Tuesday, 1 March 2022

বাংলার এক নমস্য রাজ্যপাল

 আজ তাঁর জন্মদিন এ রাজ্যের এক রাজ্যপালের গল্প শোনাই। নাম ছিল তাঁর হরেন্দ্রকুমার মুখার্জী। ইংরেজিতে লিখতেন Harendra Coomar Mookerjee। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত রাজভবনের মালিক ছিলেন। ভোরবেলা রাজ্যপালের হাঁটতে বেরোনোর অভ্যাস। এক শীতসকালে বেরোতে গিয়ে দেখলেন লিফটম্যান সারা রাত ডিউটি করে লিফটের পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার ঘরে ফিরে গিয়ে একটা শাল নিয়ে এসে লিফটম্যানের গায়ে জড়িয়ে দিয়ে প্রাতঃভ্রমণে নেমে গেলেন রাজ্যপাল। পরে লিফটম্যান ঘুমিয়ে পড়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে শাল ফেরত দিতে এলে বলেছিলেন, ছোট ভাইকে দেওয়া উপহার ফিরিয়ে নিতে নেই। মাইনে পেতেন ৫০০০ টাকা। ৫০০ নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা দুঃস্থদের এবং টিবি রোগীদের চিকিৎসায় দান করে দিতেন। একবার রাজভবনের সব কর্মচারীদের ডাকলেন চায়ের নেমন্তন্নে। সবাই শঙ্কিত। হরেন্দ্রকুমারের একটা 'বদভ্যাস' আছে। এইসব চায়ের পার্টি ডেকে টাকা তোলেন আর পরে তা বিলিয়ে দেন সামাজিক উন্নয়নে। এবারও না চাঁদা চেয়ে বসেন। চা-পর্ব শেষ হলে রাজ্যপাল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাত জোড় করে বললেন, আমি গরীব রাজ্যপাল। আদেশ করতে পারি না। বরং আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ আছে। আপনারা জানেন যে আমায় টিবি ফান্ডের খাতাপত্রের হিসেব রাখার জন্য একজন লোক রাখতে হয় মাইনে দিয়ে। আপনারা যদি একটু ভাগাভাগি করে হিসেবপত্তরগুলোর দায়িত্ব নেন, তাহলে সে টাকাটা বেঁচে যায়। ওই টাকা দিয়ে বরং রোগীদের কিছু ফলমূল কিনে দিতে পারি। শুনে সবার মাথা হেঁট। ওঁর স্ত্রী-র নাম ছিল বঙ্গবালা। রাজভবনের কর্মীরা ওঁকে 'মা' ডাকতেন। বিলাসব্যসন শূন্যে নামিয়ে এনেছিলেন বলে রাজভবনের অতিথিদের কেউ কেউ দিল্লি ফিরে গিয়ে নেহেরুর কাছে নালিশ করেন। মৃত্যুর আগে রাজ্যপালের ফান্ডে আট লক্ষ টাকা জমিয়ে দান করে গেছিলেন হরেন্দ্রকুমার মুখার্জী। 


রাজভবনে তো অনুমতি ছাড়া কারোর প্রবেশ নিষেধ। সাধারণের তো নয়ই।


কিন্তু অনেকেই দেখছেন, একজন বৃদ্ধ মানুষ মাঝে মাঝেই এসে সটান ঢুকে যাচ্ছেন রাজভবনের ভেতর। রক্ষীরা কেউ কিছু বলছেও না। কী হল ব্যাপারটা? ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতেই একাংশ চিনতে পারলেন ওই বৃদ্ধ ব্যক্তিটিকে। এ যে শরৎচন্দ্র পণ্ডিত; মানে দাদাঠাকুর! এসেছেন ‘বন্ধু’র সঙ্গে একটু দেখা সাক্ষাৎ করতে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। দাদাঠাকুর যাঁর কথা বলছেন, তিনি আর কেউ নন, ডঃ হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৃতীয় রাজ্যপাল। আরও ভালো করে বললে, পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র পূর্ণ সময়ের রাজ্যপাল, যিনি ছিলেন বাঙালি!

বাঙালি মানে যাকে বলে ফ্রম টপ টু বটম; আদ্যোপান্ত বাঙালি। আর হবেন নাই বা কেন। এত বিশাল জায়গায় গিয়েও মনটা যে মাটির দিকেই পড়ে রয়েছে। যেমন স্বভাব, তেমন ব্যক্তিত্ব, তেমনই তীক্ষ্ণ মেধা। অবশ্য স্রেফ রাজ্যপাল হিসেবেই তাঁকে মনে রাখেনি ইতিহাস। পড়াশোনায় ছিলেন তুখোড়। হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়ই ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে প্রথম ডক্টরেট। পরে সেই বিভাগের প্রধানও হয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়তেই আরও নানা পদে ছিলেন তিনি।

হরেন্দ্রকুমারের সঙ্গে দাদাঠাকুরের সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বের, স্নেহের। একে অপরকে শ্রদ্ধাও করতেন। দাদাঠাকুরের ব্যঙ্গ ও রসিকতা তো কিংবদন্তিসম। সেই রস থেকে বঞ্চিত ছিলেন না হরেন্দ্র। তাঁর কড়া নির্দেশ থাকত, দাদাঠাকুর এলে যেন কেউ তাঁর পথ না আটকান। একদিন রাজভবনে ঢোকার পরেই রাজ্যপাল কুশল জিজ্ঞাসা করছেন। আসতে কোনো অসুবিধা হয়েছে কিনা, এই প্রশ্নটাই করেছেন তখন। দাদাঠাকুরের বক্তব্য, ‘কিছু অসুবিধা হয়নি। একজন নরকের সঙ্গী আমাকে এগিয়ে দিয়ে গেছে।” এই কথাটা শুনে রাজ্যপাল একটু ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে গেলেন। নরকের সঙ্গী! সেটা আবার কী? দাদাঠাকুরের বক্তব্য, ‘ওই যে, যাঁদের মাথায় হেলমেট থাকে, তারাই তো নরকের সঙ্গী । হেল মানে নরক আর মেট মানে সঙ্গী!’


এইরকমই একদিন কথাবার্তায় হঠাৎ দাদাঠাকুর বলে উঠলেন, ‘আপনার নামটা ভুল।’ হরেন্দ্রকুমার তো অবাক! বলেন কী! এতদিন এই নামটা ব্যবহার করছি, বাপ-ঠাকুরদার দেওয়া, ভুল হয় কী করে? এই প্রশ্নটিরই অপেক্ষা করছিলেন দাদাঠাকুর। সঙ্গে সঙ্গে জবাব, ‘আপনি যা উপার্জন করেন, তার সবই দান করেন। অথচ আপনার নাম হরেন। কিন্তু আপনি তো হরণ করেন না!’ মজার কথা হলেও, হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়ের স্বভাবটাই ছিল সেরকম। একদম সাদাসিধা জীবন। যেটুকু দরকার না হলেই নয়, সেটুকু নিয়ে থাকতে চান তিনি। যা রোজগার করেন, সবই দান করে দেন। আগেও এমনটা করেছিলেন। অধ্যাপক থাকাকালীনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে তিন লাখ, পরে আরও এক লাখ টাকা দান করেন। সেই সময় এই টাকার মূল্য আরও বেশি ছিল। এছাড়াও যখন তিনি সেখানকার ইন্সপেক্টর, তখনও খ্রিস্টান যুবকরা যাতে ঠিকঠাক শিক্ষা পায়, অসুবিধা না হয় সেটা দেখতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বাবা-মা’র নামে একটি ফান্ডও তৈরি করেন। প্রথমে দুই লাখ, পরে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা সেখানে দেন।


১৯৫৬ সালের আগস্টে মারা যান রাজ্যপাল ডঃ হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়। বয়স তখনও ৭০ পেরোয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর আরও এক বাঙালি, ফণীভূষণ চক্রবর্তী রাজ্যপাল হন; কিন্তু সেটা মাত্র তিন মাসের জন্য। পূর্ণ সময় অবধি তাঁর মেয়াদ ছিল না। তারপর আজ পর্যন্ত বাংলা কোনো পূর্ণ সময়ের বাঙালি রাজ্যপালকে পায়নি। ডঃ হরেন্দ্রকুমারই এক এবং একমাত্র। তবে মারা যাওয়ার আগেও, নিজের সারা জীবনের কাজের সঞ্চয় ১৭ লাখ টাকা দিয়ে যান তাঁর সাধের প্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। একপ্রকার নিঃস্ব হয়েই তাঁর মৃত্যু! এমন মৃত্যুও তো সুখের…


(সংগৃহীত)

No comments:

Post a Comment

T.S. কনকা আর্মি নিউরো সার্জেন

 সাল ১৯৬২। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। সীমান্তে আহত জওয়ানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে। সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে যোগ দিলেন ...