ভূত.চতুর্দশী
বাংলা ৫ ই কাত্তিক ১৪২৯,
ইংরাজি ২৩শে অক্টোবর ২০২২
*ভূত চতুর্দশীর প্রকৃত অর্থ কী তা বোঝার জন্য*
ভূত চতুর্দশী একটি বাঙালি হিন্দু উৎসব। হিন্দু শকাব্দ অনুসারে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দিন অর্থাৎ দীপান্বিতা কালী পূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশী পালন করা হয়।এই একই দিনে উত্তর ভারতে নরক চতুর্দশী বলে অপর একটি হিন্দু উৎসবও পালিত হয়।এই দিন বাঙ্গালী গৃহস্থের বাড়িতে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো, চৌদ্দ রকম শাক একত্রে রান্না করে অন্নের সাথে খাওয়া ও এ দিন ছেলেদের কপালের ডানে আর মেয়েদের কপালের বায়ে ঘি-তুলসীপাতা- কাজল ধারণের প্রথা রয়েছে।
ভূত চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা হল এরকম। ভূত বলতে আমাদের ধরতে হবে পঞ্চমহাভূত। অর্থাৎ ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোমকে। লক্ষ্যণীয়, কার্তিক মাসের এই চতুর্দশী তিথিতে যে চোদ্দটি প্রদীপ আমরা দিচ্ছি, সেটাও এই পঞ্চভূতের উপাদানেই তৈরি। ঠিক যেমন আমাদের এই শরীর। মাটি দিয়ে তৈরি হল প্রদীপের কায়া, জলে তা আকার নিল, আগুনে তা হয়ে উঠল প্রাণবন্ত, হাওয়া তাকে দিল আলোকময়তা এবং মহাশূন্য জেগে রইল তার খোলে। বিশ্বাস, এই চোদ্দটি প্রদীপের আলো অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে।
কথিত আছে, অমাবস্যার রাতের অন্ধকারে মর্ত্যে নেমে আসেন।
মাতা চামুণ্ডারূপী কালি, চৌদ্দ ভূত দিয়ে অশুভ শক্তিকে ভক্তবাড়ি থেকে তাড়ানোর জন্যে মা কালী নেমে আসেন মর্ত্যে।
যার জন্য এদিনে নিয়ম ছিল ১৪ রকমের শাক খাওয়ার এবং বিকেলে অন্ধকার সরিয়ে আলোয় বাড়ি আলোকিত করতে ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর রেওয়াজ ছিল এবং আজও আছে।
পুরাণে বলা রয়েছে...
সত্যভামার পরামর্শে মহারথী শ্রীকৃষ্ণ নরককে বধ করেন। দ্বারকায় শুরু হয় খুশির উৎসব। দ্বারকাবাসীরা সারারাত প্রদীপ জ্বালিয়ে কৃষ্ণের মঙ্গলকামনা এবং জয়ের আনন্দ উপভোগ করেন। যার জন্য ভূত চতুর্দশী নরক চতুর্দশী নামেও খ্যাত।
তবে এর পৌরাণিক গল্পটিও বেশ মজাদার। বিষ্ণুপুরাণ থেকে জানা যায়, পৌরাণিক সময়ে স্বর্গ মর্ত্য পাতালের অধিপতি ছিলেন রাজা বলি। তিনি এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেছিলেন। তবে শিবভক্ত, দানশীল ও পরাক্রমী রাজা বলি কিন্তু বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন না। তবে দেবতারা বলির পরাক্রমে অস্থির হয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। তিনি বলিকে জব্দ করতে বামন অবতার নিয়ে হাজির হলেন রাজা বলির কাছে।
ভগবান বিষ্ণু বামন অবতার রূপে বলির কাছে তিন পাদ জমি চাইলেন। সব জেনেবুঝেও রাজা বলি তা দিতে সম্মত হলেন। বামন অবতার তখন তাঁর এক পা রাখলেন স্বর্গে, অন্য পা মর্ত্যে। উদর থেকে বেরিয়ে এল তৃতীয় পদ। বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের পৌত্র বলি সেই চরণ মস্তকে ধারণ করলেন। ফলে তাঁর স্থান হল রসাতল বা পাতালে। কারণ মহাবলি রাজা বলি মৃত্যুহীন প্রাণ। তিনি সপ্ত চিরজীবীর অন্যতম। বাকি ছয় জন হলেন ব্যাসদেব, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, পরশুরাম, হনুমান ও বিভীষণ। ভূত চতুর্দশীর রাতে শিবভক্ত বলি মর্ত্যে আসেন পূজা নিতে। সঙ্গে আসেন তাঁর অনুচর ভূতরা।
*i.নিয়মসম্পাদনা.il*
এক্ষেত্রে ভূত শব্দটি কিন্তু যথেষ্ট কৌতুহলব্যঞ্জক। অনেকের ধারণা বা বিশ্বাস ভুত চতুর্দশীর দিন আদাড়-বাদাড়, বেলগাছ, শেওড়াগাছ, বনঝোপ থেকে দলে দলে বেরিয়ে পড়ে রাশি রাশি ভুত বেড়িয়ে পড়ে।
এই সব ভূতেদের ভয়ে ভূত চতুর্দশীর দিনে বাড়ির অন্ধকার কোনায় কোনায় জ্বেলে দেওয়া হয় চোদ্দো প্রদীপ। কিন্তু এখানে ভূত মানে অতীত। এই দিনটিতে বাঙালিরা চৌদ্দ শাক খেয়ে চৌদ্দপুরুষকে স্মরণ করেন।
পুরাণ অনুযায়ী মনে করা হয়, এই দিন স্বর্গ ও নরকের দ্বার কিছু ক্ষণের জন্য উন্মোচিত হয়। একই সঙ্গে বিদেহী আত্মা এবং স্বর্গত ব্যক্তিরা নেমে আসেন পৃথিবীতে। প্রদীপের চিহ্ন দেখে নিজেদের উত্তর পুরুষের ভিটেয় পৌঁছে যান। তাঁদের আশীর্বাদ করেন। তাই ভূত চতুর্দশীর দিনে ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে।
🍁🌿 হিন্দু ধর্ম মতে মৃত্যুর মানব দেহ পঞ্চভূতে (ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম) বিলীন হয়ে পাঁচ উপাদানের মধ্যেই মিশে থাকেন। তাই প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা ১৪ রকমের শাক মৃত ১৪ পুরুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। ১৪ শাক ধোয়ার পর সেই বাড়ির প্রতিটি কোনে ছিটিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রেত ও অশুভ শক্তি দূর করতে বাঙালি গৃহস্থরা এই দিন সন্ধেয় বাড়িতে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে থাকেন।
🍁🌿 বাংলার ঋতু প্রকোপ অন্য প্রদেশের থেকে বেশি হওয়ার জন্য আশ্বিন ও কার্ত্তিক মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। এই সময় ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সরষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষুনী, শেলু এই চৌদ্দটি শাক একত্রে খাওয়া হয়। বাংলার নব্য স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য (১৬ শতাব্দী) তার অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” উল্লেখ করেছেন “নিৰ্ণয়া-মৃতের” (একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ) অভিমত অনুসরণ করে..
"ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।
ভূত চতুর্দশীর দিন বাংলার ঘরে ঘরে চোদ্দ শাক খাওয়ার রীতি।
🌈১) এদিন চৌদ্দ শাক খাওয়ার পাশাপাশি চৌদ্দ প্রদীপ দেওয়ার রীতিও রয়েছে। মূলত, এমন দিনে ইষ্ট দেবতা ছাড়াও পূর্ব পুরুষকে স্মরণ করে প্রদীপ দেওয়ার রীতি প্রচলিত। বাড়িতে যেন যমের ছায়া না পড়ে আর অলক্ষ্মীর বাস না হয়, তার জন্যই এমন রীতি প্রচলিত। মনে করা হয় প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে মিশে থাকে দেহ। আর সেই প্রকৃতির ১৪ টি শাককে এক এক একটি পুরুষের উদ্দেশে উৎসর্গ করে খাওয়ার রীতি পালিত হয়। শাস্ত্র মতে বলা হয়, এমন চতুর্দশী তিথিতে মা কালী নরকাসুরকে বধ করেছিলেন। সেই থেকে বহু জায়গায় এমন দিন নরক চতুর্দশী নামে পরিচিত।
২. শিব পুজো করুন*
মনে করা হয় , ভূত চতুর্দশীর দিন যদি মহাদেবকে পুজো করা হয়, তাহলে নির্বাণ লাভ করা যায়। যা চাইবেন তাই এদিন পাওয়া যায়। মনে করা শিবপুজো করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা যায় এদিন। ভূত চতুর্দশীর দিন যদি শিবের পুজো করা হয়,তাহলে নরক গমনের হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
৩. ভূত চতুর্দশীর স্নান*
ভূত চতুর্দশীর দিন তেল, ফুল ও চন্দন মিশিয়ে একটি পাচন বানিয়ে তা মেখে স্নান করলে বহু অশান্তি কেটে যায়। এদিন ইষ্টদেবতার উদ্দেশ্যে চালের গুঁড়ো, তিলের গুঁড়ো, ঘি ও চিনি দিয়ে পুজো করলে মনের ইচ্ছাও পূরণ হয় বলে দাবি করেন, তিলের তেল যদি স্নানের আগে এই দিনে মেখে নেওয়া যায়, তারপর স্নান করা যায়, তাহলে তা খুবই সুফল দিতে পারে। এদিন স্নানের জলে তুলসী পাতা ফেলে দিলে তা কার্যকরী ফল দেবে বলে মনে করেন অনেকে
*৪. কোন রঙের পোশাক পরা উচিত?*
ভূত চতুর্দশীর দিন কোনও মতেই কালো রঙের পোশাক পরতে নিষেধ করছেন শাস্ত্রজ্ঞরা। তাঁদের মতে এমন দিনে রঙিন পোশাক পরা উচিত।
*৫. ঘর পরিষ্কার রাখুন*
এদিন ঘরে কোনও নোংরা রাখা উচিত নয়। ঘর রাখতে হবে ঝকঝকে, তকতকে। তবে সার্বিক সুফল মিলবে।
*৬. ভাঙা বাসন সরিয়ে ফেলুন*
বাড়িতে ভাঙা জিনিস, বাসন পত্র থাকলে তাও সরিয়ে ফেলা উচিত বলে পরামর্শ দেন অনেক
*৭. দরজায় দুটি প্রদীপ জ্বালান*
ঘরের বাইরে এই দিনে সদর দরজার কাছে দুটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে তা ভাল ফল দেয়।
যমের প্রতি প্রদীপ সমস্ত ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি দেওয়ার কাজ করে। ফলে বহু বাড়িতেই ভূত চতুর্দশীর রাতে যমের নামে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি পালিত হয়। শাস্ত্র মতে মনে করা হয় এই কাজ করলে, তা শুভ ফল দেবে।
এক্ষেত্রে ভূত শব্দটি কিন্তু যথেষ্ট কৌতুহলব্যঞ্জক। অনেকের ধারণা বা বিশ্বাস ভুত চতুর্দশীর দিন আদাড়-বাদাড়, বেলগাছ, শেওড়াগাছ, বনঝোপ থেকে দলে দলে রাশি রাশি ভুত বেড়িয়ে পড়ে।
এই
🍁🌿ভূত-পেত্নী, এককথায় অশরীরি আত্মা।
ভূত চতুর্দশীর রাতের ১৪ ভূতের নাম।
*১)ব্রহ্মদৈত্য, ২)পেত্নী, ৩)শাকচুন্নি, ৪)ডাইনী,*
*৫)স্কন্ধকাটা: মাথাবিহীন ভূত,*
*৬)মেছোভূত: মাছলোভী ভূত,*
*৭)পেঁচাপেঁচি: জোড়া ভূত,*
*৮)মামদো ভূত: ,৯)নিশি: খুব ভয়ংকর ভূত,*
*১০)কাঁদরা-মা: অনেকটা নিশির মত,*
*১১)চোরাচুন্নি: দুষ্ট ভূত। কোনো চোর মারা গেলে 'চোরাচুন্নি' ।*
*১২)কানাখোলা: গভীর নির্জন চরাচরে মানুষকে পেলে তার গন্তব্য ভুলিয়ে দিয়ে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়।*
*১৩)আলেয়া: জলাভূমির ভুত (Alea)। এরা জেলেদেরকে বিভ্রান্ত করে।*
*১৪)দেও: এ ধরনের ভূত (Deo)নদীতে বা লেকে বসবাস করে। এরা লোকজনকে জলে ফেলে ডুবিয়ে মারে।*
জয় মা🙏
No comments:
Post a Comment