অবস্থান করে ।এর অর্থ হলো মা দূর্গতিনাশিনি তিনটি কালকে একত্রে হস্তে ধারণ করেন এবং তিন কালের মিলিত শক্তি দিয়েই তিনি কালের শত্রু তথা জগতের অমঙ্গলকামী অসুর নামক শক্তির বিনাশ করেন।মায়ের বাহন সিংহ হলো যা শৌর্ষ আর শ্রেষ্ঠ বীরতার প্রতীক সেই সিংহ মা দশভূজার বাহন হয় কারণ জগতের অমঙ্গল কামী শক্তিকে নাশ করতে গেলে সিংহের মত র্দ্যোদন্ড প্রতাপ রুপী শক্তির ওপরেই ত্রিকাল নিয়ন্তা আদি মাতাশক্তির অবস্থান প্রয়োজন। এর সাথে রয়েছে মা এর সাথে তাঁর চার সন্তান সন্ততির মূর্তি।যা জীবকূলের একাধিক দিক রক্ষা করে আসেন।
মা দূর্গার সাথে কার্তিক,
গনেশ,মা লক্ষী'মা স্বরস্বতী পূজিতা হন?
মা দূর্গা হলেন আমাদের জীবনের দশটি দিক কে সুরক্ষিত রাখবেন।মা লক্ষী মানব কূলের সম্পদ আর অন্নের সমস্ত দিক সুরক্ষিত রাখেন।মানে তিনি জীবজগতের অন্নের সমস্ত দিক সুরক্ষিত রাখেন তাই তাঁকে বন্দনা করা হয়।
মা স্বরস্বতী ।তাঁর শিক্ষা ছাড়া মানব জীবন অসম্পূর্ন তাই তাকে বন্দনা করতে হয়🙏
গনপতি।তার বুদ্ধি।তাঁর সিদ্ধি ছাড়া মানব কূলের জীবন অসম্পূর্ন।
দেব সেনাপতি।কার্তিকেয়।যার সমর ছাড়া জীব জগতের সূর অসুরের মানব জীবনের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
ইঁদুর।যে মানব কূলের খাদ্য সূরক্ষা প্রদান করতে সক্ষম।ময়ূর।যে মানব কূলের সাপরুপী অহং মদমত্ততা কে বিনাশ ঘটায়।
পেঁচক।
যে মানব কূলের নিশি( রাত্রি) অর্থাৎ যখন জীব কূলের সমস্ত স্বত্বা নিস্ক্রিয় থাকে, তখন জীবকূলের সেই স্বত্বা কে বিনাশ করে।।
এদের সহযোগিতা ছাড়া জীব কূলের পূর্ণতা অসম্ভব।তাই দশপ্রহরনী মাদূর্গ্গাকে দূর্গোৎসবে সনাতনীরা আরাধনা করে থাকেন।


দারুন লিখেছো দাদা।
ReplyDelete🙏
ReplyDelete